kalerkantho


সুনামগঞ্জ সীমান্তে পণতীর্থ ও ওরস শুরু

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ২২:৩৩



সুনামগঞ্জ সীমান্তে পণতীর্থ ও ওরস শুরু

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তে বৃহত্তর সিলেটের সবচেয়ে বড় উৎসব বারুণি ও শাহ আরেফিনের ওরস শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নদীর তীরে বসেছে মেলা। পূণ্য স্নানের আশায় গঙ্গারূপী যাদুকাটা নদীর তীরে দেশ-বিদেশের লাখো পূণ্যার্থী এবং এর পাশেই শাহ আরেফিনের মোকামে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাধন ভজনের জন্য জড়ো হয়েছেন। 

কয়েক শ বছর ধরে একই এলাকায় হিন্দু-মুসলমান এই উৎসবে মেতে ওঠেন। এবার পণতীর্থ মেলায় প্রায় ২ লাখ পূণ্যার্থী অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে শাহ আরেফিনের ওরসেও সমপরিমাণ লোক সমাগম ঘটবে বলে জানা গেছে। ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব নির্বিগ্নে করতে এলাকাবাবাসী ও প্রশাসন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

রাজারগাঁও শ্রী শ্রী অদ্বৈত প্রভুর জন্মধাম পরিচালনা কমিটির সভাপতি করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, এ বছর স্নানযাত্রার মুখ্য সময় নির্ধারিত হয়েছে ১৪ মার্চ ৩০ ফাল্গুন বুধবার দিন বেলা ৩টা ৪৫ মিনিট ১৭ সেকেন্ড থেকে ১৫ মার্চ ১ চৈত্র পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ১৪ মিনিট ৫০ সেকেন্ড পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যেই স্নান করবেন দেশ-বিদেশের লাখো পূণ্যার্থী।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছর চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে বৃহত্তর সিলেট বিভাগের সীমান্তের বড় উৎসব হয় শ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর জন্মধান নবগ্রামে। স্থানীয়ভাবে এটি বারুণি স্নান বা বারুণি মেলা হিসেবে পরিচিত। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখানে তীর্থরূপি গঙা স্নান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জনশ্রুতি রয়েছে পঞ্চদশ শতাব্দীতে লাউড়ের রাজা দিব্যসিংহের মন্ত্রী ছিলেন শাস্ত্রবিদ ও সভাপণ্ডিত অদ্বৈত আচার্য্যে পিতা কুবেরাচার্য্য। তার স্ত্রী নাভাদেবির ৬টি সন্তান মারা যাওয়ায় রাজ্য ছেড়ে চলে যান তিনি। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে এই পণতীর্থের সূচনা করেন তার সন্তান অদ্বৈত আচার্য্য প্রভু। মানুষ তাঁকে গৌরআনা ঠাকুর বলে। তার স্বীকৃত পাণ্ডিত্যের কারণে রাজা দিব্যসিং বিশেষ অনুরোধ করে তাকে এখানে ফিরিয়ে আনেন। ১৪৩৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেন কমলের মতো সুন্দর এক পুত্র, যার নাম রাখেন কমলাক্ষ বা অদ্বৈত আচার্য্য। মা নাভাদেবি স্বপ্নে দেখেন তার পুত্র শঙ্খচক্র গদাধরী মহাবিষ্ণু রূপী অদ্বৈতের দীপ্তিময় আভা মুখমণ্ডল ও অঙ্গে চারদিক আলোকিত। তিনি তা প্রত্যক্ষ করে অজান্তেই আনত হয়ে চরণোদন প্রার্থনা করে পৃথিবীর পবিত্র সপ্তবারীর জলে অবগাহন করতে দেখেন। পরে তার ঘুম ভেঙ্গে গেলে চিন্তিত মাকে দেখে অদ্বৈত আচার্য্য স্বপ্নবিবরণ জানতে চান। ছেলের পীড়াপিড়িতে তার স্বপ্ন বৃত্তান্ত খুলে বলেন মা। মহাপ্রভু খ্যাত অদ্বৈত আচার্য্য মায়ের স্বপ্নপূরণ ও উদ্বেগ দূর করার জন্য ‘সপ্ততীর্থ হানি হেথায় করিব স্থাপন’ বলে অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে পৃথিবীর সপ্তবারীর জল একত্রিত করেন। পরে মা নাভাদেবি সেই পবিত্র জলে স্নান সম্পন্ন করেন। এরপর থেকেই এই তীর্থের নাম হয় পণতীর্থ বা পণাতীর্থ। এ সময় তীর্থগণ পণ করে গিয়েছেন যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন এই মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে এখানে পূণ্য স্নান উপলক্ষে লাখো পুণ্যার্থীর আগমন ঘটবে। এই জনশ্রুতিতেই কয়েক শ বছর ধরে এখানে পূণ্য স্নান অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এদিকে একই সময়ে যাদুকাটা নদীর তীরে শাহ আরেফিনের মাজারে ভারত সীমান্তের ঘোমাঘাটের নিচে শুরু হয়েছে শাহ আরেফিনের ওরস। গঙ্গা স্নান শেষে পূণ্যার্থীরা এখানে এসে শাহ আরেফিনের মাজারেও দর্শন দিয়ে যান। দেশ-বিদেশের লাখো শাহ আরেফিন ভক্ত জড়ো হয়েছেন লাউড়েরগড়ে।

হযরত শাহ আরেফিন লঙ্গর খানার খাদেম মুক্তিযোদ্ধা ও প্রাক্তন শিক্ষক হাজি মো. নুরুল আমিন জানান, ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে বাংলাদেশ অভ্যন্তরে কয়েক শ বছর ধরে শাহ আরেফিনের ওরস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বাদ ফজর মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে শুরু হয়ে ১৭ মার্চ রবিবার বাদ ফজর আখেরী মোনাজাতের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে ওরস। এরই মধ্যে ওরসে যোগ দিতে হাজারো কাফেলাধারী ভক্তরা সমবেত হয়েছেন।

তাহিরপুর থানার ওসি নন্দন কান্তি ধর বলেন, গঙ্গা স্নান ও শাহ আরেফিনের ওরস উপলক্ষে এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। আমরা ইতিমধ্যে একাধিক সভা করে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে এবং রাস্তাঘাটে পণতীর্থে ও ওরসে আসা ভক্তদের হয়রানি না করতে ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছি। 
এবারও বরাবরের মতো সম্প্রীতি বজায় রেখে উৎসব সমাপ্ত হবে বলে জানান তিনি।


মন্তব্য