kalerkantho


পুকুর কেটে টাকার কুমির

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৮:৫৬



পুকুর কেটে টাকার কুমির

দেড় বিঘা জমিতে পুকুর কেটে শ্রমিক থেকে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছেন। রূপকথা হতে পারত। তবে তা হয়নি। বগুড়া সদর উপজেলার মানিকচক গ্রামের খোকা (৬০) ছিলেন শ্রমিক সর্দার। ১০ বছর আগেও তাঁর ছিল না কোনো থাকার ঘর। তিন বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। কাজ না পেয়ে অনেক সময় রিকশা চালিয়ে দিন পার করেছেন। এখন তিনি তিনটি বাড়ি, দুটি ইটভাটা, সাতটি ট্রাক এবং ১০ একর জমির মালিক।

স্থানীয়রা জানায়, ২০০৭ সালে দেড় বিঘা জমিতে পুকুর কাটার পর খোকা বালুর ব্যবসা শুরু করেন। চারপাশের জমি ধসে যেতে থাকে। বাড়তে থাকে তাঁর আয়। সব মিলিয়ে ২০০ বিঘা জমি ধসে পুকুর হয়ে গেছে। গ্রামের ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। বিলীন হয়েছে গ্রামে চলাচলের সরকারি রাস্তা, সেতু ও কবরস্থান।

সম্প্রতি মানিকচক গ্রামে গেলে দিনমজুর এরফান আলী বিশাল খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে হাত তুলে দূরের একটি স্থান দেখিয়ে বলেন, ‘ওইখানে ছিল আমাদের বাড়ি। মা-বাবাসহ আটজনের পরিবার। বাড়ির অদূরে শ্যালো মেশিন লাগিয়ে বালু তুলছিল খোকা। একদিন সকালে বাড়ির উঠানে দেখা দিল ফাটল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধসে যেতে শুরু করল ঘরের দেয়াল। মালামাল কোনোমতে সরিয়ে নিতে পারলেও জায়গাটি রক্ষা করা যায়নি।’ তাঁদের জায়গার ওপর এখন ১৫০ ফুট উচ্চতার পানি।

এই গ্রামের বাসিন্দা নাসির, আজাহার, আজমল ও মোজাফফর জানান, তাঁদের প্রত্যেকের জমি ছিল দুই থেকে ১০ বিঘা পর্যন্ত। কিন্তু আজ তাঁরা নিঃস্ব। ভূমিহীন হয়ে অন্য স্থানে বসবাস করছে। নাসির ও আজাহার জানান, জমিতে ভাঙন দেখা দেওয়ার পর ধসে গেল মাটি। প্রতিদিন জমির আকার পরিবর্তন হতো। তখন হাতে-পায়ে ধরেও খোকাকে থামানো যায়নি। তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখাত। শেষমেশ সাত লাখ টাকা বিঘার জমি ৫০ হাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে কেউ কেউ। এখন সেই স্থানে গভীর পানি। খোকা সেখানে মাছ চাষ করেন।

স্থানীয়রা আরো জানায়, বগুড়ার সবচেয়ে বড় বালুমহাল এই মানিকচকে। প্রতিদিন ৬০-৬৫টি খননযন্ত্র বসিয়ে মাটির নিচ থেকে বালু তোলা হতো। একাধিকবার পুলিশি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা কোনো কিছুই থামাতে পারেনি এই বালু উত্তোলন।

গত তিন বছরে অবৈধ বালু ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে পাঁচজন খুন ও সাতজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। বালুর ট্রাকের চাপায় ও বালুচাপায় মারা গেছেন আরো পাঁচ ব্যবসায়ী। এর মধ্যে রয়েছেন শেখেরকোলা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন, রাজাপুরের যুবদল নেতা আমিনুল ইসলাম দিপু, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জুয়েল, সহযোগীসহ রাইসুল, ভাটকান্দি গ্রামের শাহীন প্রামাণিক এবং আওয়ামী লীগকর্মী শফিক।

বালু ব্যবসায়ীরা জানান, মাটির নিচে পাইপ দিয়ে আবাদি জমির তলদেশ থেকে বালু তুলতে প্রতি সিএফটি (কিউবিক ফুট) খরচ পড়ে মাত্র তিন টাকা। প্রশাসনসহ স্থানীয় সন্ত্রাসী বাবদ খরচ আরো এক টাকা। চার টাকা সিএফটির বালু বিক্রি করা হয় ১৪-১৫ টাকায়। বগুড়া শহরের কমপক্ষে ৫০টি স্থানে চলে এই অবৈধ ব্যবসা।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়া শহরের ৫০টি পয়েন্টে বালু ব্যবসার নেতৃত্বদানকারীর প্রধান হলেন খোকা। এ ছাড়া পল্লীমঙ্গলের ফারুক, খালেক, মানিক, সালেক, আজাদ ও মিজানুর। নওদাপাড়ায় নুর আলম ও আলম। জোড়গাছায় ফজলু ও জুয়েল। গোবর্ধনপুরে বেলাল। খামারকান্দি মধ্য কাতালিতে দেলোয়ার ও স্বপন। মানিকচকে খোকার নেতৃত্বে রয়েছে কালিবালার দুলাল, মুকুল, জাকের, রানা, গুলফান, রাজন, ইনসান, বাবলু, মতিন ও মিরাজ। তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বগুড়া দ্বিতীয় বাইপাস মহাসড়ক থেকে শাখারিয়া ইউনিয়নের ভেতরে কালিবালা থেকে মানিকচক হয়ে কদিমপাড়া পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কটি সরকারি ম্যাপে ১৫ ফুট চওড়া এবং তিন কিলোমিটার দীর্ঘ। একইভাবে মানিকচক হিন্দুপাড়া থেকে ফাঁসিতলা হয়ে শাখারিয়ার তালপট্টি সড়কটির একই দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ। এই সড়কের দুই পাশে ছিল বাড়িঘর, আবাদি জমি, সেতু, কবরস্থান ও বাগান। এগুলোর কোনো কিছু এখন নেই। মহাসড়ক থেকে মাটির রাস্তাটি নেমে গ্রামের মধ্যে ঢুকেছে। ৫০০ মিটার যাওয়ার পর সামনে বিশাল জলাশয়। রাস্তাটি হারিয়ে গেছে জলাশয়ের ভেতরে। দুই ফুট গভীরতার এই জলাশয়ে সম্প্রতি বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়েছে। সেখানে খোকা মাছ চাষ শুরু করেছেন। মানিকচকের এই সড়ক দিয়ে শাখারিয়া ইউনিয়নের ছাগলদানি, কদিমপাড়া, পাঁচবাড়িয়া, উলিপুর, চালিতাবাড়ী, শাখারিয়া, গোপালবাড়ী গ্রামের মানুষ যাতায়াত করতেন। এখন তাঁরা ভিন্ন রাস্তা ব্যবহার করেন।

বগুড়ার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাসুদার রহমান মিলন বলেন, ‘আমার গ্রামের বাড়ি মানিকচক। অবৈধ বালু তোলায় আমার ১০ বিঘা জমি ধসে গেছে।’


মন্তব্য