kalerkantho


সহৃদয় প্রাণে বদলে গেল শামীমার জীবন

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি নিয়ে এবারের পুরো আয়োজনে লিখেছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ। সহযোগিতা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ডিং, কমিউনিকেশনস অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ ইমতিয়াজ

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সহৃদয় প্রাণে বদলে গেল শামীমার জীবন

ছবি : শারাবান তহুরা আলী শারিন

রাজশাহীর তানোরের মেয়ে শামীমা আক্তার। বাবা আসমত আলী মুদি দোকানদার। টেনেটুনে চলে তাঁদের সংসার। শামীমা ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার পর থেকে মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার ইচ্ছা গেড়ে বসল বাবার মনে। মেয়েকে আরো ভালো করে লেখাপড়া করতে উৎসাহ দিতে লাগলেন। এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ‘জিপিএ ৫’ পেলেন শামীমা। এইচএসসি পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। অনেকের সঙ্গে আলাপ করে বাবা জানলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেতে হলে ভর্তি কোচিং করতে হয়। কিন্তু কোচিং ভর্তির ১০ হাজার টাকা তো তাঁর নেই। তা-ও মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে যেকোনো মূল্যে টাকা জোগাড় করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। তবে মেয়ে নারাজ। বাবাকে ধার-কর্জ করতে হবে বলে তিনি কোচিংয়ে পড়তে চাইলেন না। বাবাকে বললেন, যা থাকে কপালে, নিজের মতো করে পড়ালেখা করে ভর্তির চেষ্টা করব। কোথাও সুযোগ না পেলে আমাদের তানোর ডিগ্রি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করে চাকরি করে সংসারের অভাব মেটাব। এইচএসসির ফল প্রকাশিত হয়ে গেল। এবারও তিনি ‘জিপিএ ৫’ পেলেন। অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে শামীমার ভালো ফলাফলের কথা চারদিকে রটে গেল। পরিচিত এক সাংবাদিক সৌরভ হাবিব তাঁদের বাড়ি এলেন। তাঁর ভালো ফল, জীবনযুদ্ধের গল্প এক বহুল প্রচারিত দৈনিকে ছাপানো হলো। তিনি বলে গেলেন, চিন্তা কোরো না। এবার তোমার পাশে কেউ না কেউ দাঁড়াবেন। এক টিভি চ্যানেলও তাঁর খবর প্রচার করল। ঠিক তা-ই হলো। দুই দিন পর হঠাৎ শামীমার মোবাইলে ফোন এলো। ওপাশ থেকে এক ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি কোহিনূর কেমিক্যাল কম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড থেকে বলছি। আমাদের প্রতিষ্ঠান আপনার লেখাপড়ার সব খরচ বহন করতে চায়। আপনি মানুষের মতো মানুষ হোন, দেশকে আপনার মেধায় আলোকিত করুন।’ এবার শামীমার চোখের পানি আর বাঁধ মানল না। তিনি খুশিতে কাঁদতে লাগলেন। কান্না থামলে সেই ভদ্রলোক বললেন, ‘ঢাকায় সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি নামে একটি ভালো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আমরা আপনাকে সেখানে বিনা বেতনে পড়াব।’ শামীমা সৌরভ ভাইকে ফোন করলেন। তাঁর পরামর্শে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কথা ভাবলেন তিনি। মা-বাবাও মেয়েকে ঢাকায় পড়তে পাঠাতে রাজি হলেন। তবে কোনো কোনো প্রতিবেশী বললেন, অচেনা-অজানা এক মানুষের ফোন পেয়ে সে কেন ঢাকায় যাবে? কোথায় থাকবে? যদি কোনো ক্ষতি হয়? ভয়ে বাবার বুক কেঁপে উঠল। তবে মা সোনাবান বিবি মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার সারা জীবনের স্বপ্নটি পূরণ করবেন বলে কারো কথায় কান দিলেন না। তাঁর মনে হলো, মানুষটি ভালো না হলে তাদের সাহায্য করতে চাইবেন কেন? তাঁর কথায় বাবাও রাজি হলেন। বাবার হাত ধরে, সৌরভ ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার পথে রওনা করলেন শামীমা আক্তার। এসে উঠলেন সৌরভ ভাইয়ের এক আত্মীয়ের বাসায়। মনে মনে ঠিক করে এসেছিলেন, প্রকৌশলের কোনো বিষয় পড়বেন। তবে সেই বাসার অনেকে বললেন, ‘দেশে এখন অনেক টেক্সটাইল মিল, টেক্সটাইলে পড়লে ভালো চাকরি পাওয়া যায়।’

পরদিন তাঁরা কোহিনূর কেমিক্যাল কম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডে এসে চমকে গেলেন। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিমের অফিসে এসেছেন তাঁরা। তিনিই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন! তবে তিনি এই মেধাবী মেয়েটিকে খুব সাহায্য করলেন। বললেন, ‘আমরা আপনার লেখাপড়ার খরচ তো দেবই, থাকা-খাওয়া নিয়েও চিন্তা করতে হবে না। আপনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে থাকবেন। নিরাপত্তা খুব ভালো। আপনার খাওয়া, বই-খাতা কেনা, চলাফেরা—সব খরচ আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে আমি নিজে বহন করব।’ এভাবেই সহৃদয় এক মানুষের সাহায্যে বদলে গেল মেধাবী এক শিক্ষার্থীর জীবন। সেদিন রেজাউল করিম সাহেব সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার মহোদয়কে ডেকে নিয়ে এলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সিট ও ভর্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। বললেন, ‘আপনি কোন বিষয়ে পড়তে চান?’ তখনো শামীমার ঘোর কাটেনি। মানুষ মানুষের জন্য এতটা করে? আমতা আমতা করে তিনি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার কথা জানালেন। এরপর তিনি তাঁকে আরো একটি পরামর্শ দিলেন, ‘আমাদের ফল সেমিস্টারের আর দুটি মাস বাকি আছে। দুই মাস পর স্প্রিং সেমিস্টারে ভর্তি হলেই ভালো। বাড়ি গিয়ে এই সময়ের মধ্যে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে আসতে পারবেন।’

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে আবার ঢাকায় এলেন শামীমা। গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং বিভাগে লেখাপড়া শুরু করলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকেন। মন দিয়ে ক্লাস করেন, হোস্টেলে ফ্রি পড়েন। প্রথম সেমিস্টারে প্রথম হলেন। প্রতি মাসের প্রথম তারিখে কোহিনূর কেমিক্যালের মালিকের পক্ষ থেকে হাতখরচের টাকা তাঁর কাছে পৌঁছে যায়। শামীমা প্রতি সেমিস্টারেই ভালো ফল করতে লাগলেন। অনার্সে তিনি বিভাগের সর্বোচ্চ সিজিপিএ ‘৩.৮৫’ পেয়েছেন। ইন্টার্নও করেছেন রেজাউল করিম সাহেবের বিদিশা নিটেক্স লিমিটেডে। সেখানেও সবাই তাঁর কাজের সুনাম করেছেন।

শামীমা এখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার, ঢাকার গাজীপুরে ‘স্প্যারো অ্যাপারেলস লিমিটেডে’ চাকরি করেন। তাঁদের বাড়িতে এখন আর আগের মতো অভাব নেই। একটি মেয়ে আর তাঁর সহৃদয় অভিভাবক বদলে দিয়েছেন তাঁদের দুঃখ। আরো ভালোভাবে নিজের পায়ের মাটি শক্ত করে এমএসসি করবেন তিনি। শামীমা স্বপ্ন দেখেন—এরপর শিক্ষকতা পেশায় আসবেন। তাঁর আলোয় আলোকিত হবে হাজারো তরুণ প্রাণ।



মন্তব্য