kalerkantho


বাড়িতেই হানা দিচ্ছে মোটরসাইকেল ছিনতাইকারীরা

বাঁধার মুখে পড়লেই হামলা

এস এম আজাদ   

১৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:৫০



বাড়িতেই হানা দিচ্ছে মোটরসাইকেল ছিনতাইকারীরা

মোটরসাইকেল চোর-ছিনতাইকারীরা তাদের কৌশল পাল্টেছে। আগে রাস্তায় বা বাইরে রাখা মোটরসাইকেল বেশি চুরি হলেও এখন অপরাধীরা বাড়ি বাড়ি হানা দিচ্ছে। বাড়ির পার্কিংয়ে রাখা মোটরসাইকেল তালা ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে তারা। বাঁধার মুখে পড়লেই নিরাপত্তাকারী বা মোটরসাইকেলের মালিককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করছে। বেশির ভাগ ঘটনা ঘটছে শুক্র-শনিবার, বন্ধের দিনে। গত এক মাসে দুই ডজনের বেশি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। হামলায় এক নিরাপত্তাকর্মী নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন।

সর্বশেষ গতকাল শুক্রবারও দুটি ঘটনা ঘটে। ভোরে মুগদার মানিকনগরের একটি বাসায় নিরাপত্তা কর্মী মিজান (৫৫) ও একটি ফ্ল্যাটের গৃহকর্মী আব্দুল গণিকে (৩০) কুপিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। দুপুরে খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগের উত্তর গোড়ান-আদর্শনগের একটি বাড়ির নিচে থেকে মোটরসাইকেলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, মোটরসাইকেল চুরি বা ছিনতাই হলে সে ঘটনার তদন্ত হয় না।
সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেই দায় এড়িয়ে যায় পুলিশ। ছিনতাই হওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনাও কম। তদন্ত ও মামলা না হওয়ায় হাজারো ঘটনা ধামাচাপা পড়ছে। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে কৌশল পাল্টে বাড়িতেই ঢুকছে অপরাধীরা। এ জন্য ছুটির দিনে বেশি বাসায় থাকা অলস মোটরসাইকেলটিই তাদের পছন্দ।

গত ৮ মার্চ দিবাগত রাতে মিরপুরের উত্তর টোলারবাগে মোটরসাইকেল চুরিতে বাধা দিতে গিয়ে খুন হন নিরাপত্তাকর্মী ওমর ফারুক। এ ঘটনায় জড়িতদের কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তবে চুরি যাওয়া মোটরসাইকেলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০ মার্চ উদ্ধার করে পুলিশ। একইরাতে মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের 'ই' ব্লকের নোভা রহমান হাউজিং সোসাইটির একটি বাসায় হানা দেয় চোরেরা। সেখানেও মোটরসাইকেল চুরিতে বাধা দেওয়ায় দুর্বৃত্তের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন নিরাপত্তাকর্মী অপু কুমার সরকার ও আনিসুর রহমান।

দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, একটি সিন্ডিকেট করেছে মনে হলেও এর সঙ্গে কারা জড়িত তা বের করা যায়নি। সাধারণত চুরি করা মোটরসাইকেল কেউ ফেলে যায় না। হত্যার আলামত বলেই মোটরসাইকেলটি ফেলে রাখা হয় বলেই ধারণা পুলিশের।

গত ১০ মার্চ ভোরে খিলগাঁওয়ের উত্তর গোড়ানের ৬৬ নম্বর বাসায় কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকে তিন চোর। সেখানেও একইভাবে তাদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন নিরাপত্তাকর্মী মনির হোসেন। ওই বাড়ির অদূরে আদর্শবাগে গতকাল দিনেদুপুরে ঘটে ঘটনা। ভুক্তভোগী নূরে আলম কালের কণ্ঠকে জানান, ৩৫০ নম্বর বাড়ির নিচে তার ডিসকভার মোটরসাইকেলটি রাখা ছিল। দুপুরে নামাজের সময় লোকজন ছিল না। এ সুযোগে চোর হানা দেয়। পাশের গলির মুখে সিসি ক্যামেরা আছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, একজন লাল গেঞ্জি পড়া যুবককে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যেতে দেখেন তারা। নূরে আলম জানান, চুরির ঘটনায় পুলিশ জিডি নিয়ে তদন্ত করছে।

জানতে চাইলে খিলগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাহাঙ্গীর হোসেন খান বলেন, 'ঘটনাটি আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি।'

খিলগাঁওয়ের কাছেই মুগদায় মানিকনগরের ৮২/৮৩ নম্বর নুর ফাতেমা ভবনে গতকাল ভোর ৫টায় তিন ছিনতাইকারী ঢুকে পড়ে। রাসেল নামে এক ফ্ল্যাট মালিক জানান, ছিনতাইকারীরা নিরাপত্তা কর্মী মিজানকে চাপাতি দিয়ে এবং গৃহকর্মী আব্দুল গণিকে রড দিয়ে আঘাত করে মোটরসাইকেল নিয়ে যায়।

টোলারবাগ ও গোড়ানের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, এ দুই এলাকায় কয়েক বছর ধরেই বাড়িতে মোটরসাইকেল চোর-ছিনতাইকারীরা হানা দেয়। মাঝে বন্ধ থাকলেও এখন আবার বেড়েছে।

গত ১০ মার্চ ভোরে হাজারীবাগের বউবাজার এলাকায় নিরাপত্তাকর্মী মুরাদ হোসেনকে ছুরিকাঘাত করে মোটরসাইকেল চুরির চেষ্টা চালানো হয়। এ সময় চোর শিবলিকে আটকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয়রা।

হাজারীবাগ থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া বলেন, শিবলি চিহ্নিত চোর। এর আগেও তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিন্ডিকেটের সদস্য হলেও সে একা অপরাধ করে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ সূত্র জানায়, গত এক মাসে মোটরসাইকেল ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত অন্তত ১২ জন সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। কোনো ঘটনায়ই পরে তদন্তে অপরাধী ধরা পড়ার নজির নেই। গত বছরের ১৯ অক্টোবর ধানমণ্ডির ৯/এ এলাকার একটি ছয় তলা বাড়ির নিরাপত্তা কর্মী মেনহাজ উদ্দিনকে (৫০) ছুরিকাঘাত করে মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে ছিনতাইকারীরা। বাড়ির কেয়ারটেকার তৌফিক এলাহী বলেন, এ ঘটনায় একবার পুলিশ এসে খোঁজ নিয়ে যায়। পরে আর কিছুই হয়নি।  

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের শেষ তিন মাসে রাজধানীতে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে ৭৮টি। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে সারাদেশে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় ২৯২টি মামলা হয়। একই সময়ে পুরনো ঘটনায় উদ্ধার হয়েছে মাত্র ১৩৫টি মোটরসাইকেল। মামলা না হওয়ায় ঘটনাগুলো পুলিশের এই তথ্যের বাইরে রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত চলছে। শিগগিরই জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।'



মন্তব্য