kalerkantho


সেই সাক্ষাৎকার থেকে

মানুষই আমাকে নায়করাজ বানিয়েছে

২২ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



মানুষই আমাকে নায়করাজ বানিয়েছে

ছয় ভাই-বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট, তাই খুব আদরের ছিলাম। একটু জেদিও ছিলাম। আমার আত্মবিশ্বাস খুব বেশি ছিল। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন—যে খেলাই খেলতাম, সেটিতে ভালো করতে চাইতাম। কাজের মতো কাজ পেলে সেটিকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। নিজের সঙ্গে নিজে জেদ করে সেখানে ভালো করেছি। স্কুলে পড়ার সময় থেকে ফুটবল আমার প্রিয় ছিল। আমি গোলকিপার ছিলাম। সেভেন-এইটে পড়ার সময় এক স্ট্রাইকার আমার বুকে বল মেরে দিয়েছিল। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলাম। সেই ভয় থেকেই বিয়ের তিন বছর পর খেলা ছেড়ে দিয়েছি।  

ছোটবেলায় একটু ডানপিটে ছিলাম। ক্লাসের মনিটরও ছিলাম। সরস্বতীপূজায় আবৃত্তি করি, খেলাধুলা করি বলে একদিন আমাদের খেলার শিক্ষক এসে বললেন, নাটক করতে হবে। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। স্যার কিন্তু নিশ্চিত, ‘না, তোকে দিয়ে নাটক হবে।’ বললাম, স্যার, আমাকে পেটালেও হবে না। কারণ কোনো দিন অভিনয় করিইনি। তিনি নাছোড়, ‘স্কুল ছুটির পর মিটিং হবে। আসিস।’ গিয়ে দেখি, হলরুম ভর্তি করে ছেলেরা সব বসে আছে, প্রধান শিক্ষকসহ সব স্যাররাও আছেন। প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘এই, তুই নাকি নাটক করতে পারবি না বলেছিস?’ বললাম, স্যার আমার দ্বারা নাটক হবে না। কিন্তু তাঁরা জোর করে আমাকে অভিনয় করতে নিয়ে গেলেন। তখনকার দিনে কলকাতায় তরুণদের অভিনয় করার জন্য স্ত্রী চরিত্রবর্জিত নাটকের বই পাওয়া যেত। ‘বিদ্রোহী’ নামের একটি নাটকের বই এনে স্যার বললেন, ‘এটিতে অভিনয় করতে হবে।’ গ্রামের এক দল ছেলে সামাজিক কাজ করে বেড়ায়। সেখানে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করলাম। এই হলো অভিনয়ের শুরু।

সেটিই পরে নেশা হয়ে গেল। অভিনয়ের এই জীবনটি আমার কাছে ভালো লেগে গেছে। তরুণতীর্থ নামে আমাদের একটি ক্লাব ছিল। সেই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। তিনি প্রতি রবিবার আগ্রহীদের বিনা পয়সায় আবৃত্তি শেখাতেন। আমি সেই ভাগ্যবানদের একজন যে তাঁর কাছে আবৃত্তি শিখেছে। তরুণতীর্থে কিশোরদের নাটকগুলোতে অভিনয়ও করেছি। চলচ্চিত্র পরিচালক পীযূষ দত্তের ‘রঙ্গসভা’য়ও কাজ করতাম। সেখানে বড়দের নাটকে অভিনয় করতাম। ফলে অভিনয়ের নেশা আরো বেড়ে গেল। ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর তো বাড়ি থেকে কিছু একটা করার জন্য খুব চাপ দিতে লাগল। আমরা একটু অবস্থাপন্ন পরিবারের মানুষ ছিলাম। ফলে অভিনয়ের দিকেই মনোযোগী হতে পেরেছি। মাঝখানে ১৯৫০ সালে বোম্বে চলে গেলাম। সেখানে চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জন্য অ্যাক্টিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ছিল, সেখানে ৯ মাসের একটি কোর্স করে ফিরে এলাম। আমাদের অধ্যাপক ছিলেন মিস্টার নাইয়ার নামের এক ভদ্রলোক। সপ্তাহে এক দিন দিলীপ কুমার আমাদের ক্লাস নিতে আসতেন। ওস্তাদজি খুব করে বললেন বলে চলে এলাম। তবে আমাদের পরিবার থেকে আমার এই অভিনয়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে চাইছিলেন না। তবে মেজদার সাহায্যে আমি তখন অভিনয় চালিয়ে যেতে পেরেছি।

এর মধ্যে আমাকে বিয়ে করতে হলো। আমার অনেক বান্ধবী ছিল। নাটকের সূত্রেও অনেক মেয়ের সঙ্গে পরিচয় ছিল। ফলে মা-বাবা ভয় পেয়ে গেলেন, কখন না কোন অঘটন ঘটিয়ে বসি। একদিন বাড়ি ফিরে দেখি, মিটিং বসেছে। সেটির আলোচ্য বিষয় আমি! তাঁরা বললেন, তুমি নাটক করতে পারবে না। বললাম, নাটক আমি ছাড়ব না। ফলে তাঁরা সিদ্ধান্ত দিলেন, নাটক করতে চাইলে তোমাকে বিয়ে করতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। এক বছরের মাথায় মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিয়ে করলাম। আমাদের দুজনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং খুব ভালো। সেও আমার অভিনয়ের কথা জানত। আমাকে চিনতও। আমাদের পাড়া থেকে মাত্র মাইল তিনেক দূরে তাদের বাড়ি ছিল। বিয়ের আগে সে আমার অভিনয়ও দেখেছে। তার সঙ্গে আমার একটিই কথা ছিল—অভিনয় আমার প্রথম প্রেম, এরপর কিন্তু তুমি। সে সেটি সারা জীবন মেইনটেন করেছে। চলচ্চিত্রে আসার পরেও এর ব্যত্যয় হয়নি।

এর মধ্যে ১৯৬৪ সালে হঠাৎ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলো। আমাদের এলাকাটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেল। পাঞ্জাবে অভিনয়ের জন্য চলে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে এই অবস্থা দেখার পর খুব হতাশ হয়ে গেলাম। বোম্বে চলে যাব কি না ভাবছিলাম। আমার নাটকের গুরু পীযূষদা বললেন, ‘বোম্বে গিয়ে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠবি না। বাঙালিরা ওখানে এমনিতেই পারে না। তুই পাকিস্তানে যা। সেখানে নতুন ইন্ডাস্ট্রি হবে। কিছু একটা করতে পারবি।’ সারা রাত ভাবলাম, স্ত্রীর সঙ্গেও আলাপ হলো। আবার এটিও মনে হচ্ছিল, পাড়াময় এত বন্ধুবান্ধব থাকতে এত ধাক্কা খেয়েছি। কলকাতার নাকতলায় আর থাকব না। বড় দুই ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করলাম। তাঁরা তো আকাশ থেকে পড়লেন। এর পরও মন ভাঙার বেদনা নিয়ে আমি বাবার প্রচুর সম্পত্তি দুই ভাইকে লিখে দিয়ে ছয়-সাত মাসের বাপ্পারাজ আর স্ত্রীকে নিয়ে এপারে চলে এলাম।

আরো অসংখ্য রিফিউজির সঙ্গে সোজা যশোরে চলে এলাম। ট্রেনে আমার সঙ্গে এক খালু আর তাঁর পরিবার এসেছিল। আমরা সোজা ঢাকার ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে নামলাম। তখন ঢাকার লোকের মধ্যে হৃদ্যতা ছিল। আমাদের চেহারা দেখে তারা ভাবল, এরা নেহাত ভদ্রলোক। তারা বলল, এখানে বাড়ি ভাড়া না নিয়ে আপনারা মিরপুরে যান, সেখানে রিফিউজিদের জন্য প্রচুর কোয়ার্টার আছে। বাসে চড়ে মিরপুর ১১ বা ১২ নম্বরে নামলাম। কিছু পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হলো। তাদের মাধ্যমে একটি ছোট বাড়িতে উঠলাম। প্রথম দিনেই ঝড়বৃষ্টিতে একেবারে ভয় পেয়ে গেলাম। স্ত্রী, নবজাতক ছেলে আরো ভয় পেয়ে গেল। দরজা-জানালা বৃষ্টির তোড়ে ভেঙে যাওয়া ঠেকাতে পিঠ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে হলো। টয়লেটও নেই, সেটির বদলে আছে খোলা ঝিল। সকালে সেখানে গোসল সেরে খালুর কাছে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে কমলাপুরে আমাদের জব্বার ভাইয়ের (মুখ ও মুখোশ ছবির আব্দুল জব্বার) সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি আমাদের টালিগঞ্জের বাড়ির পাশে চলচ্চিত্রাভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের বাসায় যেতেন। তিনি আমাকে দেখেই বললেন, ‘কেমন আছো? তোমরা সোজা আমার বাসায় আসতে?’ এরপর কমলাপুরে তাঁদের পাড়ায় এক ভাড়া বাসায় চলে এলাম। তাঁর ও তাঁর ছেলেদের সঙ্গে আলাপ হলো। চলচ্চিত্রে হঠাৎ করে কিছু হয় না বলে তাঁর উজালা প্রডাকশনের ৪ নম্বর সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করলাম। এই কাজ করতে করতে সিনেমায় অভিনয়ের চেষ্টা করে চলেছি। জহির রায়হান একদিন ডেকে বললেন, ‘একটি ছবি করব। যোগাযোগ রাখবেন।’ তখন তিনি ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা বানানোর চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে কমলাপুর থেকে মগবাজার নয়াটোলায় এলাম। এফডিসির কাছাকাছি হয় বলে ফার্মগেটে বাসা নিলাম। বাসে চলাফেরার অভ্যাস নেই বলে খুব কষ্ট হতো। তাই বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে হোন্ডা কিনলাম। এর মধ্যে জহির রায়হান বললেন, সুযোগ দেবেন। তিনি তখন ‘বাহানা’ বানাচ্ছিলেন। তত দিনে আমার স্ট্রাগল একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে। দেশে ফিরে যাওয়ার কথাও ভাবছিলাম। সেখানে আমার সবাই আছে। তবে স্ত্রী বললেন, ‘না, এসেছ যখন শেষ পর্যন্ত দেখো।’ তিনি সাহায্য না করলে আমি এত দূর আসতে পারতাম না। হোন্ডা বিক্রি করে খেয়েছি। দুটি বাচ্চাই শিশুসন্তান। আমি-স্ত্রী এক বেলা উপোসই থাকি। কিছুদিন পর জামান আলী খান নামের টেলিভিশনের এক প্রযোজকের মাধ্যমে ডিআইটিতে ‘ঘরোয়া’ নামের একটি সাপ্তাহিক কমার্শিয়াল নাটকে বিজ্ঞাপনে অভিনয় শুরু করলাম। এই আমি দাঁড়াতে পারলাম।

এর মধ্যে জহির রায়হান আমাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি বললেন, ‘আমি আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।’ বললাম, কেন? “আপনাকে আমি হিরো বানিয়েছি। আমার ‘বেহুলা’ ছবির আপনি হিরো।” অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চোখে পানি এসে গেল। তিনি আমাকে ৫০০ টাকা সাইনিং মানি দিলেন। বেহুলার পর তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘আনোয়ারা’তে অভিনয় করলাম। সেটিও খুব ভালো চলল। এরপর ‘আগুন নিয়ে খেলা’ করলাম। এই সামাজিক ছবিতে এক ছাত্রের চরিত্রে দর্শক আমাকে ভীষণভাবে গ্রহণ করল। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

‘জীবন থেকে নেয়া’র মতো ছবি আর হবে না। এটি জহির রায়হান বলেই তৈরি করতে পেরেছিলেন। একদিন এফডিসির ৩ নম্বর ফ্লোরে আমরা শুটিং করছি। পাকিস্তানি আর্মি এসে ছবির নায়ক বলে আমাকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে গেল। খুব হয়রানি করল। কবরী আর আমার জুটিকে আমার দেশের লোক গ্রহণ করেছিল। ফলে এটি রোমান্টিক হিট জুটি হয়ে গেছে। কবরীর পরে আমার নায়িকা হিসেবে শাবানা, ববিতা এলো। আমি ১৬ জন নায়িকার একাই নায়ক। তবে স্মরণীয় ছবি আমি পাইনি। ভালো ছবি হিসেবে ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘অশিক্ষিত’, ‘অবুঝ মন’, ‘ময়নামতি’, ‘মাটির ঘর’, ‘অন্ধবিশ্বাস’ আমার পরিচালনা করা ‘বেঈমান’, ‘বদনাম’ আছে। তবে আমার সেরা অভিনয় ‘বাঁদী থেকে বেগম’। আমার ১০০তম ছবি হওয়ার পর চিত্রালীর আহমেদ জামান চৌধুরী আমাকে নায়করাজ উপাধি দিলেন। তখন এফডিসিতে সাত দিনের অনুষ্ঠান হয়েছিল। অহংকার আমার নেই, কিন্তু নায়করাজ বলায় আমি গর্বিত। এ দেশের মানুষই আমাকে নায়করাজ বানিয়েছেন। এর পর থেকে লোকে আমার নাম আবদুর রাজ্জাক না লিখে ‘নায়করাজ রাজ্জাক’ লেখে।

২০১৫ সালে জুলাই মাসে অসুস্থ নায়করাজ সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার পর কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ।

অনুলিখন : ওমর শাহেদ


মন্তব্য