kalerkantho


গল্প

ভূতের খোঁজে

ইসমাইল আরমান

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভূতের খোঁজে

আঁকা : মাসুম

ব্যাপারটা গোড়া থেকেই বলি। ওর পুরো নাম আশিকুর রহমান বাবু। মফস্বলের ছোট্ট একটি শহরে থাকে। পড়ে সেখানকার একটি স্কুলে, ক্লাস সিক্সে। ভূত-প্রেতের ভীষণ ভক্ত। ওর প্রিয় মুভি ‘দ্য কনজ্যুরিং’। পড়তে ভালোবাসে ভৌতিক গল্প। জীবনের বড় শখ সত্যিকার ভূত দেখা। এই শহরেই যে সেই সুযোগ এসে যাবে, কল্পনাও করেনি।

আজ দুপুরের ঘটনা। বৃহস্পতিবার হাফ স্কুল। ছুটির পরে স্কুলের সামনের জেনারেল স্টোরে আইসক্রিম খেতে ঢুকেছিল বাবু। দোকানের মালিক শমসের মিয়ার সঙ্গে ভালো খাতির। প্রায়ই বন্ধুবান্ধবসহ আইসক্রিম-চকোলেট খেতে আসে। আজ অবশ্য একা।

দোকানে ঢুকেই বাবু দেখল, শমসের মিয়া কার সঙ্গে যেন তর্ক করছে। বয়স্ক এক ভদ্রলোক, দেখেই চিনল—হামিদ সাহেব, স্কুলের পাশেই তাঁর বাড়ি। হাতে বাজারের ব্যাগ। কেনাকাটা করতেই এসেছেন বোধ হয়। আলোচনার বিষয় শুনে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল ওর।

‘...আমি বলছি, ও বাড়িতে ভূত আছে!’ জোর দিয়ে বললেন হামিদ সাহেব।

‘অনেকেই বলে’, শমসেরকে নিরাসক্ত দেখাল।

‘কিন্তু আমি নিজ চোখে দেখেছি,’ হামিদ সাহেব অটল।

‘তাই নাকি? কিভাবে দেখলেন?’

‘আমার ছাগলটা হারিয়ে গিয়েছিল। চরতে চরতে কই যে চলে গেল, ফিরল না। কী আর করা, সন্ধ্যায় বের হলাম খুঁজতে। ওখানে পৌঁছতেই শীত শীত করতে লাগল...’

‘তা ইদানীং অবশ্য সন্ধ্যায় একটু ঠাণ্ডা পড়ছে,’ বাধা দিয়ে বললেন শমসের।

‘আগে শোনোই না! দেখলাম বাগানের ভেতর একটি ছোট ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে...’

হো হো করে হেসে উঠলেন শমসের। বললেন, ‘তাতেই আপনার ধারণা হলো, ওটা ভূত? আপনি একটা মানুষ বটে!’

‘ধুত্তরি!’ রেগে গেলেন হামিদ সাহেব। ‘তোমার সঙ্গে কথা বলাই উচিত না।’ দরজার দিকে হাঁটা দিলেন তিনি।

পেছন থেকে ডাকলেন শমসের, ‘ভাংতি নিয়ে যান।’

‘পরে নেব,’ বলে বেরিয়ে গেলেন বৃদ্ধ। ভালোই রেগেছেন।

‘পাগল!’ মাথা নাড়লেন দোকানি।

এতক্ষণে কথা বলার সুযোগ পেল বাবু। জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাপার কী?’

‘আর কী,’ বিরক্ত কণ্ঠে বললেন শমসের, ‘কোথায় নাকি ভূত দেখে এসেছেন...আমাকে রসিয়ে রসিয়ে শোনাতে চেয়েছিলেন। পাত্তা দিলাম না। যত্ত সব!’

‘কোথায় ভূত দেখেছেন?’ বাবুর গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল।

‘কোথায় আবার, চৌধুরী মহলে।’

বাড়িটা চেনে বাবু। মোক্তারপাড়া ছাড়িয়ে আরো কিছুদূর যেতে হয়। একেবারে নির্জন জায়গাটা। চারপাশে জঙ্গল। কখনো যাওয়া হয়নি। ও উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘ওখানে ভূত আছে?’

‘লোকে তো তা-ই বলে,’ শমসের বললেন। ‘তা, কী দেব? আইসক্রিম?’

মাথা ঝাঁকাল বাবু। তারপর জানতে চাইল, ‘লোকে কী বলে?’

‘ভূতের কথা?’

‘হুঁ।’

‘কী আর বলবে...ওই বাড়িতে নাকি চাঁদ উঠলেই একটা ছোট ভূত ঘুরে বেড়ায়। তা...তোমার তো খুব আগ্রহ। যাবে নাকি ভূত দেখতে?’

‘না, না। আমি কি তাই বলেছি নাকি?’ বিব্রত হলো বাবু।

‘যাও, যাও। আজ রাতে চাঁদ থাকবে। দেখো গিয়ে, ভূত পাও কি না।’ মুচকি হাসলেন শমসের।

আইসক্রিমের দাম মিটিয়ে বেরিয়ে এলো বাবু।

দিনের বাকি সময়টা উত্তেজনায় কাটল। কোনো কিছুতে মন বসাতে পারল না ও। শমসেরের প্রস্তাবটা ওর মনে ধরেছে। ঠিক করল, আজই চৌধুরী মহলে যাবে। কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় মা বেরোতে দেবেন কি না কে জানে। শেষ পর্যন্ত অঙ্ক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ার নাম করে ছাড়া পেল ও। কিসের প্রাইভেট পড়া, ঘর থেকে বেরিয়েই বই-খাতা একটা ঝোপের ভেতর লুকাল, তারপর ছুটতে শুরু করল গন্তব্যের দিকে।

শহরের এই অংশটা সবচেয়ে প্রাচীন। বেশির ভাগ বাড়িই সেই ব্রিটিশ আমলের তৈরি। সেগুলোর শরীর থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে অনেক আগেই, এখন ভিতও দুর্বল হয়ে পড়েছে। মোক্তারপাড়া এখন পুরোপুরি পরিত্যক্ত। একটি রিয়াল এস্টেট কম্পানি সম্প্রতি পুরো এলাকা কিনে নিয়েছে। সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট আর শপিং কমপ্লেক্স বানাবে। যেকোনো দিন পুরনো বাড়িগুলো ভাঙচুর শুরু হয়ে যাবে।

চৌধুরী মহলে যেতে হলে মোক্তারপাড়া ছাড়িয়ে যেতে হয়। শহরের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে প্রাসাদের মতো বিশাল বাড়িটি। এককালে প্রভাবশালী চৌধুরী পরিবার থাকত ওটায়। এখন পুরোপুরি খালি। বহুদিন থেকে পরিত্যক্ত। ওটার শরীরে জমেছে শেওলা; দেয়াল খসে পড়েছে; বিশাল বাগান ভরে গেছে উঁচু আগাছায়; চারপাশের জঙ্গল ওটাকে গিলে খাওয়ার জন্য এগিয়ে আসছে।

দৌড়াতে দৌড়াতে বাবু মোক্তারপাড়ায় পৌঁছে গেছে। চারদিক সুনসান। নিজের পায়ের আওয়াজ ছাড়া আর কিছু কানে আসছে না। হঠাত্ দূরে কোথায় যেন একটা কুকুর ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কী যেন একটা লাফিয়ে উঠল বুকের ভেতর।

‘ও কিছু না,’ বিড়বিড় করল বাবু। ‘কুকুর ডাকছে।’ জোর করে ভয় তাড়ানোর চেষ্টা করল।

কেমন একটা শীত শীত ভাব, বুকও কাঁপছে। মোক্তারপাড়ায় ঢোকার পর থেকেই ভয়টা ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।

‘ফিরে যাব না,’ প্রতিজ্ঞা করল বাবু। ‘যদি ফিরে যাই, তাহলে আমি একটা কাপুরুষ। ভূত দেখতে এসেছি যখন, ভূত দেখেই ফিরব।’

গন্তব্যে পৌঁছে গেছে ও, চাঁদের আলোয় বিশাল বাড়িটা দেখতে পাচ্ছে সামনে। নড়বড়ে দেয়াল। গেটের দিকে নজর দিল ও, সেখানে কী যেন একটা নড়ে উঠল। বাবুর বুক ধক করে উঠল, ভূতটা নাকি? দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিল ও।

হতাশ হতে হলো ওকে। গেটের সামনে ওটা ভূত না। বাচ্চা একটি মেয়ে, রঙিন একটি বল নিয়ে খেলছে; বয়সে ওরই মতো। বাবুকে ছুটে আসতে দেখে চোখ তুলে তাকাল সে। বলল, ‘আরি, আরি, ওভাবে দৌড়াচ্ছ কেন?’

‘ধ্যাত্!’ হতাশা চাপতে পারল না বাবু। দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস ফেলতে লাগল; সুস্থির হয়ে নিচ্ছে।

‘কী ব্যাপার?’ জানতে চাইল মেয়েটি।

‘কিছু না,’ হাত নাড়ল বাবু। ‘তুমি এখানে কী করছ?’

‘মাছ ধরছি’ গম্ভীর গলায় বলল মেয়েটি।

‘মাছ!’ থমকে গেল বাবু। তাড়াতাড়ি চারপাশে তাকাল। ‘পুকুর নেই, ছিপ নেই...মাছ ধরছ কিভাবে? দেখে তো মনে হচ্ছে বল খেলছিলে।’

‘তাহলে আবার জিজ্ঞেস করো কেন?’ মুখ ঝামটা দিল মেয়েটি।

জবাব খুঁজে পেল না বাবু। চুপ করে রইল। ‘তুমিই বা এখানে কেন?’ আবার বলল মেয়েটি। ‘সন্ধ্যাবেলায় এদিকে কেউ আসে না বলেই জানতাম।’

‘আমি ভূতের খোঁজে এসেছি,’ খুশি খুশি গলায় বলল বাবু।

ভ্রু কুঁচকে ফেলল মেয়েটি। বলল, ‘ভূত! সত্যিকার ভূত?’

মাথা ঝাঁকাল বাবু। ‘এ বাড়িতে একটা ভূত থাকে, ওটাকে দেখতে এসেছি,’ বলল ও। কথা বলার মতো একজনকে পেয়ে ভালোই লাগছে।

‘এ বাড়িতে ভূত আছে?’ মেয়েটি যেন অবাক হয়েছে। ‘অবশ্য বাড়িটি দেখতে খানিকটা ভূতুড়ে তো বটেই! তুমি ভূতকে ভয় পাও না?’

‘আরে নাহ্!’ হাত নাড়ল বাবু। ‘ওসবে আমার ভয় নেই। তার ওপর শুনলাম, এটা নাকি ছোট ভূত। ভয় পাব কেন? দেয়াল টপকে এক্ষুনি ঢুকব, মোলাকাত করব ওর সঙ্গে।’

‘গেট থাকতে দেয়াল টপকাতে চাইছ কেন?’ মেয়েটি ধাক্কা দিতেই গেটটা খুলে গেল।

‘আজব তো!’ বাবু বলল। ‘একটু আগে যখন তাকালাম, তখন তো মনে হলো গেটে তালা দেওয়া ছিল।’

[বাকি অংশ পরের সংখ্যায়]

 


মন্তব্য