kalerkantho


ভাস্কর্য প্রদর্শনী

প্রকৃতির সঙ্গে, মেঘের সঙ্গে

নওশাদ জামিল    

৫ আগস্ট, ২০১৭ ০৯:৪৯



প্রকৃতির সঙ্গে, মেঘের সঙ্গে

রাজধানী শিল্পাঙ্গনে শুরু হয়েছে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রকৃতিকেই প্রথম ও শেষ আশ্রয় মানেন তিনি। প্রকৃতি থেকেই তিনি সংগ্রহ করেন শিল্পের উপাদান।

গাছের মরে যাওয়া শাখা কিংবা বাঁশ দিয়ে তিনি তৈরি করেন শিল্পকর্ম। তুচ্ছ জিনিস, বর্জ্য ও কুড়িয়ে আনা কাঠ তাঁর হাতের স্পর্শে হয়ে ওঠে নান্দনিক শিল্পকর্ম। পর্বতমালা থেকে শ্রাবণের মেঘ, গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা- প্রকৃতির সব নির্যাসই যেন ধারণ করতে চায় তাঁর ভাস্কর্য। তিনি বরেণ্য শিল্পী ফৌরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। প্রকৃতিনির্ভর ভাস্কর্য নিয়ে রাজধানীর শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে শুরু হয়েছে তাঁর একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী।

আয়োজন করে রঙ-তুলি এনে কল্পনার আশ্রয়ে একটা কিছু আঁকবেন—এমন শিল্পী নন মুক্তিযোদ্ধা ও ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। বরং তিনি অনন্য এক ভাবুক মানুষ। তাঁর মধ্যে সতত বাস করে শিল্প ও প্রশান্তি। এ সূত্রে তিনি বিচরণ করেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে।

তিনি এমন এক শিল্পী যিনি প্রকৃতি ও মানুষের রূদ্র রূপ দেখেছেন, পাশাপাশি দেখেছেন শান্তির সপক্ষে মানুষের ভালোবাসা। তাঁর শিল্পের মধ্যে তাই প্রশান্তি মেলে, শান্তির আবির মেলে। ধ্যানমগ্ন শিল্পীর মতো প্রকৃতি থেকে তিনি এই শিল্প-শিক্ষা অর্জন করেছেন। আর সৃষ্টিতে মেলে ধরেছেন শিল্প ও প্রকৃতির অনন্য বারতা।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর ভাস্কর্যে বারবার এসেছে একজন প্রকৃতি মাতার কথা। এই সূত্রে তিনিই প্রকৃতি, তিনি সার্থক মাতা। অবিশ্বাস্য শক্তিতে সুখ-দুঃখ, বৈরিতা সব কিছুকে তিনি ধারণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি শৈল্পিক জগতের ঠিকানা দেন- যেখানে আমাদের দেখা হয় শৈশবের পণ্ডিত মশাই, পথিক, বেদের বহর, জলপুত্র- এমন আরো অনেকের সঙ্গে। আমরা জানতে পারি প্রকৃতি ও মানুষের যুগল বন্ধনের মর্মকথা।

'মেঘের সঙ্গী' শিরোনামের ভিন্নধর্মী এই প্রদর্শনী গতকাল শুক্রবার উদ্বোধন করেন ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। শিল্পী নিসার হোসেনের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেন কথাশিল্পী আনিসুল হকসহ অন্যরা। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী এবং শিল্পাঙ্গন গ্যালারির পরিচালক রুমী নোমান।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলেন, 'আমি বাণিজ্যের কথা ভাবি না। প্রদর্শনীর কথা ভাবি না। শিল্পের দাম নিয়েও ভাবি না। কখনোই ভাবিনি। শুধু শিল্পের কথাই থাকে মনে। ' তিনি বলেন, 'রবীন্দ্রনাথের গানে আমার জীবনের সব রোমান্স। আর প্রকৃতির মাঝে পাই শিল্পের দেখা। আমার সব কাজ প্রকৃতি থেকে নেওয়া। ' 

প্রদর্শনী ঘুরে দেখা যায়, প্রতীকনির্ভর কাজ করেন প্রিয়ভাষিণী। অনুষঙ্গের ভাব ও বস্তুকে তিনি রূপকল্পের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেন। তাতে বিমূর্ততার স্পর্শ নেই। বাস্তবের ঘাত, প্রগাঢ় অনুভূতি ও মানবিক বোধ তাঁকে প্রস্ফুটিত করার অনন্য ক্ষমতা দিয়েছে। প্রকাশবাদী আঙ্গিক ও নিরীক্ষার কারণেই হয়তো তাঁর কাজকে সব সময় নতুন মনে হয়।

শিল্পীদের কাজ পুরাণের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয়। প্রিয়ভাষিণীও বিশেষ করে দেব-দেবীর গড়ন ও কাঠামোর সঙ্গে বিষয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে পুরাণের দিকে চোখ রাখেন। তবে সেখানেও থাকে লোকজ মোটিফ। আবহমান বাংলার প্রকৃতি রূপান্তর করার ক্ষেত্রে তিনি আকার ও গঠনগত কাঠামোর বিন্যাস, অবয়ব গড়ার ক্ষেত্রে বিষয়ের উপলব্ধি ও উপস্থাপনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রিয়ভাষিণীর কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক- সংগীত ও কাব্যের প্রতি মমত্ববোধ। ভাস্কর্যের রূপ অদল-বদলের খেলা যতই নিগূঢ় হতে থাকে, শিল্পী ততই কাব্যের কাছে চলে যান। রবীন্দ্রনাথের বৈশ্বিক চেতনা ও সুরের সঙ্গে তিনি যোগ করে নেন জীবনানন্দের রূপসী বাংলা। একদিকে নিসর্গ, অন্যদিকে আধুনিক মনন। ভাস্কর্যের নামকরণের ক্ষেত্রেও এটা লক্ষ করা যায়। এ কারণে হয়তো তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিই কোমল ও কাব্যিক। বাস্তবতা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের অস্থিরতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, প্রকৃতির সঙ্গে নগর জীবনের বৈপরীত্য কিংবা পাপবোধ যেন তাতে অনুপস্থিত। কথাটা পুরো সত্য নয়। খানিকটা গভীরে গিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে, তিনি প্রকৃতি ও মানুষের ভেতরের মূর্ছনাকেই রূপ দিতে চেয়েছেন। জীবনের কদর্যতা, বঞ্চনা ও নির্মম বাস্তবতাকে তিনি উপেক্ষা করেননি। শিল্পী হিসেবে তিনি প্রকৃতিপিয়াসী, সৌন্দর্য রূপায়ণের কারিগর। তবে তিনি বক্তব্য থেকেও দূরে যান না। যেখানে সংঘাত-নিপীড়ন সেখানেই নতুনতর রূপ দিতে চান শিল্পী। ভাস্কর্যের কাঠামো যতই শক্ত হোক, অনুভবে মনে হয় এর ভেতরে আছে শিল্পীর স্নেহধারা। অপরিসীম ধৈর্য, মমত্ববোধ, সারাক্ষণ শৈল্পিক ভ্রমণের মধ্য দিয়ে তিনি ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলেন মানবিক দিক।

প্রদর্শনীতে শিল্পীর ৮৯টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, সোনালী কন্যা, জলে ভাসা, ভিজে পাখি, ক্ষুধার্ত বক, বীরাঙ্গনা বিলাপ, মিলন তিথি, পরম্পরা, মাতৃত্ব, প্রতিপক্ষ, অপেক্ষা, শৈশব প্রভৃতি।

ধানমণ্ডির ৩০ নম্বর সড়কের গ্যালারি শিল্পাঙ্গনে এই প্রদর্শনী চলবে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা থাকবে সবার জন্য।

 


মন্তব্য