kalerkantho


তৎপর চোরাকারবারিরাও

মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়েছে কুমিল্লা সীমান্তে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা    

১৯ জুন, ২০১৮ ১১:৫২



মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়েছে কুমিল্লা সীমান্তে

ঈদে ছুটির দিনগুলোতে মানুষ যখন পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে বের হন বিনোদনকেন্দ্রে, স্বজনদের সঙ্গে  ব্যস্ত সময় কাটান হাসি-আনন্দে; ঠিক এর উল্টো চিত্র চোখে পড়ে 'নির্ভেজাল মাদক স্পট' কুমিল্লা সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায়। 

ঈদে 'এক্সট্রা বিনোদন' পেতে মাদকাসক্ত যুবকদের আনাগোনা বেড়েছে কুমিল্লার ভারতীয় সীমান্তে। সেই সঙ্গে তৎপরতা বেড়েছে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের- কিছুদিন আগেও যারা ছিলেন আত্মগোপনে। ঈদের দিন সকাল থেকেই কুমিল্লা নগরী ও এর আশপাশের উপজেলা এবং ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে মোটরবাইকে চড়ে যুবকরা আসছে দল বেঁধে। পর্যাপ্ত মাদক সেবন শেষে কেউ কেউ সীমান্তেই শুরু করে উন্মত্ত আচরণ। আবার অনেকে সঙ্গে করেও নিয়ে যাচ্ছে ফেনসিডিল-ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। 

ঈদের দিন বিকেলেই এ রকম একদল মাদকাসক্তকে আটক করেছেন সীমান্তে টহলরত বিজিবি সদস্যরা। ১০টি মোটরসাইকেলযোগে বিভিন্ন বয়সের ২৮ জন তরুণ ও যুবক মাদক সেবন শেষে উন্মত্ত আচরণ করছিল। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও জরিমানা করা হয়। 

কুমিল্লা কোটবাড়িস্থ ১০ বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ঈদকে কেন্দ্র করে গত তিন দিনে জেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য ছাড়াও অস্ত্র, চোরাই মোটরসাইকেলসহ প্রায় ১৫ লাখ টাকার আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় পণ্য জব্দ করেছে বিজিবি। এসব পণ্য চোরাচারালানে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক হয়েছে বেশ কয়েকজন চোরাকারবারি।

বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে ১০ বিজিবি-কুমিল্লার অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার বলেন, সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে এবং মাদকসেবীদের উৎপাত রোধে বিজিবি সদস্যরা তৎপর রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই অভিযান চলছে এবং চোরাইপণ্য জব্দ ও চোরাকারবারি আটক হচ্ছে।

জানা যায়, ১৬ জুন বিকেলে জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী মীর আলী চৌধুরী এলাকা থেকে ২৮ মাদকসেবীকে আটক করে বিজিবি সদস্যরা। বিভিন্ন স্থান থেকে ১০টি মোটরসাইকেলযোগে বিভিন্ন বয়সের এসব তরুণ ও যুবক ওই এলাকায় মাদক সেবন শেষে উন্মত্ত আচরণ করছিল। পরে সন্ধ্যায় সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রূপালী মণ্ডল এসব মাদকসেবীকে কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রদান করেন। বর্তমানে তারা কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা ভোগ করছেন।

এ ছাড়া একই দিন বিজিবি সদস্যরা অভিযান চালিয়ে 'ধর্মপুর আশ্রয়ণ' এলাকা থেকে একটি দেশি পিস্তল ও এক রাউন্ড কার্তুজসহ মো. ইয়াছিন (৩৫) নামের একজনকে আটক করেন। তিনি ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর গ্রামের সোলেমান মিয়ার ছেলে। 

অপরদিকে, বৌয়ারা বাজার বিওপির টহলদল সীমান্তের দক্ষিণ সূর্যনগর এলাকা থেকে পাঁচ বোতল ফেনসিডিল ও একটি বিয়ার ক্যানসহ শাহজাহান নামের এক মাদকসেবীকে আটক করে। আর মালিকবিহীন অবস্থায় জব্দ করা হয় এক হাজার ইয়াবা ও ১০৩ বোতল ফেনসিডিল।

এর আগের দিন (১৫ জুন) বিজিবি সদস্যরা যশপুর সোনাইছড়ি এলাকা থেকে ১০৪ বোতল ফেনসিডিল, ২৯ বোতল হুইস্কি, ৩৮ বোতল বিয়ার, সাড়ে পাঁচ কেজি গাঁজা জব্দ করে। ১৭ জুন জেলার সীমান্তবর্তী বুড়িরটিলা এলাকা থেকে মাদক সেবন করে ফেরার পথে সাত পিস  ইয়াবা এবং একটি ভারতীয় মোটরসাইকেলসহ দেলোয়ার ও জালাল মিয়া নামের দুই যুবককে আটক করে বিজিবি। 
অপরদিকে, বিবির বাজার বিওপির টহলদল কেরানীনগর এলাকা থেকে একটি মটরসাইকেলসহ সাইফুল ইসলাম ও সাইজুল ইসলাম নামে আরো দুই মাদকসেবীকে আটক করে। এ ছাড়া মালিকবিহীন অবস্থায় জব্দ করা হয় আরো একটি ভারতীয়  মোটরসাইকেল। 

কুমিল্লায় বিজিবি সদস্যদের তিন দিনের অভিযানে উদ্ধার এসব মাদক ও চোরাইপণ্যের আনুমালিক মূল্য ১৪ লাখ ৯০ হাজার বলে জানিয়েছেন ১০ বিজিবির অতিরিক্ত পরিচালক হাসনাত মুহম্মদ মোফাজ্জল করীম। তিনি জানান, আটক মাদকসামগ্রী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য মালামাল কাস্টমস অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভৌগলিকভাবেই সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় কুমিল্লায় মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের তৎপরতা বেশি। মাদকের সহজলভ্যতা ও সীমিত দামের কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে সীমান্তে আনাগোনা বেড়েছে মাদকসেবীদেরও। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে শুরু করে সদর দক্ষিণ, আদর্শ সদর, বুড়িচং এবং ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা পর্যন্ত এ জেলার সীমান্ত-দৈর্ঘ্য ১০৪ কিলোমিটার। দীর্ঘ বছর ধরে  এ পাঁচটি উপজেলার শতাধিক স্থান নিয়ে মাদক, আগ্নেয়াস্ত্র, শাড়ি, থ্রি পিসসহ আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় অবৈধ অনেক পণ্যই অবাধে চলে আসে বাংলাদেশে। 
সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান ও পুলিশের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' কুমিল্লায় বেশ কিছু মাদকব্যবসায়ীর মৃত্যুর পর সীমান্তে মাদকসেবী ও কারবারিদের আনাগোনা অনেকাংশেই কমে আসে। সেই সঙ্গে  অভিযানের খবরে গা ঢাকা দেয় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ঈদকে কেন্দ্র করে আবার সরগরম হয়ে উঠেছে 'অরক্ষিত' সীমান্তের চিহ্নিত মাদক স্পটগুলো। 

কুমিল্লা শহরসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোটরবাইক বা অন্যান্য যানবাহনে করে উঠতি বয়সী তরুণ ও যুবকসহ নানা বয়সী মানুষ ছুটছে সীমান্ত এলাকায়; যেখানে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় ফেনসিডিলসহ তাদের চাহিদার সকল প্রকার মাদক।' 
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লা সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় চিহ্নিত 'স্পটগুলোতে' সন্ধ্যার পরই পাল্টাতে থাকে চিত্র। রাত বাড়ার সাথে সাথে এসব এলাকায় বাড়তে থাকে মাদকের বহর। সীমান্তের ওপার থেকে এপারে মাদক চালানের অন্যতম 'সহায়কের ভূমিকা'  পালন করে ,লাইনম্যানরা'। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে  তাদের রয়েছে সরাসরি যোগাযোগ। সীমান্তের যেসব অংশে কাঁটাতারের বেড়া নেই- অরক্ষিত এসব জায়গা দিয়ে অনায়াসেই মাদক ঢুকছে কুমিল্লায়। ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। 



মন্তব্য