kalerkantho


সচল ঢাকার অচল সড়ক

যানজটের ক্ষতি পোষাতে ভাড়া সন্ত্রাস!

যানজটের মধ্যে মানুষ হাঁটে সড়কে

নিজস্ব প্রতিবেদক    

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ১২:৪৭



যানজটের ক্ষতি পোষাতে ভাড়া সন্ত্রাস!

যানজটের কারণে রাজধানীতে বাস, মিনিবাস, হিউম্যান হলার, অটোরিকশা থেকে শুরু করে অ্যাপভিত্তিক গাড়িতেও বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সর্বশেষ সমীক্ষা অনুসারে, ঢাকার গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া বাবদ একজন যাত্রীকে মাসে ৩০০ থেকে ৯০০ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। সমিতির গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য পর্যবেক্ষণ উপকমিটির পাঁচ সদস্যের দল তিন মাসে ১০৩০টি বাস-মিনিবাসের যাত্রীসেবা পর্যবেক্ষণ করে সম্প্রতি প্রতিবেদন দিয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ৮৭ শতাংশ বাসেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

জানা গেছে, গত ৫ ডিসেম্বর রাজধানীতে তিনটি পরিবহন কম্পানি ২৮টি পথে হিউম্যান হলারের ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের অনুমতি ছাড়াই ভাড়া বাড়ান উৎসাহী মালিকরা। তাঁরা দাবি করছেন, যানজটে ট্রিপ কমে যাওয়ায় তাঁরা ভাড়া বাড়িয়েছেন। যানজটে ট্রিপ কমে গেছে আগের চেয়ে অর্ধেক।

বাসের সংকট থাকায় অনুমোদনহীন হিউম্যান হলার ঢাকাবাসীর অনেকের চলাচলের ভরসা হয়ে উঠেছে। হিউম্যান হলার লেগুনা মালিক সমিতি গত ৫ ডিসেম্বর থেকে ১৮টি রুটে ভাড়া বাড়িয়ে নোটিশ টানিয়েছে। রাস্তায় যানজটের কারণ দেখিয়ে দেশ মাটি ও গ্রিন মোটরস নামে দুটি কম্পানি আরো ১০টি রুটে ভাড়া বাড়িয়েছে যাত্রীপ্রতি পাঁচ টাকা। মোহাম্মদপুর থেকে খামারবাড়ি রুটে ভাড়া পাঁচ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০ টাকা।

গ্রিন মোটরসের লাইন সুপারভাইজার মো. সেন্টু বলেন, ‘যানজটের জন্য ট্রিপ ৯টি থেকে ছয়টি হয়েছে। আমাদের ৪০টি গাড়ির আয় কমে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে ভাড়া বাড়িয়েছি।’

ঢাকা মহানগরীতে বড় বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে এক টাকা ৭০ পয়সা, মিনিবাসে এক টাকা ৬০ পয়সা। সর্বনিম্ন ভাড়া বড় বাসে সাত টাকা, মিনিবাসে পাঁচ টাকা। এ ভাড়ায় দুই ধরনের বাসে কমপক্ষে তিন কিলোমিটার ভ্রমণ করার সুযোগ আছে; কিন্তু তা সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না বলে যাত্রীদের অভিযোগ।

রায়েরবাগ থেকে মানিকনগর হয়ে কুড়িল পর্যন্ত পথে মাসে ২৬ দিন চলাচল করতে হয় একটি বেসরকারি অফিসে কর্মরত মো. আলাউদ্দিনকে। রায়েরবাগ থেকে অনাবিল পরিবহনের বাসে উঠলে তাঁকে ভাড়া দিতে হয় ৪০ টাকা। অল্প আয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারে পাঁচ টাকা বেশি খরচ করাটা অনেক কঠিন। খরচ কমাতে আলাউদ্দিন রায়েরবাগ থেকে মানিকনগর পর্যন্ত লাব্বাইক পরিবহনের বাসে ভাড়া দেন ১৫ টাকা। বাস থেকে নেমে পরে মানিকনগর থেকে কুড়িলে আসতে রাইদা পরিবহনে ভাড়া দেন ২০ টাকা। বাস বদল করে এভাবে একবার চলাচলে পাঁচ টাকা বেঁচে যায়। এতে দিনে আসা যাওয়ায় ১০ টাকা খরচ কমান তিনি। সরকারি ভাড়ার হার অনুসারে, রায়েরবাগ থেকে কুড়িলপথে বাসভাড়া বড়জোড় ২৫ টাকা। আলাউদ্দিন জানান, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ১০ টাকা বেশি তাঁর কাছ থেকে জোর করেই নেওয়া হচ্ছে। সংসারে মাসে আয় তাঁর ১২ হাজার টাকা। যারা বাস পান না তাঁদের বাধ্য হয়ে এই একই দূরত্বের জন্য অটোরিকশায় গুনতে হয় ৩০০ টাকা। তা যদি না মেলে অ্যাপে উবার ডাকলে কমপক্ষে ৬০০ টাকা গুনতে হয়। এভাবে ঢাকা মহানগরীর দুই শতাধিক পথে পরিবহনে উঠে ভাড়া সন্ত্রাসের শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীদের। মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসিন্দা ফারিয়া রসুল গতকাল রবিবার পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন, কলেজগেট থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত গেলেই ১০ টাকা দিতে হচ্ছে। ছাত্রদের ভাড়া অর্ধেক রাখা উচিত হলেও তা মানা হচ্ছে না।

বিআরটিএর ভাড়ার তালিকায় দেখা গেছে, মিরপুর-১২ নম্বর সেকশন থেকে গুলশান হয়ে নতুনবাজার পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার পথে ১১টি স্থান থেকে যাত্রী তোলার নিয়ম রয়েছে। বিআরটিএ নির্ধারিত বাস ভাড়া ২৭ টাকা। কিন্তু বিহঙ্গসহ বিভিন্ন পরিবহনে এক স্থান থেকে অন্য যেকোনো স্থানে গেলেই কমপক্ষে ২০ টাকা রাখা হচ্ছে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রতিটি বাস ২০ শতাংশ আসন খালি নিয়ে চলাচল করবে ধরে নিয়েই ভাড়ার হার ঠিক করেছিল সরকার। কিন্তু ঠাসাঠাসি করে যাত্রী তোলা হচ্ছে। তার মধ্যে চালু করা হয়েছিল ‘সিটিং বাস সার্ভিস’। গত এপ্রিলে তা বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তারপর কমিটি হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। সিটিং বাসে ভাড়া সন্ত্রাস চলছেই।

মিরপুর আনসার ক্যাম্প থেকে নতুনবাজার রুটে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী নওশের আলী বলেন, মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, কালশী, শেওড়া, কুড়িল, নর্দা হয়ে নতুনবাজার চলাচল করে এমন সব বাসে উঠলেই ২৫ টাকা দিতে হচ্ছে। এরা সরকারি ভাড়ার তালিকা মানছে না। আসা যাওয়ায় দিনে ১০ টাকা বেশি দিয়ে মাসে কমপক্ষে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে বাবর রোডের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নিয়ামত আলীকে। তিনি বলেন, যানজট, ভাঙা রাস্তা, ভাঙা বাসে দম বন্ধ হয়ে যায়। তার পরও মাসে বেশি টাকা বের করে দিতে হচ্ছে।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রায়ই বলছেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। বাস্তবে ভাড়া সন্ত্রাস কমছে না।


মন্তব্য