kalerkantho


স্মৃতিকথা

মনের ছায়া মতের ছবি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



মনের ছায়া মতের ছবি

একাত্তরে আমার পিতা জীবিত ছিলেন না। পিতৃত্বের বিরুদ্ধেই কি বিদ্রোহ ঘটেছিল একাত্তরে? সেই যাঁরা কর্তা, যাঁরা মুরব্বি, যাঁরা আনুগত্য চান, তাঁদের বিরুদ্ধে? তা তেমনই ছিল বৈকি ঘটনা। একবার আমার এক পরিচিতজন, সে বলেছে, আমি নাকি বিশেষ সৌভাগ্যবান। আমি আমার পিতার বিশেষ স্নেহ পেয়েছি। এমন অনেক পিতা আছে, যারা স্বার্থপর, অত্যাচারী, বিবেকহীন। যারা মায়ের স্বামী বটে; কিন্তু সন্তানের পিতা নয়। তা নিশ্চয়ই আছে। অবিবেচক পিতার অভাব হবে কেন অবিবেচক সমাজে? সেই যে এক পিতা, যে শুধুই কর্তৃত্ব চায়, আনুগত্য চায়, সেই পিতার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘটেছিল একাত্তরে। তরুণের বিদ্রোহ। বয়সেই শুধু নয়, চেতনায়ও। আমার মনে আছে, শেখ মুজিবের যে বিজয় ঘটেছিল সত্তরের নির্বাচনে, সে সম্পর্কে টেলিভিশনে ধারাবিবরণী দিতে গিয়ে উত্তেজিত কথক বলেই ফেলেছিলেন কথাটা—ওই বিজয় ছিল তরুণের বিজয়। বলেই অবশ্য নিজের অদৃশ্য জিব দ্রুত কেটেছেন তিনি মনে মনে। কেননা শেখ মুজিবের বয়স তো তখন পঞ্চাশের কোঠায়। তাঁকে তিনি তরুণ বলেন কী করে? আমতা আমতা করছেন ভদ্রলোক, শেখ মুজিব অবশ্য ঠিক তরুণ নন, তবু ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু লজ্জা পাওয়ার কারণ ছিল কি সত্যি সত্যি? বললে কি ভুল হতো যে তরুণ বয়সের কথা বলা হচ্ছে না, তারুণ্যের কথা বলা হচ্ছে?

সেই তারুণ্য, চেতনায় তারুণ্য, এক মহাবিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল একাত্তরের বাংলাদেশ। আমার পিতা তখন জীবিত ছিলেন না। জীবিত থাকলে কোন পক্ষে থাকতেন তিনি? কর্তাদের পক্ষে কি? তিনি কি আমার আত্মীয়টির মতো করতেন, যাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল ২৭ মার্চ ১০টায়? আমার এই প্রবীণ আত্মীয়টির কথা আমি কোনো দিন ভুলব না। ২৭ মার্চ আমরা কেউই তো প্রকৃতিস্থ ছিলাম না। উদ্বেগে, উত্তেজনায়, আতঙ্কে, অনিশ্চয়তায় অন্য রকম হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। সেদিন সকালে অনেকেই অনেক কথা বলেছিলেন। কী ঘটেছে সে বিষয়ের কথা, কী ঘটবে সে বিষয়েরও কথা। তত্ত্বালোচনা নয়, জীবন-মরণের প্রশ্ন সব। প্রবীণ, অভিজ্ঞতায় ধনী আত্মীয়টি যে শুনেছিলেন কথাগুলো, আমরা খেয়াল করিনি। আমরা তখন আশ্রিত তাঁর। তিনি গৃহস্বামী। কিন্তু এমন ভদ্র তিনি, এমন সুবিবেচক, হৃদয়বান, আত্মীয়বৎসল যে নিজের উপস্থিতিকে কখনো উঁচু করে ধরেননি; সেদিন নয়, কোনো দিনই নয়। হঠাৎ শুনি তাঁর গলার স্বর, তাকিয়ে দেখি তিনি কথা বলছেন। কোনো উত্তেজনা ছিল না তাঁর কণ্ঠে, ভঙ্গিও ছিল শান্ত, বক্তব্যে ততোধিক। একেবারেই সাদামাটা, বর্ণগন্ধহীন স্বরে বললেন তিনি কথাগুলো। ‘আমরা বাপু রাজনীতি বুঝি না। আমরা যে রাজা হয় তাকেই বলি, সালাম।’ বলে, ওইটুকুই বলে, সত্যি সত্যি হাত তুলে সালাম করলেন তিনি। সেই অদৃশ্য রাজনৈতিক শক্তিকে, যে শক্তি মানুষ মারছিল, আরো মারবে বলে শুধুই দাঁত কিড়মিড় করছিল, তার উদ্দেশে নীরবে অভিবাদন জানালেন তিনি। উঠে দাঁড়াননি অবশ্য, বসেই ছিলেন। কিন্তু আমি যেন দেখলাম অন্ধকার হয়ে এসেছে চতুর্দিক, মিথ্যে হয়ে গেছে সব কিছু। সামনে চায়ের পেয়ালা, খাবার আছে সাজানো-গোছানো। বসার ঘর, পেছনের বাগান, প্রসন্ন সকাল। সব কিছু একেবারে মিথ্যে হয়ে গেছে। অন্যদের কী মনে হয়েছে আমি জানি না, আমার মনে হয়েছে, দিনদুপুরে কঠিন আঁধার এসেছে নেমে। আমি যেন এও দেখলাম, সেই নির্মম অন্ধকারে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, পা ঠুকে, হাত তুলে সালাম ঠুকছেন। সেই সঙ্গে আমার শ্রদ্ধাভাজন মান্যজনের বিষয়-সম্পত্তি, জাগতিক সাফল্য, ওই বাড়ি, স্বাচ্ছন্দ্য, ওই সব কিছুর অভ্যন্তর থেকে—হৃদয় হতে, বেরিয়ে এলো। বক্তব্যটি—সালাম, মহারাজ, আমার সালাম। বেরিয়ে এলে হাত তুলে দাঁড়ানো এই অভিবাদন। যেন সেই সকালের নয় শুধু, সেদিনের নয়, সে বছরের নয়, শত শত বছরের পুরনো ওই অভিবাদন পুরুষানুক্রমে দিচ্ছি আমরা, দিতে দিতে পরিশুদ্ধ হয়ে হয়ে আজকের স্তরে এসে পৌঁছেছি। আজ তা আগের মতো স্থূল হয়তো বা নয়, তবে আগের চেয়ে অধিক পরিব্যাপ্ত।

একাত্তর সালে এরপর আরো কত ঘটনা ঘটল। কত অঘটন। কিন্তু ওই ছবি আমাকে ছাড়েনি। কোনো উত্তেজনা ছিল না তাঁর গলায়। কোনো কৌতুক ছিল না তাঁর ভঙ্গিতে, সে জন্যই তো এমন গভীর হয়ে বসে গিয়েছিল আমার মনে। তাঁর সাধারণত্বই অসাধারণ হয়ে শুধুই ধাওয়া করে বেড়াল আমাকে। একাত্তরে করেছে ধাওয়া, বাহাত্তরে করেছে, সব বছর করেছে, আজও করে। রাজাকার দেখেছি, আলবদর দেখেছি। ছিল শান্তি কমিটি। প্রাণ রক্ষার জন্য কেউ কেউ গেছে। শত্রুপক্ষে। কিন্তু অনেকে গেছে নিছক পুরনো অভ্যাসে। পুরুষানুক্রমিক সেই অভ্যাসে। ‘সালাম হুজুর, হাজার সালাম। আমরা হুজুর অরাজনৈতিক, আমরা হুজুর বহু পুরনো দালাল।’ আমাদের এই নিচু এলাকায়, এই জলাভূমিতে, বদ্বীপে কে কোথায় কবে বড় হয়েছে দালালি ছাড়া?

কিন্তু আমার পিতা কী করতেন, যদি তিনি জীবিত থাকতেন একাত্তরে? না, হাত তুলতেন—এ আমার বিশ্বাস নয়। তিনি উন্নতি করেননি, বিষয় বিচারে সফল ছিলেন না, ঈর্ষাযোগ্য ছিল না তাঁর জাগতিক অবস্থান। সেই অপারগতাই আশ্বস্ত করে। কিন্তু তিনি কি যোগ দিতেন ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের’ দলে? না, যোগ দিতেন না। শারীরিকভাবে যাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না, নৈতিকভাবেও যাওয়া ছিল কঠিন। বিচ্ছিন্ন ছিলেন, ছিলেন অবিশ্বাসী। আস্থা ছিল না তাদের ওপর, যারা রাজনীতি করে। ভালো মানুষেরা কি অস্ত্র নিয়ে যায় যুদ্ধ করতে? ওড়ায় তারা পুল? ভাঙে তারা তৈরি জিনিস? যেসব ঘটনা চতুর্দিকে দেখতেন কোনো ম্যানুয়াল অনুযায়ী তার হিসাব চলে না। কোনো অফিস অর্ডারে তার তারিখ নেই। ভারি মুশকিল হতো আমার পিতার। কিন্তু ঘটনাগুলো যে ঘটছিল। তাঁকেও যে পালাতে হতো বাড়ি ছেড়ে। তখন কোনো উপায়ই থাকত না নিরপেক্ষতার। তখন তিনি পক্ষ নিতেন। যেতেই হতো তাঁকে আমার সেই হাত তোলা আত্মীয়দের বিরুদ্ধ পথে। আপনি, আব্বা, সেই চরম সময়ে জীবিত থাকলে চরম ঘটনা দেখতে পেতেন। দেখতেন মানুষের মহত্ত্ব। কত উঁচুতে উঠতে পারে মানুষ। আত্মত্যাগে, কষ্টসহিষ্ণুতায়, সহমর্মিতায়। আবার দেখতেন কত দূর নামতে পারে মানুষ। স্বার্থপরতায়। কাপুরুষতায়। পলায়নে। আত্মসমর্পণে। কিন্তু উচ্চতা দূরে দূরেই ছিল, দেখতে হতো ঘাড় উঁচু করে। কোথায় লড়ছে মানুষ, কোথায় কে কাকে আশ্রয় দিয়েছে, আশ্রয় দিতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে—সেসব খবর আসত দূর থেকে, গানের মতো। নিকটে ছিল হীনতা। নীচুতা। এবং পশুর মতো আত্মসমর্পণ।

তাই ভারি বিপদ হতো আপনার। যতই যা বলুন। একাত্তরের ঘটনা আর কখনো দেখেনি কেউ, আপনারা যাঁরা দূর দেশ দেখেছেন, বড় বড় যুদ্ধ দেখেছেন, তাঁরাও নন। একাত্তরের হিসাব মেলানো কষ্ট ছিল। আর হিসাবে সমস্যা নয় তো শুধু। ওই যে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়েছে, তার যতই সমালোচনা করুন, সে যে এমনভাবে ভাঙবে সে তো আপনারা ভাবেননি কখনো। এসব তত্ত্ব থাকত। সংকট দেখা দিত নিরাপত্তা নিয়েই। পালাবেন কোথায় আপনার পরিজন নিয়ে? যে আপনি চিরদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন—কি বাসা বদলে, কি শহর বদলে, লাগেজের হিসাব, পরিবারের সদস্যদের হিসাব, টাকার হিসাব, হিসাব টিকিটের—সব কিছু যাঁর একক জিম্মায় থাকাই ছিল চিরকালের নিয়ম, অমোঘ বিধান, সে নেতৃত্ব আপনি দেখতেন শুধুই সরে সরে যাচ্ছে। থাকছে না আপন হাতে। পারছেন না ধরে রাখতে। মানুষ যখন মানুষ নেই, জন্তুতে পরিণত হয়ে গেছে—শুধু দালালিতে বা সহযোগিতায় নয়, তার চেয়ে বেশি করে এবং অনেক বেশি সংখ্যায় আতঙ্কে, নিরাপত্তহীনতায়, তখন আপনি আপনার পুরনো নেতৃত্ব প্রথাসিদ্ধ পদ্ধতিতে টিকিয়ে রাখবেন, এমনটা তো হওয়ার নয়। সমাজ তো ছিল না একাত্তরে, শুধু ছিল বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন মানুষ, যাদের মনুষ্যত্ব শুধুই খসে খসে পড়ছিল, অল্পবয়সী মেয়ের নতুন পরা শাড়ির চেয়েও ঘন ঘন। কিন্তু যে আমি মনে মনে ভাবতাম আপনার অভিভাবক হয়ে পড়েছি, যেহেতু আপনি অবসর নিয়েছেন, শুয়েই থাকছেন বেশির ভাগ সময়, সেই আমাকে নিয়েও তো সমস্যা হতো আপনার। একাত্তরে আমার মা বলছিলেন, ‘তুই চলে যা দেশ ছেড়ে।’ চলে যাওয়াটাই যে ভালো আমার পক্ষে, আমার আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ীরাও বলেছিলেন তখন। বাঙালি মাত্রই বিপদগ্রস্ত তখন, এমনকি দালাল বাঙালিও নিরাপদ নয়, দালাল হয়েও নয়। কিন্তু আমার মা শুনেছিলেন আমার নাকি বিশেষ রকমের বিপদ ঘটবার সমূহ সম্ভাবনা। কারণ কী? না, ওই যে আমি আর্টিকল লিখেছি! যে পথে যেতে নেই, আপনি অনেক অনেক আগেই জানতেন—সেই লেখালেখির কারণেই নাকি নাম উঠে গেছে বিশেষ খাতায়। তার ওপর সে যে কী মাথা গরম হয়েছিল এই ছেলের, চিরকাল মুখচোরা বলেই জানতেন যাকে আপনি, লোকের সামনে দাঁড়িয়ে যে কথা বলতে পারবে বলে কখনো বিশ্বাস ছিল না, হুজুগে পড়ে সে-ও নাকি সভা-সমিতিতে বক্তৃতাও করেছে সময়ে-অসময়ে। তাইতো আমার মা বলেছেন, ‘যা বাবা, তুই চলে যা।’

কিন্তু আব্বা, আপনি কি বলতে পারতেন অত সহজে অমন কথা? আপনার অভিমানে বাধত। আপনি আমাকে আশ্রয় দেবেন, রক্ষা করবেন, দাঁড়াবেন আড়াল করে—এটাই তো কথা ছিল। সেটা পারলেন না, পারলেন তো না-ই, উপরন্তু বলেছেন, যা তুই পালিয়ে যা—এমন কাজ আমার পৌরুষে লাগত ভীষণভাবে। আমার মা আমার কথাই ভাবছিলেন শুধু। আপনি আপনার নিজের কথাও ভাবতেন, আমার কথা ভাবতে গিয়ে। ঘা লাগত আপনার অভিমানে। যেন আপনার নেতৃত্বই দিচ্ছি ভেঙে। পিতৃত্বেরই অধঃপতন। সেই যে একবার আমার ছোটবেলায় ভদ্রলোকের ছেলে একজন মাতাল হয়ে ধাওয়া করেছিল আমাদেরকে, পাড়ার ছেলেদেরকে, তখন ছুটতে গিয়ে আমি গিয়েছিলাম মাটিতে পড়ে, আর সেই ক্ষিপ্ত মাতাল, আমরা যে এতক্ষণ তাকে উত্ত্যক্ত করেছি তার শোধ নিয়েছিল পা দিয়ে আমাকে মাড়িয়ে দিয়ে। আমার তো তেমন কিছু লাগেনি, ধুলো ঝেড়ে উঠে পড়েছিলাম অল্প পরেই, কিন্তু আপনার লেগেছিল, আপনি খুঁজে বের করেছিলেন লোকটির পিতৃপরিচয়, রাগারাগি করেছিলেন সেখানে গিয়ে। আমি, সেই আমিই ছিলাম আপনার কাছে। বাসায় ফিরতে দেরি হলে উতলা হতেন। যখন কলকাতায় গেছি আপনার বদলি উপলক্ষে, মনে আছে, আপনার হাত ধরে চড়েছি ট্রামে, নামতে গিয়ে নামতে পারিনি, পরের স্টপেজে নেমে দেখি যেন দৌড়ে আসছেন আপনি, যেন হারিয়ে না যাই। ওটাই তো মূল ছবি, আপনার-আমার সম্পর্কের, যেন আমি কোনো দিনই হারিয়ে না যাই। আপনি বেঁচে থাকতে দেবেন না কিছুতেই ঘটতে সেই ঘটনা (শেষ পর্যন্ত ঘটল অবশ্য বিপরীত ঘটনাই, আপনি তো হারিয়ে গেলেন আমি বেঁচে থাকতে)। তারপর, অনেক পরে, বয়স হয়েছে, বিয়ে হচ্ছে, দেখি কি বিয়ের আসরে কোথা থেকে কমলা দিচ্ছেন এনে, বলছেন—খা। সেই যে আপনার অভিভাবকত্ব, সে তো আমি ভুলিনি। বোধ হয় আপনিও ভোলেননি—ঘটনাগুলো মনে না থাক, অনুভূতিটা নিশ্চয় মনে ছিল। সেই আপনি অভিভাবক, কী করে বলবেন, যাও তুমি, হারিয়ে যাও, চলে যাও এমন কোথাও, যেখান থেকে তুমি আর কোনো দিন ফিরতে পারবে না। অত সহজে যে পাকিস্তানটা ভেঙে খান খান হবে, এ তো আপনি বিশ্বাস করতে পারতেন না, আপনারা কেউই পারতেন না বিশ্বাস করতে।

বিশ্বাস না করার কারণটা সহজ। পাকিস্তান যে মহৎ কিছু—এটা কখনোই মানতেন না। পাকিস্তান আপনাকে কিছুই দেয়নি, কিছু যন্ত্রণা ছাড়া। পাকিস্তানে যারা ওপরে উঠেছে আপনার চেনা-পরিচিতের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে, তারাও আহ্লাদে আটখানা করেনি আপনাকে। দুষ্ট লোকদের স্বেচ্ছাচারণভূমি যে পাকিস্তান সে আমার চেয়ে আপনি আরো স্পষ্টরূপেই জানতেন, আমি জানি। কিন্তু যারা শাসন করছে পাকিস্তানকে, তাদের হাতে তো অস্ত্র আছে, তারা তো নিষ্ঠুর, আছে পুলিশ, মিলিটারি; সাধারণ নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ পারবে কেমন করে? লড়বে কোন শক্তি নিয়ে? লড়বে যারা, আশপাশে তারা ছিল না। লড়াকু মানুষেরা দূরেই ছিল, দূরে দূরেই লড়েছিল তারা। ভালো মানুষেরাই ছিল শুধু চতুষ্পার্শ্বে, সেই যারা নামেতেই ভালো শুধু, কামেতে স্বার্থপর, যাদের দেখে দেখে ঘেন্না ধরে গিয়েছিল আপনার, আস্থাই হারিয়ে বসেছিলেন মানুষের ওপরে। শাসনকারীকেও বিশ্বাস করতেন না, শাসিতকেও বিশ্বাস করতেন না। সে জন্যই তো ভেতরে ছিল গভীর এক সিনিসিজম।

সিনিসিজম বটে, কিন্তু দার্শনিক কোনো কিছু নয়। পীড়িতজনের আক্ষেপ এটা, পীড়াই একপ্রকারের—সত্যি কথা বলতে কি, অসুস্থ লোকেরা তো আন্দোলন করে না, আন্দোলন করেনি কখনো। তারা বড়জোর পরস্পর মিলিত হয়ে অন্যের নিন্দামন্দ করে, সমালোচনার ঝড়টর তোলে। তার বেশি কিছু নয়। সময়মতো ফিরে যায় নিজ নিজ গৃহে। দিনের পর দিন চলে এই কাজ। সমাজ এগোয় না। চিন্তা এগোয় না। তারা বলে, এই ব্যবস্থাটা টিকবে না, কিন্তু ব্যবস্থাটা ঠিকই টিকে থাকে।

দার্শনিকতা নয় ঠিকই, তবে শৌখিনতাও নয়। আমার বাল্যবন্ধু একজন বলেছিল একদা, বাল্যকালেই, যে সে সিনিক কবিতা লিখবে। শব্দটা লিখেছে সদ্য সদ্য, জায়গা খুঁজছিল প্রয়োগের, কবিতায়ই ভাবল দেবে লাগিয়ে। আমার পিতার সিনিসিজম এ থেকে কত দূরে! ভাবলে হাসি পায় আমার। বিশ্বাস হারিয়েছি, এই কথাটা বলা কত সহজ, কিন্তু বিশ্বাস হারিয়ে বেঁচে থাকা, সে যে কেমন অভিজ্ঞতা, জানে-বোঝে শুধু ভুক্তভোগীই। আমি নিজে জানি না বলেই বিশ্বাস করি। আর বিশ্বাস করতে ভালোওবাসি যে আমি বিশ্বাসী, বিশ্বাস করি মানুষের সম্মিলিত শক্তিতে। আপনি, আব্বা, বিশ্বাস করতেন না। না দার্শনিক, না শৌখিন এক সিনিসিজম আনন্দহীন করে তুলেছিল আপনার জীবনকে।

 

দুই

 

নিম্নমধ্যবিত্তের গৃহের মতো আনন্দহীন প্রতিষ্ঠান কোথায় আছে পৃথিবীতে? মনের গলি বসবাসের গলির চেয়েও বেশি ঘিঞ্জি, অধিক নোংরা। কাঁথা-বিছানা, জামাকাপড়, ভাঙা টিন, দোমড়ানো প্যাটরা—কিছুই তো ফেলে দিতে পারি না। আবার দরজা-জানালা সব রেখেছি বন্ধ করে। খুলতে গেলে অবিশ্বাস হাত চেপে ধরে, জং ধরা বিদ্বেষগুলো নড়তে চায় না, বাইরে থেকে হানা দিতে চায় অন্যের উন্নতির দুর্গন্ধ। কাউকেই বিশ্বাস করতে পারি না। সম্মান করতেও নয়। কাউকেই নয়। কেননা নিজেকে নয় যে। বাতাস নেই, শুধুই গুমট—উদ্বেগের, দুশ্চিন্তার, বৈচিত্র্যহীনতার। গান নেই, সুরও নেই। এমনকি নাটকও নেই। নাটক যখন আসে, আসে সে অতিনাটক হয়ে।

মঞ্চের নাটকেই বা বিশ্বাস কী? আমার পিতার পক্ষে কষ্টকর হয়েছিল বিশ্বাস রাখা। সে-ও এক ঘটনা বটে। মফস্বল কলেজে বার্ষিক নাট্যাভিনয়ে তাঁর সঙ্গেই গিয়েছিলাম আমি। কলেজের নাটক, অতএব অবশ্যই নির্ভরযোগ্য। সেই ভরসাতেই নিয়ে যাওয়া। সে নাটকে অনেক কিছুই ছিল বটে, কিন্তু দুটি ঘটনা মনের মধ্যে দাগ কেটেছিল সবচেয়ে বেশি। দুটিই খাদ্য বিষয়ে। একজন, প্রতিনায়ক, সে কী এক ওষুধ খেয়েছে, খেয়ে এখন যা পায় তা-ই খায়। অনুক্ষণ খাই খাই তার। হাঁড়ি-পাতিল-ডেকচি একটার পর একটা খালি করে দিচ্ছে সে লোক। মিষ্টিওয়ালা বিপদে পড়েছে তাকে নিয়ে। অপর একজন, সে-ই বোধ হয় নায়ক হবে, জড়িয়ে জড়িয়ে, থেকে থেকে, শুধুই বলে সে, খেয়েছে! না, সোমরস। সোমরস খেয়েছে সে। ‘সোমরস’ কী পদার্থ, সে আমি কিছুই জানি না। মনে বোধ হয় ওই মূর্তিটা গিয়েছিল দাগ কেটে। ওই রস খেলে মিঠাই-মণ্ডা-মিষ্টি-পায়েস খাওয়ার চেয়েও বড় সম্মান পাওয়া যায়। প্রতিনায়ক নয়, নায়কই হওয়া যায় দেখা যাচ্ছে। দেখে বোধ হয় আমারও লোভ হয়েছিল সে রস খাব। তারপর কিভাবে পেরেছিলাম সেই বিশেষ অভিপ্রায়ের কথা সে আমার মনে নেই; কিন্তু দিব্যি মনে আছে, আমার পিতা মনে হলো গভীর ময়লার কোনো খাদের মধ্যে হঠাৎ পড়ে গেলেন। অমনি তাঁর বিস্মিত, বিচলিত হুংকার।

‘সোমরসে’র উৎসটা কী তিনিও হয়তো অনুধাবন করে থাকবেন। না পারার কোনো কথা নয়। সেদিন থেকেই দেখেছি নাটকের কথা উঠলেই গম্ভীর হয়ে যেতেন। পরে আমরা যে নাটকফাটক দু-একটা করেছি সে তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও। বাধা যে দেননি, সেটা নিতান্তই বাধা দেওয়া অর্থহীন হবে মনে করে।

তাহলে আনন্দ কোথায় খুঁজব আমরা? বায়োস্কোপ ছিল। কিন্তু বায়োস্কোপের ছবি কি আমাদের দেখার মতো? শৈল্পিক মানের কথা থাক না, নৈতিক মানটাই প্রথমে আসবে। নীতি না থাকলে শিল্প থাকুক বা না থাকুক তাতে কী-ই বা এলো-গেল। পাছে তাঁকে অমান্য করে নিজেরাই যাচ্ছেতাই ছবি দেখতে চলে যাই, সে জন্য সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হতো আমার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত পিতাকে। সঙ্গে নিজে যেতেন, নয়তো সঙ্গে লোক দিতেন একজন। ‘উদয়ের পথে’, ‘সাত নম্বর বাড়ী’—এসব ছবি আপনার তত্ত্বাবধানেই দেখেছি আমরা। ওই একই ভয়, পাছে হারিয়ে যাই। এই যে চলচ্চিত্র দেখলাম, দেখে মনটা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে বা যাচ্ছে কি না সে ব্যাপারে আপনার নীরব উদ্বেগটা আমি এখনো টের পাই, এখনো কল্পনা করতে পারি, যেন স্পর্শই করি সরাসরি। অনেক বছর পর সেবার ফেরত গিয়েছি সেই শহরে, যেখানে আপনার হাত ধরে স্কুলে গিয়েছিলাম আমি, একসময়ে, অত্যন্ত ভয় করে। সেই স্কুল দেখলাম, পথঘাট দেখলাম। অনেক কিছু বদলেছে, অনেক কিছুই আবার আছে ঠিক আগের মতোই। ফিরে এসে সারা রাত আমার ঘুম নেই। যে চিন্তাটা ছেলেবেলায় প্রায়ই হতো, সেটাই দেখি ফিরে এসেছে। দেখলাম পথ হারিয়ে ফেলেছি আমি। আর চারদিক থেকে মস্ত একটা শূন্যতা বড় একটা বোঝা হয়ে ধেয়ে আসছে আমার দিকে, যেন একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেবে আমাকে। একেবারেই। পিতার কেন প্রয়োজন সে আমি আপনার উদ্বেগকে স্মরণ করলেই বুঝি, আমার ওই দুঃস্বপ্নকে স্মরণ করলে আরো বেশি স্পষ্ট করে বুঝতে পারি। কেন মানুষ একজন পিতা খোঁজে, আপন পিতার মধ্যে তাকে না পেলে অন্যকে ধরে। শ্বশুরকে পিতা করে, নয়তো অফিসের কর্তাকে কিংবা শিক্ষককে। যিনি কাজ পাইয়ে দেবেন, তাঁকে। নিজের পিতাকে হত্যা করে সেই রক্তাক্ত হাত নিয়ে অন্যকে সালাম করেছে পিতা হিসেবে—প্রায় আক্ষরিক অর্থেই এমন ঘটনা ঘটেছে জানি। নিরীহ ভদ্র সন্তানকে পিতৃহন্তা হিসেবে দেখেছি আমি, পিত্রানুসন্ধানী হিসেবে ব্যস্ত দেখেছি অবিশেষ্য আরো বেশি। দেখেছি পাল্টে নিতে পিতাকে, সময়মতো, সুযোগমতো।

সোমরসের কথা বলছিলাম। রস আরো ছিল। আদিরসের চর্চা কিছু কম ছিল না তো। রসিকতায়, বিশেষ করে বয়স্কজনের, সেই রস ম-ম করত। অনেক সময় মনে হয়েছে, বুঝি বা বমিই হয়ে যাবে আমার—তার দুর্গন্ধে। আমার পিতার বন্ধু একজন, পৈতৃক কাছের দোকানকে প্রায় লাটেই তুলে দিয়েছিলেন আরেক রসের সন্ধানে—সে রসটা আধ্যাত্মিক। তিনি আমার ভক্তিভাজন, কিন্তু তাঁকে দেখলে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই, হামেশাই মনে হতো, যেন ভেতরে ভেতরে হাঁ করে আছেন, যদি দু-এক ফোঁটা রস ঝরে পড়ে কোনো ধ্বনি থেকে—তত্ত্ব থেকে, হয়তো বা চিন্তা থেকে। আমি বুঝিনি সেসব উচ্চতর ব্যাপার, আমার সহানুভূতি ছিল না তাঁর রসাস্বাদনের প্রতি। অথচ আমি বিজ্ঞান পড়িনি কেন, সে কারণ অন্য কেউ না জানুক আমি তো জানি। আমার ধারণা ছিল, বিজ্ঞান বড্ড বেশি বৈজ্ঞানিক, তার মধ্যে সব কিছুই শুকনো, কাঠ দিয়ে ঠাসা, আগুন জ্বলে, রহস্যকে দেয় পুড়িয়ে। আমি কবিতার ভক্ত ছিলাম। কিন্তু কবিতা যে আমি লিখব না কোনো দিন সে-ও নিশ্চিত জানতাম। আসলে না ছিলাম কাব্যের, না বিজ্ঞানের, ঘরেরও নয়, ঘাটেরও নয়।

চোখের সামনে দেখছি সাংস্কৃতিক সামন্তবাদ তার আগের জোর আর রক্ষা করতে পারছে না। খান বাহারে খান সাহেবে যেন কুলাচ্ছে না ঠিক। সৈয়দও যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। বিত্তহীন খানদান ঘরে মেয়েকে বিয়ে দিতে রীতিমতো ইতস্তত করছেন অত্যন্ত পরহেজগার পিতা। টাকা এসে ধাক্কা দিচ্ছে রক্তকে, চাকরি পাঞ্জা লড়ছে বংশের সঙ্গে এবং কোনো সন্দেহই থাকছে না যে শেষ পর্যন্ত জিতবে কোন পক্ষ। জিতবে টাকা, জিতবে চাকরি। তবে তখনো চাকরিই মর্যাদা, ব্যবসা তখনো তেমন পরাক্রম অর্জন করেনি, যেমনটা আজ সে করেছে। সময়টা ছিল আসলে সহাবস্থানের—সামন্তবাদী সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে আছে বুর্জোয়া সংস্কৃতি, দশ আনা ছ আনা শরিকানা যেন। সহাবস্থান আজও আছে, শুধু অনুপাতের ইতরবিশেষ ঘটে থাকতে পারে। সর্বত্র সমান নয় অনুপাত। পরিবারে-পরিবারে তফাত, পরিবারের সদস্যে-সদস্যে ব্যবধান। দ্বন্দ্ব নেই। দ্বন্দ্ব নেই তার কারণ, পুঁজিবাদ এখানে এমন প্রবল ও স্বাধীন হয়ে ওঠেনি যে সে লুপ্ত করে দেবে সামন্তবাদকে। যে ছেলে বিদেশে অতি উচ্চ গবেষণা করেছে ফলিত বিজ্ঞানের, সে যখন দেশে ফিরে এসেছে, মায়ের দেওয়া তাবিজটা ফেলে আসেনি, কালো সুতা দিয়ে অক্ষত করে রেখেছে আপন বাহুতে।

এ নিয়ে অবশ্য কোনোই সন্দেহ ছিল না যে আমার পিতার কালই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ। যদিও ওই একই কথা নিশ্চিত বলতে পারি, তিনিও শুনেছেন তাঁর পিতার মুখে। এই বলাকে কি বলব বংশানুক্রমে প্রতিশোধ গ্রহণ—একে অপরের ওপর? নাকি বলব স্বর্গকে পেছনে খোঁজা? বোধ করি তা-ই, বোধ করি স্বর্গকে পেছনে খোঁজাই। সামনে না পেয়ে।

এ কথা আপনি আমাকে কতবার কত সময়ে বলেছেন। আমি এমনই আত্মনিমগ্ন যে কিছুই আমার ভালো লাগে না। পছন্দ হয় না। খাবারগুলো খারাপ। বাসাটা ভালো নয়। আত্মীয়-স্বজনগুলো বদ। বাবা অপছন্দ। মা সম্বন্ধে বিরূপতা—এ আপনার প্রশ্রয়ের কথা ছিল না, সমালোচনার কথা ছিল। তা আমি অনেক কিছুই অপছন্দ করতাম। এখনো করি। নিজেকে সমেত। কিন্তু আপনিও পছন্দ করতেন না আপনার যুগকে। দেখতে পেতেন না পরিবর্তিত কোনো ভবিষ্যতে। সে জন্য চলে যেতেন পেছনে। পেছনের অসুন্দর অংশটা যেতেন ভুলে। সুন্দর আরো সুন্দর হয়ে উঠত। এই কাজ আপনি করেছেন, আপনার পিতা করেছেন, করেছেন আপনার পিতামহ। করার কথা আমারও।

আপনাদের যে যুগ গেছে, সে যুগে কি সব কিছুই শ্রেয় ছিল? তা-ই যদি হবে তাহলে আপনি নিজে অমনটা চটা ছিলেন কেন বিশ্বসংসারের ওপর? ওই যে ছেলে-মেয়েরা সব বিদেশে চলে যাচ্ছে, চাইছে না ঘরে থাকতে, তার ঘটমানতার মধ্যেও কি সমালোচনা নেই আপনাদের জীবনের সামান্যতার? অকিঞ্চিত্করতার? আনন্দহীনতার? কী দিয়ে, কোন আকর্ষণে, প্রলোভনে উপযুক্ত ছেলেটিকে ধরে রাখবেন ঘরে? ডাকবেন তাকে ঘরে কী ভাষায়—কোন ভাষায়? কী আছে দেওয়ার মতো, এক পরনিন্দা ও পরশ্রীকাতরতা ছাড়া। চরমই চরমের জন্ম দেয়, তাই দেখি চরম গ্রামভক্তের সন্তানই এত বেশি বিদেশভক্ত হয় যে দেশে যদি নিরুপায় হয়ে থাকেও, তবে থাকে নিতান্ত বিদেশির মতোই। নামকরা গ্রামভক্তদের উদাহরণ দেওয়া যায়, কিন্তু বোধ করি দরকার নেই। আপনাদের যুগেও কি অন্যায় ছিল না? লোকে ঠকায়নি লোককে? ভাই ভাইকে? একজনের স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যায়নি আরেকজনের স্বামী? গেছে। ঠিকই গেছে। কিন্তু জিনিসটা জানাজানি হয়নি আজকের মতো। যোগাযোগ ছিল কিছু কম, ঔদাসীন্য কিছু বেশি। এ যুগের ছেলে সিগারেট খেলে আপত্তি করেন আপনি, কিন্তু অত্যন্ত ভক্তিভাজন মানুষকেও কি হুঁকা খেতে দেখিনি আমি? পুরুষ বাদ থাক, মেয়েরাও তো হুঁকা খেত। না, তাতে আপত্তি হয়নি। আপত্তি আসলে হুঁকাতে নয়, সিগারেটেও নয়; আপত্তি সম্পূর্ণ অন্য জায়গায়, সে হলো ঔদ্ধত্যে। বেয়াদবিতে। খাক সিগারেট, তবে লুকিয়ে খাক। আরো ভালো, ভানটা যদি করে লুকাবার। তাতে আমার মানসম্মান বাড়ে। বোঝা যায় ছেলেটা বেয়াদব নয়। কদর করতে জানে গুণীর। মানা না মানারই প্রশ্ন আসলে।

একাত্তরে অমান্য করেছিল বেশির ভাগ মানুষ। তবে মান্যও করেছে কেউ কেউ। সত্য কথা এই যে বাঙালিরা ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছিল দুই ভাগে। অত্যন্ত নিরীহ লোকও দেখেছি মনে মনে যোদ্ধা হয়ে উঠেছে—মুক্তিযোদ্ধা। আবার দেখেছি দালালও। মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনীয়তা ছিল অপরিহার্য। তাদের মধ্যে সরব যারা, যারা সশস্ত্র, তারা কারা? নিতান্ত ছেলে-ছোকরারা, অত্যন্ত অর্বাচীনেরা। তবু এমনই দুর্ভাগ্য আমাদের যে সেই ছেলে-ছোকরারা, সেই রগচটা দুঃসাহসীরাই একমাত্র ভরসা ছিল সেই দুর্দিনে। ৫০ বছর আর বাঙালি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না—বয়স্ক তত্ত্বজ্ঞানীদের অনেকেই বলতেন এ কথা। একেকটা দিন ছিল ১০০ বছরের মতো দীর্ঘ, ৫০ বছর কল্পনা করাও কঠিন ছিল অনেকেরই পক্ষে। ভুক্তভোগীদের পক্ষে।

একাত্তরে দালাল এসেছিল। একজন-দুজন নয়, অনেক। কোথা থেকে এলো এত দালাল? ভয়ে দালাল হয়েছে কেউ, কেউ বা লোভে। কাঁঠাল ভাঙলে যেমন মাছি আসে, তেমনি অসংখ্য দালাল দেখেছি চারপাশে, শুধুই ভনভন করেছে। কাকে বিশ্বাস করব? কার মধ্যে কোন দালাল আত্মগোপন করে আছে কে বলবে? বোমা ফাটে, গর্জে ওঠে গুলি, আকাশ এফোঁড়-ওফোঁড় করে উড়ে যায় প্লেন, অন্যদিকে এরই পাশে এবং বিপরীতে, ফিসফিস করে কথা বলে মানুষ, সন্ত্রস্ত, ভীত তারা। দালালরাও সন্ত্রস্ত, দালালরাও আতঙ্কিত। কিন্তু মাছিরা জন্মে কোথায়? জন্মে ওই ভয়েরই নর্দমায়। আর জন্মে স্বার্থবুদ্ধির আস্তাকুঁড়ে। সংকীর্ণ, ব্যক্তিগত স্বার্থের। শুভবুদ্ধি, দেশপ্রেম, মানবপ্রীতি—সব কিছু শুকিয়ে যাবে যেন স্বার্থের খরায়। ছিল, মানবিক গুণগুলো অবশ্যই ছিল, ছিল সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ প্রীতিরও নিদর্শন। কিন্তু আমাদের চারপাশে, আব্বা, মানুষের সামান্যতাই অসামান্য হয়ে উঠেছিল—দৈত্যের মতো। ‘নিজের চরকায় তেল দাও’, ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা,’ ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’—এসব বচন যে নিতান্ত ঠাট্টা-তামাশার কোনো ব্যাপার নয়, মর্মান্তিক সত্য, একাত্তর তা হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিয়েছে মানুষকে। সেই জ্ঞানের পরে আর কোনো ক্ষমা সম্ভবপর?

দালালদের আদর্শটা কী? সে আদর্শের যত বড় নামই দেওয়া হোক না কেন, অভ্যন্তরে ছিল স্বার্থ। নিতান্ত ধর্মান্ধ যে ব্যক্তি, অন্ধ বলেই সে বুঝতে পারেনি কার স্বার্থে লড়েছে। নাদান সে, হয়তো বা অন্যের স্বার্থকেই নিজের স্বার্থ মনে করেছে। সেটা অন্ধত্বের লক্ষণ বটে। অন্ধ সে ওই দিক থেকেও।

কতশত বছরের পুরনো এই ব্যাধি। ওই যে আমাদের যুগ-যুগান্তরের পরাধীনতা, তারই পলি পেয়ে পেয়ে এর বিশেষ বৃদ্ধি। আর আপনাদের আত্মসন্তুষ্ট সিনিসিজমের, ঔদাসীন্যের, হতাশার যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, তা তো দালালিকেই সাহায্য করেছে। আলবদর গাছে ধরে না, সে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, সে একটা সামাজিক ব্যাধি।

সমাজে আছে অচলায়তন। পরিবর্তন আসেনি উত্পাদনব্যবস্থায়। পুঁজিবাদী বিকাশের দিকে এগোচ্ছিল অর্থনীতি। সেই সময় এলো ইংরেজ, ঠেলে তারা পিছিয়ে দিল চাকা, জোর করে। সামন্তবাদ যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, তার জন্য আয়োজন হয়েছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের। সেটা এক দিকে, আরেক দিকে শিল্পের যেটুকু বিকাশ ঘটেছিল তাকে দেওয়া হলো ধ্বংস করে। স্তব্ধতা এলো সমাজে। যেন আবদ্ধ জলাশয়। সেখানে অনেক ব্যাধির বিকাশ। দালালিরও।

দালালিটাও পুরনো। সে আমরা কত দেখেছি। নতুন যেটা, সেটা মুক্তির জন্য সশস্ত্র লড়াই। অমন ব্যাপকভাবে সে কাজ আগে কখনো ঘটেনি। মুক্তিযোদ্ধারা কার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন? লড়েছিলেন না তো শুধু, বাইরের একটা বিকট শক্তির বিরুদ্ধে, লড়েছিলেন ভেতরেরও ওই অতি পুরনো ব্যাধির বিরুদ্ধে, যার নাম প্রতিক্রিয়াশীলতা, পুরনো মূল্যবোধ, রাষ্ট্রনৈতিক দর্শন, সামাজিক সম্পর্ক ইত্যাদি।

একাত্তরে, আব্বা, আপনার কথা নানাভাবে মনে পড়েছে আমার। খুব করে মনে পড়েছিল একদিন বাসের এক বিরুদ্ধ পরিবেশে বসে। ঢাকা শহরেরই চলমান বাস, যেন লাশ বহন করে চলেছে কিছু। কথা যা দু-চারটে অবাঙালিরাই বলছে শুধু। কিন্তু সে বলাতেও উল্লাস নেই, আনন্দ নেই, এমনকি প্রাণও নেই। যেন বলার জন্যই বলা। অবাঙালিদের হাতে সিনেমা সাময়িকী একটা। ‘কিরে, বাংলা পড়ছিস নাকি আজকাল?’ তার পরিচিত একজন বলল, উর্দুতে, ইর্য়াকির সুরে। পড়ুয়া দেখি দমে না, বলছে, ‘হ্যাঁ, সব কিছুই জানা ভালো।’ কথাটা নাড়া দিয়েছিল আমাকে। বাঙালিরাও উর্দু শিখেছিল বৈকি তখন। আরো শেখার কথা ছিল। হঠাৎ মনে হলো, দূরে, বাসের অপর প্রান্তে, নিজের চারদিকে অনেকটা বিষণ্নতা জমিয়ে, বসে আছেন যে ভদ্রলোক, তাঁকে আমি চিনি। হ্যাঁ, কোনো ভুল নেই, তিনিই। তিনিও চেনেন আমাকে। না চেনার কোনো কারণ নেই তো। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন ইউপির ভদ্রলোক, আপনার, আব্বা, আপনার সেই বন্ধু, হোমিওপ্যাথির ওষুধ দিতেন যিনি, চিকিৎসক ছিলেন আপনার, তাঁরই মেয়ের জামাই তো, সেই যে যিনি কাজ করতেন রেলওয়েতে, থাকতেন বোধ হয় রংপুরে। তাঁর বিষণ্নতাই আকর্ষণ করল আমাকে। আমি নিজেও খুবই বিষণ্ন ছিলাম। কারণ তো ছিল না প্রফুল্ল হওয়ার। কিন্তু তাঁকে মনে হলো আমারই মতো বিষণ্ন। আপনার কথা মনে পড়ল আমার। আপনি যদি থাকতেন বাসে, নিশ্চয় উঠে যেতেন, গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন তাঁর পরিবারের কথা। কেমন আছেন তাঁর শ্বশুর, আপনার সেই বন্ধু যিনি, আপনার অসুখ হলেই যাঁর কাছে ছুটে যেতাম আমরা, রাত-বিরাত ছিল না। যখন আমরা পাশাপাশি থাকি, যাঁর পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিন মেয়ে নিয়ে এসেছিলেন ইউপির ভদ্রলোক, মোহাজের হয়ে। চাকরি ছিল সেক্রেটারিয়েটে, বাসা আজিমপুরে। ছেলে ছিল না। ছোট মেয়েটি তো আমার ছোট বোনের সবচেয়ে নিকট বন্ধু ছিল, সারা দিন ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখতাম দুই বন্ধুতে। সেই সব সদস্য পরিবারের, কোথায় আছেন তাঁরা, কেমন আছেন সবাই? আপনি জিজ্ঞেস করতেন। কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করতে পারিনি। আমি বসেই ছিলাম আমার আসনে, তিনি রইলেন তাঁর আসনে। তিনি কি হাসলেন আমাকে দেখে, যেমন হাসতেন সিঁড়িতে দেখো হলে? আমিই বা কি হাসলাম তাঁকে দেখে? জানি না, আমি জানি না। তিনি কি ভাবলেন, আমি তাঁর শত্রু? আমি কি ভাবলাম, তিনি আমার শত্রু? তা-ও আমি জানি না। শুধু এটুকুই মনে পড়ে, খুব অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। এক স্টপেজ আগেই আমি নেমে পড়েছিলাম। তিনি চলে গিয়েছিলেন বাসে করেই, হয়তো মোহাম্মদপুরেই। সেখানে কি সবাই ছিলেন তখন? ভালো ছিলেন? আমার মনের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। হয়তো বাসায় ফিরে তিনি বলেছেন আমার কথা। চৌধুরী সাহেবের বড় ছেলেটাকে দেখলাম বাসে, কথা হলো না, খুব বিষণ্ন মনে হলো। যেমন আমি বলতাম আপনাকে, আপনি থাকলে—রিজভী সাহেবের জামাইকে দেখলাম, বাসে, বড় বিষণ্ন মনে হলো। ব্যস, ওইটুকুই। রিজভী সাহেবদের সম্পর্কে খুব বেশি কি কোনো দিনই জানতাম আমরা? না, জানতাম না, ব্যবধান ছিল ভাষার, তার ওপর বড় চাপা স্বভাব ছিল ভদ্রলোকের, বোধ করি ভারতে সব কিছু খুইয়ে চলে এসেছিলেন ঢাকায়। তবু এই যে কথাটুকুও হলো না দুজনের, শত্রু হয়েছি বলে সন্দেহ পরস্পরের, তাতে তো আমাদের কারোরই কোনো হাত ছিল না। কিন্তু আমরা সবাই ছিলাম এর ভুক্তভোগী। যেমনটা ঘটেছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়, কলকাতায়। একই ক্লাসে পড়ি, পাশাপাশি বসি, একই সঙ্গে ফিরি বাসায়, অথচ বিশেষ বিশেষ রাস্তার মুখে এলে চমকে চমকে উঠি আমি, মনে পড়ে যায় আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুটি এক সম্প্রদায়ের, আমি আরেক সম্প্রদায়ের। সন্ত্রস্ত থাকি। সেই সময়ে অফিস থেকে ফিরতে আপনার দেরি হলে কেমন অস্থির হয়ে পড়তাম আমরা। একাত্তর ছিল তার চেয়ে অনেক ব্যাপক, অনেক নিষ্ঠুর।

রাজনীতি, আমি জানি আপনি বলতেন, রাজনীতি, রাজনীতি ছাড়া এ অন্য কিছু নয়। রাজনীতিই খেলাচ্ছে আমাদেরকে। হ্যাঁ, সে তো বটেই, সে নিয়ে তো কোনো মতভেদ নেই আপনার সঙ্গে আমার। তর্ক শুধু কোন রাজনীতি তাই নিয়ে। রিজভী সাহেব যে ঢাকায় চলে এসেছিলেন, অত্যন্ত অসহায়ভাবে, সে-ও রাজনীতিরই কারণে। ওই যে তাঁর পরিবার ও আপনার পরিবার একদা পাশাপাশি থেকেও পরে দূরবর্তী হয়ে পড়েছে, নিজেরই অজান্তে হয়ে উঠেছে শত্রু পরস্পরের, তার কারণও রাজনীতিই। কিন্তু কে করছে এই রাজনীতি? আমরা তো করিনি। করলেও করেছি অন্যের ক্রীড়নক হিসেবে। এই রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত স্বার্থের, যে স্বার্থ নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যদের বিভক্ত করে, শত্রু করে তোলে পরস্পরের। এর হাত থেকে বাঁচার উপায় কী?

কে বাঁচাবে মানুষকে সেই রাজনীতির হাত থেকে, যা দেশের মধ্যেই উদ্বাস্তু করে দেশবাসীকে? বাঁচাবে আবার রাজনীতিই। অন্য রাজনীতি, ভিন্ন ধরনের রাজনীতি, শ্রেণিস্বার্থের উত্খাত করার শক্তি রাখে যে শোষণবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন, সেই আন্দোলন। কিন্তু এসব কথা বলার বা শোনার মানসিকতা অনেকেরই ছিল না আমাদের—একাত্তরে।

আপনার সঙ্গে এসব কথা বলতে গেলে আশঙ্কা থাকত বেয়াদবির। নিদেনপক্ষে তার্কিকতার। এ দুয়ের কোনোটাই পছন্দ ছিল না আপনার। বেয়াদবি তো পাপ বটেই, তর্ক করাও অপচয় বৈ অন্য কিছু নয়। কিন্তু এ কি জানতেন আপনি যে একগুঁয়েমির মতোই কতকগুলো ধারণা ভেতরে ভেতরে গড়ে উঠেছিল আমার? জানতেন কি, আমার গায়ের পানি আপনি অনেক অনেক দিন পরম স্নেহে মুছে দিয়েছেন বটে, কিন্তু ওই সব ধারণাকে মুছে দিতে পারতেন না। আসলে নাগাল পেতেন না, এমনই একটা দূরত্ব বেড়ে উঠেছিল আমাদের মধ্যে। কিন্তু ওই একটা ব্যর্থতা, যাতে কোনো অগৌরব নেই। অন্তত আমি তা-ই মনে করি। আপনি হয়তো মানতেন না। কারণ

কোনো ব্যর্থতাই গৌরবের ছিল না—আপনার দিক থেকে।

অনুলিখন : শ্যামল চন্দ্র নাথ


মন্তব্য