kalerkantho


আত্মহনন থেকে বাঁচাতে মেয়েটিকে পাহারা

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ    

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ২১:২২



আত্মহনন থেকে বাঁচাতে মেয়েটিকে পাহারা

সহপাঠীরা চোখের সামনে ফরম পূরণ করে আগামী দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই সময় লাকী আক্তার জানতে পারে পরীক্ষা তো দূরের কথা নবম শ্রেণিতে তার  নিবন্ধনই হয়নি।

খবর শুনে ওই ছাত্রী নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়ে বেশ কয়েকবার আত্মহননের চেষ্টা করে। তবে মা-বাবার সর্তকতায় ব্যর্থ হয় সে চেষ্টা। ওই ছাত্রী ময়মনসিংহের নান্দাইলের সুরাশ্রম দারুস সালাম (ডিএস) দাখিল মাদ্রাসার ওই ছাত্রী।

আজ মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে উপজেলার গাংগাইল ইউনিয়নের জলহরি গ্রামে অবস্থিত ছাত্রীর বাড়িতে গেলে তার মা মরিয়ম বেগম বলেন, "আমার মেয়ে আসন্ন দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেবে, তাই আমাদের পরিবারে এক ধরনের আনন্দ বিরাজ করছিল। গত পাঁচ বছর ধরে যে মাদ্রাসায় আমার মেয়ে পড়ালেখা করছে, সেই প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এ ঘটনার জন্য তাদের সব  দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করছে। "

মরিয়ম বেগম আরো বলেন, "এ ঘটনায় আমাদের পরিবারে হতাশা নেমে এসেছে। আমার মেয়ে খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে শুধু কান্না করছে। গত সপ্তাহে এ খবর পাওয়ার পর সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু ওই  সময় ঘটনাটি দেখে ফেলায় অল্পের জন্য রক্ষা পায় মেয়েটি।

"

ওই ছাত্রীর বাবা ফখর উদ্দিন বলেন, "আমি গরিব মানুষ। খেয়ে না খেয়ে মেয়েটিকে লেখাপড়া করাচ্ছি। একটা স্বপ্ন ছিল লেখাপড়ার শেষে যদি একটা চাকরি হয়। কিন্তু এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। কোনো কাজ করতে ভালো লাগে না। মেয়েটিকে আগলে রেখে দিনভর ঘরে বসে থাকি। "

ফখর উদ্দিন আরো জানান, ২০১৫ সালে তার মেয়ে এই মাদ্রাসা থেকে জেডিসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ২০১৬ সালে ওই মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ওই শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করার সময় এলে ফি হিসেবে ৪০০ টাকা শ্রেণি শিক্ষক আবুল কালামের কাছে তিনি নিজে জমা দেন। তখন ওই শিক্ষক তার কাছে আরো ১০০ টাকা দাবি করলে তিনি তাও দেন। তবে আবুল কালাম টাকা নেওয়ার কথা এ প্রতিবেদকের কাছে অস্বীকার করেছেন।

ফখর উদ্দিন বলেন, দাখিল পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় এলে তিনি মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক এ কে এম ওমর ফারুকের হাতে ১৫০০ টাকা জমা দিয়েছেন। কিন্তু সুপার আরো ৫০০ টাকা দাবি করেন। টাকা দেওয়ার দুই-তিন দিন পর তা ফেরত দিয়ে সুপার তাকে জানান লাকির নাকি নবম শ্রেণিতে নিবন্ধনই করা হয়নি। তিনি মেয়েকে নবম শ্রেনিতে নিবন্ধন করার পরামর্শ দেন। ওমর ফারুকের মুখ থেকে এ-কথা শোনার পর তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েন।

লাকি আক্তার জানায়, সে মাদ্রাসায় নিয়মিত ক্লাস করেছে। অর্ধবার্ষিক ও চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়ে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। আগামী ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিতব্য দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে গত মাসে মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত প্রাক নির্বাচনী ও নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার এ কথার সঙ্গে  সহমত প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকজন সহপাঠী।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার গাংগাইল ইউনিয়নের সুরাশ্রম গ্রামে অবস্থিত ওই মাদ্রাসায় গেলে সুপার এ কে এম ওমর ফারুক শিক্ষার্থী হাজিরা খাতা দেখিয়ে দাবি করেন, "লাকি নামের ওই ছাত্রী ২০১৬ সালের মার্চ থেকে মাদ্রাসায় অনুপস্থিত রয়েছে। ফলে জুলাই মাসে তার নিবন্ধন করা হয়নি। " তিনি যে খাতাটি দেখে এ প্রতিবেদককে তথ্য দিচ্ছিলেন সেটি ছিল চকচকে নতুন খাতা।  

রেজিস্ট্রেশন করা না হলে লাকি কীভাবে নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ ও পরে প্রাক নির্বাচনী ও নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে জানতে চাইলে সুপার দাবি করেন, "এটি শ্রেণি শিক্ষকের ভুল। "

তবে হাজিরা ও ফলের খাতা থেকে লাকির নাম কৌশলে মুছে ফেলা হলেও দশম শ্রেণির প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষার ফি হিসেবে ৩০০ টাকা আদায়ের তথ্য রয়েছে। ওই তালিকার সাত নম্বর ক্রমিকে লাকির নামে ৩০০ টাকা জমা পড়ার তথ্য রয়েছে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে এটিকেও শ্রেণি শিক্ষকের ভুল বলে দাবি করেন। পরে এ প্রতিবেদকে নানাভাবে ম্যানেজ করার করার চেষ্টা করেন তিনি।

এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান জানান, তিনি এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন ঘটনাটি তদন্ত করে ওই ছাত্রীর পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করার। অন্যথায় মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।


মন্তব্য