kalerkantho


প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ‘বিদ্রোহ’ চার বিচারপতির

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ‘বিদ্রোহ’ চার বিচারপতির

ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ডেকে মামলার বেঞ্চ নির্ধারণে নিয়ম না মানাসহ কয়েকটি অভিযোগ তুলে তাঁর কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের চার জ্যেষ্ঠ বিচারপতি। গতকাল শুক্রবার দিল্লিতে ওই সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা বলেছেন, প্রধান বিচারপতি যেভাবে আদালত চালাচ্ছেন তা ভারতের গণতন্ত্রকেই হুমকির মুখে ফেলে দেবে।

বিবিসি জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের এভাবে প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধান বিচারপতির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা ভারতীয় বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। রীতি অনুযায়ী, উচ্চ আদালতের বিচারকরা সরাসরি কখনো সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন না। তাঁদের সংবাদ সম্মেলনে আসার ঘটনাও এর আগে কখনো ঘটেনি।

বিচার বিভাগকে ঘিরে এই অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর সরকারের আইনমন্ত্রী রবি শঙ্কর প্রসাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তা জানা যায়নি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার দিল্লিতে বিচারপতি জাস্তি চেলামেশ্বরের বাসভবনের লনে এই সংবাদ সম্মেলন হয়। তাঁর পাশে ছিলেন অন্য তিন বিচারক বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি মদন লকুর ও বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফ। বিচারকরা বলেছেন, প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র এখন তাঁর ব্যক্তিগত মর্জিমাফিক বিভিন্ন বেঞ্চে মামলা পাঠাচ্ছেন। এটি আদালতের নিয়মকানুনের লঙ্ঘন। বিচারপতি চেলামেশ্বর বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানের (সুপ্রিম কোর্ট) সুরক্ষা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারলে ভারতে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব থাকবে না বলে আমাদের চারজনের বিশ্বাস।’

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোতে বেঞ্চ বরাদ্দ নিয়ে আপত্তির বিষয়টি জানিয়ে দুই মাস আগে প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিয়েছিলেন চার বিচারক। চিঠিতে তাঁরা বেশ কিছু বিচারিক নির্দেশের ব্যাপারে তাঁদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছিলেন। সেই চিঠির অনুলিপি গতকাল সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘নিয়ম অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব আদালতের কাজ সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য কাজের পালা ও মামলার ভার বণ্টন করা। তিনি সুপ্রিম কোর্টের সর্বেসর্বা নন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির দায়িত্ব যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তাঁর নাম আগে বলা হয়, পার্থক্য শুধু এটুকুই।’

সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি চেলামেশ্বর বলেন, যেসব মামলার ফল ভারতের রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হয়, প্রধান বিচারপতি সেসব মামলা বেছে বেছে তাঁর পছন্দসই কিছু বেঞ্চে পাঠান।

চিঠি পাঠানোর পরও বিচারপতি মিশ্র ‘সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেননি’ জানিয়ে বিচারপতি চেলামেশ্বর বলেন, বিচার বিভাগের নানা অনিয়মের বিষয়ে তাঁরা এখন প্রকাশ্যে মুখ খুলতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘কেউ যেন এমন অভিযোগ করতে না পারে যে আমরা সুপ্রিম কোর্টকে বাঁচাতে মুখ খুলিনি। কেউ যেন বলতে না পারে যে আমরা আমাদের বিবেক বিক্রি করে দিয়েছি।’

বিচারপতি চেলামেশ্বর এও বলেন, তাঁদের এই সংবাদ সম্মেলন কোনো ধরনের রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়। সাংবাদিকরা প্রশ্ন রেখেছিলেন, তাঁরা প্রধান বিচারপতির অপসারণ (ইমপিচ) চান কি না? জবাবে তাঁরা সেই সিদ্ধান্তের ভার জাতির ওপর ছেড়ে দেন।

বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, কোন কোন মামলা প্রধান বিচারপতি তাঁর পছন্দসই বেঞ্চে পাঠিয়েছেন, সেটি সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতিরা উল্লেখ করেননি। তবে ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক জল্পনা রয়েছে যে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির দুর্নীতির বিষয়টি এর একটি। গত বছরের আগস্টে এই ঘটনা নিয়ে তুমুল বিতর্ক ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের ভেতর চলতে থাকা এই টানাপড়েন প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।

ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, গত বছর কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সি এস কারনানের ঘটনা হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল সারা দেশে। বিচারপতিদের দুর্নীতি নিয়ে মুখ খুলে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে, জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছে কারনানকে। গতকালের ঘটনা ধারে ও ভারে তাকেও ছাপিয়ে গেল।



মন্তব্য