kalerkantho


এই ইদ না সেই ঈদ?

আনিসুল কবীর   

২৫ জুন, ২০১৭ ১৭:২৪



এই ইদ না সেই ঈদ?

ফাইল ফটো

ঈদ বা ‘ইদ’ যাই বলিনা কেন, তাতে ঈদের কিছু যায় আসে না। ইদানিং, ঈদের আনন্দ যেন দিন দিন কমছে। আশংকা করছি আর কিছুদিন পরে ঈদের দিনকে সবাই একটি বিশেষ ছুটির উপলক্ষ হিসেবেই ধরে নিবে। প্রতি বছরই বিদেশে ঈদ করা মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। কক্সবাজার-সিলেটসহ সকল পর্যটন কেন্দ্রের হোটেলগুলোতে ‘তিল ঠাঁই আর নাইরে’ অবস্থা।  

এখনও আমাদের জেনারেশনের অনেকের বাবা-মা বেঁচে আছেন। তাই ঈদের সময় দেশের বাড়িতে ঈদ করার একটা তাড়া থাকে। প্রচণ্ড একটা আকর্ষণ থাকে। কিন্তু এই জেনারেশনের বাবা-মারা চলে যাবার পর আমাদের পরের জেনারেশন মনে হয় না আর নাড়ির টানে নিজ জেলায় ফিরে যাবে। নাড়ি এখন খুব বেশি টান টান হয়ে যাচ্ছে, মনে হয় অচিরেই নাড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমি এই আশংকায় দিন কাটাচ্ছি।

 

এমনও হতে পারে যে, প্রতি ৫ বছরে একবার বিদেশে ঈদ না করলে আপনার প্রেস্টিজের ফালুদা হয়ে যেতে পারে। আমি গত ৫ বছর ধরে চেষ্টা করছি ঈদের সময় বিদেশে গিয়ে থাকবো। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও মনকে মানাতে পারছিনা। ঈদের দিন ভাইবোন বন্ধুবান্ধব আশপাশে থাকবে না, ভাবতেই খারাপ লাগে। আর আমাদের ওপর নির্ভরশীল কতো মানুষ ঈদের সময় আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সবার সাথে একটা বেইমানী টাইপ হয়ে যায়। যাক সে কথা, আমি আজকে চিন্তা করছিলাম আমাদের ছোটকালের ঈদ নিয়ে কিছু লিখতে।

ছোটকালে আমরা থাকতাম সরকারি কলোনিতে। কলোনিগুলোতে বাচ্চাদের মধ্যে ঈদের জামাকাপড় নিয়ে বেশ রেষারেষি হতো। কে কতো টাকা দিয়ে জামা কিনেছে, জুতা কিনেছে এসব নিয়ে আলাপ হতো। বাবা-মায়েরা বেশ বিপদে পড়ে যেত এসময়। সবার ক্রয় ক্ষমতা তো আর একরকম না। কলোনিতে সব ধরনের মানুষই থাকে। কর্মকর্তা, কর্মচারী সবার বাচ্চারাই এক সাথে খেলাধুলা করে। সবাই সবার বন্ধু। কারো বাবা ঘুষ খায়, কারো বাবা অতি সৎ জীবনে অভ্যস্ত। তাই ঈদের কেনাকাটা শেষে বাচ্চাকাচ্চাদের মধ্যে অহংকার, মন খারাপ, বাবা-মায়ের সাথে হইচই- অনেক কিছুই হতো। কান্নাকাটির ঘটনাও প্রচুর হতো।  

কিন্তু ঈদের দিনটি হতো অসম্ভব সুন্দর আর আনন্দময়। ঈদের দিন ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠার পরই মনের মধ্যে আনন্দের একটা রেশমি অনুভূতি শুরু হতো। বাথরুমের নতুন লাক্স সাবানটার গন্ধ অন্য সময়ের চেয়ে কেন যেন অনেক ভালো লাগতো। গোসল করে পরিস্কার পাঞ্জাবী আর পায়জামা (নতুন পাঞ্জাবী থাকতোনা, কারণ শার্ট-প্যান্ট বা পোলো শার্ট কেনার পর আলাদা পাঞ্জাবীর বাজেট থাকতো না) পরে রেডি হয়ে যেতাম। আতর মেখে নতুন টুপি মাথায় দিয়ে এক বাটি করে সেমাই খেয়ে আব্বার সঙ্গে বাসার বাইরে আসার সাথে সাথেই দেখতাম অন্য সব বাসা থেকেও সবাই নামাজ পড়ার জন্য বের হচ্ছে। সবার মুখের মধ্যে খুশির ছটা। বাবাদের পিছে পিছে হাঁটার সময় নিরব খুনসুটি।  

ঈদের নামাজে শেষ হতে তখন অনেক সময় লাগতো। হুজুরের ইসলামি জ্ঞানের ভাণ্ডার নিজের মাথায় ট্রান্সফারের এক পর্যায়ে নামাজ শেষ হতো। এই মুহূর্তটাই ছিলো সবচেয়ে সুন্দর। সবার সাথে হুড়াহুড়ি করে কোলাকুলি করতে করতে সারা বছরের মারপিট, শত্রুতা  সব কিছু কোথায় বাষ্পভূত হয়ে যেতো। মসজিদ থেকে ফেরার পথে প্রায় দৌড়ে আসতাম বাসায়। পাঞ্জাবী পালটে ঈদের জন্য কেনা বা বানানো শার্ট-প্যান্ট গায়ে দিয়ে বাসায় বানানো খাবার-দাবার অল্প করে খেয়ে বাইরে চলে আসতাম।  

বন্ধুবান্ধব একসাথে কলোনির সব খালাম্মাদের বাসায় বাসায় ঘুরতাম। অন্যদিন আমাদের দেখলে মুখ শক্ত করে ফেলা খালাম্মাদেরকেও এসময়ে মনে হতো বেহেস্ত থেকে নেমে আসা কোনো মানুষ, এতো আদর করে খাওয়াতেন যে কী বলবো! সারাদিন ঘুরাঘুরির ফাঁকে প্লাস্টিকের খেলনা হাতঘরি, ললিপপসহ আরও অনেক জিনিস যা বছরভর কিনতে পারি নাই, সেসব আশপাশের মেলা থেকে কিনতাম, নাগরদোলায় চড়ে বিমলানন্দ উপভোগ করতাম।  

আরেকটা মজার বিষয় হচ্ছে, তখন যাদের বাসায় ক্যাসেট প্লেয়ার ছিলো, সেগুলো জোরে জোরে বাজানো হতো। পুরো দিনটা কিভাবে যেন ফুরুত করে এক নিমিষে চোখের সামনে দিয়ে উধাও হয়ে যেত। রূপকথার মতো এক একটা ঈদ যেন বিশাল এক খুশির পসরা নিয়ে প্রতি বছর আসতো আমাদের মাঝে। টাকা পয়সার টানাটানিতেও খুশির ঘাটতি ছিলোনা কখনো। বরং ঈদের খুশির জন্য ঈদের দিনটিই ছিলো যথেষ্ট।  

 


মন্তব্য