kalerkantho

গল্প

শীতলদা

সানজিদা সামরিন

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



শীতলদা

অঙ্কন : হাসিব কামাল

বাবার শখের লাইব্রেরি দেখে দেখে বড় হওয়া। বাড়ির নিচের তলার অর্ধেকটাই দখল করে রয়েছে বইয়ের ভারী শেলফগুলো। আমার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কৈশোর থেকে যৌবনে পা রেখেছে ঘরোয়া এ বইশালা। লাইব্রেরির নকশা গেছে পাল্টে। দেয়ালের রং হয়েছে উজ্জ্বল। বাতিগুলোয় এসেছে আধুনিকতা। পুরনো চেয়ারগুলো সরিয়ে মাটিতে কার্পেট বিছানো হয়েছে। বছর কয়েক ধরেই বাবা একটা লাইব্রেরি তৈরির কথা ভাবছেন; যেখানে শুধু ঘরোয়া পড়ুয়াই নয়, পড়তে আসবে বহিরাগতরাও। তাঁর বন্ধুমহলও বেশ উৎসাহী এ ব্যাপারে; যদিও ওই অর্থে পরিচিতি বা লোকের আনাগোনা হওয়া একটু কঠিন এ এলাকায়। তার পরও বাবার বন্ধু, মায়ের বন্ধু আর মহল্লার পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা আসবে-যাবে, পড়বে-লিখবে আর সঙ্গে সুলভ মূল্যে এলাচ চা খাবে, ব্যাপারটা ভেবে বাবা নিজেই স্বপ্নে ভাসেন। আমিও মুগ্ধ ওই এলাচ চায়ের ব্যাপারে! ঘন লিকারের দুধ চায়ে এলাচ ভেঙে দেওয়া!

বাবার নিজের পাতা পাতা অনুবাদের খাতা রয়েছে অনেক। তাঁর উত্তরাধিকার বলেই হয়তো আমার মতো অকর্মা কন্যাটিও অনুবাদের কাজে নিজের ন্যূনতম গুণে শাণ দিচ্ছে। টুকিটাকি ম্যাগাজিনে লেখা ছাপিয়েও গর্বিত করেছি পিতৃদেবকে। শেষমেশ বাবার স্বপ্ন আমার অনুবাদে বই বের করা। আমি খুশি, হতবাক, অবাক কোনোটাই নই। তবে নিজ ভাষাশিক্ষার সর্বোচ্চ সাধনা দিয়ে বেশ কয়েকটি বিদেশি লোককাহিনি অনুবাদ করে তুলে দিয়েছি বাবার হাতে। পাঠাগারের কাজ এগোচ্ছে। বাড়ির নিচের তলা এবার পুরোটাই যাবে বইয়ের দখলে। বাবার যোগাযোগ অনেক। এর মধ্যেই জানা গেল, চিলেকোঠার একটি ঘরকে মিটিং রুম বানানো হবে। পাঠাগারের মূল দয়িত্বে বাবার কাছের কিছু ব্যক্তি কাজ করবেন। রোজ বাবা বাড়ি থেকে বের হলে আমি ভবিষ্যৎ মিটিং রুমে যাই। ওখানে ওভাল শেপের একটা বড় টেবিল বসানো হয়েছে। আমি যাই, একা একা হেঁটে বেড়াই। কখনো ছবি আঁকি, কফি খাই, বই পড়ি। এমনই একদিন সেখানে বই পড়ছিলাম। বুঝলাম, বাবা চাবি দিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করছেন। ভেতর থেকে দরজা খুললাম। বাবা একা নন, সঙ্গে এক নতুন মুখ।  বাবা বললেন—বিভাবরী, ও হচ্ছে শীতল। তোমার অনূদিত গল্পগুলো ও-ই সম্পাদনা করছে। কোনো কার্পণ্য না করে হেসে বললাম, কেমন আছেন? সতেজ হাসি হেসে শীতলবাবু বললেন, এই তো ভালো! আপনি? জি, ভালো।

বাবা শীতলবাবুকে নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। আমি নিচে মায়ের কাছে এলাম। চা নিয়ে অবশ্য আমাকেই উঠে আসতে হলো। বৈঠক চলছে। আমি, বাবা, শীতল রায় চৌধুরী বসে। বাবা আপনমনে কথা বলছেন। তাঁর কাছে মানুষের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কেমন সম্মোহন শক্তি রয়েছে তাঁর।

শীতলদাকে আজই প্রথম দেখলাম। নামও শুনিনি এর আগে। পরিচয় পর্বে জানা গেল, তিনি বাবার স্কুলে নতুন বাংলা শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। বাংলা ব্যাপারটা তাঁর সঙ্গে যায়। খুব কালো চুলগুলো কোঁকড়া, তবে মসৃণ। ধবধবে ফরসা, মুখে হালকা চাপ দাড়ি-গোঁফ।  নীল ফুল স্লিভ গেঞ্জিতে শীতলদার সাদাটে ভাব আরো বেড়ে গেছে। বাবা শীতলদাকে বললেন, বিভাবরী লেখে ভালোই। চর্চা দরকার। কিন্তু ও কিছুই করে না। লেখার ব্যাপারে যেটুকু আগ্রহ, তা ডায়েরি লেখায়। আমি তো ওকে বলি মূল জায়গাটা তৈরি হওয়া দরকার।

শীতলদা আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। বললেন, ডায়েরি লেখা তো ভালো। বহুবার উদ্যোগ নিয়েও ধরে রাখতে পারিনি। লেখার হাতটা অনেক সময় এসব জায়গা থেকেও তৈরি হয়। নিজ মনে খোলাখুলি লিখতে লিখতে। বাবার নানা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, আমার আসছে জন্মদিনের পর পরই আমার অনূদিত বইটি প্রকাশ পেতে পারে। এসবের খোঁজখবর নিই না আমি।

শীতলদা আর লাইব্রেরির সঙ্গে সম্পৃক্ত বাবার কাছের লোকরা আসেন বাড়িতে। কত রকম মিটিং চলে। আমি কখনো থাকি, কখনো থাকি না। তবে এখানে যাঁরাই আসেন সবার চেয়ে শীতলদাকে আমার সহজ মনে হতে লাগল। ধীরে ধীরে লাইব্রেরিতে এলাকার পড়ুয়ারা আসতে শুরু করল। পাঠচক্রও ভালোই চলতে লাগল। লাইব্রেরি সামলানোর দায়িত্বে আপাতত শীতলদা একাই আছেন। অন্য যাঁরা আছেন, তাঁরা রোজ এখানে বসেন না। সপ্তাহে দু-একবার আসেন। শীতলদার সঙ্গে অকথিত একটা মানসিক যোগাযোগ তৈরি হচ্ছিল বোধ হয়। তিনি রোজই আমাকে কিছু না কিছু লিখতে দেন। লাইব্রেরিতে বসে যখন লিখি, তিনি এসে পেছনে দাঁড়ান, দু-একটা ইনস্ট্রাকশন দেন। স্মিত হেসে ফিরে যান নিজের জায়গায়। মোট কথা রোজই শীতলদার চোখে আমায় চোখ রাখতে হয়।

আমার গ্র্যাজুয়েশনের পাঠ চুকে গেছে। এখন দিব্যি সময় হাতে। ধীরগতিতে হলেও লাইব্রেরিটা সম্প্রসারিত হচ্ছে। লোকজন আসছেন। ফোন দিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। নতুনরা জানতে চাইছেন। এলাচ চায়ের গন্ধ বাড়ছে। নিচে ব্যস্ততা বাড়ছে। বাড়ছে পায়ের শব্দ। ধীরে ধীরে লাইব্রেরিতে আমার গতিবিধিও বাড়ছে। শীতলদা স্কুলে চাকরি ও লাইব্রেরি দুটিই সামলান বিধায় রোজ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আসেন। সপ্তাহে মঙ্গলবার তাঁর ছুটি। বাকি ছয় দিনের তিন দিন দুপুরে ও তিন দিন সকালে আসেন। প্রথম প্রথম তাঁর আনাগোনা নিয়ে তেমন একটা মাথাব্যথা ছিল না আমার। লেখা তাঁর হাতে পৌঁছে দিতাম সেভাবেই, যখন তাঁকে তাঁর টেবিলে দেখতাম। কিন্তু একটা সময় ঠোঁটস্থ হয়ে গেল কখন তিনি আছেন আর কখন নেই। শীতলদার সঙ্গে কাজ ছাড়া কথা তেমন হয়নি শুরুতে। যখন তাঁকে টেবিলে না পেতাম, তখন লেখা রেখে একটা চিরকুট দিয়ে যেতাম, যাতে লেখা ছুড়ে ফেলে গেছি, তা মনে না করেন।

কোনো এক মঙ্গলবার সকালে বিছানায় গড়াগড়ি করছি। ঘুম ভেঙেছে। আজ শীতলদার ছুটি। তাই লেখা জমা দেওয়ার বিষয়ও নেই। এর মধ্যে সোনালিদি চা নিয়ে এলো। সঙ্গে তারাশঙ্করের ‘সপ্তপদী’ বইটা। হাতে দিয়ে বলল, শীতল দাদাবাবু দিতে বললেন।

শীতলদা এসেছেন আজ! ওনার তো ছুটি! বইটা আমার পড়া। শীতলদা আমায় পড়তে দিলেন হয়তো। খুলতেই হলদে এক টুকরো কাগজ বের হয়ে এলো। লেখা—‘আমি এক সপ্তাহের জন্য থাকব না। কলকাতা যাওয়ার আগে আজই শেষ এখানে। তুমি বিকেলের আগে এসে লেখাটা দিয়ে গেলেই চলবে। দেখে দেব। ধীরেসুস্থে আরাম করে এসো। শুভ সকাল।’

আমি দ্রুত মুখ ধুয়ে চুল বেঁধে লাইব্রেরিতে গেলাম। সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল খুব। সকালটা ধুয়ে দিয়েছিল বর্ষার শেষ দিকের বৃষ্টি। লাইব্রেরির পেছনের বারান্দার প্রাচীর অনেকখানি তোলা। একটা বেতের রকিং চেয়ার আর একটা ছোট্ট কর্নার টেবিল ছাড়া কিছুই নেই ওখানে। বাবা মাঝেমধ্যে বসে মসলাদার পান খান। বারান্দার দরজা থেকে দেখা গেল, রকিং চেয়ারে কেউ বসে। মাথার দিকটা দেখা যাচ্ছে না। শুধু চেয়ারের নিচ থেকে মেঝেতে পড়ে থাকা শুভ্র একজোড়া পা আর সাদা ধুতির কুঁচি দৃশ্যমান। দরজার কাছাকাছি গিয়ে দেখা গেল, রাতের অগোছালো বনের মতো একরাশ কালো চুল। ডান হাতটা নেতিয়ে পড়ে আছে। এতটা দেখেও উল্টো ফিরে এলাম। শীতলদা কি ঘুমিয়ে পড়েছেন?

আমি লাইব্রেরিতে বসে আফ্রিকান লোককাহিনির শেষ গল্পটা অনুবাদ করতে বসলাম। এ লেখাটাই দিতে হবে শীতলদাকে। এক কোণের টেবিলে বসে কাজটা করছিলাম। কিছুক্ষণ পর চোখ পড়তেই দেখলাম শীতলদা নিজের টেবিলে ফিরেছেন। ব্যস্ত। একগাদা কাগজের স্তূপের ভেতর বসে রয়েছেন। মাঝেমধ্যে দু-একজন এখান থেকে ওখানে যাচ্ছে। বই নিচ্ছে। নেড়েচেড়ে দেখছে, আবার চলে যাচ্ছে। হঠাৎ ঝনঝন করে কী যেন ভাঙল! কেন যেন গলা উঁচিয়ে শীতলদার টেবিলের দিকে তাকালাম। তিনিও দেখি গলা উঁচিয়ে আমার টেবিলে তাকিয়েছেন! ব্যাপারটা একই সঙ্গে ঘটল! তিনি এদিকে তাকালেন কেন বুঝলাম না। উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ারটা সরিয়ে নিলেন। বুঝলাম, ওখানেই ভেঙেছে কিছু। যাব কি যাব না করেও ওদিকে গেলাম। দেখি, পা দিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা গুবলেটের টুকরোগুলো একপাশে সরাচ্ছেন। ব্যস্ত হয়ে বললাম, শীতলদা, আপনি রাখুন। আমি সোনালি দিদিকে ডেকে দিচ্ছি। আপনি রাখুন...। তিনি বললেন, না, ঠিক আছে।

কথা কানে না তুলে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলাম। ‘সোনালিদি সোনালিদি, এখনই লাইব্রেরিতে এসো। একটা গ্লাস ভেঙেছে। শীতলদার টেবিলে।’ এ কথা বলে ঠিক অতটাই দ্রুত পায়ে নেমে এলাম, ঠিক যতটা দ্রুত ওপরে উঠেছি। এসে শীতলদাকে বললাম, সোনালিদি এসে পরিষ্কার করে দেবে। শীতলদা ততক্ষণে ভাঙা কাচগুলো ঠেলে সরিয়ে চেয়ারে বসেছেন। ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসলাম। বুক ধড়ফড় করছে খুব...। কেন জানি না। গুবলেট ভেঙে যাওয়ায় তিনি ব্যথা পাননি। কী হয়েছে? কিছুই হয়নি। শুধু একটুখানি ঝনঝন শব্দ আমায় খণ্ড খণ্ড করে দিল! ইচ্ছা হচ্ছিল, ভাঙা কাচের টুকরোগুলো দিয়ে স্নান করে নিই...।

একটানা কাজ সেরে ঠিক ৪টায় শীতলদার টেবিলে লেখা জমা দিলাম। তাঁকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছে। শুকনো মুখেই বললাম কবে ফিরবেন।

এক সপ্তাহ আমার আর কোনো কাজ নেই। লেখা নেই। তবে লাইব্রেরি কেন যেন আর টানল না আমায়। দিনে দু-একবার গিয়ে ঢুঁ মারা।

বাবার লাইব্রেরিতে পড়ুয়া বেশ ভালোই জমল। কম বয়সী, মাঝবয়সী আর খুব বয়সী লোকও আসতেন। এই মাঝবয়সী ও খুব বয়সীদের মধ্যবর্তী শ্রেণির কিছু লোক আসতেন, যাঁরা উপদেষ্টা গোছের। ও বয়সটাই অমন! কারণে-অকারণে জ্ঞান দিতে মন চায়! পরম কাকুও অমনই একজন। একবার অবশ্য আমায় ভুলে বলে ফেলেছিলেন বিভা, তোর চুলগুলো তো ভারি বেড়েছে!

কী যে অবাক হয়েছিলাম সেদিন, তা আর বলতে...! পরম কাকুকে এখানে পড়তে আসা বিশেষ কারোরই পছন্দ নয়। লাইব্রেরিতে এলাচ চা ছিল প্রথম দিককার চমক। এর পরে এলো আরেক চমক। তা হলো, সবাই স্বরচিত ছোট গল্প/কবিতা লিখে জমা দেবে। সেখান থেকে বাছাই করে ওয়ালবোর্ডে টাঙিয়ে দেওয়া হবে। থাকবে অনেক দিন। এ উদ্যোগ মূলত এ লাইব্রেরির প্রতি কম বয়সীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্যই নেওয়া। যাই হোক, ওই গল্প-কবিতা লিখতে গিয়েও পড়া লাগে পরম কাকুর খপ্পরে। কারণ তিনিই ওসব গল্প-কবিতা থেকে বানানগুলো শুধরে দেন। 

এক সূত্র ধরে শীতলদাকে একবার কাকু পেয়ে বসলেন। শীতলদা আর বাড়াননি। ‘আচ্ছা’ বলেই ঘটনা ক্ষান্ত করেছেন। এরপর অনুবাদ নিয়ে আরেকবার লাগতে গেলেন শীতলদার কাছে। শীতলদা সেবারও শান্ত উত্তরের সঙ্গে শুভ্র হাসি উপহার দিলেন কাকুকে। কেন জানি কোনো কাজ না পেয়ে একবার আমি একটা চিঠি লিখে বসলাম পরম কাকুকে—

‘প্রীও পড়ম কাকূ, প্রণাম নেবেন। ক্যামণ আছেণ? আষা কড়ি ভালও আছেণ। কাকূ, পাড়লে আমাড় এ চিঠীর বাণাণগুলো ঠীক কড়ে দীণ! ও হ্যা, আমী দূক্ষিত কাকূ। আমাড় এ চিঠী পেয়ে যদী আপনাড় রাগে শব চূলও ঝড়ে যায় তাহলে আমাকে ক্ষমা কড়বেণ আষা কড়ি। ঈতী আপনাড় আদড়েড় বীভাবরী’

এই চিঠি পাওয়ার পর পরম কাকু বাবাকে তা দেখালেন। বাবা আমাকে খুব বকবেন আশা করেছিলেন। কিন্তু উল্টো পরম কাকুকেই বাবা বললেন, সেই তো পরম, কী দরকার লেখা কেমন হবে আর গল্প কে কিভাবে লিখবে, তা নিয়ে ছেলেপুলেদের সঙ্গে লাগার। তোমার কাজ যেটা সেটা করো।

পরে অবশ্য বাবা আমাকেও ডেকে বলেছেন, পরম কাকুকে অমন চিঠি লেখা উচিত হয়নি। যেমনই হোন, উনি আমার বড়। বাবা আর কাকু বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পর যখন আমি মিটিংরুমের দিকে যাচ্ছিলাম, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় জানালা দিয়ে চোখে পড়ল টেবিলের ওপর রাখা কাকুকে দেওয়া চিঠিটা তুলে শীতলদা একবার পড়ে নিলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা দ্যুতি ছড়াচ্ছিল গোটা চেহারায়। তা দেখে কী যে বোধ হয়েছিল আমার জানি না...!

পাঠচক্র, লেখা জমা দেওয়া ছাড়া শীতলদার সঙ্গে মৌখিক আলাপচারিতা তেমন ছিল না। শীতলদা অন্য সবার সঙ্গেও যে খুব কথা বলেন তাও নয়। মিতভাষী, হাসি-খুশি মানুষ। মাঝেমধ্যে তাঁকে খুব অস্থির দেখায়। একটা সময় বুঝতে পারলাম, তিনি যখন খুব অস্থির থাকেন, তখনই কিছুক্ষণের জন্য পেছনের বারান্দায় চলে যান। চুপচাপ বসে থাকেন। এমনই একদিন তাঁকে টেবিলে না পেয়ে পেছনের বারান্দায় গেলাম। তিনি রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে বসে। পেছন ঘুরে বের হয়ে আসতেই ডাক দিলেন—বিভা! তাকাতেই বললেন, কিছু বলতে এসেছিলে? মাথা নাড়িয়ে বললাম—না, এমনি। তিনি বললেন, ইচ্ছা হলে চেয়ার নিয়ে এসে বসতে পারো। চলেও যেতে পারো।

সেদিন বসিনি। কিন্তু এর পর থেকে তিনি বারান্দায় থাকলে গিয়ে বসি। চুপচাপ থাকি দুজনই। যতক্ষণ ইচ্ছা বসি; যেন টক্সিন রিলিজ করার মতোই বিষয়। কেন যেন এই চুপচাপ, স্তব্ধতা অনেক বেশি সরব হয়ে ওঠে তখন।

ভদ্রলোককে কখনো চা খেতে দেখিনি। অনীহা আছে এমনটাও জানা নেই আমার। আর আমি চায়ের পোকা। এলাচ দেওয়া দুধ চা ফেরানোর সাধ্য আমার নেই। উনি সিগারেটও খান না। শীতলদার সামনে বসে কখনো কিছু খাই না আমি। খুব বেশি ভালো লাগা একটা অস্বস্তিও তৈরি করে। কী অদ্ভুত!

একদিন সকালে লাইব্রেরির সবচেয়ে কিনারের টেবিলে বসেছিলাম। পড়তে আসিনি। এলাচ চা তৈরি হলেই বাইরে গিয়ে খাব। এমন সময় দরজায় শব্দ পেলাম। ভয়ে না, তবু কেন যেন বুকের ভেতর কেউ হাতুড়ি পেটাতে শুরু করল। একটা গন্ধ...গভীর একটা গন্ধে গা শিউরে উঠল। পায়ের শব্দ কাছে আসছে ক্রমাগত। আমার চেয়ারের পেছনে আলতো করে নক করে যেতে যেতে তিনি বললেন, তোমার কাগজ নিয়ে যাও। শীতলদা নিজের জায়গায় গিয়ে বসে ড্রয়ার খোলা অবধি অপেক্ষা করে আমি এগোলাম তাঁর দিকে।

বসো। এই নাও উপহার, কবিতা দুটিই ভালো হয়েছে। তবে শব্দভাণ্ডার আরো জোরালো করো।

তিনি কবিতার কাগজের সঙ্গে সোনালি ছোট্ট একটা কৌটা দিলেন। হাতে নিয়ে ধন্যবাদ জানালাম। এমন সময় চায়ের ডাক পড়ল—বিভাদি, চা।

আমি মাথা নাড়িয়ে শীতলদাকে বললাম, আসছি। চা খাবে? চলো, আমিও যাই। আমি হেসে বাইরের দরজার দিকে পা বাড়ালাম। তিনিও এলেন...। চায়ের পর্ব শেষ করে নিজের ঘরে এলাম। ছোট্ট সোনালি কৌটাকে মনে হলো প্রাণভোমরা। খুলতেই ছোট্ট শুভ্র একটা শঙ্খ বেরিয়ে এলো। শঙ্খের নিচে ভাঁজ করা একটা কাগজ। ভাঁজ খুলতেই লাল কালিতে ফুটে ওঠা লেখায় ছিল—

‘বিভাবরী, আজকে এখানে আমার শেষ কর্মদিবস। লাইব্রেরির দায়িত্বে আর নেই আমি। স্কুলের চাকরিতেও ইস্তফা দিয়েছি। এ মাস পর কলকাতা চলে যাচ্ছি। এরপর লাইব্রেরির দায়িত্বে যিনি আসবেন, তাঁকে সহায়তা করো। তুমি লেখো ভালো। শিগগিরই বই আসছে তোমার। অগ্রিম শুভেচ্ছা রইল। যোগাযোগ রেখো, কলকাতায় তোমার নিমন্ত্রণ রইল। আর আমার থেকে কোনো খারাপ পেয়ে থাকলে নিজগুণে ক্ষমা করো। তোমার মঙ্গল হোক।’

শীতলদা শীতলদা। চাওয়াহীন এক প্রাপ্তি তিনি। ভালোবোধের কোনো সংজ্ঞা নেই। এর মতোই এ প্রাপ্তিরও কোনো ব্যাখ্যা নেই; যা শুধু অনুভব করা যায়! কাল সকাল থেকেই সে পায়ের শব্দ, শিউরে ওঠার মতো গন্ধ, বারান্দায় রকিং চেয়ারে নেতিয়ে পড়া হাত কোনোটিই থাকবে না। যদি নাই থাকে, তাতে কী! তাকে তো আমি চাইনি। কিন্তু যেটুকু পেয়েছি, তাও নিজের সম্বল বলেই মানি। তিনি একবারও বললেন না, বুঝতে দিলেন না যে তিনি থাকবেন না! অবশ্য বুঝতে দেওয়ার বা বোঝানোর কোনো কথাও ছিল না। চিঠির উত্তরে দুটি লাইন ছাড়া কিছুই লিখতে পারলাম না।

‘তোমাতে ক্ষুব্ধতাবিহীন শুভ্রতা আছে, মুগ্ধতা ছাড়া কী পাই খুঁজে’

‘সপ্তপদী’ বইয়ের ভাঁজে চিরকুটটা সোনালি দিদির হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিলাম তাঁর কাছে। শীতলদা বিদায় নেওয়ার সময় মা খুব ডেকেছিলেন। দরজার পেছন থেকে শুধু বলেছি, স্নানে আছি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বড় সড়কের দিকে ধুতির কুঁচির নিচে শুভ্র একজোড়া পায়ের এগিয়ে যাওয়া দেখলাম। সময়গুলো অমনই ছিল গো শীতলদা! তোমার সাদায় আবির মেশানো গালের দিকে চেয়ে মনে হতো, জীবনে সুখ বড়ই সূক্ষ্ম ব্যাপার!


মন্তব্য