kalerkantho


যৌথ ইশতেহার

রাখাইনে সহিংসতা বন্ধে কমনওয়েলথের আহ্বান

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



রাখাইনে সহিংসতা বন্ধে কমনওয়েলথের আহ্বান

লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসে বৃহস্পতিবার রাতে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন ব্রিটেনের রানি। সেই অনুষ্ঠানে পৌঁছার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ছবি : এএফপি

নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধীদের জবাবদিহি করানো এবং সেখানে সব সহিংসতা বন্ধ ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে কমনওয়েলথ। ৫৩ জাতির গ্রুপ কমনওয়েলথ গতকাল শুক্রবার যৌথ ইশতেহারে এই আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল বিকেলে সমাপ্ত কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের ২৫তম সম্মেলনে সর্বসম্মতভাবে এই ইশতেহার গৃহীত হয়।

যৌথ ইশতেহারে বলা হয়, সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত সব রোহিঙ্গাকে স্থায়ীভাবে ফেরত নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। পাশাপাশি সদস্য দেশগুলো তাদের মর্যাদা সহকারে নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনে প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টিরও আহ্বান জানাচ্ছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করে কমনওয়েলথ নেতারা বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন। ইশতেহারে বলা হয়, দুস্থ মানুষগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কমনওয়েলথ নেতারা বাংলাদেশ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করছে। সরকারপ্রধানরা বর্তমান সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা অবিলম্বে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির কথা উল্লেখ করে কমনওয়েলথ নেতারা রোহিঙ্গাদের স্থায়ী প্রত্যাবাসন শুরু করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তাঁরা মিয়ানমার সমাজে রোহিঙ্গাদের সমমর্যাদা দেওয়ারও আহ্বান জানান। সরকারপ্রধানরা সব ধরনের চরমপন্থার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের জঙ্গিবাদবিরোধী কর্মপরিকল্পনার প্রতি অব্যাহত সমর্থন প্রকাশ করেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমনওয়েলথ সচিবালয়ের পরিচালনা পরিষদ পর্যালোচনায় সংস্থাটির উচ্চপর্যায়ে গ্রুপে আরো প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ জন্য তিনি এশিয়ার দেশগুলো থেকে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করে এই গ্রুপটিকে আরো প্রতিনিধিত্বশীল করার পরামর্শ দেন। কমনওয়েলথ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না উল্লেখ করে তিনি এর সংস্কারের জন্য তিন দফা সুপারিশ তুলে ধরেন।

গতকাল ব্রিটেনের উইন্ডসর ক্যাসলে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ হেড অব গভর্নমেন্টমিটিংয়ের (সিএইচওজিএম) রিট্রিট অধিবেশনে সংস্থাটির নেতাদের সঙ্গে পারস্পরিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ পরামর্শ তুলে ধরেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে রিট্রিট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর সরকারপ্রধানরা এতে উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কমনওয়েলথের কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে সচিবালয়ের জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ দক্ষতাকে আমরা মূল্য দিই। আমরা মনে করি, সঠিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মতামতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই গ্রুপে কমনওয়েলথের বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এই রাষ্ট্রসংঘকে আরো প্রতিনিধিত্বশীল করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম জানান, দিনব্যাপী রিট্রিটে উচ্চপর্যায়ের গ্রুপের সম্প্রসারণ, অর্থায়ন ও কমনওয়েলথ সচিবালয় গভর্নেন্স এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, বোর্ড অব গভর্নরের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার জন্য একটি প্রক্রিয়া থাকা উচিত। তিনি বলেন, যখন সিএফটিসি সংকুচিত হয়ে আসছে এবং অন্যান্য অর্থায়নের উৎস নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে উদ্ভাবনী অর্থায়নসহ বিভিন্ন অর্থায়ন প্রক্রিয়া ও বিকল্পের দিকে মনোনিবেশ করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থায়নে বহুপক্ষীয় ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে বিনিয়োগ ঋণের জন্য রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় আন্তর্জাতিক অংশীদারির চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭২ সালের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করে বলেন, ‘আসুন, জাতীয় সম্পদের অপচয় না করে তা জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যবহার করি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি শান্তির স্থান সৃষ্টির জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চাই, যেখানে আমরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিতে পাশাপাশি বসবাস করতে পারব এবং আমাদের জনগণের স্বার্থে গঠনমূলক-কৌশল প্রণয়নে কাজ করতে পারব।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) উপ-আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সাইবার ইস্যু বিষয়ে বলেন, ‘আমরা এ নিয়ে সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ উভয়েরই সম্মুখীন।’ তিনি বলেন, একদিকে বিভিন্ন দেশে একটি অবাধ, গতিশীল ও নিরাপদ ইন্টারনেটের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক ডাটা ইকোসিস্টেমে ‘উন্মুক্ততা’ সমর্থন করা প্রয়োজন। তিনি কমনওয়েলথ সাইবার ঘোষণাকে স্বাগত জানান।

প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথের সংস্কারের গুরুত্বের বিষয়ে বলেন, কমনওয়েলথের বিদ্যমান গঠন কাঠামো অনেক পুরনো ও বিন্যাস অপর্যাপ্ত এবং আমাদের প্রত্যাশা আংশিক পূরণ করতে পারে। কমনওয়েলথের যেকোনো পর্যালোচনা ও সংস্কার অবশ্যই সংস্থাটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের দিকে লক্ষ রেখে করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমনওয়েলথকে অবশ্যই ক্রমবর্ধমানভাবে এর নিজের মধ্যে সংশ্লিষ্ট হতে হবে এবং অবশ্যই এর কর্মসূচিতে বেসরকারি খাত ও বিভিন্ন পেশাজীবী গ্রুপকে স্বাগত জানাতে বৃহত্তর ভূমিকা রাখতে হবে।

শেখ হাসিনা সংস্থাটিকে আরো কার্যকর করতে তিন দফা সুপারিশ পেশ করে বলেন, ‘এ জন্য আমাদের সংস্থার (কমনওয়েলথ) পরিবর্তন এবং সম্ভবত নতুন করে যাত্রা শুরু করা প্রয়োজন।’

প্রথমে প্রধানমন্ত্রী একটি কমনওয়েলথ উন্নয়ন তহবিল এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য একটি প্লাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব করেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি তৃণমূল পর্যায়ে কমনওয়েলথ মূল্যবোধ গ্রহণের মাধ্যমে কমনওয়েলথের রাজনৈতিক মূল্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। তৃতীয়ত, তিনি প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাবের জন্য একটি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব করেন।

রানি এলিজাবেথের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। ২৫তম কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে যোগদান উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। 

প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম গতকাল শুক্রবার সাংবাদিকদের জানান, ‘শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার রাতে এখানে বাকিংহাম প্যালেসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।’ প্রেসসচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী একই স্থানে প্রিন্স চার্লসের সঙ্গেও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথ দেশগুলোর অন্যান্য সরকারপ্রধান ও নেতাদের সঙ্গে রানির দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শুক্রবার যুক্তরাজ্যের রাজধানীতে উইন্ডসর ক্যাসেলের সেন্ট জর্জেস হলে বিভিন্ন রিট্রিট সেশনে যোগ দেন। সূত্র : বাসস।

 


মন্তব্য