kalerkantho


দাম কমার অপেক্ষায় সরকার ও মিলাররা!

ঘোষণা দিলেও ধান-চাল কেনা শুরু হয়নি

আশরাফুল হক   

১৯ মে, ২০১৮ ০০:০০



দাম কমার অপেক্ষায় সরকার ও মিলাররা!

বোরো ধান-চালের দাম নির্ধারণ করে বাজারে দাম আরো কমার অপেক্ষায় সংগ্রহ অভিযান এখনো শুরু করেনি সরকার। মিলাররাও বসে আছেন দাম আরো কমার আশায়। এক মাস আগে যখন দর নির্ধারণ করা হয়েছিল তখন বাজারে মোটা চালের দাম ছিল ৪৪ টাকা কেজি। এখন সেটা ৪২ টাকায় নেমে এলেও তা সরকারের সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে চার টাকা বেশি। বাজারে দাম বেশি থাকলে মিলাররা কম দামে কিভাবে সরকারকে চাল সরবরাহ করবেন তা জানতে চাইলে সরকার ও মিলারদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বোরো চালের দাম আরো কমবে। এরপর চাল সংগ্রহে নামবে তারা।

সাধারণত বোরোর ভরা মৌসুুমে বাজার চাঙ্গা রাখার লক্ষ্যেই সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় প্রতি কেজি বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য ২৬ টাকা এবং চাল ৩৮ টাকা দরে কেনার সিদ্ধান্ত হয় গত ৮ এপ্রিল। তখন বাজারে চালের দাম ছিল ৪৪ টাকা। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি হিসাবে ঢাকার বাজারে গত সপ্তাহে গুটি ও স্বর্ণার মতো মোটা চালের দাম ছিল ৪২ টাকা। সরকারের সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে এটি কেজিতে চার টাকা বেশি।

খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি ২ মে থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে ৯ লাখ টন চাল এবং দেড় লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত হয়। ২ মে থেকে বোরো ধান-চাল সংগ্রহ করার কথা থাকলেও এখনো সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়নি। এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ১০৬ টন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এখনো কোনো ধান সংগ্রহ হয়নি। খাদ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবার জানান, এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ১০৬ টন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এখনো কোনো ধান সংগ্রহ হয়নি। অথচ হাওরে বোরো ধান কাটা প্রায় শেষ। আন্যান্য অঞ্চলেও প্রায় ৭৩ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষিবিদ বলেন, বরাবরই সরকার ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে নামে দেরিতে। ফলে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান কৃষকদের উপকারে আসে না। বরং তা এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকদের মুনাফা লোটার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এবার দর নির্ধারণসহ সংগ্রহ অভিযানের ঘোষণা কিছুটা আগে দেওয়া হলেও এখনো অভিযান পুরোদমে শুরু না হওয়ায় কৃষকদের লাভবান হওয়ার সুযোগ তেমন থাকছে না।

২০০৮ সালের কৃষিশুমারি অনুযায়ী, দেশে এক কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক আছে। তারা ফসল ওঠার সময় কম দামে ধান বিক্রি করে দিয়ে কৃষি ঋণের টাকা পরিশোধ করে। বছরের শেষ সময়ে গোলার ধান ফুরিয়ে গেলে তখন তারা বাজার থেকে চাল কিনে খায়। তখন বাজারে চালের দাম বেশি থাকে। অর্থাৎ বাজারে যখন দাম কম থাকে তখন তারা বিক্রি করে কৃষি উৎপাদনের খরচ পরিশোধ করে। পরে যখন বাজারে দাম বেড়ে যায় তখন তারা কিনে খায়। এই জটিলতায় পড়ে রয়েছে দেশের এক কোটি কৃষক পরিবারের পাঁচ কোটি সদস্য। বেশি দামে কিনে খাওয়ায় তাদের বাজেটের বড় অংশ চলে যায় চাল কেনার পেছনে। ফলে তারা পুষ্টির দিকে মনোযোগ দিতে পারে না। এতে তাদের পুষ্টিহীনতা বেড়ে যায়।

অর্থনীতিবিদ, ও বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের নেতাদের মতে, কৃষকদের এই অবস্থা থেকে বের করে আনার জন্য সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান কাটার মৌসুুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রহ শুরু করতে হবে। যেভাবেই হোক কৃষক যখন ধান বিক্রি করে সেই সময় সরকারকে মাঠে থাকতে হবে। চালের চাহিদা যতটুকু তার পুরোটাই অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে হবে। উৎপাদন কম হলে বাইরে থেকে আমদানির কথা চিন্তা করা যেতে পারে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের পরিমাণ বেশি থাকলে স্বল্প মেয়াদে রপ্তানিরও অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। এতে একটা ভারসাম্য থাকবে। কৃষক বা ভোক্তা কেউই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। 

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ধান-চাল সংগ্রহের জন্য মিলারদের সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে। ১০ মে পর্যন্ত চুক্তি করার কথা ছিল। সেটা বাড়িয়ে ২০ মে পর্যন্ত করা হয়েছে। এরপরই পুরোমাত্রায় শুরু হবে সংগ্রহ অভিযান। যদিও এরই মধ্যে কিছু জায়গায় সংগ্রহ শুরু হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গতকাল জানান, এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ১০৬ টন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এখনো কোনো ধান সংগ্রহ হয়নি। তাঁরা বলেন, এখনই বাজার থেকে ধান কেনা হলে তাতে আর্দ্রতা বেশি থাকবে। তা সংরক্ষণ করা মুশকিল হবে। এ কারণে তাঁরা সংগ্রহ অভিযানে নামতে ঢিলেমি করছেন। এ ছাড়া সংগ্রহ অভিযানের সময় চালের যে দর থাকে সেই দরে তাঁদের পক্ষে চাল পাওয়া সম্ভব নয়। বাজার দর নাগালে এলেই সংগ্রহ শুরু করার জন্য মিলারদের চাপ দেবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মহসীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বোরোর ফলন এবার ভালো হয়েছে। হাওরের বোরো কাটা ৯৯.৯৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। অন্যান্য অঞ্চলের বোরোও ৭৩ শতাংশ কাটা হয়েছে। এ সময়ের ঝড়-বৃষ্টি ফসল ঘরে তোলার ক্ষেত্রে কিছুটা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। একটু বৃষ্টি শুরু হলেই কৃষি শ্রমিক মাঠ ছেড়ে চলে আসে বজ্রপাতের ভয়ে। ধান কেটে ঘরে আনলেও মানুষ শুকাতে পারছে না।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এবার প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২৪ টাকা, যা গত বছরের উৎপাদন খরচের চেয়ে দুই টাকা বেশি। আর গত বছরের তুলনায় চাল উৎপাদন খরচ কেজিতে বেড়েছে পাঁচ টাকা। এবার চাল উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৩৬ টাকা।

সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করেন অটো মিল, হাসকিং মিল ও মেজর মিলের মালিকরা। তাঁরা সরকারকে বলেছিলেন সংগ্রহ মূল্য ৪০ টাকা কেজি করার জন্য। তাঁদের যুক্তি, আমন মৌসুুমে সরকার চাল সংগ্রহ করেছে ৩৯ টাকা কেজি দরে; সব সময়ই বোরো চালের সংগ্রহ মূল্য বেশি ধরা হয়। এ কারণে তারা ৪০ টাকা দর নির্ধারণের সুপারিশ করেছিলেন। মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম লায়েক আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবার প্রচুর ফলন হয়েছে। এসব ফসল ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারলে চাল সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। আমরা এখনো ধান কেনা শুরু করিনি, তার কারণ হচ্ছে শ্রমিকের স্বল্পতা। যে শ্রমিক মাঠে ধান কাটছে সে শ্রমিকই তো চাতালে এসে ধান শুকাবে। তাহলে আমরা সংগ্রহ শুরু করব কিভাবে? এখনো বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরের মাঠে প্রচুর ধান রয়ে গেছে। ধান ঘরে উঠুক তারপর সংগ্রহ শুরু হবে।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এ মৌসুুমে ৪৯ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এতে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদন হবে। দেশের খাদ্য গুদামগুলোতে গতকাল পর্যন্ত চালের মজুদ ছিল প্রায় আট লাখ ২১ হাজার টন। মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের হাতে আছে প্রায় ৪০ লাখ টন চাল। আরো কিছু চাল বন্দরে রয়েছে। বোরো ধান কাটার হার ৮০ শতাংশ পার হলে বাজারে চালের সরবরাহ বাড়বে। তখন বাজারে চালের দামও কমবে। এর অপেক্ষায়ই রয়েছেন মিল মালিকরা। তখন তারা কম দামে কিনে সরকারের গুদামে চাল সরবরাহ করবেন। আর সরকারও সেই কম দামকে টার্গেট করেই বোরো চালের দর নির্ধারণ করেছে।


মন্তব্য