kalerkantho


যেভাবে চাকরি পেলাম

হ্যান্ডব্যাগে বাংলাদেশ ও পৃথিবীর মানচিত্র রাখতাম

জুতসই একটি চাকরি বগলদাবা করা সহজ কর্ম নয়। সানজিদ সাদকে চাকরি পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-পরিচালক সোহেল নওরোজ

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হ্যান্ডব্যাগে বাংলাদেশ ও পৃথিবীর মানচিত্র রাখতাম

এইচএসসির পর মেডিক্যাল ভর্তি কোচিং করেছিলাম। স্বভাবতই বাড়ির সবার প্রত্যাশা ছিল ডাক্তার হয়ে তাদের মুখ উজ্জ্বল করব। কিন্তু যখন তা হলো না, আর সবার মতো আমিও হতাশ হয়েছিলাম। তবে মুষড়ে পড়িনি। ভর্তি হয়েছিলাম ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় ছিল মাৎস্যবিজ্ঞান। মাছের জীবনচক্র নিয়ে পড়ার সময় শুরুতে অস্বস্তি লাগত। তবে তা দ্রুতই কাটিয়ে উঠেছিলাম। ঠিক করেছিলাম নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে সবার প্রত্যাশার প্রতিদান দিতে হবে। সেই থেকে নিজেকে তৈরি করেছি।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে, তাদের প্রথম লক্ষ্য থাকে বিসিএস ক্যাডার হওয়া। কৃষির ছাত্রদের জন্য বিসিএসে টেকনিক্যাল ক্যাডারে পদ বেশি, প্রতিযোগী থাকে জেনারেল ক্যাডারের চেয়ে কম। আমি একটু ভিন্ন পথে হেঁটেছিলাম। টেকনিক্যাল ক্যাডার বাদ দিয়ে চয়েস ফরমে শুধু জেনারেল ক্যাডার নির্বাচন করেছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে শুরু করেছিলাম জোর প্রস্তুতি। বিসিএস দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাই এর পাশাপাশি আরো কিছু চাকরির আবেদন করেছিলাম। বিসিএসের প্রস্তুতি অন্য নিয়োগ পরীক্ষায় খুব কাজে দিত। প্রশ্নগুলো আমার জন্য সহজ হয়ে যেত। বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় গণিত এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়নি। এ সময় অন্য বিষয়গুলো ঝালিয়ে নিতে পারতাম।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে সহকারী গবেষক হিসেবে নিয়োগ পাই। এটি ছিল আমার প্রথম চাকরি। এর জন্য কোনো লিখিত পরীক্ষা দিতে হয়নি। শুধু মৌখিক পরীক্ষা দিয়েই মনোনীত হয়েছিলাম। প্রথম চাকরিতে খুব বেশি দিন স্থায়ী হতে পারিনি। তিন মাসের মাথায় মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি প্রকল্পে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পাই। এটি আমার বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পোস্টিং ঢাকায় হওয়ায় সাত-পাঁচ না ভেবে যোগ দিই।

চাকরি আর বিসিএসের প্রস্তুতি একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে কোচিংয়ে ভর্তি হই। নিজের মতো করেই প্রস্তুতি নিয়েছি। কোচিংয়ের ক্লাসে নিয়মিত না হলেও লেকচার শিট সংগ্রহ করে সেগুলোতে চোখ বোলাতাম। কোচিংয়ের মডেল টেস্ট প্রস্তুতিতে সহায়ক হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগের এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হই। একসঙ্গে দুটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় আত্মবিশ্বাসের পালে নতুন হাওয়া লাগে। বিসিএসের জন্য নিজেকে তৈরি করতে আরো মনোযোগ দিই। দুর্বলতা দূর করতে এবং কম জানা বিষয়গুলো চিহ্নিত করে সেদিকে জোর দিই।

বিভিন্ন ঘটনার সাল-তারিখ মুঠোফোনে মেসেজ ড্রাফটে লিখে রাখতাম। যানজটে আটকে থাকার সময় সেগুলোতে চোখ বোলাতাম। হ্যান্ডব্যাগে বাংলাদেশ ও পৃথিবীর মানচিত্র রাখতাম। ফুরসত পেলেই দেখে নিতাম। বিভিন্ন বিষয়ের জন্য সময় ভাগ করে নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছি। তাই বেশ ভালো প্রস্তুতি হয়েছিল। বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। প্রায় কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা হয়। বিসিএসের আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়োগের ফলাফল প্রকাশ হয়। তাতে উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ পাই। বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমিতে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ চলছে। এমন সময় বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হয়। তাতে সমবায় ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হই।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নিয়োগ পেয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলাম। অনেক অচেনা মুখের সঙ্গে আমিও প্রধান কার্যালয়ে যোগ দিয়েছিলাম। দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ২২ জুলাই। যোগদানের কয়েক দিন পর তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান একটি পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যে এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম যে কেন্দ্রীয় এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়েছিল। আমার সেদিনের সেই উপলব্ধি আজও অটুট আছে।


মন্তব্য