kalerkantho


মণিভূষণ ভট্টাচার্য; মঞ্চনাটক যার জীবন ও ভালোবাসা

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল   

২৫ আগস্ট, ২০১৭ ১৩:৩৫



মণিভূষণ ভট্টাচার্য; মঞ্চনাটক যার জীবন ও ভালোবাসা

ছবি: প্রিয়ন্ত পাল

বয়স যখন ৮, বাড়ির সামনে বাগানটির জঙ্গল পরিস্কার করে আয়োজন করা হলো মঞ্চনাটকের। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'মুকুট'।

নাটকের উদ্যোক্তা এবং নির্দেশক কাকা আশুতোষ ভট্টাচার্য। বাড়ির কেউ হলেন অভিনয়শিল্পী আর বাকীরা দর্শক। অভিনয় একেবারে মন্দ হলো না।  সেই থেকে শুরু হলো নাট্যাঙ্গনে মণিভূষণ ভট্টাচার্যের পথচলা। নাটকের সঙ্গে গভীর প্রেম তার তখন থেকেই। ময়মনসিংহের গুণী নাট্যব্যক্তিত্ব মণিভূষণ ভট্টাচার্যের মনে নাটকের বীজ বপন হয়েছিল সেই সময়েই। সেই প্রেম ধীরে ধীরে আরও গভীর হলো যখন তিনি ময়মনসিংহের বিখ্যাত মৃত্যুঞ্জয় হাইস্কুলে ভর্তি হলেন।

মৃত্যুঞ্জয় হাইস্কুলে তখন বেশ সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল। প্রতিবছর নিয়ম করে মঞ্চ নাটক হতো।

মণিভূষণ ভট্টচার্য সেখানে পেয়ে যান শংকর স্যারকে। তার কাছ থেকেই নাটকের অ আ ক খ শেখা। পড়াশোনার পাশাপাশি চলত নাটকের মহড়া। তখন কল্যাণ মিত্রের নাটক, আলাউদ্দিনের নাটক, রবীন্দ্রনাথের নাটক, মুনীর চৌধুরীর নাটক, সুকুমার রায়ের নাটকগুলোর মহড়া হতো। ১৯৭৬ সালে যখন তিনি দশম শ্রেণির ছাত্র, দারুণ এক টার্নিং পয়েন্ট আসে মণিভূষণ ভট্টাচার্যের জীবনে। আন্তঃস্কুল নাট্য উৎসবে রবীন্দ্রনাথের 'মুকুট' নাটকের ঈশা খাঁ চরিত্রে অভিনয় করে দ্বিতীয় পুরস্কার পান তিনি।

উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। নাটকের প্রতি পাগলামি এতটাই বেড়ে গেল যে সেই পুরস্কারটি নিয়ে বিছানায় ঘুমাতেন। বাড়ির কারও সেটা স্পর্শ করার 'অনুমতি' ছিল না। এসএসসির পর ১৯৭৮ সালে বন্ধুরা মিলে 'তরুণ নাট্য গোষ্ঠী' নামে একটি নাটকের দল গঠন করলেন। বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন বাদল বসাক, আনিসুর রহমান, মনু দত্ত, আসলাম প্রমুখ। ১৯৮০ সালে ময়মনসিংহ শহরের টাউনহলে শহীদ মুনির চৌধুরীর বিখ্যাত নাটক 'কবর' মঞ্চায়িত হলো। মুর্দা ফকির চরিত্রে অভিনয় করলেন মণিভূষণ। কয়েকবছর পর সকলের জীবন ও জীবিকার তাগিদে এবং অর্থাভাবে সেই দলটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে গিয়েছিল। বাকীরা নিজ নিজে পেশা বেছে নিলেও কেবল মণিভূষণ ভট্টাচার্যই নাটকের প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকেন। কিন্তু এবার তিনি কী করবেন? নাটক তো করতেই হবে। নাটক ততদিনে তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

সুযোগ অবশেষে আসল। দল ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৮৪ সালে দেশের সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীতে যোগ দিলেন তিনি। উদীচীর সেই নাটক বিভাগে ছিলেন তার অগ্রজ অরুণ ভট্টাচার্য নয়ন, রাজা দিলীপ, নরেশ দেবনাথ প্রমুখ স্বনামধন্য অভিনেতা আর নির্দেশক। পাশাপাশি তিনি শহরের বহুরূপী নাট্যসংস্থাতেও কাজ করতেন। দুই সংগঠনে কাজ করার চাপ সামলাতে বেশ কষ্ট হলেও পিছপা হননি নাটক পাগল এই মানুষটি।

মণিভূষণ ভট্টাচার্য অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শাস্তি', 'রাজা', মুহিত চট্টোপাধ্যায়ের 'মহাকালীর বাচ্চা', এম এ খালেকের 'মাস্তান সুন্দরী জোস্না', বাদল সরকারের 'বাকী ইতিহাস', 'ভূমিকম্পের পরে', 'চর্যাপদের হরিণী', মাইকেল মধুসুদন দত্তের 'বুড়ো শালিকর ঘাড়ে রোঁ', উদীচীর বিখ্যাত নাটক 'ইতিহাস কথা কও', 'দিন বদলের পালা', এসএম সোলায়মানের 'ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল', উপমহাদেশের প্রখ্যাত অভিনেতা এবং নির্দেশক উৎপল দত্তের 'স্পেশাল ট্রেন' ইত্যাদি।

'ইতিহাস কথা কও' নাটকটি মঞ্চায়ন করতে গিয়ে এক ভিন্নরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন মণিভূষণ ভট্টাচার্য। তখন স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলের শেষদিক। উদীচীর আয়োজনে সেই নাটক দেখতে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় মানুষের ঢল নামল। নাটকের শেষদিকে একটি দৃশ্য ছিল এমন- একজন পাগল মঞ্চে উঠে চিৎকার করে বলবে 'ওই...., গান বন্ধ....!' সেই পাগলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মণিভূষণ। মঞ্চে উঠে ডায়লগ দেওয়ার সাথে সাথে উত্তেজিত হয়ে ওঠে দর্শকরা। মণিভূষণকে মৌলবাদী শক্তির একজন মনে করে মঞ্চে উঠে বেদম মার দেওয়া শুরু করে তারা! কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছিল না উত্তেজিত জনতাকে। ওই পাগলটি যে একজন অভিনেতা, এই দৃশ্যটি যে নাটকের একটি অংশ, তা বিশ্বাসই করছিল না কেউ! শেষ পর্যন্ত মঞ্চের মাইকে বারংবার ঘোষণা দিয়ে দর্শকদের শান্ত করা হয়। এরপর নাটকের বাকী অংশ মঞ্চায়িত হয়। ঘটনা ভয়াবহ হলেও সেদিন সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন মণিভূষণসহ সবাই।

ইতিমধ্যেই অভিনয়ের পাশাপাশি নির্দেশনা দেওয়া শুরু করেছিলেন। গণসাহায্য সংস্থার গণনাটক বিভাগ থেকে তার নির্দেশনার শুরু। ১৯৯৩ সালে তিনি যোগদান করেন এই সংস্থাটিতে। এখানেই উমহাদেশের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব বাদল সরকারের প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ পান তিনি। এটাকে জীবনের বড় একটি অর্জন বলে মনে করেন মণিভূষণ ভট্টাচার্য। এছাড়া আনন্দমোহন কলেজে পড়াশোনার সময় নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের 'গ্রাম থিয়েটার' এ যোগ দেন তিনি। সেই সুবাদে বেশ কিছুদিন সেলিম আল দীনের সহচর্যে আসেন। 'মড়া' নাটকে নির্দেশনা দিয়ে তার ক্যারিয়ারের শুরু। এছাড়া 'দেয়ালের লিখন', 'শাস্তি', 'জনৈকের মহাপ্রয়াণ', 'রথের রশি', 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ' ইত্যাদি বহুল আলোচিত সব নাটক। সময়ের সাথে সাথে অভিনেতা মণিভূষণ ভট্টাচার্য হয়ে ওঠেন নাট্যগুরু।

চলছে নাটকের মহড়া।  ছবি: প্রিয়ন্ত পাল

নাট্যগুরু মণিভূষণের গুরু ছিলেন অরবিন্দ সরকার জীবন। তার নির্দেশনায় অনেক নাটকে কাজ করেছেন তিনি। শিখেছেন নাটকের অনেক কিছু। প্রায় অর্ধশত বছরের ক্যারিয়ারে মণিভূষণ ভট্টাচার্য অভিনীত নাটকগুলোর প্রায় ৭ শতাধিক মঞ্চায়ন হয়েছে। তার মধ্যে 'দিন বদলের পালা' নাটকটি শতাধিকবার মঞ্চায়িত হয়েছে।

নাটক নিয়ে দেশের বাইরে গিয়েছেন বেশ কয়েকবার। প্রথমবার উদীচীর হয়ে কলকাতার ময়াদানে গিয়েছিলেন ময়মনসিংহ গীতিকার বিখ্যাত পালা 'মহুয়া' অবলম্বনে একটি নৃত্যনাট্য নিয়ে। একই নাটক নিয়ে বহুরুপী নাট্যসংস্থা থেকে শিলিগুরির মধুসূদন নাট্যমঞ্চে গিয়েছিলেন। এছাড়া মান্নান হীরার নাটক 'আগুনমুখার' নিয়েও ভারতে গিয়েছেন। সেরা নির্দেশনার কথা জানতে চাইলে স্মৃতি হাতড়ে তিনি বাছাই করতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত 'দেয়ালের লিখন', 'মড়া' আর 'শাস্তি' নাটকের কথা আলাদা করতে পারলেন। মণিভূষণ ভট্টাচার্য এখন কেবল অভিনেতা নন, ময়মনসিংহের অনেক তরুণ মঞ্চভিনেতা, নির্দেশকদের নাট্যগুরু তিনি।

উদীচী ও বহুরূপীতে নাটক করার পাশাপাশি ২০০২ সাল থেকে ময়মনসিংহ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে নাট্য প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। কাকা আশুতোষ ভট্টাচার্য আর বড় ভাই অরুণ ভট্টাচার্যের উৎসাহে তার এতদূর পথচলা। একটা সময় পর বাবা-মার অনুপ্রেরণা লাভ করেন তিনি। সবাই মিলে বাড়ির দুই ছেলের নাটক দেখতে যাওয়া হতো তখন। তারপর একসময় নিজের সংসার হলো। সংসারের প্রয়োজনে পেশাগত কাজে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ওই যে নাটক, সেই নাটক তো পেশাগত কাজে বিঘ্ন ঘটাত। এটা নিয়ে স্ত্রী বিউটি ভট্টাচার্যের সঙ্গে খিটিমিটি হতো মাঝেমধ্যেই। একমাত্র মেয়ে পূজা যখন বড় হলো, তখন সেই হয়ে উঠল নাটকপাগল বাবার আশ্রয়। বাবা চুপিচুপি মেয়েকে বলে নাটক করতে বের হয়ে যেতেন, আর মায়ের অগ্নিমূর্তি থেকে বাবাকে বাঁচাত মেয়ে। একসময় বিউটি ভট্টাচার্য বুঝতে পারেন তার স্বামীর রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে নাটক। দুটোকে আলাদা করা সম্ভব নয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তিনিই মণিভূষণ ভট্টাচার্যের সবচেয়ে বড় উৎসাহদতা।

বিখ্যাত নাটক 'দিন বদলের ইতিহাস' এ অভিনয়। ছবি: ফয়জুর রহমান জোহান

একটি বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো, বড় ভাই অরুণ ভট্টাচার্য নয়ন এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী। বড় ভাই, বড় প্রেরণাদাতা একজনের এমন অসুস্থতা কষ্ট দেয় মণিভূষণকে। এই মুহূর্তে তিনি প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব মমতাজউদ্দিন আহমেদের 'যামিনীর শেষ সংলাপ' নাটকে অভিনয় করছেন। নাটকটি আগামী ৮ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চায়িত হওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘ বছর নাটকের সাথে পথচলায় মণিভূষণ পেয়েছেন সুন্দর মানুষ হওয়ার শিক্ষা। তিনি বিশ্বাস করেন ব্যক্তিকে সৎ, চরিত্রবান আর সুন্দরতম হিসেবে গড়ে তোলে নাটক।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, 'নাটক করে পেয়েছেন টা কী? টাকা-পয়সা? বাড়ি-গাড়ি' মণিভূষণ তাদের হাসিমুখে জবাব দেন, তিনি পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা। জীবন বাস্তবতার যুদ্ধে এই ভালোবাসাই তার এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা।

যুগসন্ধিক্ষণের মানুষ মণিভূষণ ভট্টাচার্য। বাংলা নাটকের সোনালী যুগ থেকে বর্তমানের ক্রান্তিকালের সাক্ষী তিনি। বর্তমানের মঞ্চনাটক নিয়ে তার সন্তুষ্টি থাকলেও টিভি নাটকের হালচাল দেখে তিনি ভীষণ মর্মাহত। তার ভাষায়, 'একটা সময় ছিল যখন টিভি নাটক মানে নির্দিষ্ট সময়ে টিভির সামনে বসে যাওয়া। মানুষ দোকানপাট বন্ধ করে টিভির সামনে বসত। রাস্তাঘাট খালি হয়ে যেত। এখন সব একই ধরনের নাটক, একই ধরনের অভিনয়, একই ধরণের স্ক্রিপ্ট। ভালো নাটক হচ্ছে না, ভালো অভিনয় হচ্ছে না, ভালো নাটক লেখা হচ্ছে না। এটা আমাদের দেশের নাটকের জন্য একটি ক্রান্তিকাল। '

ময়মনসিংহ উদীচী কার্যালয়ে ছবিটি তুলেছেন ফয়জুর রহমান জোহান

নাটকের এই দুরাবস্থার জন্য তিনি দায়ী করেন অতি বাণিজ্যিক মানসিকতাক, যা শিল্পকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সেইসঙ্গে টিভি নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখার ব্যর্থতা, বিজ্ঞাপনের বাহুল্যকে দায়ী করেন তিনি। নাটকের সংখ্যা বাড়লেও এর মান ক্রমেই নিম্নগামী হচ্ছে। দেশের নাটকের এই হাল তাকে কষ্ট দেয়। অভিনয় না জেনেও, কেবল পরিচালকের সঙ্গে বিভিন্ন সম্পর্ক সৃষ্টি করে এখন অভিনয়শিল্পী হওয়া যায়। ইউটিউবে যার হিট যত বেশি সে নাকি ততবড় অভিনেতা!

তবে মণিভূষণ ভট্টাচার্যের আশা, আবারও একদিন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে প্রবল একটি জোয়ার আসবে। ভালো নাট্যকার, অভিনেতা, নির্মাতারা উঠে আসবে। আবার বদলে যাবে বাংলাদেশের নাটক। ময়মনসিংহের নাট্যজগতের প্রাণপুরুষ মণিভূষণ ভট্টাচার্যের স্বপ্ন একটি নাট্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা। যেখানে প্রকৃত অভিনয় শিখতে পারবে তরুণ নাট্যানুরাগীরা।


মন্তব্য