যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজ লতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সবুজ তরমুজ। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে তরমুজের আবাদ, বাতাসে দোল খাচ্ছে গাছের লতা। দেখে মনে হবে মাটির মধ্যে তরমুজ ফেলে রাখা হয়েছে। শ্রমিকরা জমি থেকে তরমুজ তলে টুকরি ভর্তি করে কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকে তুলছে।
পাইকাররা এসব তরমুজ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। এমনই চিত্রের দেখা মিলে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের চরাঞ্চলের পতিত জমিগুলোতে। এখানে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষে বিপ্লব ঘটেছে, এবার প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শত কোটি টাকার তরমুজ বাজারজাত করার আশাবাদী কৃষকরা। তিন বছরের ব্যবধানে চাষের পরিধি বেড়েছে কয়েকগুন।
আরো পড়ুন
এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাল শিক্ষা বোর্ড
স্থানীয়রা জানায়, মিরসরাইয়ের চরাঞ্চলে যারা তরমুজ চাষ করছেন তারা নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচার উপজেলার বাসিন্দা। আগে সেখানকার মাঠে মাঠে তরমুজ চাষ হলেও একই জমিতে বারবার তরমুজ চাষ করায় সেসব জমি চাষের উপযোগীতা হারিয়েছে। মিরসরাই এলাকার মাটি ও আবহাওয়া তরমুজ চাষের উপযোগী হওয়ায় চাষিরা খোঁজ নিয়ে এখানে তরমুজ আবাদ করছেন।
মিরসরাইয়ের চরাঞ্চলে প্রত্যেক বছর রবি মৌসুমে ইছাখালী, মঘাদিয়া, মায়ানী ও সাহেরখালী ইউনিয়নের চরের অধিকাংশ জায়গা পতিত হয়ে পড়ে থাকতো। সেসব পতিত জমির মাটিগুলো ল্যাবে পরীক্ষা করেন নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলার তরমুজ চাষিরা। এরপর দোঁআশ মাটি (বালিযুক্ত) ও উপযুক্ত পরিবেশ হওয়ায় ২০২২ সালে প্রথম মিরসরাইয়ে বাণিজ্যিকভাবে ১৪৫ একর জমিতে তরমুজ শুরু করেন নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম। ফলন ভালো হওয়ায় পরের বছর তাকে অনুসরণ করে আরো বেশ কয়েকজন তরমুজ চাষ করেন।
স্থানীয় কৃষকদের থেকে ৩ মাসের জন্য প্রতি একর জমি ১৫ হাজার টাকা খাজনায় বর্গা নেন চাষিরা।
এরপর ৪ ইউনিয়নে তরমুজ চাষ ছড়িয়ে পড়ে। এখানে এবার চাষকৃত তরমুজের জাতের মধ্যে অন্যতম বাংলালিংক, শ্যুট ফ্যামিলি, ড্রাগন কিং, গ্রীন ড্রাগন, ব্লাক বেবী, গ্লোরি জাম্বু, পাকিজা, বিগ ফ্যামিলি, ড্রাগন বিউটি, আস্থা, সুগার, ভিক্টর সুগার, ড্রাগন কিং। চলতি বছর প্রায় ১ শ কৃষক তরমুজ আবাদ করেছেন। এসব তরমুজ ক্ষেতে কাজ করছেন প্রায় ২ হাজার শ্রমিক। এবার উপজেলার ইছাখালী, মঘাদিয়া, মায়ানী ও সাহেরখালী ইউনিয়নে প্রায় ১২’শ একর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। ২০২৪ সালে আবাদ হয়েছিল ৪৭৫ একর জমিতে। ২০২৩ সালে চাষ হয় ১৭৫ একর জমিতে। ২০২২ সালে আবাদ হয় ১৪৫ একর জমিতে।
তরমুজ চাষি আবু জাফর বলেন, ‘এবার আমি প্রায় ৬০ একর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছে। আশা করছি আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো বিক্রি করতে পারবো।’
চাষি সানা উল্ল্যাহ বলেন, ‘এবার আমি ১২ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। প্রতি একরে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি একর প্রতি ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবো। ইতিমধ্যে ৮ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি।’
আরো পড়ুন
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক তানিফা নিহত
ইসমাইল হোসেন সুমন বলেন, ‘আমরা ৫ জন মিলে ৩৫ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এক কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি সম্ভব হবে।’
তরমুজ চাষি ইকবাল হোসেন বলেন, ‘চাষাবাদ ও বাজারজাত সুবিধা থাকায় এবং দোঁআশ মাটি হওয়ায় তরমুজ চাষ করেছি। আকারে অনেক বড় এবং সুস্বাদু হওয়ায় বাজারেও রয়েছে এসব তরমুজের বেশ চাহিদা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে সরাসরি ক্ষেত থেকে এসব তরমুজ কিনে নিয়ে যান।’
মঘাদিয়া ইউনিয়নের কাজীরতালুক গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানকার স্থানীয় জমির মালিক থেকে সুবর্ণচরের তরমুজ চাষিরা প্রতি একর ১৫ হাজার টাকা করে তিন মাসের জন্য বর্গা নিয়ে তরমুজ চাষ করছেন। আমরা তাদের সব সময় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছি।’
মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, ‘এখানকার মাটি ও আবহাওয়া তরমুজ চাষের উপযোগী হওয়ায় ক্রমান্বয়ে চাষের পরিধি বাড়ছে। এবার ১২শ একর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। তরমুজ চাষে পরিশ্রম বেশি হলেও অন্যান্য রবি শস্য থেকে এটাতে ৩ গুণ বেশি লাভ হয়। সুবর্ণচর উপজেলার চাষিরা এখানে তরমুজ চাষ করছেন। আবহাওয়া এবং বাজারে দাম ভালো থাকলে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদন হবে। যার বাজার মূল্য প্রায় শত কোটি টাকা।’