kalerkantho


মাদারীপুরে যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪ শিক্ষিকা, ৫ শিক্ষার্থী!

মাদারীপুর প্রতিনিধি   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৭:৫৮



মাদারীপুরে যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪ শিক্ষিকা, ৫ শিক্ষার্থী!

ছবি : কালের কণ্ঠ

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ১৮৬ নং পশ্চিম মাইজপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির বেহাল অবস্থা। জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ে চলছে পাঠাদান, নেই তেমন কোন ভাল ঘর। এ বিদ্যালয়ে খাতায় ৪৫ জন ছাত্র-ছাত্রীর নাম রেজিস্টার থাকলেও উপস্থিত থাকে ৫ জন ছাত্র-ছাত্রী। এছাড়াও একজন শিক্ষিকা প্রায় অনুপস্থিত থাকেন।

খোজ নিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা ৪ জন থাকলেও ইয়াসমিন খানম নামের এক শিক্ষিকা বছরের বেশির ভাগ সময় অনুপস্থিত থাকেন। সে ছুটি না নিয়ে দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকলেও একদিন বিদ্যালয়ে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে। এছাড়াও জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ে পাঠদান ও উপবৃত্তি না দেওয়াসহ নানা সমস্যার জন্য ঐ এলাকার প্রায় ২ শতাধিক শিক্ষার্থী এই ১৮৬নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভর্তি না হয়ে, তার মাঠ দিয়ে হেটে অন্য বিদ্যালয় প্রতিদিন যাওয়া আসা করে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিদ্যালয়, স্থানীয় ও অভিভাবক সূত্রে জানা গেছে, কালকিনি উপজেলার ১৮৬ নং পশ্চিম মাইজপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কার্যক্রম চালু হওয়ার পর থেকেই ইয়াসমিন খানম নামের এক শিক্ষিকা বছরের বেশির ভাগ সময় ছুটি না নিয়ে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। এ ব্যাপারে একাধিকবার ম্যানেজিং কমিটি ও এলাকাবাসীর স্বাক্ষরিত দরখাস্ত উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসে দেয়া হলেও তার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই শিক্ষিকার কারণে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা কমে গিয়ে শূণ্যের কোঠায় এসেছে বলে অভিযোগ আছে।

তাছাড়া স্কুল সরকারি হওয়ার দুই বছরের মাথায় উপবৃত্তির টাকা ইয়াসমিন খানম নামের ঐ শিক্ষিকা আত্মসাত করায় প্রাথমিক শিক্ষা অফিস উপবৃত্তি বন্ধ করে দিয়েছে। ২০১৮ সালে নতুন বছরেও কোন প্রকার ছুটি না নিয়েই বিদ্যালয়ে আসেননি তিনি। এরপরেও বছরের অনেক সময় সরকারি বিভিন্ন ট্রেনিংয়ে কোন না কোন শিক্ষিকা অনুপস্থিত থাকেন। 

বিদ্যালয়ে গিয়ে ২ জন শিক্ষিকাকে পাওয়া গেলেও পাওয়া যায়নি বাকি দু‘জনকে। শিক্ষিকারা ঠিকমত বিদ্যালয়ে না আসায়, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় এবং উপবৃত্তি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসী তাদের ছেলে-মেয়েদের দুরের স্কুলে পড়াশুনা করাচ্ছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির হাজিরা খাতায় ৪৫ জনের নাম থাকলেও স্কুলে উপস্থিত থাকে ৫ জন। 

উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীরা জানায়, তারা পড়াশুনা করতে স্কুলে এসেও বেশির ভাগ সময় ইয়াসমিন খানম নামের শিক্ষিকাকে স্কুলে পান না। যদিও আসেন তাহলে অল্প সময় থেকেই চলে যান। একটি ভাংগাচুড়া স্কুলে পড়াশুনা করে এবং উপবৃত্তির টাকা দেয়া হয় না। সরকারের সকল সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি নতুন ভবনেরও দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এালাকাবাসী বলেন, ‘আমরা এই স্কুলে কেন পড়াশুনা করাবো? স্কুলে বেশির ভাগ সময় শিক্ষিকারা থাকেন না। দুই একজন থাকলেও ছাত্র-ছাত্রী না আসায় অলস সময় কাটায়। তারপর এই স্কুলে কোন টাকা দেয়া হয় না। আমরা অন্য স্কুলে পড়ালে পড়াশুনা ভালো হয় এবং উপবৃত্তির টাকাও পাই।’

ঐ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা (ভারপ্রাপ্ত) মিনতি মজুমদার বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী আছে। তবে জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ঘর ও উপবৃত্তি না পাওয়ায় বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী অন্য বিদ্যালয় চলে গেছে। তাছাড়া বিদ্যালয়ে আমরা ৪ জন শিক্ষিকার মধ্যে একজন বিভিন্ন সময় ট্রেনিং এ থাকেন। অন্য একজন কোন প্রকার ছুটি না নিয়ে অনুপস্থিত থাকেন। ঐ শিক্ষিকা পরপর তিন দিন অনুপস্থিত থাকলে আমি তাকে ফোন দেই। তখন তিনি আমাকে জানান সে একটি ট্রেনিংয়ে আছে। এরপর আমি উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে জানালে তিনিও আমাকে জানান আমার কাছে ঐ শিক্ষিকার কোন দরখাস্ত নেই বা সে কোন প্রকার ছুটি নেয়নি। 

এলাকাবাসী জানান, অনুপস্থিত শিক্ষিকা ইয়াসমিন খানম নিজ বাড়িতে আছেন এবং পারিবারিক কাজ করছেন। এ ব্যাপারে ঐ শিক্ষিকা ইয়াসমিন খানমকে মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি জানান, আমি ফোনে প্রধান শিক্ষিকার কাছে জানিয়েছি, আমি আসতে পারবো না। আমার কাছে সেই রেকর্ড আছে।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হাজী মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শিক্ষিকা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে আমি ছাড়াও এলাকাবাসী উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসে অনেক বার দরখাস্ত দিয়েছেন। কিন্তু তেমন কোন ব্যবস্থা তারা নেয়নি। কেন নেয়নি এটা আমার বোধগম্য নয়। আমি এই স্কুলে জন্য সবকিছু করতে রাজি আছি। এই স্কুলের এই অবস্থা দেখলে কান্না পায়। প্রথমদিকে এই স্কুলে ২ শতাধিকের বেশি ছাত্র-ছাত্রী ছিল। আজ তা শুণ্যের কোঠায় নেমে এসেছে। 

তিনি আরো বলেন, স্কুলে পড়াশুনা করার মতো ঘর নেই। আমার নিজের অর্থায়নে কোনরকম টিন দিয়ে মাঠে ক্লাস নেয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের স্কুলের মাঠ দিয়ে শত শত ছাত্র-ছাত্রী অন্য স্কুলে যায়। অথচ আমাদের স্কুলে আসেনা। এর কারণ হচ্ছে স্কুলে ভালো কোন ভবন নেই, শিক্ষিকারা ঠিক মত স্কুলে আসে না এবং স্কুলে উপবৃত্তি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাই সরকারের কাছে আমার দাবি আমাদের এই স্কুলে যেন একটি নতুন ভবনসহ সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা ফিরিয়ে দেয়া হয়। আর যারা স্কুলের ভালো চায় না, একজন শিক্ষিকা হয়েও দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকেন, তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানাই।

কালকিনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সরোয়ার হোসেনকে অফিসে গিয়ে না পেয়ে তার কাছ ফোনে জানতে চাইলে তিনি জানান, ইয়াসমিন খানম নামের ঐ শিক্ষিকার ছুটি ব্যাপারে আমাকে জানানো হয়নি। আমাদের কাছে কোন দরখাস্ত করা হয়নি। 

মাদারীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. নাসির উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, এই ঘটনা যদি সত্য হয় আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো। তাছাড়া এর আগেও যারা দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন তাদের আমার চাকুরি থেকে বাদ দিয়েছি। আর যদি কোন কারণে বিদ্যালয়ের উপবৃত্তি বন্ধ হয়ে থাকে তাহলে আমরা সেটা চালু করার ব্যবস্থা করবো এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য সকল প্রকার কাজ করবো।

 

  

 


মন্তব্য