kalerkantho


চাদর পেতে বারান্দায় রয়েছে শিশু রোগী

অসীম মণ্ডল, সিরাজগঞ্জ    

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১০:৫৪



চাদর পেতে বারান্দায় রয়েছে শিশু রোগী

সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে অনান্য বিভাগের চেয়ে রোগী বেশি গাইনি ও শিশু বিভাগে। গতকাল রবিবার সকালে সরেজমিনে শিশু বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, দরজার বাইরে থেকে ভেতর পর্যন্ত চাদর পেতে বারান্দায় শুয়ে রয়েছে শিশুরা।

বেলকুচি উপজেলার তিন বছরের শিশু আফছারের মা আমেনা খাতুন জানালেন, ডায়রিয়ার সমস্যা নিয়ে শনিবার রাতে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। ডায়রিয়া রোগীদের জন্য আলাদা কোনো কক্ষ বরাদ্দ না থাকায় এই ঠাণ্ডায় শিশুটিকে নিয়ে বারান্দায় থাকতে হচ্ছে তাঁকে। এ কারণে শিশুটির নিউমোনিয়া হয়ে যায় কি না সেই ভয়ে আছেন আমেনা।

শিশু ওয়ার্ডে ঢুকতেই দেখা মিলল রাহিম নামের এক বছরের শিশুর বাবা আবেদ আলীর। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সমস্যা নিয়ে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন চার দিন আগে। চিকিত্সকদের দেখা মাঝে মাঝে মিললেও নার্সদের অনেকবার ডেকেও পাওয়া যায় না।

তাঁদের আচরণও সুখকর নয়। আর বেশির ভাগ ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে। ভ্যানচালক আবেদ আলীর জন্য যা অনেক কষ্টকর।

দুপুরে কর্তব্যরত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার লিটন জানান, সিনিয়র ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট আর অন্যান্য মিলিয়ে এখানে ১২ জন চিকিত্সক পালাক্রমে চিকিত্সা দেন।

গাইনি বিভাগে ঢুকতেই চোখে পড়ে ক্ষয়ে যাওয়া এবং ব্যবহারের অনুপযোগী বিছানায় রোগী রাখা হয়েছে। লোহার খাটের জং ধরার চিহ্ন চাদরের ওপরে কালচে দাগ ফেলেছে। আর হাসপাতালে স্বজনদের দেখতে আসা বেশির ভাগ মানুষই নাকে রুমাল চেপে চলাফেরা করছে। দুপুর সাড়ে ১২টার সময়ও গাইনি বিভাগের চিকিত্সকদের কক্ষে তালা ঝোলানো। দায়িত্বরত নার্সরা জানালেন, চিকিত্সকরা আশপাশেই আছেন। প্রয়োজনমতো চলে আসবেন।

তাড়াশের মিলু জানালেন, তাঁর স্ত্রী গর্ভবতী। তাঁকে নিয়ে চিকিত্সকদের কাছে এসেছেন। কিন্তু গাইনি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিত্সকরা স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যেতে বলেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। গাইনি বিভাগে রোগীর চাপ থাকলেও চিকিত্সক রয়েছেন মাত্র দুজন। ফলে তিনি নিজেও ভাবছেন স্ত্রীকে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাবেন কি না।

হাসপাতালের খাবারের মান নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ। যেমন—শনিবার ছিল বিজয় দিবস। এদিন দেশের সরকারি সব হাসপাতালে উন্নতমানের খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে দেওয়া হয়েছে সাদা ভাত, মাংস আর নামকাওয়াস্তে দই আর মিষ্টি। এমন তথ্যই দিলেন রায়গঞ্জের লোকমান। তিনি বুকে ব্যথা নিয়ে গত সাত দিন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। তাঁর ভাষায়, হাসপাতালের খাবার মানে পাঙ্গাশ মাছ, ভাত আর পাতলা ডাল। তবে কখনো কখনো ব্রয়লার মুরগির মাংস মেলে। তবে খাবারের মান এতই খারাপ যে তিনি আত্মীয়ের বাসা থেকে খাবার এনে খাচ্ছেন।

ওই ওয়ার্ড থেকে বের হতেই দেখা যায় দুজন বয়স্ক মানুষ খাবার বিলি করছেন। চামচ দিয়ে তিন চামচ ভাত আর হাত দিয়ে মাছের একটি টুকরা তুলে দিচ্ছেন রোগীদের প্লেটে। সঙ্গে রয়েছে পাতলা ডাল। অবশ্য খাবার সরবরাহকারীদের দাবি, সপ্তাহে দুই দিন পাঙ্গাশ, দুই দিন ব্রয়লার মুরগির মাংস, দুই দিন রুই মাছ আর এক দিন অন্য মাংস দেওয়া হয় রোগীদের। সকালের নাশতায় থাকে কলা, পাউরুটি ও ডিম।

এর আগে সকালে জরুরি বিভাগ পার হয়ে দোতলায় উঠতেই দেখা গেল, একটি কক্ষের দরজায় চাপাচাপি করে দাঁড়িয়ে আছে অন্তত জনা ত্রিশেক মানুষ। দেয়ালের গায়ে চিকিত্সকের নেমপ্লেট লাগানো। চিকিত্সক অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞ, তাঁর নাম দেলোয়ার হোসেন। কোনোমতে অফিস সহায়ক কক্ষের দরজাটা একটু খুলে ডাক দিচ্ছেন পরবর্তী রোগীর নাম ধরে। এখানেই কথা হয় উল্লাপাড়ার মাজেদা খাতুনের সঙ্গে। বেশ কয়েক দিন আগে পড়ে গিয়ে পায়ে চোট পেয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন তিনি। তিন দিন ধরে চেষ্টা করে চিকিত্সকের দেখা পেয়েছেন গত পরশু। সেদিন একটা এক্স-রে করতে দিয়েই চিকিত্সক তাঁর দায় শেষ করেছেন। তিন দিন পর আবার এসেছেন সেই এক্স-রেটি চিকিত্সককে দেখিয়ে পরবর্তী চিকিত্সা নেওয়ার জন্য। কিন্তু গত তিন দিন বিনা চিকিত্সায় থাকায় মাজেদা খাতুন ভীষণ কষ্টে দিন পার করেছেন। একই চিকিত্সকের কাছে আসা হাজেরা খাতুন বললেন, ‘সব জায়গাতেই অনেক রোগী। ডাক্তারও বেশ কয়েকজন করে আছেন। কিন্তু ডাক্তাররা নিজেদের সুবিধার জন্য যেকোনো একজন বহির্বিভাগে রোগী দেখেন। যে কারণে অনেকেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়। দুজন ডাক্তার যদি রোগী দেখতেন, তাহলে রোগীদের জন্যও একটু আরাম হতো। কিন্তু কে শুনবে কার কথা। ’

বর্তমানে এ বিভাগে মাত্র দুজন অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞ থাকলেও রোগীর চাপ বেশি। তাই বেশির ভাগ রোগীর চিকিত্সা পেতে দেরি হয়।

চক্ষু বিভাগে যেতেই দেখা মিলল ডা. আব্দুল মুঈদের সঙ্গে। ছোট্ট একটি শিশুর চিকিত্সা দিতে তিনি ব্যস্ত। শিশুটির চোখের কোনায় কোনো একটা সংযোগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় নালি দিয়ে পানি চোখে যাচ্ছে না। সেটি ছাড়ানোর জন্য কিভাবে ম্যাসাজ করতে হয় সেটি তিনি শেখাচ্ছেন শিশুটির মাকে। এই বিভাগে চারজন চিকিত্সক রয়েছেন। পালা করে তাঁরা রোগী দেখেন এবং অস্ত্রোপচার করেন। বিভাগটি সদর হাসপাতালে নতুন চালু হয়েছে। এরই মধ্যে চোখের ছানি অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। গত ১৫ দিন ধরে স্বল্প খরচে অস্ত্রোপচারও চলছে।

হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত কক্ষে গিয়ে দেখা মিলল সলঙ্গার শুকুর আলীর সঙ্গে। পায়ে ঘা আর গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়ে গত আট দিন ধরে চিকিত্সাধীন এই মুক্তিযোদ্ধা। সপ্তাহের অন্যান্য দিন চিকিত্সকরা খোঁজখবর রাখলেও গত তিন দিন কোনো চিকিত্সকের দেখা পাননি তিনি। সরকারি ছুটি আর শুক্রবার একসঙ্গে হলে সব সময় এমন ঘটনাই নাকি ঘটে। আইসিইউর বেশির ভাগ কক্ষেই তালা ঝুলতে দেখা গেল।

এসব বিষয়ে কথা হয় হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. আকরামুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি জানান, রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২৭২। অথচ চিকিত্সক আছেন সব মিলিয়ে ২৯ জন। মেডিক্যাল কলেজের কতজন চিকিত্সক এখানে সেবা দেন সে বিষয়ে তাঁর কাছে লিখিত কোনো তথ্য নেই।

ডা. আকরামুজ্জামান বলেন, ‘এই স্বল্পসংখ্যক চিকিত্সক নিয়ে এত বড় হাসপাতালের সেবা দেওয়া আসলেই দুরূহ। তবে দায়িত্বরত যাঁরা আছেন তাঁদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। ’

হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে আরএমও বলেন, ছুটির দিনগুলোতে কিছুটা সমস্যা হলেও সপ্তাহের অন্যান্য দিন হাসপাতাল পরিচ্ছন্নই থাকে। হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণের জন্য সপ্তাহে দুই দিন পৌরসভার গাড়ি আসার কথা। কিন্তু কোনো কোনো সময় আসে না। এ বিষয়ে পৌর মেয়রকে অনুরোধ করেও কোনো কাজ হয়নি। যে কারণে হাসপাতালে ঢোকার মুখে মাঝে মাঝেই আবর্জনা দেখা যায়।



মন্তব্য