kalerkantho


‘বাহাদুর শাহ’ই রাস্তার আসল বাহাদুর!

জাহিদ সাদেক   

১৬ মে, ২০১৮ ১৭:২৮



‘বাহাদুর শাহ’ই রাস্তার আসল বাহাদুর!

নাম বাহাদুর শাহ পরিবহন। নেই কোনো রুট অনুমতি। তবু রাস্তায় চলছে পাগলা ঘোড়ার গতিতে। নির্দিষ্ট রুট অনুমতি না থাকায় যখন-তখন ঢুকে পড়ছে পুরান ঢাকার চিপা গলিতে। আর এতেই বাধছে বিপত্তি। গলির সে জ্যাম ছাড়তে লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গলিতে গাড়ি ঢোকালে হেঁটে চলা যাত্রীরাও চলাচল করতে পারে না রাস্তায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শনিবার সন্ধ্যায় পুরান ঢাকার সূত্রাপুর থানার সামনে দিয়ে ঋষিকেশ দাস লেনে বাহাদুর শাহ পরিবহনের দুটি গাড়ি ঢুকে পড়ে। এতে রাস্তায় দেখা দেয় প্রচণ্ড যানজট। এই জ্যাম ছাড়তে সময় লাগে আধঘণ্টার বেশি সময়। এই সময়ের মধ্যে এমন অবস্থা যে রাস্তায় হেঁটে পার হওয়ারও জো নেই। একে তো গলিতে রিকশার দৌরাত্ম্য, এর সঙ্গে দুটি বাহাদুর শাহ পরিবহন। স্থানীয় সূত্রাপুর বাজারের দোকানদার শাহ লেবু বলেন, এই রাস্তা যা প্রশস্ত তাতে একটি বাহাদুর শাহ কিংবা চার চাকার একটি গাড়ি ঢুকলে রাস্তায় হাঁটার মতো জায়গা থাকে না। আরো বিপত্তি বাধে যখন উল্টো দিক থেকে আরেকটি গাড়ির সঙ্গে ক্রসিং হয়। এদের বলার কিছুই নেই। এরাই এখন রাস্তার ‘বাহাদুর’ হয়ে গেছে। যখন ইচ্ছা যে রাস্তায় সেদিকেই তারা ঢুকে পড়ছে। বিষয়টি কাউন্সিরকে জানানো হলেও আসলে এর কোনো ব্যবস্থাই করতে পারেননি। ঋষিকেশ দাস লেনের বাসিন্দা মতলু সরদার বলেন, ‘প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত এই রাস্তায় বাহাদুর শাহ পরিবহনের গাড়ি ঢুকে পড়ে। কারণ এ সময় তাদের যাওয়ার মূল রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম পড়ে। কিন্তু এদিকে এসে তারা নিজেরাই জ্যাম তৈরি করে। পুরান ঢাকার সরু রাস্তায় সাধারণ মহল্লাবাসীর হাঁটার পথেও তারা জ্যাম সৃষ্টি করছে।’ বিষয়টি স্থানীয় কাউন্সিলরকে জানানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সির আরিফ ভাইকে (মো. আরিফ হোসেন) জানানো হয়েছে। পরে এটা নিয়ে মালিক সমিতির সঙ্গেও কথা হয়। এতে নিয়ম করা হয়, যেসব ড্রাইভার গলির রাস্তায় গাড়ি ঢুকাবেন তাঁদেরকে জরিমানা করা হবে।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘কে মানে কার কথা। এসব শুধু মহল্লাবাসীকে নামে মাত্র আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন হয় না।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, পুরান ঢাকার সদরঘাট ও বাবুবাজার এলাকা থেকে বাহাদুর শাহ পরিবহন নামে প্রায় ১০৯টি গাড়ি ডেমরা, যাত্রাবাড়ী ও জুরাইন চলাচল করে। এসব গাড়ির কোনো রুট অনুমোদন নেই। কিন্তু মালিকপক্ষের দাবি তাদের রুট অনুমোদন আছে। তবে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (আরটিএ) ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার অনুমোদিত রুটে গাড়ির তালিকায় বাহাদুর শাহ নামের কোনো পরিবহনের নাম পাওয়া যায়নি।

বাহাদুর শাহ পরিবহনের মালিক সমিতির সদস্য ইলিয়াস হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁর নিজের ছয়টি বাহাদুর শাহ গাড়ি আছে। প্রতিটি গাড়ির ‘হিউম্যান হোলার’ হিসেবে রুট অনুমোদনের জন্য প্রায় দেড় লাখ টাকা দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া প্রতি ছয় মাস পর পর ৩০ হাজার টাকা সরকারকে দিয়ে থাকেন। তবে কাকে দেন বা কী কারণে দেন তা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমাদের সদরঘাটে ৫৪টি এবং বাবুবাজারে ৫৫টি হিউম্যান হলার আছে। তা ছাড়া প্রায় প্রতিদিন সূত্রাপুর, কোতোয়ালি, বংশাল, শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী থানায় একটি করে গাড়ি দিতে হয় পুলিশের বেড়ানোর জন্য। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসও গাড়ি নিয়ে যায়। এসব গাড়িতে কোনো ভাড়া দেয় না। মাঝেমধ্যে সামান্য তেল খরচ টাকা দিয়ে থাকেন।’

আবার বাহাদুর শাহ পরিবহনের বেশ কিছু গাড়ির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এসব গাড়ির মেয়াদ ১৭ বছর দেওয়া থাকলেও কোনো কোনোটির বয়স ২০ বছর পার হয়ে গেছে। তা ছাড়া প্রতিনিয়ত অ্যাক্সিডেন্ট ও অন্যান্য কারণে এসব গাড়ি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়লেও বহাল তবিয়তে রাস্তায় চলাচল করছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক পূর্ব) বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত কোনোমতেই কাম্য নয়। যেসব হিউম্যান হলার লক্কড়ঝক্কড় সেগুলোর বিরুদ্ধে এরই মধ্যে মামলা দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে বাহাদুর শাহ পার্ক ও সদরঘাটসংলগ্ন বাংলাবাজারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অবৈধ বাসস্টপেজ ও লোকাল বাসের যাতায়াতে বড় ধরনের সমস্যা মনে করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ছোট-বড় দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং এই এলাকায় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় অবৈধ বাসস্ট্যান্ড ও লোকাল বাসের যাতায়াতকে সমস্যা মনে করেন অভিভাবকরাও।

সার্বিক বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাহাদুর শাহ পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমরা নিয়ম করেছি যে যদি কোনো ড্রাইভার গলি দিয়ে ঢুকে, তবে তাকে এক দিন বহিষ্কার এবং তিন দিন এমন করলে তাকে আর ড্রাইভার হিসেবে রাখি না। তা ছাড়া জরিমানাও নেওয়া হয়। কিন্তু তাদের অনেকেই সুযোগ পেলেই গলিতে ঢুকে পড়ে। আমি বিষয়টি আবারও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি।’ বিভিন্ন থানা বিনা টাকায় গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যখন এসব থানার গাড়ির সমস্যা থাকে তখন আমাদের কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে থাকে।’ বাহাদুর শাহ পরিহনের যখন-তখন গলিতে ঢুকে পড়ার বিষয়টি জানতে চাইলে সূত্রাপুর জোনের এসি (ট্রাফিক) বলেন, ‘বাহাদুর শাহ তো এমনভাবে যাওয়ার কথা না, আচ্ছা, আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে কঠোরভাবে হ্যান্ডেল করার জন্য বলছি।’ বিনা ভাড়ায় গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ‘এটা এমন নয়। যেদিন আমাদের প্রয়োজন থাকে, সেদিন আমরা ভাড়া দিয়েই তাদের কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে থাকি।’


মন্তব্য