kalerkantho


উপন্যাস

লেবাননি জাদুকর

মোস্তফা মামুন

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



লেবাননি জাদুকর

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

বৈরুতে নেমে তনু কাকা প্রথমেই জানতে চাইল, ‘আমাদের একজন বিখ্যাত নেতা এখানে মারা গিয়েছিলেন—বলো তো তাঁর নাম কী?’

যেকোনো নতুন দেশে গিয়ে শুরুতে সেই দেশসংক্রান্ত কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় কাকার কাছে। প্রস্তুতিও তাই নেওয়া থাকে। আমি লেবানন নিয়ে কিছু পড়াশোনা করে এসেছি। হিজবুল্লাহ, পিএলও, দক্ষিণ লেবাননের সমস্যা মিলিয়ে যা জেনেছি, তাতে প্রথম প্রশ্নেই আটকে যাব ভাবিনি। কিন্তু আমাদের কোন নেতা এখানে মারা গেলেন? বঙ্গবন্ধু, জিয়া—না, সবাই তো দেশেই মারা গেছেন।

কাকা হাসতে হাসতে বলল, ‘একটা ক্লু দিই। বাংলাদেশ আমলে না, তারও আগে।’

আমি মেনে নিয়ে বললাম, ‘তাহলে আর পারছি না। বাংলাদেশ আমলের আগে হলে বেশি পুরনো। আমার রেঞ্জের মধ্যে আসবে কী করে?’

‘অত আবার পুরনো না। তুই নাম বললেই তাঁকে চিনতে পারবি।’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ, চেনা নাম। খুব চেনা।’

ক্লু পেলে না-জানা জিনিসও আন্দাজ করতে ইচ্ছা করে। চেষ্টা করি। টুকটাক দু-একটা ঢিল মারি। যারা কোনো খোঁজখবর রাখে না, তাদের আন্দাজের ঢিল লেগে যায়। কিন্তু আমি খেয়াল করেছি, আমার ক্ষেত্রে এসব ঘটে না। কাকাকে একদিন মন খারাপ করে বললাম সেটি। কাকা বলল, ‘শোন, যারা পড়াশোনা করে, তাদের আন্দাজের শক্তি খুব দুর্বল হয়।’

‘কারণটা কী?’

‘কারণটা হলো, তারা এই শক্তির চর্চাই করে না। ধর, তুই বেশির ভাগ জিনিসই পড়াশোনা করে জানতে চাস। ফলে তোর আন্দাজ করার দরকারই পড়ে না। চর্চা না করার ফলে এই বিদ্যায় তোর দক্ষতা নেই। যারা কিছু  জানে না বা পড়াশোনার কষ্ট করে না, তারা নির্ভর করে আন্দাজের শক্তির ওপর। তাতে সেই বিদ্যায় তাদের দক্ষতা তৈরি হয়।’

মেনে নিলাম। কারণ খেয়াল করে দেখেছি, আমার বন্ধু ইমরান কোনো বিষয়েই তেমন কিছু  জানে না। আগ্রহও নেই। কিন্তু মহাকাশ কিংবা মঙ্গল গ্রহ নিয়ে যেকোনো প্রশ্ন করলেই সে কিছু একটা উত্তর দিয়ে দেয়। আর কিছু কিছু ঠিকঠাক মিলেও যায়। কিন্তু আমি যা জানি না, তা অনুমান করার বদলে ভাবি, এই না-জানাটা তো একটা লজ্জার বিষয়। কোন বই বা ওয়েবসাইটে এটা জানা যাবে তা-ই ভাবতে শুরু করি। অনুমানচর্চা আসলেই আমার নেই।

কিন্তু এখন সত্যিই কৌতূহল তৈরি হয়ে গেছে। কাকা যে রকম করে বলছে, তাতে মনে হচ্ছে, মানুষটা খুব চেনা। তাহলে আমি জানি না কেন?

কাকা হাসতে হাসতে বলল, ‘তাঁর নাম হচ্ছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ। উনি এখানে মারা গিয়েছিলেন।’

এখানে—এত দূর এসে। তা ছাড়া বৈরুত তো আমাদের অঞ্চলের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রও নয় যে মিটিংটিটিংয়ে এসে দুর্ঘটনায় পড়বেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মারা গিয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে। আইয়ুব খানের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের  মধ্যস্থতায় একটা মিটিং করতে এসে তাতে খুব উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে হোটেলে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক। অনেক ইতিহাসেই এটাকে সেই মিটিংয়ের উত্তেজনা এবং আইয়ুব খানের বিস্ফোরক আচরণের ফল বলে মনে করা হয়। সোহরাওয়ার্দীর ক্ষেত্রেও কি সে রকম কিছু? তিনি তো অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কিছুদিন। কোনো মিটিংটিটিং করতে এসে কি...

আমি হিসাব মেলাতে পারছি না দেখে কাকা ধাঁধা বাদ দিয়ে বলল, ‘উনি এখানে এসেছিলেন চিকিৎসা করাতে।’

এখানেও চমক। বললাম, ‘এত জায়গা থাকতে চিকিৎসার জন্য বৈরুতে!’

‘হ্যাঁ, এখনকার প্রেক্ষাপটে অদ্ভুত লাগবে। কিন্তু সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বৈরুত ছিল এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত শহরগুলোর একটি। এটিকে বলাই হতো এশিয়ার ইউরোপ। ইউরোপের খুব কাছে বলে ইউরোপীয় সংস্কৃতি ছিল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য মিলিয়ে ইউরোপিয়ানদের কাছেও খুব পছন্দের দেশ। তাই আমাদের দেশের মানুষও ছুটি কাটাতে, চিকিৎসা করাতে, উচ্চশিক্ষার্থে এখানে আসত। যুদ্ধ সেই সব কিছু শেষ করে দিয়েছে।’

১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ১৫ বছর স্থায়ী ওদের গৃহযুদ্ধের বিষয়ে মোটামুটি জেনে এসেছি। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধ অনেক দিক দিয়েই ওদের শেষ করে দিয়েছে।

গাড়ি চলতে শুরু করেছে। সৈকত ধরে এগিয়ে চলছি আমরা। মাত্র কয়েক মিনিটেই যা দেখলাম, তাতে চোখ জুড়িয়ে যায়। ভূমধ্য সাগর বয়ে চলছে সৌন্দর্যের রং নিয়ে। জলরাশির খেলা দেখতে দেখতে মনে হয়, পৃথিবীটা কত সুন্দর। মানুষ সেই সুন্দরে রং দিয়ে তাকে অপরূপ করেছে। আবার মানুষই যুদ্ধবিগ্রহ করে সেই রঙে কালি ছিটিয়েছে।

সুন্দরের মধ্যে একটা জিনিস শুধু চোখে লাগে। গাড়িগুলো খুব নোংরা। গায়ে কাদার মাখামাখি। আমাদের দেশে গ্রামের কাঁচা রাস্তা পার হলে যেমন ধুলা-ময়লা মেখে বিশ্রী রূপ নেয়, ঠিক সেই রকম। অথচ এখানে চকচকে রাস্তা।

কাকা নয়, ড্রাইভার খেয়াল করল আমার এই বিস্ময়। হাসতে হাসতে বলল, ‘আমাদের বৈরুতে গাড়িতে উঠে প্রথমেই মানুষ যে প্রশ্নটি করে সেটি হলো, গাড়িগুলো এত নোংরা কেন?’

ড্রাইভারের নাম টনি। শুরুতেই সে জানিয়েছে, সে একজন খ্রিস্টান। যেকোনো দেশের সংখ্যালঘু মানুষ নিজেদের পরিচয় খুব সহজে প্রকাশ করতে চায় না। তা ছাড়া ওর চেহারায় আরব ভাবটা এমন যে সে না বললে কোনোভাবেই আমরা বুঝতে পারতাম না। তবু শুরুতেই জানিয়ে দেওয়ার কারণ কিছুটা বুঝি। এই দেশে ধর্ম খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওদের সংবিধানে গুরুত্বটা এমনভাবে দেওয়া হয়েছে যে বলা হয়েছে, দেশের প্রেসিডেন্ট হবেন একজন ম্যারোনাইট খ্রিস্টান। প্রধানমন্ত্রী একজন শিয়া মুসলিম। পার্লামেন্টের স্পিকার শিয়া মুসলিম। ডেপুটি স্পিকার ও উপপ্রধানমন্ত্রী গ্রিক অর্থোডক্স খ্রিস্টান। এর পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে। তাই টনি যে শুরুতেই তার ধর্ম পরিচয় দিয়েছে, তাতে অবাক হইনি। কিন্তু অবাক হচ্ছি এই নোংরা গাড়িবহর দেখে।

টনি বলল, ‘আমাদের বড় একটা সমস্যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। যেখানে-সেখানে মানুষ ময়লা ফেলে। সরকারি একটা ময়লা ফেলার জায়গা বন্ধ করার পর থেকে এই অবস্থা। রাস্তায় ফেলা এসব বর্জ্য যায় সাগরে। তার ফলে পরিবেশ-বাতাস সব দূষিত হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে সেগুলো ভেসে এসে গাড়ি নোংরা করে দেয়।’

হোটেলের কাছে চলে এসেছি। হোটেলটির নাম ল্যাংকাস্টার ইন। অন্যান্য দেশে বিমানবন্দর থেকে লোকালয় অনেক দূরে থাকে। কিন্তু এখানে মাত্র ১০ মিনিটেই আমরা হোটেলের গেটে।

অদ্ভুত সুন্দর হোটেল। সামনে দাঁড়ালেই সাগর।

কাকা হাসতে হাসতে বলল, ‘হোটেল পছন্দ হয়েছে?’

বললাম, ‘দেশটা সুন্দর জানতাম; কিন্তু এত সুন্দর!’

‘শোন, শুধু দেশ সুন্দর হলেই ভালো লাগে না। ভালো লাগে অজানাকে আবিষ্কার করতে। লেবাননে এসে হোটেলে ওঠার আগেই তুই অনেক অজানা জিনিস জেনেছিস। সফরের উদ্দেশ্যই থাকে এমন কিছু জিনিস জানা, যা গিয়ে মানুষকে জানানো যায়। এখানে এরই মধ্যে দুটি জিনিস পাওয়া গেছে।’

‘তা ঠিক।’

‘আরেকটা ব্যাপার আছে। দেশ যত সুন্দরই হোক, তোর থাকার জায়গা যদি ভালো না হয়, তবে সেই সৌন্দর্য ঠিক মনে ধরে না। এখানে হোটেলটিও ভালো দেখে তোর আরো পছন্দ হচ্ছে।’

মেনে নিলাম, এই কথাও ঠিক।

হোটেলের রিসেপশনে রুম বরাদ্দের সময় কাকা হাসিমুখে বলল, ‘সৈকত দেখা যায় এমন একটা রুম দেবেন আমাদের, যেন বসে কফি খেতে খেতেই ভূমধ্য সাগরটা দেখতে পারি।’

রিসেপশনের তরুণটি মুখ না তুলেই বলল, ‘আমাদের সব রুম থেকেই সাগর দেখা যায়। এ জন্যই তো সাগরের পাড়ে হোটেল বানানো।’

কাকা বলল, ‘হাবিবি।’

মানুষটাও উত্তর দিল, ‘হাবিবি।’

কাকার যেকোনো দেশ ভ্রমণের প্রস্তুতিটা খুব বিন্যস্ত। তাতে সেই দেশের কিছু প্রচলিত শব্দ শেখারও একটা অংশ থাকে। কাকা বলে, যেকোনো দেশের মানুষ সবচেয়ে খুশি হয় বিদেশিদের মুখে নিজেদের ভাষার শব্দ শুনলে। একটা আত্মীয়তা বোধ করে। ভাবে, এই মানুষটি আমার দেশকে ভালোবাসছে। সম্মান দিচ্ছে।

লিফটে উঠে বললাম, ‘হাবিবি মানে কি ধন্যবাদ?’

‘না। ধন্যবাদ হলো শুকরান।’

‘তাহলে তুমি যে হাবিবি বললে...মানুষটাও উত্তর দিল হাবিবি।’

‘হাবিবিটা ঠিক ধন্যবাদের মতো আবার ধন্যবাদ নয়। এটার বাংলা অর্থ হবে বোধ হয় এ রকম, ওহ আমার প্রিয়।’

শব্দটার অর্থ আজই প্রথম জানলেও এটা অবশ্য খুবই পরিচিত আমাদের কাছে। ‘হাবিবি-হাবিবি’ গানটা আমার খুব পছন্দের।

গানে বোধ হয় এই শব্দটা খুব ব্যবহৃত হয়। আসার সময় গাড়িতে টনি যে উঁচু লয়ের গানটা বাজাচ্ছিল, তাতেও ‘হাবিবি-হাবিবি’ ছিল।

পাশে সাগর। মরুর দেশ। ‘হাবিবি-হাবিবি’ মূর্ছনা।

বহু দেশে গেছি। পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশ ঘোরা হয়ে গেছে। কিন্তু শুরুতে কোনো দেশ এমন মুগ্ধ করতে পারেনি। আমার এত দিনের যে তালিকা ছিল, তাতে সবার আগে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া।

কিন্তু আজ তালিকা বদলে সবাই এক ঘর করে পিছিয়ে গেল। এক নম্বরে বৈরুত আর লেবানন।

 

 

দুই

 

ঘরে ঢুকে মনটা ভরে গেল। জানালার পর্দাটা টেনে দিতেই মনে হলো, সাগরের উত্তাল জলের জোয়ার যেন ভিজিয়ে দিয়ে গেল পানি না ছিটিয়েই। জানালা খুলতেই উত্তাল শব্দ। এই শব্দ না শুনলে জানতামই না যে শব্দ কখনো কখনো সুরের চেয়েও বেশি করে হৃদয় রাঙায়।

জানালায় তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে এই সৌন্দর্য দেখতে পাওয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, ঠিক সেই সময়ই বেজে ওঠে রুম বেল। রুম সার্ভিস বা হোটেল ম্যানেজমেন্টের কেউই হবে হয়তো। কিন্তু কাকার যেন একটু ভ্রু কুঁচকে গেল। বলে, ‘এত তাড়াতাড়ি কে এলো?’

ব্যস্ত ভঙ্গিতে দরজা খুলতে দেখা গেল, হোটেলেরই লোক। আমি মুখ ফিরিয়ে আবার সাগরে মন দিই।

লোকটি ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলে, ‘মিস্তার চৌদারি?’

‘হ্যাঁ।’

‘ইম্পর্ট্যান্ট ইনফরমেশন ফর ইউ। তোমার এক বন্ধু বিমানবন্দরে আটকা পড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে তোমার কাছে খবর পাঠাতে বলেছে।’

আমি একটু অবাক। এখানে কাকার বন্ধু কে? আর বিমানবন্দরে আটকা পড়লে কাকা কী করতে পারে? মাত্র এসেছে। কাউকে চেনেই না। তা ছাড়া তার গোয়েন্দাবৃত্তির কৃতিত্বের কথাও তো লেবাননের কেউ জানে না।

কাকা ব্যস্ত ভঙ্গিতে মোবাইল ফোন বের করে বলল, ‘তাড়াতাড়ি ওয়াই-ফাইটা কানেক্ট কর তো।’

পাসওয়ার্ডের জন্য হোটেলের রিসেপশনে ফোন করতে যাচ্ছিলাম, ফোন ঘোরানোর আগেই দেখি, টেবিলেই বড় একটা কাগজে পাসওয়ার্ডটা লেখা। কানেক্ট হয়ে গেল মুহূর্তেই।

কাকা তাড়াতাড়ি করে হোয়াটসঅ্যাপ বের করে একটা মেসেজে চোখ বুলিয়েই বলে, ‘চল।’

‘এয়ারপোর্টে? এখনই?’

‘হ্যাঁ।’

‘কে ওখানে?’

‘গিয়েই দেখবি।’

‘আমার চেনা নাকি?’

‘হ্যাঁ।’

চমকিত হয়ে বললাম, ‘আরো কেউ আসছে আগে বলোনি তো?’

‘চল।’

কাকা পা বাড়ায়। গাড়িতেও আমি জানতে চাইলাম, কিন্তু কাকা হোয়াটসঅ্যাপ নিয়ে ব্যস্ত থাকল।

এমনিতে প্রযুক্তিবিমুখ। একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে, কিন্তু সপ্তাহে এক দিন ঢোকে। বলে, ‘দেখি, দুনিয়ার মানুষের রুচি আর চিন্তা কোন পথে এগোচ্ছে।’ তার সঙ্গে ওখানে অনেকে যোগাযোগ করতে চায়, কিন্তু কাকা কোনো মেসেজের উত্তর দেয় না। নিজে কিছু লেখে না। কিন্তু এই একটা জিনিস তার খুব পছন্দের। হোয়াটসঅ্যাপ। আজ অনেকক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপ টিপে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আমাকে মেসেজ দিয়েছে এক ঘণ্টা আগে। তার মানে এক ঘণ্টা আগ পর্যন্ত তাকে ফোন ব্যবহার করতে দিয়েছে। কিন্তু এখন যখন উত্তর দিচ্ছে না, তখন বোঝা যাচ্ছে, অবস্থা বেশ খারাপ।’

‘ফোন করো।’

‘করলাম তো। বন্ধ।’

‘ও। মানুষটা কে?’

কাকা বলল, ‘এখন না বলি। আমি তোকে চমক দেওয়ার জন্যই আগে বলিনি। কিন্তু এত বড় চমক যে হয়ে যাবে, সেটি তো বুঝতে পারিনি।’

বৈরুত যুদ্ধপ্রবণ শহর। বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময় খুব কড়াকড়ি আশা করেছিলাম। কিন্তু কেউ এমনকি আমাদের ব্যাগটাও দেখতে চায়নি।

কিন্তু এখন ঢোকার সময় মনে হলো, যেন আমরা কোনো সমরাস্ত্র কারখানায় ঢুকছি।

গেটে রাইফেল হাতে একঝাঁক সৈনিক বা পুলিশ দাঁড়িয়ে। আর চেক এমনভাবে করল, যেন পারলে শরীর থেকে কাপড় খুলে নেয়। কাকার পকেটে একটা ম্যাচ ছিল। সেটি ছুড়ে ফেলে দিল ভীষণ অপমানজনক ভঙ্গিতে।

ভেতরে ঢুকে অনেক ঘোরাঘুরি করে আটকে পড়া যাত্রীদের অনুসন্ধানের ডেস্কটা খুঁজে পাওয়া গেল। তাতে একজন মানুষ বসে আছে, পৃথিবীর কিছুতেই কিছু যায় আসে না, এমন নির্লিপ্তভাবে। কাকা তাকে গিয়ে বলল, ‘আমার একজন বন্ধুর খোঁজে এসেছি। ইমিগ্রেশনে কোনো জটিলতায় সম্ভবত তাকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না।’

‘নাম?’ সেই নির্লিপ্ত ভঙ্গি।

‘আরিফ। সঙ্গে একটা ছোট মেয়েও আছে। পরী।’

আরিফ কাকা! পরীও এসেছে। আমার যে কেমন লাগে! একই সঙ্গে চরম আনন্দ আর চরম দুঃখ মিলিত হলে ঠিক কী রকম হয়, আজ সেটি জানলাম।

পরী এসেছে, সেটি কী আনন্দের ব্যাপার! আবার ওরা বিমানবন্দরে আটকে আছে, এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার তো আর হতে পারে না।

দ্বিমুখী অনুভূতিতে আচ্ছন্ন ছিলাম বলে খেয়াল করিনি, নামটা শুনতেই নির্লিপ্ত মানুষটি লাফিয়ে উঠেছে। ডেস্ক ছেড়ে উঠে এসে প্রচণ্ডভাবে চেপে ধরেছে কাকার হাত। ‘চলো।’

‘যাব, কিন্তু তুমি এভাবে আমার হাত ধরেছ কেন?’

মানুষটি প্রচণ্ড রুক্ষ স্বরে বলল, ‘নো টক।’

আমিও চললাম কাকার পেছন পেছন।

মানুষটি একটু পেছন ফিরে যেন মশা কিংবা মাছি দেখছে, এমনভাবে চোখ ফিরিয়ে নিল।

পঁচিশ-ত্রিশ মিটার হেঁটে একটা প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে যে ছোট্ট ঘরটার সামনে এনে দাঁড় করাল, সেখানকার পরিবেশের মধ্যে কেমন যেন একটা ভীতিকর ব্যাপার আছে।

কাকার হাত ছাড়ল এখন। ‘চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে। নো ডান-বাম।’

কাকা কিছু বলল না। নিজের ডান হাতের কবজির ওপরটা একটু ভালো করে দেখে। মানুষটি এতক্ষণ এখানেই চেপে ধরেছিল।

ফিসফিস করে বললাম, ‘কাকা, ঠিক বুঝতে পারছি না। পরীরা এত দেশ ঘুরেছে অথচ এখানে কী এমন হলো যে...।’

কাকাও চিন্তিত। কিন্তু শত চিন্তার মধ্যেও আমাকে নিশ্চিন্ত রাখাটা দায়িত্ব মনে করে। বলল, ‘এ রকম হয়। এয়ারপোর্টে কোনো কিছু নিয়ে ওদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিলে জেরা-জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু জেনুইনদের কোনো ভয় নেই।’

‘ছাড়বে?’

কাকা হাসে। ‘ছাড়বে না কেন? ওরা কি সন্ত্রাসী নাকি?’

মানুষটি আবার ফিরে আসে। কাকার হাত চেপে ধরে এমন হ্যাঁচকা টান মারে যে আমার মনে হলো, কাকাকেও না আটকে ফেলে।

মনেই হচ্ছিল না, আমাকে ভেতরে যেতে দেবে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, আমার দিকে একবার তাকিয়ে আবার হেলাফেলার ভঙ্গিতে মুখ ফেরায়।

আমি ঢুকে গেলাম নিশ্চিন্তে।

কিন্তু সেই ঘরটায়ও আরিফ কাকা বা পরী নেই। একটা মাঝারি গড়নের লোক বসে একটা বই ওল্টাচ্ছে। আমাদের ছোট বাচ্চারা যেমন বই খুলতে গিয়ে উল্টা দিক থেকে শুরু করে মাঝেমধ্যে, মনে হলো, সে রকমই ভুল করছে মানুষটি। তখনই খেয়াল হয়, আরবি তো লেখা শুরু হয় ডান দিক থেকে। আমাদের বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা থেকে ওদের শুরু।

বইটা রেখে লোকটা বলে, ‘তোমার নাম?’

‘তন্ময় চৌধুরী।’

মানুষটা উচ্চারণ করতে গিয়ে আটকে যায়। বলে, ‘মুসলিম?’

‘হ্যাঁ।’

‘শুনেছি তোমাদের দেশের মানুষ নামে মুসলমান হলেও আসলে মুসলমান নয়। তোমার তো দেখছি নামেও মুসলমানিত্ব নেই।’

‘আমাদের নাম হয় আমাদের দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী। বেশ অনেক বছর তুর্কি-ফারসিরা রাজত্ব করায় নামে তোমাদের অঞ্চলের প্রভাব আছে কিছু। তোমাদের প্রভাব এবং আমাদের আদি ঐতিহ্য মিলিয়ে নাম রাখা হয়। তাই কোনো নাম শুনলে তোমাদের কাছে মুসলমান মনে হবে, কোনোটা শুনলে মনে হবে না।’

নামসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁকে আর উৎসাহী দেখা গেল না। সে চলে এলো কাজের কথায়। ‘তোমার সঙ্গে আইএসের সম্পর্কটা কী?’

 

এতক্ষণে বিষয়টা পরিষ্কার। কিন্তু বিরাট ভয়ের ব্যাপারও। সন্দেহ যখন করছে, তখন এত সহজে ছাড়ার প্রশ্ন নেই।

কাকা একটুও দুশ্চিন্তা না করে হেসে বলে, ‘তোমরা তাহলে আমার বন্ধুকে সন্ত্রাসী ধারণা করে ওকে আটকে রেখেছ?’

‘ইয়েস। ও এখনো স্বীকার করছে না। কিন্তু বেশিক্ষণ সময়ও লাগবে না। তুমিও স্বীকার করবে।’ মানুষটি হাসে। যেন সে নিশ্চিত, আমরা সবাই এখানে বোমা মারতে এসেছি।

কাকা তবু মিইয়ে যায় না। বলে, ‘বিরাট কোনো ভুল-বোঝাবুঝি হচ্ছে। আমাদের দেশে কিছু সন্ত্রাসী কাণ্ড হচ্ছে বটে; কিন্তু সেটি তো সব দেশেই হয়। তোমাদের দেশের ইতিহাসে কত যুদ্ধবিগ্রহ।’

‘দেশের কথা বাদ দাও। নিজের কথা বলো।’

‘আমি একজন সাধারণ পর্যটক। বেড়াতে এসেছি।’

‘ইয়ার্কি। আমরা চেক করেছি, গত এক বছরে শুধু বেড়ানোর জন্য বাংলাদেশ থেকে মাত্র তিনজন মানুষ এখানে এসেছে। তাদের দুজন তোমাদের হাইকমিশনারের আত্মীয়। আরেকজন বড় ডাক্তার, বৈরুতে ওর এক ডাক্তার বন্ধুর আমন্ত্রণে এসেছিল।’

‘যাকে ধরেছ, সে-ও তো বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা।’

‘তারটা সে বলছে। নিজেরটা বলো। তোমরা তো মিসকিন দেশ, বেড়ানোর বিলাসিতা তো তোমাদের দেখানোর কথা না। তা-ও যে দেশের মানুষ, নামেই শুধু মুসলমান, তোমাদের বেড়ানো মানে মউজ-মাস্তি। ইউরোপে যাবে। নইলে ব্যাংকক।’

এত অপমানজনকভাবে হাসে যে আমার ইচ্ছা হয়েছিল একটা কঠিন উত্তর দিই। আমি যা মনে মনে ভেবেছিলাম কাকা যেন ঠিক সেই উত্তরটাই দিল। ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘দেখো, তুমি আমার ধর্ম, আমার দেশ সব কিছুকে অপমান করছ। অথচ এখনো আমাদের অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।’

‘প্রমাণ হতে কয়েক মিনিট মাত্র লাগবে।’ সে ভ্রু নাচিয়ে হাসে।

তারপর চোখ পড়ে আমার দিকে। বলে, ‘এই বাচ্চাটি কে?’

‘আমার ভাতিজা।’

‘সে-ও তোমার সঙ্গে! সেই মানুষটির সঙ্গে একটা মেয়ে। জানো, আইএসের লোকেরা আমাদের এখানে ঢুকতে ঠিক এই কাজ করে। সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকার জন্য বাচ্চাদের ব্যবহার করে। তোমাদের যে কোন নরকে জায়গা হবে!’ বলে সে আরবিতে নিজের মনেই কী যেন বলে। আরবি শব্দ মানেই আমাদের কাছে পবিত্র বাণী। কিন্তু অর্থ না বুঝেও বুঝলাম, বিশ্রী রকম কোনো গালাগালি দেওয়া হচ্ছে।

আর থাকতে না পেরে বললাম, ‘আমরা কি একটু আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে পারি।’

মানুষটির আমার এই সাহসে চমকানোর কথা। কিন্তু হাসে। বলে, ‘এরও দেখি খুব ভালো প্রশিক্ষণ নেওয়া আছে।’

ঘটঘট শব্দ করে ঘরে ঢোকে একজন মানুষ। হাতে দুটি পাসপোর্ট। বাংলাদেশি। মানে, আরিফ কাকা আর পরীর।

সেটি টেবিলে রেখে আরবিতে কী কী যেন বলে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল।

আর সে চলে যেতেই টেবিলের মানুষটি হেসে বলে, ‘আমি খুব দুঃখিত। আমাদের ভুল হয়েছিল।’

বুকে কয়েক মণ পাথর যদি চেপে থাকে এবং সেটা এক ধাক্কায় সরে যায়, তাহলে যেমন লাগে, ঠিক সে রকম লাগল।

মানুষটির গলা পুরো বদলে গেছে, ‘আমি তোমাকে কিছু বাজে কথা বলেছি। কিছু মনে কোরো না। আমাদের চাকরিটাই খুব খারাপ, শুধু মানুষকে সন্দেহ করা। উপায়ও নেই। গত তিন মাসে আমাদের চারজন চাকরি হারিয়েছে কিছু সন্দেহভাজনকে ছেড়ে দেওয়ায়।’

 

লাগোয়া ঘরে শব্দ শোনা যায়। আরিফ কাকার গলা। পরীও নিশ্চয়ই সঙ্গে আছে। আহা রে, বেচারির না জানি কত কষ্ট হয়েছে। আজ ওর যে চেহারাটা দেখব, এমন বেদনামাখা মুখ এর আগে কোনো দিন নিশ্চয়ই দেখিনি।

 

 

তিন

 

বিকেলে হোটেলের ঠিক বাইরে কফি কর্নারে আমরা বসে। আমার আর পরীর সামনে দুটি কফির কাপ। কাকা আর আরিফ কাকার সামনে দুটি বিশাল সাইজের হুঁকা। ওরা অবশ্য বলে শিশা। আর সেই শিশা এখানে এত জনপ্রিয় যে যার সঙ্গে দেখা হয় সে-ই বলে, ‘তুমি কি একটু শিশা চেখে দেখবে। লেবাননের শিশা বিশ্বের সেরা।’ সেই সেরা শিশা পরীক্ষা করে দেখছে কাকারা। নেশাজাতীয় জিনিস বলে ছোট হিসেবে আমরা আপাতত বাদ, তবে খুব সম্ভব কোনো একপর্যায়ে একটু হলেও টেস্টটা নিতে দেওয়া হবে আমাদের।

এই হাসি-খুশি আমাদের দেখে কে বলবে আজ দুপুরে বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হিসেবে আমরা সবাই প্রায় আটকা পড়ে যাচ্ছিলাম। আমি বেশি চিন্তিত ছিলাম পরীকে নিয়ে। কিন্তু পরী গাড়িতে উঠেই বলল, ‘শান্ত ভাই, তুমি এত ভয় পাও! তোমার চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে, তোমাকে কেউ একটু পর ফাঁসি দিয়ে দেবে।’

পরীর মুখে এই কথা শোনা চূড়ান্ত অপমানের; কিন্তু আমার লাফ দিয়ে আনন্দ করতে ইচ্ছা করে। এর অর্থ পরী বিষয়টাকে সহজভাবে নিয়েছে। এই দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাওয়ায় বড় একটা টেনশন গেল। বৈরুত আর লেবাননটা মজা করেই দেখা যাবে।

লেবানন আসার প্রস্তাব শুনে প্রথমে ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। এই দেশ সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানতাম না। আমাদের দেশের মানুষ কত দেশে এখন বেড়াতে যায়, তবু কাউকেই এর আগ পর্যন্ত বলতে দেখিনি, লেবানন বেড়িয়ে এলাম। সেই প্রায় অচেনা দেশে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগটা কিভাবে এলো?

কাকাকে জিজ্ঞেস করলাম। কাকা কেমন যেন রহস্য করে।

এখন রহস্যটা পরিষ্কার হয়েছে। আরিফ কাকা একটা সরকারি কাজে তিন দিনের জন্য এসেছে। প্রস্তাবটা তারই। ‘ইউরোপ-আমেরিকায় তো যাওয়ার অনেক সুযোগ আসবে। কিন্তু লেবাননে যাওয়ার সুযোগটা সাধারণত আমাদের আসে না। চলো।’

কিন্তু একসঙ্গে আসা হয়নি। আরিফ কাকার পোস্টিং এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড বিভাগে, সেই সূত্রে যাতায়াত করতে হয় খুব। কাঠমাণ্ডু গিয়েছিলেন একটা কাজে, সেখান থেকে ঢাকা ফিরে ফ্লাইট মেলাতে খুব ঝামেলা বলে ওরা এসেছে কাঠমাণ্ডু থেকে। সঙ্গে পরীও আছে বলে আমাকে চমক দিতে কাকা আগে থেকে বলেনি কিছু। কিন্তু চমকটা বিমানবন্দরের ঝামেলায় উড়ে গেল একেবারে।

কাকা বেশ কায়দা করে শিশা টানছে। দাদার এক ভাইকে খুব ছোটবেলা হুঁকা টানতে দেখেছিলাম, এত বছর পর বিদেশ-বিভুঁইয়ে একেবারে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের ছবির পুনর্দৃশ্যায়ন যেন। শৈশবের সেই হুঁকার গন্ধের সঙ্গে অবশ্য বিরাট তফাত। ওতে মিলত সিগারেটের মতো গন্ধ, এখানে যেন স্ট্রবেরির সুবাস। জানা গেল, স্ট্রবেরিই। হুঁকার পানিতে নানা রকমের ফ্লেভার মেশানো থাকে। আরিফ কাকা যেমন নিয়েছে চকোলেট ফ্লেভার। দৃশ্য হিসেবে দারুণ, গন্ধও অপূর্ব।

এসব আয়োজনই হচ্ছে কিবরিয়া সাহেবের তত্ত্বাবধানে। তিনি এখানকার বাংলাদেশ হাইকমিশনের পদস্থ কর্তা, দুপুরে হোটেলে ফিরেই দেখি তিনি আগে থেকেই বসে। বিমানবন্দরের ঘটনা শুনে বললেন, ‘আমাকে একটা ফোন করতেন। গারলের দল। ন্যাশনাল ডেলিগেটকে সন্ত্রাসী মনে করে।’

আরিফ কাকা শান্ত গলায় বলল, ‘আমি তো এমবাসিতে জানিয়েছিলাম।’

‘কোন গাধা ফোন ধরেছিল?’

‘আমার তো গাধা না, মানুষই মনে হয়েছিল। সমস্যা শুনে বলল, আমি দেখছি।’

‘দেখছেন, আমাকে জানায়নি।’

আরিফ কাকা কী যেন বলতে গিয়ে চেপে গেলেন।

কাকা বলল, ‘যা-ই হোক, যে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, সেটি নিয়ে তো আর আলোচনার দরকার নেই। সামনে যা আসবে তা নিয়ে ভাবি।’

আমার মনে সেই তখন থেকে একটা কৌতূহল। জানতে চাইলাম, ‘আচ্ছা, এরা তো মুসলিম দেশ। যত দূর জানি, ইসরায়েলের সঙ্গে তীব্র লড়াই করছে। কিন্তু আইএস নিয়ে ওদের এত মাথাব্যথা কেন?’

কিবরিয়া সাহেব বললেন, ‘সব মাথামোটা আরবের দল। গাধা। গাধা।’

কাকা বলল, ‘হিজবুল্লাহর নাম শুনেছিস।’

হিজবুল্লাহ! মনে পড়ল, পত্রিকার আন্তর্জাতিক পাতায় মাঝেমধ্যে দেখতে পাই, হিজবুল্লাহ কাউকে ধরে নিয়ে গেছে, কিংবা আমেরিকার বিরুদ্ধে কড়া কোনো বিবৃতি দিচ্ছে।

পরী বলল, ‘হিজবুল্লাহ কে? আমাদের বাংলাদেশের কেউ।’

কাকা হাসে, ‘হিজবুল্লাহ হলো এখানকার সবচেয়ে বড় সশস্ত্র সংগঠন এবং সেই হিজবুল্লাহ কোনোভাবেই আইএসকে সহ্য করতে পারে না।’

‘কিন্তু বিমানবন্দরে তো সরকারি কর্মকর্তা সবাই। হিজবুল্লাহ-আইএসের এই গোলমালে তারা শরিক থাকবে কেন?’

কাকা আবার হাসে। ‘এখানেই হলো মজাটা। অন্যান্য দেশের এসব সশস্ত্র সংগঠন হয় সরকারিভাবে নিষিদ্ধ কিংবা সরকার তাদের প্রশ্রয় দেয় না। লেবাননে বিষয়টা অন্য রকম। হিজবুল্লাহ যদিও বেসরকারি সংগঠন; কিন্তু তারা আসলে একভাবে লেবাননি সামরিক বাহিনীর সমান্তরাল সংগঠন। আর সত্যি বললে, ওদের শক্তি অনেক বেশি। পশ্চিমা বিশ্ব তো হিজবুল্লাহকে বলে ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’।

কিবরিয়া সাহেব একটু উসখুস করে বললেন, ‘আপনি মোটামুটি ঠিকই আছেন, তবে কথা আছে আরো। এগুলো অনেক বড় ব্যাপার।’ বোঝা গেল, কাকার এই জ্ঞান প্রকাশ তাঁর পছন্দ হচ্ছে না। এমবাসির মানুষ এ রকমই হয়। যে দেশে থাকে, তাদের ধারণা সেই দেশ সম্পর্কে তাদের চেয়ে বেশি জানার অধিকার বাংলাদেশের কোনো মানুষের নেই।

আরো কোনো অপমানজনক কথা কিবরিয়া সাহেব বলে ফেলতে পারেন দেখে আরিফ কাকা একটু হস্তক্ষেপ করে। ‘শোনো কিবরিয়া, তন্ময় কিন্তু বিরাট গোয়েন্দা। তুমি তো অনেক বছর বাংলাদেশের বাইরে। দেশে সে মোটামুটি একজন তারকা।’

সরকারি কর্মকর্তাদের এটাও একটা সমস্যা। ব্যক্তি উদ্যোগের যেকোনো কাজকে ওরা তুচ্ছতার চোখে দেখে।

কিবরিয়া সাহেব বললেন, ‘তা বেশ তো। গোয়েন্দাটোয়েন্দা হওয়া ভালো। আমরাও ছোটবেলায় স্কুলে এসব নিয়ে বেশ খেলেছি। আর্থার কেনান ডয়েল পড়েছেন নিশ্চয়ই। নাকি ব্যোমকেশ-ফেলুদা।’

কাকা বলল, ‘আমি খুব একটা পড়িনি।’

‘বলেন কি মশাই। ওসব না পড়েই গোয়েন্দাগিরি! আমাদের দেশে অবশ্য সব হয়। সবাই সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। এই যে আরিফ স্যার যে সেমিনারে এসেছেন, সেখানে দেখবেন কিভাবে কিভাবে যেন ইনভাইটেশন বাগিয়ে দু-একজন বাংলাদেশি চলে আসে। আর এসে এমন সব জ্ঞান দেওয়া শুরু করে, যেন একেকজন আইনস্টাইন।’

কাকাকে ঠেস দিয়ে কথাগুলো বলা। কিন্তু বলতে গিয়ে নিজেই যে হাস্যকর হয়ে গেছেন, সেদিকে তাঁর খেয়াল নেই। এমন মানুষকে সহ্য করার কারণ নেই। তাই তিনি যখন বললেন, ‘তাহলে আপনারা এখন একটু বিশ্রাম করুন। ঠিক আটটায় আমি আপনাদের উঠিয়ে নেব গাড়িতে’ তখন একটু যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

স্বস্তি অবশ্য খুব স্থায়ী হচ্ছে না। কারণ ভদ্রলোক তাঁর সিনিয়র অফিসার আরিফ কাকার জন্য নিজে নিজেই একটা সূচি ঠিক করে রেখেছেন। তার মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে রাতের বৈরুত দেখা। আটটায় বেরোতে হবে তাঁর সঙ্গে।

আরিফ কাকা তাঁর এই অস্বস্তিকর কথাবার্তা শুনে প্রগ্রামটা বাতিল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কাকা থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘যাব। বৈরুতের রাতের সুনাম আছে। লেবাননকে একসময় বলা হতো এশিয়ার সুইজারল্যান্ড আর বৈরুত হচ্ছে প্যারিস। বুঝতে পারলি তো...দেখার অনেক কিছু আছে।’

কিবরিয়া সাহেব এবার কিন্তু কাকার জ্ঞানে খুশি, ‘ঠিক বলেছেন। আমি তো প্যারিসে গিয়েছিলাম, কিন্তু কিছু  কিছু ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, বৈরুত প্যারিসের চেয়েও এগিয়ে। দারুণ লাগবে। দারুণ!’

কিবরিয়া সাহেব উঠে চলে গেলে আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম। বলতে পারলাম না। তার আগেই দুজন মানুষ এসে আমাদের টেবিলের পাশে দাঁড়াল।

একজন বাংলাদেশি চেহারার, সঙ্গের জন আরব। বাংলাদেশি মানুষটি বসে গিয়ে বলল, ‘অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম। এমবাসির লোকটি না যাওয়া পর্যন্ত তো আর আসা যায় না।’

আরিফ কাকা বললেন, ‘এমবাসির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ?’

মানুষটি একটু ভেবে বলে, ‘ঠিক তা না। এমবাসির লোকও আছে আমাদের সঙ্গে। তবে এই মানুষটির সঙ্গে তো কথা হয়নি এখনো, এর সম্পর্কে জানি না।’

কাকা বলল, ‘আপনাদের পরিচয়টা জানলে ভালো হতো না।’

‘ও। পরিচয় তো দিতে হবে। অবশ্য এক অর্থে তো আমরা পরিচিতই। যা-ই হোক, এই বাচ্চাদের কী করবেন? নাকি ওদের নিয়েই যাবেন।’

‘কোথায় যাব?’

‘যেখানে যেতে এসেছেন।’

‘কোথায় যেতে এসেছি।’

‘উফ্! রসিকতা করছেন। ঠিক আছে, কিছুক্ষণ করুন। অসুবিধা নেই।’

আরিফ কাকা বললেন, ‘রসিকতা না। কী বলতে চাচ্ছেন, বুঝিয়ে বলুন। আমরা আবার কোথায় যাব?’

‘কেন, সিরিয়া।’

‘সিরিয়া?’

আমরা স্তম্ভিত। কিন্তু মানুষটি স্তম্ভিত আরো বেশি।

আরব লোকটি বুঝতে না পেরে আরবিতে কী কী যেন বলে। বাংলাদেশিটিও শুরু করে আরবিতে। কোরআন শরিফ পড়লেও আরবি ভাষাটা ঠিক জানি না; কিন্তু বাংলাদেশিটির আরবি উচ্চারণ শুনে মনে হলো, যেন আরব দেশের মানুষই কথা বলছে। এত সুন্দর আরবি সে শিখল কী করে?

বুঝলাম, জিন্স আর ঢোলা শার্ট পরা মানুষটির এলেম আছে।

 

 

চার

 

গাড়ি চলার সময় পাশে অপূর্ব দৃশ্য। ছোট ছোট টিলার মতো জায়গায় ঘরবাড়ি, তার আলোয় রাতের অন্ধকার দূরে সরে গিয়ে মায়াময় একটা পরিবেশ। অপহৃত হওয়ার জন্য একেবারে বেমানান পরিবেশ। কিন্তু কী আর করা! কপালটা এবার বড়ই খারাপ।

অবশ্য মনে হচ্ছে না যে আমাদের অপহরণ করা হচ্ছে। মানুষ দুটি আমাদের সঙ্গে খুব খাতির করে কথা বলছে। আমাদের আপত্তি কানে না তুলে আমাকে আর পরীর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে দুটি কোকের ক্যান। কাকাকে সিগারেট ধরিয়ে দিয়েছে নিজের হাতে।

আমরা অবশ্যই তাদের কথামতো আসতে রাজি হচ্ছিলাম না। বাঙালি লোকটি শেষে প্রায় পায়ে পড়ে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি আমাদের ভুল হচ্ছে। কিন্তু আমার বস সেই কথাটা মানবে না। আমি বিপদে পড়ে যাব।’

কাকা বলল, ‘আপনি বুঝিয়ে বলবেন।’

‘ভাই রে, এটা আপনার-আমার দেশ না। আর এসব ক্ষেত্রে বিপদ মানে তো বোঝেনই, একেবারে কতল। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে চলেন। মনে করেন, বেড়াতে যাচ্ছেন। গাড়িতে যাবেন, গাড়িতে দিয়ে যাব। আর নিয়েও যাব সুন্দর একটা রাস্তায়। মনে হবে, একটা ড্রাইভে যাচ্ছেন।’

আরিফ কাকা তবু রাজি হচ্ছিলেন না। কাকা শেষে বলল, ‘চলেন ভাই, দেশের একটা মানুষের জান বাঁচিয়ে আসি।’

১৫-২০ মিনিট গাড়ি চলার পর একটা জায়গায় একটু স্লো করে মানুষটি বলে, ‘এই জায়গাটা বিখ্যাত কেন, জানেন?’

এমন কোনো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জায়গা মনে হয় না। কিছু দোকান-মার্কেট মিলিয়ে আর দশটা জায়গার মতো।

সে নিজে থেকেই বলে, ‘আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি এখানেই খুন হয়েছিলেন, ওই যে সেন্ট জর্জ হোটেলের পাশে।’

এবার একটু আগ্রহ দেখাই। জানি, ২০০৫ সালে তাঁর মোটরবহরের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়, যাতে নিহত হন হারিরি। সেই খুনটা কে করেছে তার নিষ্পত্তি অবশ্য হয়নি। কারো মতে, প্রতিবেশী সিরিয়ার সরকার ও হিজবুল্লাহ এর সঙ্গে জড়িত। অন্য পক্ষের বক্তব্য, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।

আরেকটু এগোনোর পর হঠাৎ যেন চলে এলাম একটা ধ্বংসস্তূপে। এবারও মানুষটি ইতিহাস জানানোর দায়িত্ব নেয়। ‘এটা ২০০৬ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধের ফল। ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণে বৈরুতের এই অংশটা একেবারে শেষ হয়ে গেছে।’

পরীর একটু কৌতূহল হলো। ‘কেন যুদ্ধটা হয়েছিল।’

‘হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ করেছিল। তার জবাব দিতেই ইসরায়েলের আক্রমণ।’

‘যুদ্ধে কে জিতেছিল?’

‘যুদ্ধে কি আর কেউ জেতে? দুই পক্ষই হারে। তবে ক্ষয়ক্ষতি আমাদেরই বেশি হয়েছিল। অবশ্য হিজবুল্লাহ লড়েছিল দারুণ। ইসরায়েল যে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩৪ দিনের মধ্যে পিছু হটল, তার কারণ তাদের ওপরও চাপ পড়েছিল অনেক।’

কেউ কিছু বলে না। গাড়ি সরু ঢালের রাস্তা ধরে এগোতে থাকে।

মানুষটি আবার বলে, ‘এই দেশের দুর্ভাগ্য কী জানো, একের পর এক যুদ্ধের শিকার হয়েছে নিজেরা কিছু না করেও। ১৯৮২ সালে পিএলও এখান থেকে আক্রমণ করল ইসরায়েলকে, ইসরায়েল দেশে ঢুকল। লম্বা যুদ্ধ।’

এবার কাকা কথা বলে, ‘কিন্তু সেই যুদ্ধই তো হিজবুল্লাহর জন্ম দেয়। ইসরায়েলি বাহিনী ওখানকার আধিপত্য ধরে রাখার জন্য সাউথ লেবানিজ আর্মি বলে যে দলটা তৈরি করে, ওদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্যই জন্ম হিজবুল্লাহর। যে হিজবুল্লাহ এখন লেবাননেরই অন্য নাম।’

কাকার কাছ থেকে ঠিক এ রকম বিশ্লেষণ বোধ হয় মানুষটি আশা করেনি। একটু যেন সম্মান তৈরি হলো। তা ছাড়া বড় মানুষদের কেউ এই-ই প্রথম ওর সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেওয়ায় একটা আন্তরিকতাও বোধ করে মনে হয়।

বলে, ‘এতক্ষণ শুধু বকবক করছি। আপনাদের তো আমার নামটাই বলা হয়নি। আমার বাংলা নাম পলাশ খান, এখানে হয়ে গেছি বলাশ।’

কাকা হাসে, ‘তাই তো হওয়ার কথা।’

পরী একটু দুষ্টুমির গলায় বলে, ‘পলাশ থেকে বলাশ কেন?’

কাকা বলে, “আরবি ভাষায় ‘প’ বর্ণ নেই। প-কে ওরা উচ্চারণ করে আমাদের ব-এর মতো। ধরো আমাদের এখানে যে পীর, সে হয়ে যাবে বীর।”

পলাশ ওরফে বলাশ কিছু  বলতে যাচ্ছিল। ফোন আসে। আরবি ভাষায় ফিসফিস করে কথা বলে গাড়িকে নির্দেশনা দেয় আরেকটু ভেতরের দিকে যাওয়ার। সেখানে একটা পুরনো আমলের বাড়ি। বোঝা গেল, এটাই ওর বা ওদের আস্তানা।

এসব আস্তানায় নেপথ্য গুরুরা আসে অনেক কায়দা করে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর পাইক-পেয়াদা পেরিয়ে দেখা মেলে আসল সর্দারের। কিন্তু এখানে আসল সর্দার গেটেই দাঁড়িয়ে। আর তাকে ঠিক সর্দার শ্রেণিরও মনে হয় না।

মানুষটি হাসতে হাসতে বলল, ‘আপনারা কিন্তু আমার মন খারাপ করে দিয়েছেন।’

কাকা বলল, ‘মন খারাপ তো হবেই। আপনি স্বপ্ন দেখেছিলেন আইএসের কয়েকজন লোক পাবেন, তার জায়গায় আমাদের মতো সাধারণ পর্যটক পেলে আপনার চলবে কিভাবে?’

মানুষটি আমাদের হাত দেখিয়ে ভেতরে নিয়ে চলে। সেখানে বিরাট টেবিলে কত রকমের যে খাবার। ফলের রসের জগ গুনতে গিয়ে শেষই করতে পারলাম না।

কাকা বসেই বলল, ‘বিষয়টা আমাদের একটু খোলাসা করে বলুন তো! আপনারা কি বাংলাদেশ থেকে আইএসে লোক সাপ্লাইয়ের কাজ করেন?’

‘আপনার তা-ই মনে হচ্ছে?’

‘যা-ই মনে হোক, আপনারা কিন্তু খুব কাজের মানুষ না।’

এমন কড়া গলায় বলা যে আমারই ভয় হলো, মানুষটা না খেপে যায়। খেপল না। হাসতে হাসতে বলল, ‘আমার নাম আব্দেল্লাহ। আপনাদের বাংলায় বলে, আব্দুল্লাহ। বলাশের কাছ থেকে বাংলাও অনেক শিখেছি। তা আপনার কেন মনে হচ্ছে আমরা অযোগ্য, একটু জানতে পারি কি?’

‘জি। আপনারা লোক চিনতে পারছেন না। আমাদের যখন ভুল করে নিজেদের লোক ভাবছেন, তখন এমন হওয়াও অস্বাভাবিক না যে নিজেদের লোকদেরও ভুল করে চিনতে পারলেন না। ধরেন, যদি উল্টা হতো, আমাদের জায়গায় একদল মানুষ সব ছেড়ে আপনাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এখানে এলো এবং এসে আপনাদের খোঁজ পেল না, তখন কী বিপদে পড়ত।’

আব্দেল্লাহ হাসতে হাসতে বলল, ‘নিজেদের দেশের মানুষদেরও আপনি খুব ভালো চেনেন বলে মনে হয় না। এরা এই আমাকে বৈরুতের এক মার্কেটে কিনে আরেক মার্কেটে বেচে দিতে পারবে। যা-ই হোক, কাজের কথায় আসি। আমাদের ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক ভুল তথ্য দিয়েছিল। সেই ভুল তথ্যের কারণেই বিমানবন্দরে আপনাদের হেনস্তা হতে হয়। সেই দুঃখ প্রকাশের জন্য আপনাদের এখানে ডেকেছি।’

‘আপনাদের ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের সঙ্গে বিমানবন্দরের কী সম্পর্ক?’

‘সম্পর্কটা হলো, বাংলাদেশ থেকে এখানে আইএস ঢুকছে বলে আমাদের ওপর কড়া নজর রাখা হয়েছে। এখন আমরা যেহেতু ধরছিলাম আপনারা আমাদের লোক, তখন আমাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ওদের এজেন্ট খবরটা ওদের জানিয়ে দেয়। তাই এই ঝামেলা।’

‘ঠিক আছে, বুঝলাম। ঝামেলা তো মিটে গেল। এবার তাহলে আমরা যাই।’

‘যাবেন, বলেন কী? আরবদের কাছে মেহমান মানে হচ্ছে আল্লাহর দূত। আপনাদের খেদমত না করলে হবে নাকি?’

সঙ্গে সঙ্গেই টেবিলের পাশে এতক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েটারগুলো সক্রিয় হয়। গ্লাস উপচাতে থাকে ফলের রসে। গরম পরোটাজাতীয় কিছু আর কাবাবের গন্ধে সত্যিই পেটে খিদে চাগাড় দেয়।

কাকা কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ই বলাশ ভেতরে ঢুকে আব্দেল্লাহর কানে কী যেন বলে।

আব্দেল্লাহ একটু ভাবে। তারপর নিজের চুল টানে অদ্ভুত ভঙ্গিতে। শেষে ঘোষণা করে, ‘একই দেশের মানুষ এরা। এদের সামনে কথা বলতে তো অসুবিধা নেই। এখানেই ডাকো।’

সঙ্গে সঙ্গেই একজন মধ্যবয়সী বাঙালি লোক কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে ঢোকে ভেতরে। ঢুকেই আব্দেল্লাহর পা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ভাই, আমাকে বাঁচান। আমার সব শেষ।’

আব্দেল্লাহ বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বোঝা যায়, এভাবে পা চেপে ধরা মানুষের কবলে রোজই তাঁকে পড়তে হয়।

বলাশ বলে, ‘ওর ছেলে, এখানকার আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছে। তিন দিন ধরে গায়েব। আজ একটা উড়ো চিঠি এসেছে, সে নাকি সিরিয়ায় আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে যাওয়ার ট্রেনিং নিতে গেছে।’

আব্দেল্লাহ বলল, ‘ঠিক আছে, দেখছি দেখছি।’

মানুষটি তবু পা ছাড়তে চাইছিল না। আব্দেল্লাহ নিষ্ঠুরের মতো পা-টা সরিয়ে নেয়।

মানুষটি তবু মাটিতে পড়ে কাঁদতেই থাকে। বলে, ‘আমার ইবু, সোনার ছেলে! আমি বিশ্বাস করি না ও স্বেচ্ছায় ওখানে যেতে পারে।’

আব্দেল্লাহ ও বলাশ আমাদের খাওয়ানোতে মন দেয়। বলাশ বলে, ‘সব একেবারে খাঁটি জিনিস। ফলের জুস তো সব জায়গায় পাবেন; কিন্তু এখানে একেবারে বাগান থেকে সরাসরি আনা। মনে হবে, বেহেশতি শরবত।’

একদিকে আমাদের বেহেশতি শরবত খাওয়ানোর আয়োজন চলছে, ওদিকে একজন মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদছে। এই মুহূর্তে করণীয় কী, বুঝতে পারি না। 

এই সময়ই আরিফ কাকার মোবাইলে ফোন। ধরেই কাকা বলেন, ‘কিবরিয়া, তুমি কোথায়?’

কিবরিয়ার উত্তর শুনে মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। বলেন, ‘ভেতরে আসবে?’

আবার কিছু শুনেই উঠে পড়েন, ‘আমার বন্ধু চলে এসেছে। আমি উঠব।’

অবাক ব্যাপার, আব্দেল্লাহর যেন আমাদের চলে যাওয়াতে খুব একটা আপত্তি নেই। শুধু বলেন, ‘একটু খেয়ে গেলে পারতেন।’

কাকা বলল, ‘আরেক দিন আসব।’

আব্দেল্লাহ এমনভাবে বললেন, ‘অবশ্যই আসবেন’, যেন সে নিশ্চিত, আমাদের এখানে আসতেই হবে আবার।

 

 

পাঁচ

 

আরিফ কাকা জানতে চাইলেন, ‘তুমি কী করে জানলে আমরা এখানে?’

কিবরিয়া একটু হাসলেন, ‘ভাই, সবাই তো মনে করে, এমবাসিতে কাজ করা মানুষরা শুধু বসে বসে আরামে জীবন কাটায়। কিচ্ছু  করে না। কিচ্ছু পারে না।’

মানতেই হবে, এটা কিবরিয়া সাহেবের একটা কৃতিত্ব। আমাদের হোটেল থেকে ওঠানোর কথা ছিল আটটায়। সেখানে গিয়ে না পেয়ে এই প্রায় অন্ধকূপ থেকে আমাদের  খুঁজে বের করা বাহাদুরি বটে।

কিবরিয়া সাহেব সঙ্গে নিয়ে এসেছেন জাকারিয়া নামে তাঁর এক সহকর্মীকে। সেই মানুষটাকে দেখলে মনে হয়, পৃথিবীতে কথা বলার কোনো দরকারই নেই। সব কিছুই মাথা নেড়ে আর হেসে হেসে চালিয়ে দেওয়া যায়। একটাও কথা বলেন না। শোনেন। হাসেন। মাথা নাড়েন। ব্যস।

কাকা কোনো কিছুতেই খুব উৎসাহ দেখায় না। তার মন যেন অন্যখানে। বুঝতে পারছি, কাকা কিছু একটা মেলানোর চেষ্টা করছে; কিন্তু ঠিক কী, তা বোঝা যাচ্ছে না। জিজ্ঞেসও করতে পারছি না। কিবরিয়া সাহেব নিজের কৃতিত্বের গল্প শুনতে সবাইকে এমন বাধ্য করছেন যে সেখান থেকে সরে যাওয়াটা অভদ্রতা দেখায়।

কিবরিয়া সাহেবের পরনে এখন জিন্সের প্যান্টের সঙ্গে একটা মোটা জ্যাকেট। তাপমাত্রা এখন ৩০ ডিগ্রির মতো, মরুর দেশের ৩০ মানে আমাদের দেশের তুলনায় সেটি ৩০০ হওয়ার কথা। এর মধ্যে জ্যাকেট! মানুষটা শুধু কথায় নয়, কাজেও দেখা যাচ্ছে গাড়ল।

কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে যখন একটা রেস্তোরাঁর দিকে যাচ্ছি, তখন বুঝলাম কিবরিয়াই ঠিক। এমন ঠাণ্ডা বাতাস যে কয়েক গজ হাঁটতেই রীতিমতো কাঁপছিলাম। দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম যেখানে, সেখানে রাতে এত ঠাণ্ডা হয় কী করে!

আমার প্রশ্নটা পরী করল। ‘বাবা, এত ঠাণ্ডা কেন?’

আরিফ কাকা বললেন, ‘এ জন্যই তোমাকে সোয়েটার আনতে বলেছিলাম।’

‘এত ঠাণ্ডা!’

‘মরুভূমির চরিত্রই এই। দিনের বেলায় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, কিন্তু রাতে তাপমাত্রা বদলে যায়। এখানে বাতাসে আর্দ্রতা এবং আকাশে মেঘ না থাকায় সূর্যের তাপ বিনা বাধায়ই পৌঁছে যায়, তাই গরমটা হয় তীব্র। আবার মেঘের আড়াল না থাকায় রাতে তাপটা খুব সহজেই দূর হয়ে যায়। তাই তখন এমন ঠাণ্ডা।’

কিবরিয়া সাহেব আমাদের নিয়ে এসেছেন বৈরুতের খুব নামকরা একটা রেস্তোরাঁয়। গাড়িতে উঠেই বললেন, ‘সারা দিন যে ধকল গেল আপনাদের, একটা রিলাক্স করার জায়গা দরকার। বৈরুত রাতের পার্টির জন্য খুব বিখ্যাত শহর; কিন্তু বাচ্চারা সঙ্গে আছে।’ থেমে একটা অদ্ভুত ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিয়ে বললেন, ‘নাকি যাবেন?’

আরিফ কাকা বললেন, ‘আব্দেল্লাহর ওখানে অনেক খাবার দেখে খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠেছে। ভালো খাবার পাওয়া যায়, এমন জায়গায় চলুন।’

কিবরিয়া বললেন, ‘খাবার তো এখানে রেস্তোরাঁগুলোর বাই-প্রডাক্ট। আসল প্রডাক্ট অন্য। যা-ই হোক, বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া যায় এমন একটা জায়গায়ই যাচ্ছি। ওখানে ম্যাজিক দেখানো হয়, ওরা খুব মজা পাবে।’

সত্যিই ম্যাজিক দেখানো হচ্ছে। কিম্ভূত পোশাকের একটা মানুষ কী কী যেন বলছে আর লোকজন হেসে গড়িয়ে পড়ছে। ভাষা না বুঝলেও তার শারীরিক কসরতও যথেষ্ট আনন্দদায়ক।

একটু পর শুরু হলো ম্যাজিক শো। দারুণ সব ম্যাজিক। বিশেষ করে দর্শকদের মধ্যে একজন মানুষকে ডেকে তাকে পুরো ঘর উড়িয়ে নিয়ে আসা পিলে চমকানোর মতো। এরপর সে ঘোষণা করল, এখানে যেকোনো একজন মানুষের পকেটে একটা এক হাজার লেবানিজ পাউন্ডের নোট পাওয়া যাবে, যার নম্বরের শুরুতে হাতে লেখা থাকবে এবিসি।

সবাই পকেট হাতানো শুরু করল। আর কী আশ্চর্য, সেই পাউন্ডটা কাকার পকেটে।

কাকা উঠল। জাদুকর তাকে ডাকলেন মঞ্চে। কিছু প্রশ্নও করলেন। এখন দেখা গেল, তিনি ইংরেজিও বলেন খুব ভালো।

এসব ক্ষেত্রে কাকা খুব সাবলীল থাকে। কিন্তু কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাল। ওঁর দু-একটা বাঁকা প্রশ্নে কিছু ধোঁকা খেল আর দর্শকরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। বোঝা গেল, এভাবে মানুষকে বোকা বানানোও এই জাদুকরের বোনাস কীর্তি।

জাদুকরের রং চড়ানো পোশাকের সঙ্গে বাহারি চুল। শুধু একটাই সমস্যা। হাসিটা বন্ধ করার সময় খুব সমস্যা হয়। দাঁতটা যেন মুখের ভেতরে থাকতেই চায় না।

তাই দেখে কাকা শিশুদের মতো খুশি। বলল, ‘নকল দাঁত। বুঝলি, নকল দাঁত।’

আমি একটু ধাক্কা খেলাম। অন্য মানুষের শারীরিক সমস্যা নিয়ে তো খুশির কারণ থাকতে পারে না। আর কাকার ক্ষেত্রে তো বিষয়টা পুরোপুরি বেমানান।

কাকা তখনো বলছে, ‘বুঝলি, নকল দাঁত। পুরো পাটিটাই আলাদা।’

কাকার এই কাণ্ড দেখে এবার একটু সন্দেহ হলো। এর মধ্যে কোনো ব্যাপার নেই তো! জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করলাম না। অন্য মানুষ আছে।

ভিড়, তবু খাওয়াদাওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। আরিফ কাকা বললেন, ‘পেটে একটা বাঘ ঢুকে বসে আছে। এই সময় নো এক্সপেরিমেন্ট। তিনি নিলেন ভারতীয় খাবার।’

কাকার পছন্দ লেবানিজ ডিশ। শিশা থাকে বলে কাবাবের মতো একটা জিনিসের সঙ্গে নিল লেবানিজ একটা বিখ্যাত সালাদ। অলিভ অয়েল, লেবু, টমেটো ইত্যাদি দিয়ে বানানো সালাদটা আমিও একটু খেয়ে দেখলাম। দারুণ।

খাওয়া শেষ করে স্মোকিং জোনে কাকাকে একা পাওয়া গেল। আমি একটু খেদ দেখিয়ে বললাম, ‘তুমি অত নার্ভাস হয়ে গেলে তখন?’

‘নার্ভাস হওয়ার মতো অনেক কিছু কি ঘটছে না?’

‘তা ঘটছে, কিন্তু এর চেয়ে কম ঘটনা তো দেখিনি।’

‘তা দেখেছিস, কিন্তু ভাব, কেউ একজন আমার পকেটে একটা নোট ঢুকিয়ে দিয়েছে, আবার একটু পর সেই নোটের ভিত্তিতে আমাকে মঞ্চে ডাকা হচ্ছে; মাথা গুলিয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার না।’

আমি স্তম্ভিত, ‘বলো কী? তোমার পকেটে টাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘তার মানে যে ঢুকিয়েছে সেই মানুুষটার সঙ্গে জাদুকরের যোগাযোগ আছে।’

‘হতেও পারে।’

কথা শেষ না করেই কাকা শেষ না হওয়া সিগারেটটা ফেলে দিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে। তারপর সেটি নিয়ে সরে যায় একটু কোনার দিকে। একটা মানুষ সিগারেট টানছিল উল্টা দিকে মুখ করে। কাকা তার কাছে লাইটার চাইল।

আমি ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়ালাম কাছাকাছি।

কাকা সিগারেট নিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘এই ধন্যবাদটা লাইটারের জন্য শুধু নয়। আরেকটা কারণ আছে।’

মানুষটা একটু যেন বিব্রত। ‘ধন্যবাদটা আমার পকেটে এক হাজার পাউন্ড ভরে দেওয়ার জন্য। তোমার জন্যই মঞ্চে উঠে জাদুকরের সঙ্গে কথা বলতে পারলাম।’

লোকটি হেসে দিয়ে হাত মেলায় কাকার সঙ্গে। বলে, ‘ভালো লাগল তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে। তুমি বুদ্ধিমান মানুষ। এখানে খুব বেশি বুদ্ধিমান লোক আসে না।’

কাকা বলে, ‘মানুষ তো বোকা হতেই জাদু দেখতে আসে।’

‘কিন্তু তুমি বোকা না। এই কাজটা আমি প্রতি শোতেই করি। কেউ ধরতে পারে না। তুমি পেরেছ। তুমি কোন দেশ থেকে এসেছ?’

বাংলাদেশ শুনে কী যেন একটু ভেবে বলল, ‘তোমাদের তো মুসলিম দেশ।’

‘হ্যাঁ। মুসলিমই সংখ্যাগরিষ্ঠ।’

‘হুঁ। সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে থাকার অনেক সুবিধা। আমাদের অনেক কষ্ট।’

‘তুমি কি লেবানিজ না?’

‘লেবানিজ! কিন্তু জানোই তো আমাদের এখানে ধর্মীয় হানাহানি, গোত্রগত লড়াই অনেক বেশি। আমি হচ্ছি খ্রিস্টান, ম্যারোনাইট খ্রিস্টান। একসময় এই দেশে খ্রিস্টান ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। এখন ফিলিস্তিন অভিবাসী থেকে শুরু করে অন্যান্য আরব দেশ থেকে মানুষ এসে মুসলমানরা হয়ে গেছে ৫৫ শতাংশ, আমরা ৪০ শতাংশ।’

‘আমি যত দূর জানি, তোমাদের মানুষের দেশ ত্যাগ করাটাও খ্রিস্টানদের সংখ্যা কমে যাওয়ার একটা কারণ।’

‘ঠিক ধরেছ। সংখ্যালঘু হয়ে থাকতে অনেকের ভালো লাগে না। তা ছাড়া খ্রিস্টান বলে ইউরোপ বা আমেরিকায় ইমিগ্রেশনও সহজ। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলে তো আমাদের বিরাটসংখ্যক মানুষ।’

‘তুমিও কি চলে যাবে? তোমার নামটাও তো জানা হলো না।’

‘আমার নাম ডেভিড।’

ডেভিড আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল; কিন্তু তখন হন্যে হয়ে আমাদের খুঁজতে এসেছেন কিবরিয়া সাহেব। সঙ্গে তাঁর সহকারী জাকারিয়া।

কিবরিয়া সাহেব প্রায় চিৎকারের স্বরে বলেন, ‘আপনি এখানে? আসেন। তাড়াতাড়ি আসেন।’

‘কেন?’

‘জাদুকর ইদ্রিসুর সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করেছি। সাধারণত উনি কথা বলতে চান না; কিন্তু আমি খুব করে বললাম।’ কিবরিয়া সাহেব এ জন্য কৃতিত্ব দেখানোর চেষ্টা করেন।

কাকা বলল, ‘কেন? ওনার সঙ্গে তো আমি দেখা করতে চাচ্ছি না।’

‘আরে চলুন। এই সুযোগ জীবনেও পাবেন না’ বলে কিবরিয়া সাহেব প্রায় টেনে নিয়ে চলেন কাকাকে।

ভিড় এড়িয়ে স্টেজের পেছনে এসে দেখি, সেখানে খুব সুন্দর করে সাজানো একটা ঘর। সেখানে একজন টাক মাথার লোক বসে। তাঁর মুখে আবার মাস্কের মতো কী যেন একটা পরা। পাশে দাঁড়িয়ে আরেকজন জাদুকরের কাপড়চোপড় গোছাচ্ছে। কিন্তু জাদুকর কোথায়?

অবাক করে দিয়ে কিবরিয়া সাহেব টাক মাথার লোকটির পাশে গিয়ে বিগলিত ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন। মানে এই-ই কি জাদুকর। আশ্চর্য সাজ নিয়েছিল তো। চেনাই যাচ্ছে না।

কিবরিয়া সাহেব বললেন, ‘আমার বন্ধু। বাংলাদেশের খুব বিখ্যাত লোক। বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও বড় কোনো রাষ্ট্রীয় সমস্যায় পড়লে তার সঙ্গে নাশতার টেবিলে বসে পরামর্শ করেন।’

কিবরিয়া সাহেব এমন অম্লান বদনে মিথ্যাগুলো বলতে থাকলেন যে পরী ফিক করে হেসে দিল।

কিবরিয়া সাহেব বললেন, ‘এই মেয়ের নাম হচ্ছে পরী। আমাদের দেশে ওর মতো সুন্দরী বালিকা আর নেই।’

আরিফ কাকা এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আর আমি হচ্ছি ওর বাবা। আমার বন্ধু বলবে বাংলাদেশের সেরা বাবা; কিন্তু তুমি সেসব বিশ্বাস কোরো না।’

জাদুকর দাঁতহীন মাড়ি দেখিয়ে আবার হাসলেন। লোকটা পানটান খান নাকি। জিহ্বাটা টকটকে লাল।

কিবরিয়া বললেন, ‘ইদ্রিসু মহাশয় কিন্তু শুধু জাদুকর নন, আরো অনেক গুণ আছে তাঁর। এর মধ্যে একটা হচ্ছে উনি অতীত-বর্তমান বলতে পারেন।’

তারপর কাকার দিকে ফিরে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসিতে প্রস্তাব, ‘তন্ময় সাহেব, পরীক্ষা করতে চান নাকি?’

‘হ্যাঁ। করাব।’

ইদ্রিসু যেন একটু বিরক্ত। বলল, ‘কী সব শুরু করলে তোমরা। বলেছিলে শুধু কথা বলবে।’

কাকা বলল, ‘সেই বাংলাদেশ থেকে এসেছি। খুব ঝামেলায় গেছে প্রথম দিন। আগামী কয়েক দিন কেমন যাবে জানলে ভালো হতো। দুর্ভোগ থাকলে সতর্ক থাকতাম।’

‘দুর্ভোগ তো যথেষ্ট গেছে তোমাদের ওপর দিয়ে। দুইবার ভুল সন্দেহ করে তোমাদের লোকজন ধরে নিয়ে গেছে।’

আমি চমকে গেলাম। ঠিকই বলছে তো।

কাকা বলল, ‘জি। একেবারে ঠিক বলেছেন।’

‘কিন্তু সমস্যা এখনই শেষ হচ্ছে না। কাল দিনেও একটা বড় দুর্ঘটনার খবর শুনবে। মানসিকভাবে শক্ত থাকো।’

আরিফ কাকা একটু ভয় পেয়ে যান। ‘দুর্ঘটনা মানে কি আমাদের কারো?’

‘না, তোমাদের কারো না। এবার যাও।’

কিবরিয়া বিগলিত হয়ে বললেন, ‘জনাব! আমার বন্ধুদের আপনি যে সম্মান দিলেন, সেটি কোনো দিন ভুলব না। আমাদের গরিব এমবাসিতে আশা করি অচিরেই আবার আপনি আসবেন। আপনার পদধূলি পেতে আমরা মুখিয়ে।’

বাইরে বেরিয়ে কাকা কিবরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি বাংলাদেশের বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা।’

কিবরিয়া বলেন, ‘নয়তো কী? আপনি দুনিয়ার প্রায় সব মহাদেশে গিয়েছেন। প্রতিটি কেসে আপনি সফল।’

‘আরিফ ভাই বলেছে?’

‘জি না, জনাব। আপনারা তো ভাবেন, এমবাসির লোক কোনো কাজ করে না। গোয়েন্দা শুনে আমি এমবাসিতে গিয়ে দেশে খোঁজ লাগিয়ে সব ডিটেইল জেনেছি।’

কাকা মাথা নত করার ভঙ্গিতে বলল, ‘মানছি, আপনি আর দশজন এমবাসির লোকের মতো নন। অনেক কাজের।’

কিবরিয়ার গর্বে যেন বুক ফুলে ওঠে। জাকারিয়ার দিকে তাকান। মানে হলো, জাকারিয়া যেন এই কথাটা শুনে রাখে আর জায়গামতো গিয়ে বলে।

কাকার কথা শেষ হয়নি। বলে, ‘তবে আরো কিছু  কাজ করতে হবে আগামী কয়েক দিন। সবার আগে কালকে আপনি একটু একটা মানুষের খোঁজ বের করে দেবেন।’

কিবরিয়া হাসেন। ‘যে মানুষটা আব্দেল্লাহর ঘরে গিয়ে ওর পা চেপে ধরেছিল, সে তো?’

কাকাকে অবাক হতে খুব একটা দেখি না। গোয়েন্দাদের বৈশিষ্ট্যই হলো, সব চমক হজম করে নিজের মতো বিশ্লেষণ করা। কিন্তু এখন কাকার যে মুখটা দেখলাম, একেই বোধ হয় বলে ‘বিস্ময়ে বাক্রুদ্ধ’।

 

 

ছয়

 

পরদিন খুব সকালেই আরিফ কাকা চলে গেলেন তাঁর সেমিনারে। আমরাও বসে থাকলাম না। দেখতে বেরোলাম দিনের বৈরুত। কাকা বলল, ‘অপরিচিত দেশে এসে সবাই পছন্দ করে স্থানীয় একজন গাইডকে সঙ্গে নিতে। কিন্তু আমার মনে হয় সবচেয়ে ভালো হয় নিজেরা ঘুরলে।’

পরী বলল, ‘কিন্তু কাকা, সঙ্গে কেউ থাকলে ভালো না? সব কিছু সম্পর্কে জানা যায়।’

কাকা কিছু বলার আগেই পরীকে মুগ্ধ করার চেষ্টায় একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করালাম, ‘সেটা সুবিধার ব্যাপার; কিন্তু গাইডরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিভাবক সেজে যায়। এটা দেখতে হবে। ওটা জানতে হবে। সব তার পছন্দমতো। অথচ সব ক্ষেত্রে ওর পছন্দ তো আমাদের পছন্দ না-ও হতে পারে।’

কাকা বলে, ‘তোর ভারতের জয়পুরের ঘটনাটা মনে আছে?’

মনে হতেই হাসতে শুরু করলাম। কাজেই পরী পুরো ঘটনাটা জানতে চায়।

ঘটনা অবশ্য বলার মতো। গাইড ভদ্রলোক একটা দুর্গ দেখানোর পর দাবি করল, বাকি দুর্গগুলো আরো অনেক দূরে। যেতে হলে বিস্তর বাড়তি খরচা লাগবে। তা ছাড়া সব এক রকম। আর দেখার দরকার কী।

তার আন্তরিকতামাখা কথাটা মন দিয়ে শুনে কাকা বলল, ‘কিন্তু আমরা খুব ধনী। পয়সা বেশি খরচ হলেও দেখতে চাই।’

গাইডের মুখ কালো হয়ে গেল। কাকা বলল, ‘গাড়ি ডাকেন।’

গাইড গাড়ি ডাকে না। আমরা ততক্ষণে বুঝে গেছি, জায়গাটা নিশ্চয়ই খুব কাছে, গাড়িতে যাওয়ার দূরত্ব নয়। কিন্তু নাছোড় কাকা গাড়ি নেবেই।

মানুষটি ছিল মোটামতো। কোমরে প্যান্ট ঠিকমতো না লাগায় একটু পর পর প্যান্ট টানছে। গোলগাল শরীরের ওপর একই রকম একটা মুখ। সেই মুখটা যে কী রকম লম্বা হয়ে গিয়েছিল, তা মনে করে আবার হাসি পায়।

পরী বলে, ‘তারপর গাড়িতে করে কোথায় গেলে?’

‘যখন গাড়িতে উঠে বললাম, আমরা এই জায়গায় যেতে চাই, তখন গাড়িওয়ালা অবাক। গাইডকে বলল, আপনি ওনাদের বলেননি, ওখানে হেঁটেই যাওয়া যায়।’

গাইড শান্ত গলায় বলে, ‘আমি বলেছি। ওনারা মানেননি।’

আমি স্তম্ভিত। কাকা একটা শিস বাজানোর মতো ভঙ্গি করে ড্রাইভারকে চালাতে বলে। ড্রাইভার সেই জায়গায় নামার পর কাকা বলল, ‘ভাড়াটা দিন।’

গাইড ভাড়াটা দেওয়ার পর কাকা বলে, ‘আপনার মিথ্যাবাদিতায় আমি মুগ্ধ। তবে এই মিথ্যার শাস্তি হিসেবে আজ সারা দিন আমরা যত জায়গায় যাব, সব জায়গার ভাড়া আপনি দেবেন। নইলে আপনাদের অ্যাসোসিয়েশনে ফোন করে দেব। আপনি যা বলেছেন, তার রেকর্ড আমি এই মোবাইলে করে নিয়েছি। আমি শুধু পয়সাওয়ালা না, দুষ্ট লোক।’

গল্পটা মজার, তবে মানুষটার গোল মুখ, পড়ি পড়ি প্যান্ট—এসব না দেখলে অতটা মজা পাওয়ার কথা না। কিন্তু পরী হাসতে হাসতে প্রায় পেটে খিল ধরিয়ে ফেলল। বাড়িতে ফিরে মায়ের কাছে গল্পটা করতে চায় বলে গাইডটার নাম জানতে চাইল। কিন্তু আমার বা কাকার কারোই ওর নামটা মনে নেই।

পরী এবার বলে, ‘বানানো গল্প না তো! এত কিছুর পর নামই মনে নেই।’

পরীকে মুগ্ধ করার মতো আরেকটা জ্ঞানী বক্তব্য চলে এলো মাথায়, ‘শোনো, মানুষের নাম আমরা জেনে রাখি, যাতে তাকে মনে রাখা যায়। কিন্তু যাদের চেহারা-চরিত্র দিয়ে মনে রাখা যায়, ওদের নাম জানার দরকারই মনে হয় না। তাই ওর নামটা জানতে চাইনি।’

কথা বলতে বলতে আমরা মিনিট দশেক হেঁটে ফেলেছি। সাগরপাড়ে হাঁটায় কষ্ট বা ক্লান্তি নেই। হোটেল থেকে শহরের দ্রষ্টব্য জায়গার যে ম্যাপটা নিয়ে বেরিয়েছি, তাতে এই পথে হাঁটলেই দেখতে পাব রাউশি, সাগরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শিলাখণ্ড। রাউশির পাশে দাঁড়িয়ে আমি আর পরী ছবি ওঠালাম বেশ কিছু। কাকা ছবি ওঠায় না। তার মতে, ছবি উঠিয়ে ফেললে জায়গাটার সৌন্দর্যকে একটা ফ্রেমে আটকে ফেলা হয়।

ওটা পর্যটকদের আকর্ষণের জায়গা। এই দুপুরেও বেশ ভিড়। দেখার মতো জায়গার পাশে আমাদের দেশে থাকে চটপটি-চানাচুরওয়ালা, ওসব দেশে থাকে স্থায়ী কিছু  দোকান। যাতে বসা ও দেখার সুবন্দোবস্ত থাকে। তেমনি একটা জায়গায় বসতে গিয়ে কাকা কী যেন দেখে আমাকে বলে, ‘দেখ তো, ওই মানুষটা চিনতে পারছিস কি না?’

একটা কাউবয় হ্যাট পরা মানুষ। এই রোদে হ্যাটের দরকারই নেই। বোঝা গেল, আত্মগোপনের স্বার্থে ওটা ব্যবহৃত হয়।

একে বিশাল হ্যাট, তার ওপর ৩০-৪০ গজ দূরে। ঠিক ঠাহর করা যায় না।

মানুষটি যেন আমাদেরই দেখছে। আমাদের চোখ পড়বে বলে উল্টা দিকে ঘুরে গেল।

আমি বললাম, ‘চিনতে পারছি না তো। কে?’

‘ভাবতে থাক।’

বসার কথা ছিল কিছুক্ষণ, কিন্তু মানুষটা আমাদের অনুসরণ করে কি না সেটি বুঝতেই কাকা উঠে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সি ডাকল। এবারের গন্তব্য বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস। সেটিও বৈরুতের আকর্ষণবিশেষ। একটা সময় শিক্ষার জন্য এই শহরের খুব নাম-ডাক ছিল, কেন্দ্রে ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতি হারিয়ে গেলেও আরব বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে এখনো এক নম্বর। প্রায় দেড় শ বছরের পুরনো ক্যাম্পাসটা দেখতে তাই লোকে ভিড় করে।

কাকা ট্যাক্সিতে উঠে ড্রাইভারের পাশে বসে আমাকে বাংলায় বলল, ‘খেয়াল করে দেখিস তো আমাদের কেউ অনুসরণ করে কি না?’

আমি ও পরী একটু পর পর পালা করে পেছনে ফিরে তাকালাম। ঠিক বুঝতে পারলাম না। একবার মনে হলো, কাকার সন্দেহটা বোধ হয় ভুল।

ভার্সিটি ক্যাম্পাসটা বেশ শান্ত। বাইরে কিছু কিছু  জটলা আছে, তবে আমাদের মতো অত কোলাহল নেই।

কাকা আমাদের ঘুরে দেখতে বলে নিজে গেল ভেতরে। আমাদের যখন নিতে চাইল না, তখন নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। তা ছাড়া পরীর সঙ্গে একান্তে কিছুক্ষণ সময় কাটানো যাবে বলে আমি খুব আগ্রহ দেখালাম না।

কাকা অবশ্য বেশিক্ষণ থাকল না। বেরিয়ে বলল, ‘যা ভেবেছিলাম তা-ই। মানুষটা এখানেও আমাদের পিছু নিয়েছে।’

আমি এদিক-ওদিক তাকাই, কাউকে দেখতে পাই না। মনের মধ্যে একটা পরাজয়বোধ কাজ করে। একটা মানুষ আমাদের অনুসরণ করছে, কাকা দেখতে পাচ্ছে আর আমি ধরতেই পারছি না, লজ্জার বিষয়। পরীর দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছি নাকি!

নিজেই নিজের কাছে খুব লজ্জা পেয়ে ভাবতে শুরু করলাম, মানুষটা কে হতে পারে? হোটেলে ফেরার আগেই জানতে হবে।

আর এই মেলানোতে ব্যস্ত ছিলাম বলে, শহরের মূল বাণিজ্যিক এলাকা সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কিংবা অভিজাত মার্কেট এলাকা হামরা স্ট্রিটে ঘুরে বেড়ানোর সময়ও অন্যমনস্ক হয়ে থাকলাম।

কাকা একটা বইয়ের দোকানে ঢুকে লেবাননের ইতিহাস নিয়ে কয়েকটা বই কিনল। অন্য সময় হলে আমিও বই দেখার চেষ্টা করি। আজ তাকের দিকে তাকালামই না।

রাতে হোটেলরুমে যখন গত দুই দিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করতে বসলাম, তখন সবার আগে কথা বললাম আমি। জানালাম, আজ সারা দিন আমাদের যে ফলো করেছে, সে হচ্ছে প্রথম দিন আমাদের হোটেলে নিয়ে আসা ড্রাইভার টনি।

কাকা একটু যেন অবাক, ‘কী করে ধরলি? তখন তো দেখে চিনতে পারিসনি।’

‘আমি আসলে দেখিনি।’

‘তাহলে জানলে কিভাবে?’ পরী জানতে চায়।

‘কাকা তাকে চিনেছে, যার মানে হচ্ছে আমাদের চেনা মানুষদের কেউ। এর মধ্যে অবশ্যই চিনতে পারতাম যাদের, তারা হচ্ছে কিবরিয়া সাহেব ও জাকারিয়া। কারণ অনেকক্ষণ একসঙ্গে কাটিয়েছি। বলাশ ও আব্দেল্লাহকেও না চেনার কারণ নেই, ওরা ভয় দেখিয়েছিল বলে ওদের চেহারাটাও খুব মনে আছে। এর বাইরে সম্ভাব্য হতে পারে, কালকের জাদুকর এবং কাকার পকেটে টাকা ঢোকানো মানুষটা। জাদুকর হওয়ার কারণ তাকে সবাই চেনে। রাস্তায় নিশ্চয়ই একা বেরোবে না। কাকার পকেটে  টাকা ঢোকানো ডেভিড এবং আমাদের নিয়ে আসা ড্রাইভার টনির মধ্যে টনির সম্ভাবনাটাই বেশি থাকে। কারণ সে ড্রাইভার। কাউকে অনুসরণ করার দায়িত্ব তারই পাওয়ার কথা।’

আমার ব্যাখ্যা শুনে সবাই কাকার দিকে তাকায়। আমার ব্যাখ্যাটা সবার পছন্দ হয়েছে এবং সবাই চায়, ফলটা ঠিক হোক।

কাকা রহস্য ভেঙে বলল, ‘ঠিক হয়েছে। শতভাগ সঠিক।’

আরিফ কাকা হাততালি দিয়ে বললেন, ‘বাহ! শান্তও দেখি পুরো গোয়েন্দা হয়ে উঠেছে।’

আমি তাকাই পরীর দিকে। চেহারায় মুগ্ধতার হাসি। সামান্য হাসি, কিন্তু কী যে শক্তি এর! একটা মেয়ে হাসি দিয়ে একটা ছেলের পুরো দিনকে ভরিয়ে দিতে পারে। আমার কেন যেন মনে হয়, পরী এ রকম একটা হাসি দেবে বলেই আমার মাথা অনেক বেশি কাজ করেছে। আমার বুদ্ধি অনেক বেশি খেলেছে।

কাকা বলল, ‘তার মানে বোঝা যাচ্ছে, আমরা একটা কিছুর মধ্যে আটকে গেছি। আমাদের এখানে ফলো করা হচ্ছে মানে ব্যাপারটার মধ্যে জটিলতা আছে বিস্তর।’

আরিফ কাকা বলল, ‘বিমানবন্দরে জেরা করাও কি এর অংশ?’

‘হ্যাঁ। এখন আমি নিশ্চিত। লেবাননের ইমিগ্রেশন এবং আব্দেল্লাহদের সংঘবদ্ধ চক্র একসঙ্গে একই ভুল করতে পারে না।’

‘কিন্তু আমাদের কাছে চাইছেটা কী?’

কাকা বলে, ‘আরিফ ভাই, কিবরিয়া সাহেব কোথায়? উনি আসবেন কখন?’

‘আমাকে তো বলল ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আসবে।’

‘একটা ব্যাপার কী জানেন, কালকে আব্দেল্লাহর পায়ের কাছে যে একজন লুটিয়ে পড়েছিল...’

‘যার ছেলে আইএসে যোগ দিয়েছে?’

‘ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, সেই ছেলে কালও নাকি ক্লাস করেছে। অথচ মানুষটি বলছিল, তিন দিন ধরে নিখোঁজ।’

‘তাই নাকি? তুমি কী করে জানলে?’

আমি মনে করতে পারি, কেন আমাদের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে কাকা ভেতরে গিয়েছিল।

‘তাহলে মানুষটা মিথ্যা বলতে যাবে কেন?’

আমি বলি, ‘এমনও তো হতে পারে যে বাড়ি থেকে পালিয়েছে তিন দিন আগে; কিন্তু ভার্সিটিতে ক্লাস করছে।’

‘হতে পারে, কিন্তু বাবা নিশ্চয়ই সবার আগে ওখানে খোঁজ করেছে। আর আমাকে যেমন বলে দিল গতকালই ক্লাস করেছে, নিশ্চয়ই বাবাকেও ওরা তা-ই বলেছে। তারপর মানুষটা অত চিন্তিত কেন? আর আব্দেল্লাহই বা কেন আমাদের সামনে ওর সঙ্গে কথা বলতে গেল?’

আরিফ কাকা বললেন, ‘চিন্তার কথা।’

‘হুঁ।’

কাকা কী যেন ভাবছিল, এই সময়ই বেজে উঠল ঘরের ফোন।

আরিফ কাকা বলে, ‘কিবরিয়া এসেছে বোধ হয়।’

আমি গিয়ে ফোনটা ধরতেই নিচ থেকে একজন মানুষের কান্নাভেজা গলার আওয়াজ, ‘আমি কি আরিফ সাহেবকে একটু পেতে পারি।’

আরিফ কাকা গিয়ে ফোনটা ধরলেন। কথা শুনলেন। এবং তারপর বললেন, ‘রুম নম্বর ২১২। চলে আসেন।’

একজন মানুষ আরিফ কাকার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছে এবং কাঁদছে—বিষয়টা ঠিক মেলাতে পারছি না।

আরিফ কাকা কিছু না বলে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকলেন মানুষটির অপেক্ষায়।

 

 

সাত

 

লোকটির নাম আনোয়ার মৃধা। সে ঘরে ঢুকেই কাঁদল কিছুক্ষণ। তারপর কাকাকে আরিফ কাকা ভেবে তার কাছেই পুরো ঘটনা বর্ণনা করতে গেল।

আরিফ কাকা এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলে আনোয়ার ঝাঁপিয়ে তাঁর পায়ে পড়ে বলল, ‘ভাই, আপনি একটা কিছু করুন।’

কাকা আমাকে ইঙ্গিত করলে আমি আনোয়ারকে এক গ্লাস পানি খাওয়ালাম। ঢকঢক করে পুরো পানিটা শেষ করে আনোয়ার আর্তনাদের মতো করে বলে, ‘ভাই, আমার সব শেষ। আমার ছেলেটাই আমার জীবন।’

‘কী হয়েছে আপনার ছেলের?’ কাকার প্রশ্ন।

‘ওকে ওরা আটকে ফেলেছে আইএস বলে।’

‘কারা?’

‘এখানকার পুলিশ। কিন্তু এই আরিফ সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন, উনি তো ওকে দেখেছেন, আমার ছেলে কি ও রকম হতে পারে? আপনার দেখে কি তেমন মনে হয়েছে?’

আমি আর কাকা তাকাই আরিফ কাকার দিকে। সত্যি কি সে রকম কাউকে আটকানো হয়েছিল তাদের সঙ্গে? কই, আরিফ কাকা তো আমাদের বলেননি।

পরী বলল, ‘ও, আসাদ ভাইকে ছাড়েনি?’

‘আসাদ ভাই!’

‘হ্যাঁ। উনি কাঠমাণ্ডু থেকে আমাদের সঙ্গে এসেছিলেন। ওখানে লাউঞ্জে অপেক্ষা করার সময় আমাদের বাংলা কথা বলতে দেখে এগিয়ে আসেন। তারপর দুবাইয়েও আমরা একসঙ্গে ছিলাম।’

আমি বললাম, ‘আমাদের তো বলোনি তার কথা।’

আরিফ কাকা বললেন, ‘আসলে আমাদের বাঙালি তিনজনকেই ওরা নিয়ে গিয়েছিল। পরে আমাদের যখন ছেড়ে দেয়, তখন মনে করেছিলাম, ওকেও নিশ্চয়ই ছেড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্ট বলেই আটকেছিল।’

পরী বলল, ‘তা ছাড়া আসলে আমাদের নিজেদের নিয়ে এত টেনশন হলো, ওদিকে এসেই আবার আরেক দল ধরে নিয়ে গেল—আমার তো মনেই ছিল না।’

আনোয়ার মৃধা বলে, ‘ওর মা কোনোভাবেই আসতে দিতে রাজি হচ্ছিল না। আমি প্রায় জোর করে এনেছিলাম। নিজে আছি ২২ বছর ধরে, ভাবলাম নিজের কাছে রেখে পড়াই। তারপর ইউরোপের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেব। এখানে কিছু দিন থাকলে ইউরোপে যেতে সুবিধা হবে। কী ভাবলাম আর কী হলো! যে ছেলে নিজের হাতে এক গ্লাস পানি ঢেলে খেতে পারেনি, সে আজ জেলে। তা-ও কোন জেলে আছে, সারা দিন খুঁজেও বের করতে পারলাম না।’

আরিফ কাকা বললেন, ‘আমার কাছে আসলে আপনি কী রকম সাহায্য চান? এমবাসিতে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি।’

কাকা কী ভেবে বলল, ‘এখনই না।’

তারপর চেয়ারটা টেনে একটু সামনে এসে বলে, ‘আপনার ছেলে কোথায় পড়ত?’

‘এ বছরই ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে। ভালো ছাত্র। ডাবল জিপিএ ফাইভ।’

‘হুঁ। আপনি এখানে কী করেন?’

‘এসেছিলাম শ্রমিক হিসেবে। এখন নিজের একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়েছি।’

‘আসাদের বন্ধুবান্ধব কেমন ছিল? তাদের কারো সঙ্গে চেনাজানা আছে আপনার?’

‘তা আছে। কিন্তু ওদের কারো সঙ্গে তো আর যোগাযোগ করিনি। হারিয়েছে তো এখান থেকে। দুবাইয়ে প্লেনে ওঠার আগেও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। বিমানবন্দরে নেমেও মেসেজ দিয়েছিল।’

‘ওর পুরো নামটা কী?’

‘আসাদুজ্জামান মৃধা।’

আমার দিকে ফিরে কাকা বলল, ‘ল্যাপটপটা বের করে তোদের ফেসবুক ওপেন কর। দেখ তো ওর কোনো ফেসবুক আইডি আছে কি না।’

আমাদের পছন্দের কাজ বলে আমি আর পরী সঙ্গে সঙ্গেই লেগে গেলাম। আসাদুজ্জামান খুব প্রচলিত নাম, সার্চ করতেই অনেক অনেক আসাদুজ্জামানের প্রফাইল বের হলো। তাদের মধ্যে এই আসাদুজ্জামান আছে কি না বলা মুশকিল, কারণ অনেক আসাদেরই প্রফাইলে ছবি নেই। যাদের আছে তাদের মধ্যে নেই, পরী নিশ্চিত করল।

আমরা এবার ছবিবিহীন বিশাল আসাদ সাম্রাজ্য ঘাঁটতে শুরু করলাম। প্রফাইলে ছবি নেই, কিন্তু ফ্রেন্ডলিস্ট তো আছে। সেটি দেখেই বের করা সম্ভব। ল্যাপটপটা নিয়ে আনোয়ার মৃধার কাছে সেই লিস্টের ছবিগুলো দেখাতে শুরু করলাম। তার সাহায্য লাগল না অবশ্য। তিন বা চার নম্বরে যার নাম এলো, তার অ্যালবামে সবার ওপরের ছবিতেই আনোয়ার মৃধার সঙ্গে সে দাঁড়িয়ে।

আনোয়ার দেখেই কেঁদে উঠলেন, ‘আমার এই ছেলে...এই ছেলে সন্ত্রাসী হতে পারে?’

কিন্তু আমি চমকে উঠলাম। ওর প্রফাইলে যেসব কথা লেখা, আর যেসব পোস্টে সে ট্যাগ করা, তাতে লেবানন পুলিশের ওকে না আটকানোর কারণ নেই।

সর্বশেষ পোস্টে লেখা, ‘সারা জীবনের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। একটা মুসলিম দেশে যাব। মুসলমানদের জন্য লড়াই করব।’

পরী বলল, ‘কিন্তু লেখা তো বাংলায়।’

আমি গর্বভরে বললাম, ‘ট্রান্সলেট করতে কতক্ষণ লাগে?’

কাকাও দেখল। গভীর মনোযোগে পরীক্ষা করল।

আরিফ কাকা বললেন, ‘হায় রে ছেলেপিলে। মা-বাবা জানতেও পারছে না, ইন্টারনেটের চক্করে কত কী হয়ে যাচ্ছে?’

কাকা আনোয়ার মৃধার সঙ্গে কথা শুরু করল আবার, ‘আপনার ফেসবুক আছে?’

‘কী বুক?’

‘ফেসবুক।’

‘ওটা কী জিনিস?’

‘আপনার ছেলের সেটি আছে। আর সেখানে যা লিখেছে, তাতে ওকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।’

‘কোথায় আবার কী লিখল?’

কাকা একটু থামে। থেমে আমার পাশে এসে ফিসফিস করে বলে, ‘আনোয়ার মৃধা সার্চ দিয়ে দেখ তো?’

আমি একটু অবাক। কাকা তাকে সন্দেহ করছে।

হঠাৎ মনে হয়, সন্দেহ তো অযৌক্তিক নয়। বিদেশে যারা থাকে, তাদের কাছে ইন্টারনেট অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস। বিনা পয়সায় ফোনে কথা বলা যায় বলে ন্যূনতম শিক্ষা যাদের আছে, ওরাই ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ—এসব ব্যবহার করে।

আনোয়ার মৃধা সার্চ দেওয়ার আগে আমি আসাদের ফ্রেন্ডলিস্টটা ঘাঁটলাম একটু। আর অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, তাতে আনোয়ারউজ্জামান মৃধার নাম আছে। জন্মদিনে ছেলেকে অভিনন্দনও জানিয়েছে বাবা।

কাকার সঙ্গে চোখে চোখে কথা হলো। কাকা ইঙ্গিতেই নির্দেশ দিল ল্যাপটপ বন্ধ করে দেওয়ার।

কফির অর্ডার দেওয়া হলো। সঙ্গে এলো আরো কিছু  খাবার। আনোয়ার মৃধা ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় বোধ হয় ঠিকমতো খায়ওনি দুই দিন। খাবারগুলো খেতে থাকল পরম আগ্রহে।

কাকা আর আমি নেমে এলাম নিচে।

কাকা বলল, ‘কী বুঝতে পারছিস?’

‘মনে তো হচ্ছে বাপ-ব্যাটা দুজনই জড়িত।’

‘জড়িত কেন মনে হচ্ছে?’

‘আসাদের যেসব পোস্ট দেখলাম।’

‘কিন্তু তাতেই কি প্রমাণিত হয়ে যায় যে সে সিরিয়া যাওয়ার জন্য এখানে এসেছিল?’

‘তা প্রমাণ হয় না।’

কাকা বলল, ‘সন্দেহ হয় অবশ্য। পুলিশ সেটাই করেছে। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি, আমরা যা ৫ মিনিটে জেনে গেলাম, সেটি তো এখানকার পুলিশের জানতে দুই দিন লাগার কথা না। তার পরও আনোয়ার মৃধাকে ধরেনি কেন?’

‘তাই তো?’

‘হুঁ। এটাই ঠিক মিলছে না।’

‘তাহলে আমাদের ধরে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদির সঙ্গে আসাদের ঘটনার একটা যোগসূত্র আছে।’

‘হয়তো।’ কাকা উদাস গলায় বলে।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা রিসেপশনের কাছে চলে এসেছি। কাকা রিসেপশনের মেয়েটির দিকে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, তুমি কি ড্রাইভার টনিকে একটু ডাকবে। ও কাল আমাদের বিমানবন্দর থেকে নিয়ে এসেছিল। আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে, আজও ওকে নিয়ে বেরোতে চাই।’

রিসেপশনিস্ট বলল, ‘অবশ্যই ডেকে দেব। একটু সময় দাও। নামটা কী বললে?’

‘টনি।’

‘টনি! এই নামে তো আমাদের কোনো ড্রাইভার নেই।’

‘হতে পারে, তার ডাকনাম হয়তো টনি। বিদেশিরা কঠিন নামটা উচ্চারণ করতে পারবে না বলে সহজ এই নামটা ওদের কাছে ব্যবহার করে।’

‘তোমরা কোন ফ্লাইটে এসেছিলে?’

‘দুবাই-বৈরুত। কাল দুপুরে।’

‘গাড়িটা কী রকম ছিল?’

‘কালো সিডান কার।’

মহিলাটি কী যেন একটু চেক করে বলে, ‘তোমাদের কাল নিয়ে এসেছিল জামাইলি। হ্যাঁ, হয়তো সে তোমাদের তার নাম বলেছে টনি। ও গ্যারেজেই আছে। ডাকছি।’

কিছুক্ষণ পর যখন জামাইলি গাড়ি নিয়ে হাজির হলো, তখন তাকে দেখে বুঝলাম, টনিও ধোঁকাবাজ। এসেছে অন্য লোক। মাথাভর্তি বিরাট টাক। আবার গোঁফ এত বড় যে মনে হয়, চুলের অভাব ওটা দিয়েই পূরণ করতে চাইছে।

আমার চমককে পাত্তা না দিয়ে কাকা গাড়িতে উঠে ওর পাশে বসেই বলল, ‘কাল দুপুরে তুমি অন্যের কাছে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলে কেন?’

জামাইলি এমন চমকে গেল যে আরেকটু হলে অ্যাকসিডেন্টই হয়ে যাচ্ছিল। কোনো রকম সামলে বলল, ‘কী করব? ওদের কথার ওপর কথা চলে নাকি?’

‘ঠিক আছে। আমি কমপ্লেইন করব না; কিন্তু আমাদের আজ রাতে ওদের আস্তানায় নিয়ে যেতে হবে। ঠিক আছে?’

জামাইলি যন্ত্রের মতো মাথা নাড়ে। কাকা বলে, ‘গাড়ি ঘুরিয়ে হোটেলের সামনে নিয়ে যাও। আর কোনো ডিউটি নেবে না। আমাদের অপেক্ষা করবে। ঠিক আছে?’

কাকা নেমেই লিফটের দিকে রওনা দেয়। আমি বললাম, ‘ও তো ওদের এখনই সব জানিয়ে দেবে।’

‘দিক। তাহলে ওরা আরো তাড়াতাড়ি সামনে আসবে। আমাদের হয়তো যেতে হবে না। নিজেরাই চলে আসবে।’

‘কিন্তু ওদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমরা কি প্রস্তুত?’

কাকা হেসে বলে, ‘সব সময় সব কিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।’

 

 

আট

 

কিবরিয়ার সঙ্গে জাকারিয়াও আছেন। যথারীতি মুখে শব্দ নেই। হাসি আর মাথা নাড়া।

কিবরিয়া রুমে ঢুকেই বললেন, ‘একটু দেরি হয়ে গেল। আপনার কাজেই ছিলাম অবশ্য।’

কাকা বলল, ‘কাজটা হয়েছে?’

কিবরিয়া উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, সেই সময়ই চোখ পড়ল আনোয়ার মৃধার দিকে। অবাক হয়ে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।

কাকার দিকে ফিরে বললেন, ‘আপনি ওনাকে চেনেন?’

‘যদি উনি আনোয়ার মৃধা হয়ে থাকেন, তাহলে চিনি।’

‘মাই গড।’

আরিফ কাকা বললেন, ‘কী কিবরিয়া, হয়েছেটা কী?’

কিবরিয়া বললেন, ‘একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। সেই মানুষটি, মানে হারুন সাহেব মিসিং।’

‘কোন হারুন সাহেব?’

‘মানে যার সঙ্গে আজকে আমাদের দেখা হওয়ার কথা ছিল।’

‘ও, আচ্ছা।’

আরিফ কাকা তবু ঠিক বুঝতে পারেন না। বলেন, ‘কার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল যেন? সব তালগোল পাকিয়ে গেছে।’

কিবরিয়া বললেন, ‘ওই যে কাল আব্দেল্লাহর পায়ে পড়েছিলেন যে ভদ্রলোক। আপনাকে রেখে আমি তাঁর খোঁজে গিয়েছিলাম। শুনতে পেলাম, মানুষটি নাকি কাল রাতে বাড়িই ফেরেনি। ছেলে নিখোঁজ। তারপর বাবা। অদ্ভুত ব্যাপার।’

কাকা একটু ভেবে বলে, ‘আচ্ছা, ওনার ছেলের কেসটা কী? আপনি কত দূর জানেন?’

‘আমাদের এমবাসিতে রিপোর্ট করেছিল। ছেলে নাকি চিঠি লিখে আইএসে যোগ দিতে চলে গেছে। বাবা মিসিং হওয়ার সঙ্গে এর একটা সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। জানেনই তো, এই দেশের পুরো সিস্টেম আইএসের বিরুদ্ধে।’

‘সবাই আইএসের বিরুদ্ধে? মুসলিম দেশ, তবু?’ পরী জানতে চায়।

‘হ্যাঁ। তোমাদের কাকা তো এসব আমার চেয়েও বেশি জানেন। যারা এই দেশটা পেছন থেকে চালায়, সেই হিজবুল্লাহ সিরিয়ার আসাদ সরকারের পক্ষে, যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আইএস ইসলামিক স্টেট তৈরি করেছে। কাজেই এরা কোনোভাবেই চায় না আইএসে কেউ যাক বা আইএসের কেউ অন্য দেশ থেকে এই দেশে ঢুকুক।’

কাকা হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে জানতে চায়, ‘আচ্ছা, বাংলাদেশ থেকে লেবানন দিয়ে কেউ কি আইএসে যোগ দিতে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মানে এখন পর্যন্ত কি কেউ ধরা পড়েছে? আপনাদের এমবাসির ইনফরমেশন কী?’

‘সন্দেহভাজন কয়েকজন ধরা পড়েছে। কিছু জেলেও আছে। কিন্তু কেউ গিয়েছে, এমন নিশ্চিত খবর নেই। কারণটা তো জানেনই। সিরিয়া আমাদের প্রতিবেশী দেশ হলেও সরকার পক্ষে না থাকায় আইএসে যাওয়া খুব কঠিন। তুরস্ক দিয়ে যাওয়া অনেক সহজ বলে বাংলাদেশের যারা যেতে চায়, তারা ওই পথই ধরে।’

আমি এর মধ্যে জাকারিয়াকে দেখি। আজ পর্যন্ত তাঁর গলার স্বর শুনতে পারিনি। এখনো তিনি নানা ভঙ্গিতে কিবরিয়ার কথায় মাথা নেড়ে চলছেন।

কাকা কি আমার মনের কথাটা ধরে ফেলল। বলল, ‘জাকারিয়া সাহেব খুবই স্বল্পভাষী মানুষ মনে হয়।’

জাকারিয়া সাহেব হাসলেন। এই হাসির অর্থ কি কাকার কথায় সমর্থন?

কাকা হঠাৎ বোম ফাটানোর মতো করে বলল, ‘জাকারিয়া সাহেব, এ জন্যই কি আপনারা এখানকার বাংলাদেশি ছেলেদের আইএসে যোগ দিতে সাহায্য করছেন?’

জাকারিয়া সাহেব প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘আপনারা মানে কারা? কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?’

কাকার অভিযোগ শুনে চমকে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেই চমক ছাপিয়ে গেল জাকারিয়া সাহেবের গলার স্বর। কাকের কণ্ঠস্বরকেই সবচেয়ে কর্কশ বলে আমরা মনে করি। জাকারিয়া সাহেব মানুষরূপী কাক। মনে হলো, গলার স্বরটা এ রকম বলেই তিনি হাসি আর মাথা নাড়িয়ে কাজ চালিয়ে যেতে চান।

কাকা হাসতে হাসতে বলল, ‘তবু তো আপনার গলার স্বরটা শোনা গেল। এদের আপনার গলা শুনতে খুব ইচ্ছা হয়েছিল।’

কাকা তাঁকে নিয়ে কী রকম খেলা খেলতে চাচ্ছে, জাকারিয়া সাহেব বুঝতে না পেরে কিবরিয়ার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন।

এই সময়ই আনোয়ার মৃধা আবার কেঁদে ওঠে, ‘আমার আসাদ। আমার আসাদ!’

কাকা ধমক দিয়ে বলল, ‘আপনি চুপ করেন। আপনার আসাদ যে পথে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল, তার তুলনায় ভালোই হয়েছে। গেলে গুলি খেয়ে মরত। এখানে তো অন্তত পুলিশের কাছে আছে। মরছে না।’

আনোয়ার মৃধা বলে, ‘ভাইজান, আপনিও পুলিশের স্বরে কথা বলছেন।’

জাকারিয়া বলেন, ‘এই মানুষটা কে?’

‘আপনি চেনেন না?’

‘না।’

‘তাহলে ইঙ্গিত করে ওকে চুপ করতে বলেছিলেন কেন? আপনারা আসার পর থেকেই সে শান্ত কেন?’

‘আমি...’ জাকারিয়া বিস্মিত।

কিবরিয়া একবার কাকার দিকে, আরেকবার জাকারিয়ার দিকে তাকান। জাকারিয়া একেবারে স্তব্ধ।

কিবরিয়া বললেন, ‘তন্ময় সাহেব, আমাকে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে দিন।’

কাকা বলল, ‘বুঝতে পারবেন কিবরিয়া সাহেব। চলুন আমরা একটু বেরোই।’

‘কোথায়?’

‘আপনার আমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আপনি তো নিতে পারছেন না। কারণ মানুষটি হারিয়ে গেছে। দেখি ওকে খুঁজে পাওয়া যায় কি না।’

‘আপনি হারুনের কথা বলছেন?’

‘জি।’

‘ওকে কোথায় পাবেন?’

‘না পাওয়া গেলে চলুন জাদুকরের কাছে যাই। ভদ্রলোক তো সব জানেন।’

কিবরিয়া সাহেব একটু বিব্রত হয়ে বলেন, ‘তা অবশ্য ঠিক। চলুন গিয়ে দেখি।’

কাকা বলল, ‘একজন জাদুকর সব জানে, অথচ তার কাছে না গিয়ে আনোয়ার মৃধা আমাদের কাছে আসছে। আপনিও মানুষটি হারিয়ে গেছে শোনার পর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। চলুন।’

কিবরিয়া ও জাকারিয়া কী করা উচিত, যেন বুঝতে পারেন না। সত্যি বললে, আমরা কেউই বুঝতে পারছি না।

তবু অনিচ্ছায় কাকার পিছু পিছু রওনা দেন।

আরিফ কাকা আনোয়ার মৃধাকে দেখিয়ে বলেন, ‘এঁকে কী করব? সঙ্গে নেব?’

কাকা আনোয়ার মৃধাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি যাবেন আমাদের সঙ্গে?’

‘ছেলেকে পাব?’

‘বললাম তো, ছেলে নিরাপদে আছে।’

‘তাহলে যাই।’

কাকা কী ভেবে বলে, ‘আচ্ছা, চলুন।’

একটা লিফটে উঠল কাকারা। জায়গা না হওয়ায় আমি, আরিফ কাকা আর পরীকে অপেক্ষা করতে হলো পরের লিফটের জন্য।

পরী বলল, ‘অদ্ভুত ব্যাপার তো! বুঝতে পারছি না কে আসলে কী?’

আরিফ কাকা বললেন, ‘কিছু বোধ হয় মিলছে। ওই আসাদ ছেলেটার কারণেই আমাদের আটকে রাখা হয়েছিল।’

পরী বলে, ‘আমিও তা-ই ভাবছিলাম। আর এ কারণেই ওর সঙ্গী ভেবেই আমাদের বলাশরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল।’

আরিফ কাকা মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘কিন্তু মনে তো হচ্ছে জাকারিয়ারও একটা সম্পৃক্তি আছে। লজ্জার বিষয়, এমবাসির লোক যদি এসবে জড়িত থাকে! আমাদের মান-মর্যাদা কিছু  থাকবে না। দেশে মিডিয়া একেবারে শেষ করে দেবে।’

আমি বললাম, ‘জড়িত যদি সত্যিই থাকে, তাহলে তো ধরা পড়া উচিত। এই দু-একজনে দেশের কত বড় ক্ষতি হচ্ছে। সরকারও এদের ওপর ভরসা করে বিপদে পড়ছে।’

আরিফ কাকা কিছু বলেন না। শুধু ‘হুঁ’জাতীয় একটা শব্দ করেন।

নিচে নেমে দেখি, এক কোনায় কাকাকে নিয়ে কী যেন বোঝানোর চেষ্টা করছেন কিবরিয়া সাহেব।

কাকা শুনছে শুধু। হাসছে মাঝেমধ্যে। বিশেষ কোনো বক্তব্য নেই।

আমি একটু কাছাকাছি যাই। কিবরিয়া সাহেব বিরক্ত ভঙ্গিতে সরে দাঁড়াতে বলেন।

আমি কাকার ইঙ্গিতের অপেক্ষা করছি। কাকা যখন সরতে বলছে না, তখন আমার এখানে দাঁড়ানোর অনুমতি আছে।

কিবরিয়া সাহেব বললেন, ‘আপনি আমাকে দশটা মিনিট সময় দিন। এই আসাদ ছেলেটা আনোয়ার মৃধার ছেলে কি না সেটি বের করে দেব। এমবাসির শক্তিকে তো আপনারা তুচ্ছ মনে করেন। দেখেন, আমি কিভাবে বের করি।’

‘ওকে ইন্টারোগেশন করবেন?’

‘হ্যাঁ। দশ মিনিটও লাগবে না। আমি অলরেডি ইনফরমেশন চেক করতে বলেছি। ওদিকে আমাদের লোক কাজ করছে, এদিকে আমি জেরা করি।’

কাকা একটু ভেবে বলে, ‘ঠিক আছে, দশ মিনিটের বেশি সময় নেবেন না।’

কাকা সরে যেতে চাচ্ছিল। কিবরিয়া সাহেব আটকে বলেন, ‘আপনিও থাকেন। তাহলে সুবিধা হবে।’

কাকা একটু অবাক। আমিও।

এতক্ষণ পর্যন্ত যা দেখেছি, তাতে কিবরিয়া সাহেবেও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, আনোয়ার মৃধাকে একাকী জিজ্ঞেসের সুযোগটা তিনি নিতে চান ওর সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে। কাকাকে রাখতে চান। ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

জাকারিয়াকে দেখলাম। এমন সন্দেহের তীর ওর দিকে যাওয়ার পর বিষণ্ন থাকার কথা। মোবাইল ফোনে কিছু যোগাযোগও করা উচিত। কিন্তু কিচ্ছু করছে না। চুপ করে বসে। মাঝেমধ্যে বিব্রত ভঙ্গিতে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে।

দশ মিনিট সময় পাওয়া গেছে। আমি একটু বের হই। পরীও আসে পেছন পেছন।

বলি, ‘পরী, চলো একটা বাজি ধরি।’

‘কী বাজি?’

‘আসাদ আনোয়ার মৃধার ছেলে কি না?’

‘এটা তো বোঝাই যাচ্ছে, ওর ছেলে না। সে ছেলে সাজিয়ে এদের এ দেশে পাচার করছে।’

‘ঠিক আছে, তুমি তাহলে ওই পক্ষে।’

‘আর তুমি!’

‘বিপক্ষে।’

‘মানে তুমি মনে করছ, সে আনোয়ার মৃধার ছেলে?’

‘হ্যাঁ।’

‘তুমি এই বাজিতে হারবে।’

সত্যি বললে, আমার মনে হচ্ছে না এই বাজিতে আমি হারব। আর হারলেও তো পরীর কাছে হার। ওর জয়ের খুশিটা দেখতে মন্দ লাগবে না।

পরী বিদেশে এলে পরে জিন্স আর টপস। একেবারে ভালো লাগে না। ওকে সবচেয়ে ভালো লাগে সাদা রঙের জামায়।

সব ভালোয় ভালোয় শেষ হলে সাদা রঙের একটা জামা পরিয়ে ভূমধ্য সাগরপারে একটা ছবি ওঠাব।

বাজিতে জিতলে এটাই হবে আমার শর্ত। পরী মানবে নিশ্চয়ই।

 

 

নয়

 

গাড়িতে ওঠার সময় আমি কাকার কাছে যে প্রশ্নটা করলাম, কাকা তাতে একটু অবাক। কোনো তদন্তে কাকা নিজে কোনো ফল জানাতে না চাইলে আমার জানতে চাওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু নিয়ম ভেঙে আমি মরিয়া হয়ে জানতে চাই, ‘আসাদ কি আনোয়ার মৃধার ছেলে?’

কাকা বলল, ‘জানা এত জরুরি দরকার?’

‘হ্যাঁ।’

‘তোর কী ধারণা?’

‘কোনো যুক্তি নেই, তবু মনে হচ্ছে, আসাদই তার ছেলে।’

কাকা রহস্যময় হেসে বলে, ‘কোনো যুক্তি নেই—এই কথাটা কখনো বলবি না। যদি মন কোনো একটা জিনিস বলে, তাহলে বুঝতে হবে, এর পেছনেও যুুক্তি আছে। যুক্তিটা হয়তো আমরা ধরতে পারছি না। ঠিক আছে, তোকে জানাচ্ছি, সে আনোয়ার মৃধার ছেলে। এবার যুক্তিটা বের কর।’

গাড়িতে বসে সেই যুক্তি নিয়ে খুব ভাবতে থাকলাম। একে পরীর সঙ্গে বাজি জিতে ওকে সাগরের পটভূমিতে সাদা পরী সাজানোর স্বপ্ন, তার ওপর যুক্তি বের করার ভাবনা—সব মিলিয়ে এমন মগ্ন হয়ে থাকলাম যে ঠিক খেয়াল হলো না, কখন আমরা জাদুকরের রেস্তোরাঁর সামনে চলে এসেছি।

এমনকি যখন শুনলাম যে আজ জাদুকর ইদ্রিসু আসবেন না, শো বাতিল হয়েছে, তখনো তা নিয়ে খুব চিন্তিত হলাম না। অথচ হওয়া উচিত ছিল। কারণ কাকাকে তাতে খুব একটা চমকিত মনে হচ্ছে না। বরং যেন এটাই হওয়ার কথা—এমন ভঙ্গি।

কিবরিয়া খুবই অবাক। বললেন, ‘এমন তো কখনো হয় না। বৈরুতে আড়াই বছর আছি, কোনো দিন তো এটা শুনিনি। আশ্চর্য ব্যাপার।’

সন্দেহবিদ্ধ জাকারিয়া কথা বলার অধিকার মোটামুটি হারিয়ে ফেলেছেন। তবু খোঁজখবর করার চেষ্টা করলেন খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে। শেষে ফিসফিস করে কী যেন বললেন কিবরিয়াকে।

কিবরিয়া সেটি শুনে কাকাকে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কাকা শুনতেই চাইল না। হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘চলুন।’

‘কোথায়?’

‘চলুন, আব্দেল্লাহর কাছে যাই। ওখানে সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।’

কিবরিয়া বলেন, ‘বলছেন কী? ওকে কোথায় পাবেন?’

‘কেন, ওর আস্তানা তো আমরা চিনি। আপনিও গিয়েছিলেন। আমরা হয়তো রাস্তাটা চিনব না। আপনি চিনিয়ে নেবেন। আর আপনি না চিনলেও জাকারিয়া সাহেব চিনবেন।’

কিবরিয়া বললেন, ‘ভাই, আপনি এদের কাজকর্ম সম্পর্কে জানেন না বলেই এ রকম সহজে কথা বলতে পারছেন। এদের কোনো ঠিকানা নেই। এই পুরো লেবাননই ওদের ঠিকানা। একেক দিন একেক জায়গায়।’

‘আপনি তো ভালোই জানেন দেখছি ওদের সম্পর্কে।’

‘ভাই রে, লেবাননে কোনো এমবাসিতে কাজ করলে প্রথম কাজ হলো হিজবুল্লাহ সম্পর্কে পিএইচডি করা। ওদের নেটওয়ার্ক যে কত বিস্তৃত, এই দেশে ভাবতেই পারবেন না। যে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সারা দুনিয়াকে পানি খাওয়ায়, তারা পর্যন্ত এখানে সুবিধা করতে পারে না। আর প্রতিটি ঘরই ওদের ঘর।’

‘আচ্ছা, ওরা যে হিজবুল্লাহর লোক, সেটাই বা আপনি জানলেন কী করে? ওরা তো আমাদের বলেছে, আইএসের হয়ে লোক রিক্রুট করে।’

কিবরিয়া একটু ধাক্কা খেলেন। কিন্তু সামলেও নিলেন, ‘শোনেন ভাই, এখানে আইএসের হয়ে লোক রিক্রুটের প্রশ্নই আসে না। আইএস এই দেশে ঢুকছে—এই খবর যারা সবার আগে জানবে তারা অবশ্যই হিজবুল্লাহ। তাই আমি ধারণা করে নিচ্ছি, এরা হিজবুল্লাহরই কোনো গ্রুপ।’

‘কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু এরা কী পর্যায়ের হতে পারে বলে আপনার ধারণা? মানে প্রধান নেতা হাসান নাসরাল্লাহ পর্যন্ত এদের যোগাযোগ আছে?’

‘কোনো না কোনো পর্যায়ে তো যোগাযোগ আছে। কেন, আপনি কি তার সঙ্গে দেখা করতে চান নাকি?’

‘দেখা হলে তো মন্দ হতো না।’

কিবরিয়া হাসেন, ‘এরা যে কত ওপরের মানুষ, আপনি ধারণাই করতে পারছেন না। যা-ই হোক, হিজবুল্লাহ সম্পর্কে বলি, আর দশটা সন্ত্রাসী সংগঠনের মতো এরা নয়। শুধু রাজনৈতিক শাখা আছে বলেই বলছি না, ওরা এখানে খুব জনপ্রিয়ও। এখনকার প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি ওদের বিরোধী পক্ষের; কিন্তু সমাজে ওদের প্রভাব এত বেশি যে এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ তাঁর সরকারেরও নেই। মূলত শিয়াদের সংগঠন হলেও সব মহলেই ওদের গ্রহণযোগ্যতা আছে। ওদের সাধারণ মানুষ ভাবে, ইসরায়েলি-মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লেবাননের রক্ষাকারী।’

‘হুঁ, সেটি বুঝতে পারছি। দুজন খ্রিস্টানও দেখছি ওদের হয়েই কাজ করছে।’

‘তাহলে তো বুঝতেই পারছেন...’

‘তাহলে কি এভাবে বসে থাকব? হোটেলে গিয়ে মুড়ি খাব?’

‘তা না। আমাকে একটু সময় দিন। যত ছোট দেশেরই হই, আমরা কূটনীতিক। আমাদের একটা শক্তি আছে। ওদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা সম্ভব। আপনারা তো আরো এক সপ্তাহ আছেন। অসুবিধা হবে না কোনো?’

‘কিন্তু এই আনোয়ার মৃধার ছেলে কোথায় আছে জানা উচিত না?’

‘পুলিশের কাছে আছে। আমি তো আপনাকে বললামই, সে আইএসে যেত, গিয়ে মরত। এর চেয়ে পুলিশে থাকা ভালো না? একটা উদ্যোগ নিলে ছাড়িয়ে আনা সম্ভব।’

আমরা কথা বলছিলাম রেস্তোরাঁর কার পার্কিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে। উত্তেজনায় গলা চড়ে যাচ্ছিল বলে মাঝেমধ্যে মানুষজন মাথা উঁচু করে তাকাচ্ছিল। যদিও বৈরুত একরকম বহুজাতিক শহর, তবু এত বাংলাদেশি মানুষের সমাবেশ এবং শোরগোল বোধ হয় স্বাভাবিক নয়। যে নেটওয়ার্কের কথা শুনছি, তাতে হিজবুল্লাহর কাছে খবরটা চলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কাকা কি সে রকম কিছুর অপেক্ষা করছে! গোলমাল দেখে পুলিশ এসে নিয়ে গেল। সেই সূত্রে ওদের খোঁজ মিলল।

আমি এদিক-ওদিক তাকাই। আর সঙ্গে সঙ্গে দুজন মানুষকে দেখতে পাই। টনি ও ডেভিড। তার মানে কাকা কি অপেক্ষা করছে, ওরা কখন আমাদের ধরে নিয়ে যায়।

কাকা উত্তেজনা দমন করতেই কি না একটা সিগারেট ধরায়। কিবরিয়া সাহেবও কাকার প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নেন।

আমি একটু সরে গিয়ে টনি আর ডেভিডকে দেখতে থাকি। খুব ব্যস্ততা দেখা যায় না ওদের মধ্যে। রাতের বৈরুতে দামি গাড়ি চলছে। দিনে ঘুরে গেছি বলে জানি, এই জায়গাটার নাম হামরা স্ট্রিট। চারদিকে খোলা ক্যাফে, লোকজন পান আর আহার নিয়ে বসে। শিশার বাহারি গন্ধ।

টনি আর ডেভিডের কোনো ব্যস্ততা দেখা যায় না। দূরের একটা ক্যাফের বারান্দায় বসে ওরা বিয়ারে চুমুক দেয়।

কাকা কি ওদের দেখতে পেয়েছে? আমার তো এটা জানানো উচিত।

কাছে গিয়ে কাকাকে ওদের টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করলে কাকা না তাকিয়েই বলল, ‘ওদের কাজ শুধু আমাদের ফলো করা। এর বেশি কিছু  না। হলে সারা দিনে কোনো একবার আক্রমণ করত। খুবই ভদ্র প্রতিপক্ষ।’

আমি বললাম, ‘তাহলে যে তুমি বলছ আব্দেল্লাহর কাছে যাবে?’

কাকা সিগারেট ফেলে বলে, ‘কিবরিয়া সাহেব, চলুন। আপনার তো দু-এক দিন সময় লাগবে। অত সময় লাগবে না। এখনই যাব।’

কাকা গাড়ির কাছাকাছি এসে ড্রাইভারকে বলে, ‘নিয়ে যেতে পারবে?’

ড্রাইভার মাথা নাড়ে।

কাকা উঠে পড়ে গাড়িতে। কিবরিয়া সাহেব বলেন, ‘তন্ময় সাহেব, এটা কিন্তু বাংলাদেশ না। রিস্ক হয়ে যাচ্ছে। হেভি রিস্ক। এমবাসির লোক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, দেশের যেকোনো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’

‘আপনি কি যেতে দেবেন না?’

সরাসরি উত্তর না দিয়ে কিবরিয়া সাহেব বলেন, ‘তা ছাড়া এখানে একজন সরকারি কর্মকর্তা আছেন। আমি রিস্ক নিতে পারি না।’

‘তাহলে কিবরিয়া সাহেব, আপনি থাকুন। ওদের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করুন। আমি যাচ্ছি।’

কিবরিয়া আরিফ কাকার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘স্যার, আপনি কিন্তু যেতে পারবেন না।’

আরিফ কাকা হেসে বলেন, ‘কিবরিয়া, তন্ময়ের ওপর আমার অগাধ আস্থা। সমস্যা হবে না।’

‘তাহলে তো স্যার আমাকে যেতেই হবে।’

অনিচ্ছায় কিবরিয়া সাহেব গাড়িতে ওঠেন। আর আমি খেয়াল করি, টনি আর ডেভিডেরও বিয়ার খাওয়া শেষ হয়েছে। ওরাও গাড়ির দিকে এগোচ্ছে। টনির কানে ফোন। আমাদের ড্রাইভারের কানেও। টনি ফোন ছাড়ে। আমাদের ড্রাইভারও। বুঝলাম, ঠিকানাটা জানা যাচ্ছে।

আজ আমরা এসেছি সম্পূর্ণ অন্য একটা জায়গায়। খুব যে আড়াল আছে এমনও নয়। প্রায় লোকালয়ের মধ্যেই একটা উঁচু ফ্ল্যাট। আর আমাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্যও যেন লোক তৈরি।

আব্দেল্লাহর সঙ্গে আজ দেখা হতে দেরি হলো। আগের দিনের মতো অত খাবারদাবারের আয়োজনও নেই। কেমন যেন স্তব্ধ, গুমোট একটা পরিবেশ।

কিন্তু আব্দেল্লাহ ঢুকতেই পরিবেশ বদলে গেল। সঙ্গে দানবের মতো কয়েকজন মানুষ। মূর্তিদেরও ধাক্কাটাক্কা দিলে নড়ে। মনে হলো না, এই পাহাড়দের নাড়ানোর শক্তি কারো আছে।

এসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অ্যাকশনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই পালানোর পথ, জরুরি সময়ে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি—সবই মানসিকভাবে নেওয়া থাকে। আজ মনে হয়, কিছুতেই কিছু হবে না।

আব্দেল্লাহ হাসতে হাসতে বললেন, ‘বলেছিলাম না, আপনি আবার আসবেন। আবার দেখা হবে।’

কাকা হেসে বলল, ‘দেখা তো মাঝে আরো একবার হয়েছে।’

আব্দেল্লাহ এমন ভড়কে গেলেন যে হা-হা হাসিটা মুছে গেল। আর খেয়াল করলাম, হাসি থামাতে তাঁর খুব সমস্যা হচ্ছে। আরে, এই হাসি থামানোর ভঙ্গিটা তো খুব পরিচিত।

কাকা বলল, ‘আমাদের মাঝখানে একবার দেখা হয়েছে না!’

আব্দেল্লাহ বললেন, ‘আমি যা ভেবেছিলাম, আপনি তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান।’

‘জি। তবে আপনি ম্যাজিক দেখান দারুণ।’

মানে কী! কালকের জাদুকরই আব্দেল্লাহ। হ্যাঁ, তা-ই তো। জাদুকরের পুরো তত্পরতার মধ্যে হাসি থামানোটাতেই যা কিছু ঝামেলা হচ্ছিল। কাকা এ জন্যই নকল দাঁত নকল দাঁত করে চিৎকার করছিল। তারপর আমরা যখন ভেতরে গেলাম, তখন দেখলাম দাঁতহীন মুখ। মুখে মাস্ক পরে থাকায় চেহারা দেখিনি। আচ্ছা, মাথায় তো টাক ছিল। এটা তাহলে পরচুলা!

আরিফ কাকা আর পরীর দিকে তাকাই। বিস্ময়ে চোখ বেরিয়ে আসছে। কিন্তু এর চেয়েও বেশি বিস্ময় কিবরিয়া সাহেবের।

কিছু বলতে গিয়ে তোতলাতে শুরু করলেন। জাকারিয়ার চেহারায় অবশ্য অত ভাবান্তর নেই।

কাকা বলল, ‘কিবরিয়া সাহেব, কালকে আমরা যে এখানে থাকতে পারি, এই খবরটা জাকারিয়া সাহেব আপনাকে দিয়েছিল না?’

‘হ্যাঁ—মানে আমি বলার পর সে তার সোর্স কাজে লাগিয়ে জানায়...। আমি তো বুঝতে পারছি না। জাকারিয়া তুমি...’

কাকা হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘ওই রেস্তোরাঁয় জাদুকরের ওখানে আমাদের নিয়ে যাওয়ার আইডিয়াটা তো আপনার?’

‘তা আমারই। ভাবলাম, আপনাদের একটা ভালো কিছু দেখাই। আপনারা তো বাচ্চাদের নিয়ে আর রাতের পার্টিতে যেতে পারবেন না।’

‘তাহলে তো বোঝা যাচ্ছে, যা করেন আপনারা দুজন মিলিতভাবেই করেন।’

‘তা কাজ একসঙ্গেই করি। কিন্তু আমি তো আর জানতাম না যে...’

‘হুঁ।’

কাকা এবার আব্দেল্লাহর দিকে ফিরে বলে, ‘হারুন সাহেব তো নিরুদ্দেশ।’

আব্দেল্লাহ বলেন, ‘হ্যাঁ, বলাশ আমাকে বলল, ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে পাওয়া যাবে। আমাদের নেটওয়ার্কের বাইরে আর কতক্ষণ থাকতে পারবে।’

‘নেটওয়ার্কের ভেতরেই আছে। জনাব, আপনি যা চেয়েছিলেন, সেটি হয়ে গেছে অথবা হচ্ছে না। কিন্তু আপনার পরিকল্পনা বোধ হয় আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। কাজেই আর আমরা নাটক না করি।’

আব্দেল্লাহ হেসে বলেন, ‘বলুন দেখি, আমাদের কী পরিকল্পনা?’

‘আসলে পরিকল্পনাটা ছিল...শুরু থেকেই বলি। আপনাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আপনারা জেনে যান যে আইএসে যোগ দিতে বাংলাদেশি এক তরুণ এখানে আসছে। সে এখান থেকে সুযোগমতো সিরিয়ায় চলে যাবে। কাজেই তাকে বিমানবন্দরে আটকানোর পরিকল্পনা হয়ে যায়। খেয়াল করে দেখেন, ঠিক একই ফ্লাইটে আরো দুজন বাংলাদেশি আসছে।’

‘আপনার কি ধারণা, তাদেরও আমরা আইএস ভেবেছিলাম?’ বলাশ হাসতে হাসতে বলে, ‘যেখানে একজন সরকারি কর্মকর্তা আছেন বাংলাদেশের?’

‘না, তা ভাবেননি। আসলে তাদের দেখাতে চেয়েছিলেন, আইএসকে কত সহজে আপনারা পাকড়াও করেন এবং তার তুলনায় হিজবুল্লাহর শক্তি কত বেশি।’

বলাশ যেন একটু মিইয়ে যায়।

‘হ্যাঁ। দ্বিতীয় দফা আমাদের এখানে নিয়ে আসা, হারুনকে এনে তাঁর ছেলের কাহিনি—এ সবই আমাদের দেখানোর জন্য।’

‘আপনাদের দেখানোর জন্য এত কিছু  কেন করতে হবে?’

‘করতে হবে, কারণ আমাদের অঞ্চলে আইএসের প্রতি তরুণদের একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আপনারা আইএসকে একেবারে পছন্দ করেন না।’

বলাশ চিৎকার করে বলে, ‘করব কেন? কাপুরুষের দল। নিরীহ মুসলমানদের মারে। আমাদের দেখেন, লড়াই করছি মুসলমানদের শত্রু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। ইসরায়েলকে এখান থেকে তাড়িয়েছি। এখন চোখ তুলে তাকানোর আগে চিন্তা করে।’

‘তা ঠিক। এখানে আপনারা একটা সশস্ত্র সংগঠনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আপনাদের রাজনৈতিক উইং পার্লামেন্টে আছে। তা-ই না শুধু, আপনাদের মিডিয়া, কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক, সমাজসেবার উইং মিলিয়ে মানুষের আস্থা লেবানিজ সরকার বা আর্মির চেয়ে আপনাদের ওপর বেশি। কিন্তু আপনাদের পুরো মনোযোগ হলো এই অঞ্চলের দিকে। কিন্তু আইএস বিস্তার ঘটাচ্ছে দ্রুত। আপনারা জেনেছেন, বাংলাদেশের তরুণরাও এদিকে আগ্রহী হচ্ছে।’

‘কিন্তু আমরা তো আর ওদিকে যেতে চাই না। যদি চাইতাম তাহলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান—ওই সব দেশ থেকেও আমাদের যোদ্ধারা আসত। আমরা তো ন্যায়যুদ্ধ করছি। ইসরায়েল-আমেরিকার পুতুল হয়ে নাচছি না।’

কাকা একটু ভেবে বলে, ‘সেটি অন্য আলোচনা। আপনাদের পুরো শক্তি জোগাচ্ছে ইরান। টাকা, অস্ত্র সবই ওখান থেকে আসে।’

আব্দেল্লাহ বলেন, ‘ইরান তো সত্যিকারের মুসলমানদের দেশ। আমেরিকার সঙ্গে লড়ছে কোন দেশ?’

‘বললাম তো, সেটি অন্য আলোচনা। কিন্তু আমি শুধু ভাবছিলাম, আমাদের এর মধ্যে টানা কেন? তারপর যখন আপনাদের সৈনিক টনিকেও ধরে ফেললাম তখনো, যখন আপনারা কোনো আক্রমণ করলেন না তখন বুঝলাম, আপনাদের আসলে আমাদের ক্ষতি করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। তাহলে উদ্দেশ্যটা কী? ভাবতে শুরু করলাম। ভেবে মনে হলো, আসলে একজন সরকারি কর্মকর্তা, একজন গোয়েন্দা—এদের দিয়ে বাংলাদেশে একটা বার্তা দিতে চান, সেটি হলো আইএস এমন কিছু শক্তি নয়। হিজবুল্লাহর কাছে ওরা নস্যি।’

‘তাই তো। নস্যি। কিছুই না।’ বলাশ বলে।

‘কিন্তু কাকা, উনি জাদুকর সেজে ওখানে কেন?’

কাকা একটু ভেবে বলল, ‘এটা একটা বড় প্রশ্ন। আব্দেল্লাহ সাহেব, এটা আমার ধারণা, ভুল হলে শুদ্ধ করে দেবেন। এই একটা সময় মানুষের সঙ্গে উনি মেশেন। মানুষকে দেখেন, তাদের মনোভাব বুঝতে চেষ্টা করেন। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা হলে ওখানেই ডেকে কথা বলেন। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ওনাকে হয়তো সে রকমই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

আব্দেল্লাহ বলেন, ‘আপনি বুদ্ধিমান।’

‘টনি-ডেভিড!’

‘এদের খ্রিস্টান সাজিয়ে আমাদের এটাও বোঝানো যে হিজবুল্লার প্রতি সব ধর্মের মানুষের আস্থা আছে।’

‘আপনারও কি সেটা মনে হচ্ছে না?’

‘এটা আসলে আমার বিষয় না। তাই খুব চিন্তা করে দেখিনি। আমি যেটা নিয়ে চিন্তায় পড়েছি বা আমাদের চিন্তার বিষয়, বাংলাদেশের সরকারি মানুষের এতে সংযুক্ত হয়ে যাওয়া। তাই না, কিবরিয়া সাহেব?’

কিবরিয়া বলেন, ‘ভাই, কী বলছেন? আমাকে টানছেন কেন?’

‘কিবরিয়া সাহেব, এর মধ্যে এমন কোনো ঘটনা নেই, যেটা আপনি জানতেন না।’

‘জানতাম; কিন্তু মনে হচ্ছিল আপনি যেহেতু ব্যাপারটার সুরাহা নিজে নিজেই করতে চান, দেখি কতটুকু পারেন?’

‘হুঁ। আনোয়ার মৃধাকেও আমাদের কাছে আপনিই পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু সেটা আমাদের বলেননি।’

‘প্রমাণ?’

‘আপনার আর জাকারিয়ার একটা কথোপকথন শোনাব। যেটা আপনাদের আরিফ স্যার রেকর্ড করেছে।’

আরিফ কাকা!

আরিফ কাকা হেসে বলেন, ‘সেমিনারে একটা ফোন পেয়ে কিবরিয়া বেরিয়ে যায়। আমারও এসব লম্বা বক্তৃতা খুব বোরিং লাগছিল বলে আমিও বের হই। বেরিয়ে শুনি, ফিসফিস করে ওরা একটা পরিকল্পনা করছে। কথাগুলো শুনে মনে হলো, এই আলোচনাটা তন্ময়ের কাজে আসতে পারে। তাই রেকর্ড করে নিলাম। শোনাব? যেখানে তোমরা আনোয়ার মৃধাকে পরামর্শ দিচ্ছ আমাদের হোটেলে যেতে, আমরা তার ছেলের খোঁজটা বের করে দিতে পারি। অথচ হোটেলে গিয়ে তাকে চিনলই না।’

কিবরিয়া সাহেবের মুখটা এখন হয়েছে দেখার মতো।

আমি রসিকতা করে বললাম, ‘এমবাসির শক্তি!’

কিবরিয়া বললেন, ‘না, মানে ভাবছিলাম, দেখি আপনি কিভাবে বিষয়টার সমাধান করেন। আনোয়ার মৃধা তো এর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ। তার জন্যই তো অত কিছু  হচ্ছিল।’

‘আনোয়ার মৃধাকে গ্রেপ্তার করা এখানকার পুলিশ বা আপনাদের জন্য ছিল পাঁচ মিনিটের ব্যাপার। তবু সে কেন গ্রেপ্তার হলো না? আর এখানেই বুঝতে পারলাম, আসলে নিজেদের শক্তিটা আমাদের বোঝানোর জন্য ওকেও আমাদের সঙ্গে ভিড়িয়ে দিয়েছেন। আমরা দেখব, জানব—আইএসে যোগ দিতে গিয়ে একটা ছেলে আটকা পড়েছে। ছেলে হারানোর কষ্টে একজন বাংলাদেশি বাবা কাঁদছে, কিন্তু কোনো কূল পাচ্ছে না। বিষয়টা আমাদের মনে স্থায়ী করার জন্যই ওকে বাইরে রাখা। আমাদের কাছে ভিড়িয়ে দেওয়া। আর তখনই বুঝতে পারি, উদ্দেশ্য আসলে ওটাই। আর কিছু না। সবই ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের দূতাবাস যুক্ত না হলেই ভালো হতো।’

কিবরিয়া সাহেব চিৎকার করে বললেন, ‘জাকারিয়া, তখনই বলেছিলাম ওদের নিয়ে এত না খেলি। তুমি তো আমার কথা শুনলে না।’

জাকারিয়া কর্কশ গলায় বলেন, ‘সেটি আবার আপনি কখন বললেন? আপনিই তো বরং বললেন, এতে আমাদের লাভ হবে।’

দুজনের ঝগড়া দেখে মনটা খারাপ হয়। বিদেশে বাংলাদেশের সম্মান ধরে রাখার দায়িত্ব এঁদের, অথচ এঁরা কিনা...

পরী বলে, ‘বাবা, তুমি না বলো সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে খামাখাই অপপ্রচার চলে...’

কাকা বলে, ‘পরীর মনটা বেশি খারাপ হয়ে গেল?’

‘হ্যাঁ, কাকা।’

কাকা বলল, ‘অত মন খারাপ কোরো না। ওনারা একটা মিশন নিয়ে আগাচ্ছেন।’

‘তাই নাকি?’ আমারও ঠিক ওদের অপরাধী মনে করতে মন চাচ্ছিল না।

কাকা হেসে বলে, ‘কিবরিয়া সাহেব, আমি খুশি হয়েছি। এতটা বিব্রত হয়েও যে আপনি নিজেকে আটকে রেখেছিলেন।’

আরিফ কাকা বলেন, ‘হ্যাঁ। আমিও ওদের এই কাণ্ড দেখে হতবাক হয়ে যাই। দেশে একটু খোঁজ লাগাই। দেখতে পাই, দুজনের ক্যারিয়ারই দারুণ ব্রাইট। দক্ষতায়, স্বচ্ছতায়, সততায় ওরা অনেক এগিয়ে। তারপর বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দেখলাম, জাকারিয়া কয়েক বছর ধরেই এ রকম সমস্যাগ্রস্ত মুসলিম দেশগুলোতে কাজ করছে। এখান দিয়ে যে আইএসে কেউ যোগ দিতে পারছে না, তার পেছনেও মূল কৃতিত্ব তার। আর সেটি নিশ্চিত করতেই সে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে। সেই হিজবুল্লাহ যখন চাইল আমাদের মাধ্যমে ওদের শক্তির একটা বার্তা দিতে, তখন জাকারিয়ার না করার কিছু ছিল না। কারণ ওদের কারণেই তার কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশি ছেলেরা আইএসে যেতে পারছে না। অনেককে সে দেশে পরিবারের কাছে ফিরিয়েও দিয়েছে।’

কাকা যোগ করে, ‘এবং কিবরিয়া সাহেব তাকে পুরো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে। সরকারি সংস্থায় আমার কিছু যোগাযোগ আছে। তাদের ব্যাপারটা ইনফর্ম করার পর ওদের কাজের ধরন সম্পর্কে জানা গেল।’

পরী খুব খুশি। বলে, ‘আংকেলকে আমার এত পছন্দ হয়েছিল যে উনি খারাপ মানুষ জানলে বড় কষ্ট পেতাম।’

কিবরিয়া বা জাকারিয়ারও অনেক খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু ঠিক বোঝা গেল না। দুজনের মুখে একটু যেন বিষণ্নতা।

পরী বলল, ‘আংকেলরা একটু হাসুন। একটা সেলফি তুলি।’

কিবরিয়া বললেন, ‘একটা মিশন গোপনে চালাচ্ছিলাম। নিজেদের আড়াল রাখাই ছিল আমাদের দক্ষতা। ধরা পড়ে গেলাম। পরীক্ষায় ফেল করে কি কেউ খুশি হয়?’

তারপর কাকার দিকে ফিরে বলেন, ‘তন্ময় সাহেব, আমি আপনাকে একটু আন্ডারএস্টিমেট করেছিলাম। ভাবিনি অত দূর পর্যন্ত আপনি আসতে পারবেন।’

আমি বললাম, ‘এমবাসির শক্তি তাহলে ফেল।’

কিবরিয়া সাহেব মাথা নাড়েন।

আর আমরা হাসি। সেই হাসিতে একসময় তাঁরাও শরিক হন। বড় সুন্দর সেই দৃশ্য।

একটা সেলফি তুলতে হয়।

তুলতে গিয়ে খেয়াল করলাম, পেছনে একটা অপরিচিত ছেলেও বেরিয়ে এসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বিধ্বস্ত চেহারা, তবু চেহারায় আনন্দের ঝিলিক।

পরী অতটা চমকাল না। বলল, ‘আসাদ। আসাদ ভাই।’

এর মধ্যেও মনটা খারাপ হয়ে যায়। কী সুন্দর নিষ্পাপ চেহারা। অথচ কী বিভ্রান্ত। এত সুন্দর জীবন, কত কিছু  দেখার—তবু সেই জীবন এরা বিলিয়ে দিতে চাইছে ভ্রান্ত বিশ্বাসে।

আব্দেল্লাহ বললেন, ‘তন্ময় সাহেব বুদ্ধিমান মানুষ। তাই উপহার হিসেবে ওকে আপনাদের জিম্মায় দিয়ে দিচ্ছি। তবে শর্ত আছে একটা। এর মাথা থেকে আইএসের ভূত তাড়াতে হবে। আপনাদের হাতে এক সপ্তাহ সময়। পারবেন?’

কাকা আমার দিকে তাকায়। আমি তাকাই পরীর দিকে।

তারপর দুজনই বলি, ‘পারব। পারতেই হবে।’

কাকা বলে, ‘চ্যালেঞ্জ তাহলে নেব?’

অবশ্যই। এই চ্যালেঞ্জে আমাদের জিততেই হবে।

পৃথিবীর সুন্দরের রূপ দেখিয়ে ওকে আমরা জীবনে ফেরাব। ও শুদ্ধ হয়ে ফেরাবে ওর মতো আরো অনেক বিভ্রান্তকে।

জীবনের শক্তি দিয়েই দূর করতে হবে জীবন দেওয়ার এই ভ্রান্তিবিলাস।


মন্তব্য