kalerkantho


আসন ছাড় দিয়েও বড় জোট চায় বিএনপি

এনাম আবেদীন   

২০ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



আসন ছাড় দিয়েও বড় জোট চায় বিএনপি

এবার শুধু চার দল বা ২০ দল নয়; সরকারের বাইরে থাকা সব দলকে নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামতে চায় বিএনপি। জোট গঠন সম্ভব হলে প্রয়োজনে এক শর মতো আসনে ছাড় দিতে বিএনপি রাজি আছে। তবে পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে কি না তা নির্ভর করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গেলে তারেক রহমানের ভূমিকা সরকারে কী হবে, দুর্নীতি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কতগুলো মৌলিক ইস্যুতে ঐকমত্যের ওপর। এ ক্ষেত্রে আপাতত ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ ইস্যু নিয়ে দলগুলো পৃথকভাবে মাঠে নামতে পারে; জোট গঠন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে নির্বাচনের প্রাক্কালে।

নির্বাচনী জোট গঠনকে যৌক্তিক পরিণতি দিতে  ২০ দলীয় জোটের বাইরে গণফোরাম, বিকল্প ধারা, সিপিবি ও বাসদ, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, নাগরিক ঐক্যসহ ছোট-বড় আরো কয়েকটি দলকে আসন ছেড়ে দিতে চায় বিএনপি। জানা যায়, নিজের জন্মদিন উপলক্ষে আগামীকাল শুক্রবার সব দল ও বিশিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। এর পর কালই বা পরশু ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে ড. কামাল কিছু একটা বলতে পারেন।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেছেন, বিএনপি নতুন এই বৃহত্তর জোটের ধারণায় খুব আগ্রহী। বিকল্প ধারার সভাপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, তিনি ভেবেচিন্তে এগোতে চান, কারণ তারেক রহমানকে নিয়ে তাঁর বিশেষ শঙ্কা রয়েছে। এ রকম উদ্যোগ বিএনপি নেবেই মন্তব্য করে বাসদ নেতা কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, ভাবনাটি জুলাই-আগস্টের আগে রূপ পাবে না। এদিকে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার অবস্থান হচ্ছে, ‘স্বৈরাচার’ রোধে গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।

বিএনপির নানা উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, বৃহত্তর ঐক্য এবং জোট গঠন প্রক্রিয়ায় এবার বিএনপি বেশ আন্তরিক। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ ব্যাপারে কাজ করছেন এবং খালেদা জিয়ারও এতে সম্মতি রয়েছে। তিনি বলেন, ঐক্য প্রতিষ্ঠার মূল ঘোষণা বা এগ্রিমেন্ট হবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ডা. জাফরুল্লাহ মনে করেন, জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠা হলে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি থেকে এবং রাষ্ট্রপতি অন্য দলগুলোর মধ্য থেকে হবে—এমন চুক্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

কারারুদ্ধ খালেদা জিয়ার সবুজ সংকেত নিয়ে বিএনপির সিনিয়র একাধিক নেতা এ প্রশ্নে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, বৃহত্তর জোট গঠনের বিষয়টি আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সময় হলে রূপ লাভ করবে।

সূত্র মতে, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়; শক্তিধর এমন দু-একটি দেশেরও সম্ভাব্য এই জোটের ব্যাপারে সমর্থন রয়েছে। তবে দেশগুলোর উদ্দেশ্য হলো বিএনপির লাগাম টেনে ধরা। সুশাসন নিশ্চিত করার শর্ত হিসেবে বিএনপিকে তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না দিয়ে দল ও সরকারে ভারসাম্য রাখার পক্ষপাতি। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মনে করে ওই দেশগুলো। বিএনপিও মনে করে, বর্তমান বাস্তবতায় শুধু ২০ দলীয় জোট নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায় করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। ফলে সুশাসন নিশ্চিত করার নীতিগত অঙ্গীকারের পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বড় ধরনের ‘ছাড়’ দিয়ে হলেও সব দলকে একমঞ্চে আনতে চায় বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দেশনেত্রী খালেদা জিয়াই দিয়ে গেছেন। সরকারি জোটের বাইরে থাকা সব দলও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তথা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে। সুতরাং এক জায়গায় তো ঐক্য হয়েই আছে। এখন কেবল একজোট হয়ে মাঠে নামার অপেক্ষা। সুতরাং নির্বাচনের আগে সব গণতান্ত্রিক শক্তি একত্র হয়ে মাঠে নামলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এখন দেশের গণতন্ত্রমনা সব দলও অনুভব  করছে, সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ের জন্য ঐক্যের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ‘বৃহত্তর ঐক্যের জন্য বিএনপি কাজ করে যাচ্ছে। আশা করছি  এ দেশে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, ‘গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যের জন্য প্রত্যেকে প্রত্যেকের জায়গা থেকে কথা বলছেন। আশা করছি সবাইকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে পারব।’

বিকল্প ধারার সভাপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগের কথা বিভিন্ন জায়গায় শুনি; বাজারে আছে। কিন্তু ভয় পাই, খালেদা জিয়ার ছেলে যদি দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হন, আর সব ক্ষমতা তাঁর হাতে যায় তাহলে এক মাসের মধ্যে দেশের কী অবস্থা হবে, এটি ভেবে শঙ্কিত। তারেক বলবে আমার ওপরে নির্যাতন হয়েছে, জুলুম হয়েছে; প্রতিশোধ নেব। তখন আমরা কী করব। তাই ভেবেচিন্তে এগোতে চাই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি ঐক্য হয় সেটি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই হবে। তাই ঐক্যের ব্যাপারে গ্যারান্টি ক্লজ (শর্ত) থাকতে হবে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে এই ঐক্যে দেশের কোনো লাভ হবে না।’

বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, ‘বৃহত্তর ঐক্যর প্রশ্নে বিএনপির তৎপরতার কথা আমাদের অজানা নয়। এও জানি যে, নির্বাচনী জোট গঠনের প্রশ্নে এবার তারা ‘ছাড়’ দেবে।’ এসব মেরুকরণ রূপ লাভ করবে আগামী জুলাই-আগস্টে এমনটাই মনে করছেন প্রবীণ বামপন্থী এই নেতা।

জেএসডির সভাপতি আ স ম রব অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার পর থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তিনি বলেন, স্বৈরাচারের থাবা আরো বিস্তার রোধ করতে হলে দেশের সব গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি নেতাদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত যে দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে সেটি আসলে তাদের ওপর সরকার যে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে তার প্রতি সহমর্মিতা। তবে সরকার যদি ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা আরেকটি নির্বাচন করতে চায় সে ক্ষেত্রে বৃহত্তর জোট গঠনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছি না।’ সুব্রত চৌধুরী বলেন, দেশের সব দল সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে। ফলে আলটিমেটলি সবাইকে এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে।  ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বর বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠনের সময়ও একসঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে জামায়াতকে ৩১, বিজেপিকে সাত এবং তৎকালীন ইসলামী ঐক্যজোটকে ছয়টি আসনে ছাড় দিয়েছিল বিএনপি। আর সরকার গঠনে প্রধান শরিক জামায়াতকে দুটি মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অবশ্য এ ধরনের কোনো যৌথ অঙ্গীকার ছাড়াই বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে শরিক দলগুলোকে মোট ৪১টি আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। দলটির নেতৃত্বাধীন ওই চারদলীয় জোট এখন ২০ দলে রূপ নিয়েছে। তবে জোটে বড় হলেও ‘ভোটের হিসাবে’ ওই জোটের শরিকরা ২৫ থেকে ৩০টির বেশি আসন পাবে না বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।

জানা গেছে, উদারপন্থী বলে পরিচিত দলগুলোর পাশাপাশি সমাজের বিশিষ্ট কিছু ব্যক্তিকেও মনোনয়ন নিয়ে সংসদে নেওয়ার পক্ষে বিএনপি। ফলে ‘ছাড়’ দিতেও তাদের আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপির নীতিনির্ধারক বলে পরিচিত নেতারা।


মন্তব্য