kalerkantho


সাবধান থাকতে হবে পিন কোড দেওয়ার সময়

শেখ শাফায়াত হোসেন   

২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



সাবধান থাকতে হবে পিন কোড দেওয়ার সময়

ক্ষুদ্র ক্যামেরায় প্রতারকদের পিন চুরি ঠেকাতে এটিএম বুথ আংশিক ঢেকে দেওয়া হয়েছে বাঁয়ে; সতর্ক কার্ড ব্যবহারকারী। ছবি : সংগৃহীত

‘সারা বিশ্বেই এটিএম কার্ড জালিয়াতি হয়। এই জালিয়াতির অনেক ধরন আছে। আমাদের দেশে কার্ড জালিয়াতিগুলো হচ্ছে মূলত নিজেরা ব্যবহারের সময়। আমরা যখন কার্ড দিয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলি বা পস মেশিনে কেনাকাটার বিল পরিশোধ করি, তখন পিন কোড কেউ দেখে ফেলছে। এটা ঠেকানোর জন্য গ্রাহকদেরই সচেতন হতে হবে। আমরা আমাদের এটিএম বুথগুলোকে পিন কোড দেওয়ার বাটনগুলো ঢেকে রাখার জন্য কাভার দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। এর থেকে বেশি কিছু করারও সুযোগ নেই ব্যাংকগুলোর। কেননা কার্ডের তথ্যের সঙ্গে পিন কোড মিলে গেলে জালিয়াতি বোঝা যায় না।’ গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় দি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সোহেল আর কে হুসেইন কালের কণ্ঠকে এই কথা বলেন।

দেশে বর্তমানে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক এক কোটি ২৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক। এসব কার্ডের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরির মাধ্যমে কেউ যাতে অর্থ হাতিয়ে নিতে না পারে সে জন্য অনেক ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেই উদ্যোগ পুরোপুরি কাজে লাগছে না। কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংকগুলোও পেমেন্ট পদ্ধতির নিরাপত্তা বাড়াতে অনেক ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহারের পাশাপাশি ‘ফিজিক্যাল’ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। জালিয়াতচক্রও থেমে নেই। একের পর এক অভিনব কৌশল তারা বের করছে।

দেশে ঘটে যাওয়া বড় বড় কয়েকটি কার্ড জালিয়াতির ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূলত কার্ড ব্যবহারের সময় বিভিন্ন কৌশলে তথ্য চুরি করা হয়েছে। কখনো কখনো ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা বা কেনাকাটার বিল গ্রহণের জন্য পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস বা পস) মেশিনের ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তথ্য চুরির সঙ্গে জড়িত বলে জানা যাচ্ছে।

২০১৬ সালের মার্চে এটিএম বুথে স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে পিন কোড চুরি করে কার্ড ক্লোন করার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় বিদেশি একটি চক্র জড়িত ছিল। ওই ঘটনার পর এটিএম বুথগুলোতে অ্যান্টি-স্কিমিং ডিভাইস বসানো, পুরনো আমলের এটিএম মেশিন বদলানো এবং প্রতিটি কার্ড ইভিএম চিপভিত্তিক কার্ডে রূপান্তরের নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া পেমেন্ট সিস্টেম বা পরিশোধ পদ্ধতির বড় বড় দুর্বলতা দূর করতে ব্যাংকগুলোকে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছিল। ব্যাংকগুলোও এটিএম বুথে অ্যান্টি-স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে কার্ডের তথ্য চুরি ঠেকানোর পাশাপাশি নতুন করে কার্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে ইএমভি চিপভিত্তিক কার্ডে চলে আসতে শুরু করে।

তবে সর্বশেষ জালিয়াতির ঘটনায় দেখা যায়, রাজধানীর বনানীর একটি সুপারশপের পস মেশিনে ব্যবহার করা কার্ডের তথ্য চুরি করে গত ১০ মার্চ পাঁচটি ব্যাংকের ৪৯টি কার্ডে ২০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন এক ব্যক্তি। তাঁর কাছে বিপুল পরিমাণ ক্লোন করা কার্ড পাওয়া গেছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে ওই সুপারশপ থেকে কার্ডে কেনাকাটা করা গ্রাহকরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১০ মার্চ ক্লোন কার্ড ব্যবহার করে জালিয়াতচক্রটি আন্ত ব্যাংক এটিএম লেনদেন করে অর্থাত্ এক ব্যাংকের ইস্যু করা কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলে। জালিয়াতি টের পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে বলে। এক দিনের জন্য এনপিএসবি বন্ধ রাখা হয়।

ওই সময় ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশের পস মেশিনগুলো এখনো পুরোপুরিভাবে ইএমভি সনদপ্রাপ্ত হয়নি। তা ছাড়া আমাদের দেশের এটিএম কার্ডগুলোও পেমেন্ট কার্ড ইন্ডাস্ট্রি ডাটা সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ড (পিসিআই ডিএসএস) সনদপ্রাপ্ত না হওয়ায় এই চ্যানেলটির মাধ্যমে লেনদেন এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। আমরা চাই এই লেনদেনগুলো পুরোপুরিভাবে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে। নইলে এমন জালিয়াতি বারবার ঘটতে থাকবে।’

জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর দ্বিধাপ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে একটি লেনদেন হলেই গ্রাহকের মোবাইল ফোনে এসএমএস চলে আসে। তখন গ্রাহক বুঝতে পারে তার টাকা কেউ তুলে নিয়েছে। এ কারণে দেশে কার্ড জালিয়াতির কারণে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায় না জালিয়াতচক্র। দি সিটি ব্যাংক এমডি বলেন, ‘জালিয়াতিগুলো খুবই ছোট অঙ্কের। এ কারণে ব্যাংকের দিক দিয়ে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয় না। বড় অঙ্কের জালিয়াতি এখানে সম্ভব নয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের দায়িত্বে থাকা সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘যত দূর জানি বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের পিসিআই ডিএসএস সনদপ্রাপ্তির জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছে। এ জন্য তারা পরামর্শকও নিয়োগ দিয়েছে।’


মন্তব্য