kalerkantho


যুদ্ধাপরাধীর দেহরক্ষীর নেতৃত্বে সন্ত্রাসী হামলা, কক্সবাজারে তোলপাড়

যুদ্ধাপরাধী ওয়াসিম ও পেকুয়ার ওসি'র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০১:১৬



যুদ্ধাপরাধীর দেহরক্ষীর নেতৃত্বে সন্ত্রাসী হামলা, কক্সবাজারে তোলপাড়

শরাফত উল্লাহ ওয়াসিম, জহিরুল ইসলাম খান

সরকারের বিদায়ী বছরের সূচনালগ্নে কক্সবাজারের পেকুয়ার মগনামা ইউনিয়নে শনিবার প্রকাশ্য দিবালোকের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলছে। শনিবার প্রকাশ্য দিবালোকে শতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী মগনামা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছকে হত্যা প্রচেষ্টা চালায়। সন্ত্রাসীরা দিনে দুপুরে ইউনুছের ঘরে হানা দিয়ে শতাধিক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ইউনুছকে ধরে দিগম্বর করে লবণ মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা তার স্ত্রীর কাপড়-চোপড়ও ছিঁড়ে ফেলে। এতে গুরুতর আহত হন ইউনুছসহ ১০ জন।

এ ঘটনায় নেতৃত্ব দেন একাত্তরের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর দেহরক্ষী, সাবেক শিবির ক্যাডার ও মগনামা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ ওয়াসিম। অভিযোগ উঠেছে, পেকুয়া থানার ওসির নীরব ভূমিকার কারণেই ঘটেছে এমন ঘটনা।

এদিকে শনিবারের ঘটনার ব্যাপারে গতকাল রবিবার সকালে পেকুয়া থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। সাবেক শিবির ক্যাডার ও যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর দেহরক্ষী এবং মগনামা ইউপি চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ ওয়াসিমকে প্রধান আসামি করে ৩৭ সন্ত্রাসীর নাম উল্লেখসহ আরো অর্ধ শতাধিক সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলাটি দায়ের করেন সন্ত্রাসী হামলার শিকার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইউনুছের ভাই সরওয়ার কামাল চৌধুরী।

গতকাল রবিবার কক্সবাজার জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় শনিবারের সন্ত্রাসী ঘটনায় নেতৃত্বদানকারী একজন যুদ্ধাপরাধীর দেহরক্ষী ইউপি চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারসহ কঠোর ব্যবস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়েছে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল ইসলাম খানকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়ারও। সভায় সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন। সভায় এস. আলম গ্রুপের কয়েক শ একরের লবণ মাঠ এবং নৌ বাহিনীর অধিগ্রহণ করা সাব মেরিন ক্যাবলের জমি রিসিভারে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সভায় কয়েকজন বক্তা অভিযোগ তুলে বলেন, চকরিয়ার একজন বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় মগনামা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও যুদ্ধাপরাধীর দেহরক্ষী শতাধিক সন্ত্রাসী নিয়ে সাবেক চেয়ারম্যানের ঘরে হামলা চালিয়েছে। সরকারের বিদায়ী বছরের প্রথম দিন পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নে দিনভর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা সত্বেও পেকুয়া পুলিশের নীরব ভূমিকায় বক্তারা তীব্র সমালোচনা করেন।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা এ প্রসঙ্গে সভায় বলেন, 'পেকুয়া থানার ওসি একটানা ৫/৬ বছর ধরে কক্সবাজারে রয়েছেন। তিনি এর আগে উখিয়া, চকরিয়া ও কুতুবদিয়া থানায়ও ওসি হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তার কর্মজীবনে সুনামের চেয়ে দুর্নামই বেশি। এ কারণে তাকে এ মুহূর্তেই পেকুয়া থেকে প্রত্যাহার করা দরকার।' তিনি বলেন, সাবেক শিবির ক্যাডার ওয়াসিম একাধারে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী এবং মাক কারবারি। অপরদিকে হামলার শিকার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও অনেক মামলা মোকদ্দমা রয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, 'বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। আর সেই সরকারের শেষ সময়ে যুদ্ধাপরাধীর দেহরক্ষীর নেতৃত্বে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য অশীনিসংকেত।' তিনি যুদ্ধাপরাধীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা দেয়ার জন্য পেকুয়া থানার ওসি এবং চকরিয়ার একজন বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতার বিরম্নদ্ধে বিভাগীয় ও দলীয় কঠোর ব্যবস্থা নিতে দাবি জানান।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যান সভায় শনিবারের ঘটনার বিষয়ে বলেন, 'যুদ্ধাপরাধীদের উত্তরসুরি এবং বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারগণ সরকারের বিদায়ী বছরে পরিস্থিতি অশান্ত করতে মগনামায় টেস্ট কেইস হিসাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তাই ঘটনার ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কষ্ট হবে।'

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমদ সিআইপ বলেন, সাবেক শিবির ক্যাডার শরাফত উল্লাহ ওয়াসিম একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। এই সন্ত্রাসী বিএনপি'র টিকেট নিয়ে বিগত নির্বাচনে মগনামা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে পেকুয়া থানার ওসির সঙ্গে সখ্য করে এই দুর্ধর্ষ ক্যাডার সাগর তীরের মগনামা ইউনিয়নে গড়ে তুলে একটি বড় সন্ত্রাসী বাহিনী।

তিনি আরো বলেন, ওয়াসিম বাহিনীকে সশস্ত্র ক্যাডার দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম। তবে জাফর আলম সভায় এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।

সভায় জেলা পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন জানান, ব্যাপক অভিযোগের ভিত্তিতে চকরিয়া থানার ওসি জহিরুল ইসলাম খানের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য