kalerkantho


এস এম সুলতানের ৯৩-তম জন্মবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ আগস্ট, ২০১৭ ১৩:৪৭



এস এম সুলতানের ৯৩-তম জন্মবার্ষিকী আজ

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯১তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের  মাছিমদিয়ায়  পিতা মেছের আলী ও  মা মাজু বিবির  সংসারে  জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

জন্মের সময় তার নাম রাখা হয়েছিলো  লালমিয়া। তার পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান ওরফে লালমিয়া। নড়াইলের সকলে তাকে লালমিয়া নামেই ডাকতো।

দারিদ্যের মাঝেও ১৯২৮ সালে লালমিয়া (সুলতান) নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন। রাজমিস্ত্রি পিতা মেছের আলীর নান্দনিক সৃষ্টির ঘঁষামাজার মধ্য দিয়ে ছোট বেলার লাল মিয়ার (সুলতান) চিত্রাংকনে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ হয়।

লেখাপড়ার অবসরে বাবাকে কাজে সহযোগিতা আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছবি আঁকার হাতেখড়ি তার।

তখন জমিদার রতন বাবুদের রাজত্ব নড়াইলে। এ সময় সুলতানের আঁকা ছবি স্থানীয় জমিদারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নড়াইলের জমিদার ব্যারিস্টার ধীরেন রায়ের আমন্ত্রণে রাজনীতিক ও জমিদার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৩৩ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল পরিদর্শনে আসেন।

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সুলতান শ্যামাপ্রাসাদের একটি পোট্রেট আঁকেন। সুলতানের আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হন শ্যামাপ্রাসাদসহ অন্যরা। উৎসাহ পেয়ে ছবি আঁকায় আরও মনোযোগী হন সুলতান।   জীবিকার সন্ধানে গরীব সুলতানের বোহেমিয়ান জীবনের শুরু হয় এসময়ে।

অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন লাল মিয়া নড়াইলের জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের আমন্ত্রণে কলকাতায় পাড়ি জমান। সুলতানের শিল্পপ্রতিভার বিকাশ ঘটানোর জন্য জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়  সুলতানকে কলকাতার  খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও শিল্প-সমালোচক  কলকাতা আর্ট স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য অধ্যাপক সায়েদ সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। একাডেমিক যোগত্যা বিচার না করেই একরকম  জবরদস্তি করেই ১৯৪১ সালে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অষ্টম শ্রেণী পাস সুলতানকে কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি করা হয়। ১৯৪৪ সালে কলেজের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান দখল করে চতুর্থ বর্ষে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন নি।

১৯৪৩ মতান্তরে ৪৪ সালে কলকাতা আর্ট স্কুল ত্যাগ করে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ান সুলতান। কাশ্মীরের পাহাড়ে উপজাতীয়দের সাথে কিছুদিন বসবাস করেন এবং তাদের জীবন-জীবিকা ভিত্তিক চিত্র আঁকেন। ১৯৪৫ মতান্তরে ৪৬ সালে ভারতের সিমলায় তার প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের লাহোরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ সুলতানের একটি চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। ১৯৫০ সালে চিত্রশিল্পীদের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমেরিকা যান এসএম সুলতান। এরপর ইউরোপের বেশ কয়েকটি একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। পাবলো পিকাসো, সালভেদর দালি, পল ক্লীসহ খ্যাতিমান শিল্পীদের ছবির পাশে এশিয়ার একমাত্র শিল্পী হিসেবে এসএম সুলতানের ছবি বিভিন্ন প্রদর্শনীতে স্থান পায়।

১৯৫৫-৫৬ সালের দিকে শিল্পী সুলতান মাটির টানে দেশে ফিরে আসেন এবং নিজস্ব উদ্যোগে জন্মস্থান নড়াইলের মাছিমদিয়ায় ফাইন আর্ট স্কুল ও “শিশুস্বর্গ” নামে শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এসময় নড়াইলের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়ে মানুষের সাথে মিশেছেন বোহেমিয়ান সুলতান। কুড়িগ্রামে পৈত্রিক জমিতে একটি ছোট ঘর ছিলো তার। আর তার ছিলো গোটা কয়েক বিড়াল-কুকুর বানর। পালিতা কন্যা নিহার বালা তাকে দেখাশোনা করতো। কথিত আছে, ১৯৮৩ সালে এরশাদের সামরিক শাসনামলে এরশাদ যুক্তরাজ্যে সফরে গিয়ে সেখানকার একজন শিল্প বোদ্ধার কাছে সুলতানের নাম শোনেন। তিনি এরশাদকে এই বরেন্য শিল্পী কেমন আছেন সে সম্পর্কে জানতে জান । এরশাদ তাকে না চিনেই বলেন “ভালো আছে ”। দেশে ফিরে এরশাদ এই শিল্পীর খোঁজ করে তার পৈত্রিক নিবাসে একতলা একটি বাড়ি নির্মাণ করে দেন। যা বর্তমানে সুলতানের জাদুঘর হিসেবে সুলতান সংগ্রহশালা নামে রয়েছে।

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর চিরকুমার, অসাম্প্রদায়িক এই শিল্পী যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে দেহ ত্যাগ করেন।   প্রিয় জন্মভূমি নড়াইলের কুড়িগ্রামে তাকে দাফন করা হয়।

সুলতানের শিল্পকর্মের বিষয় ছিলো-কৃষক, জেলে, তাঁতি কামার, কুমার, মাঠ, নদী, হাওর, বাঁওড়, জঙ্গল, সবুজ প্রান্তর তথা খেটে খাওয়া পেশীবহুল মানুষগুলো। বাঁশি বাজাতেও পটু ছিলেন সুলতান।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা: শান্তিপ্রিয় সুলতান চিত্রশিল্পের মূল্যায়ন হিসেবে ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের ‘রেসিডেন্ট আর্টিস্ট’ স্বীকৃতি এবং ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়াও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’ পুরস্কার লাভ করেন।

দিবসটি পালন উপলক্ষে এসএম সুলতান ফাউন্ডেশন, জেলা শিল্পকলা একাডেমী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, মূর্ছনা সঙ্গীত নিকেতনসহ বিভিন্ন স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শিল্পীর মাজার জিয়ারত, মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পন, কোরানখানি, দোয়া, শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণী।

প্রতিবছরই সুলতানের জন্মদিনে জেলার সবচেয়ে বড় নৌকাবাইচের আসর বসে চিত্রানদীতে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর  রোয়িং ফেডারেশন ও সুলতান ফাউন্ডেশনের আয়োজনে চিত্রা নদীতে পুরুষ ও নারীদের নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া  শিল্পীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ৬ সেপ্টেম্বর থেকে সুলতান মঞ্চে ৪ দিনব্যাপি ‘সুলতান উৎসব’ আয়োজন করা হবে। সুলতান ফাউন্ডেশন ও জেলা প্রশাসন এবং এস এম সুলতান শিশু চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশন এ উৎসবের আয়োজন করবে।


মন্তব্য