kalerkantho


হাওরের চিত্র

কৃষকের হাসি ম্লান হাটে গিয়ে

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ ও শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১৯ মে, ২০১৮ ০০:০০



কৃষকের হাসি ম্লান হাটে গিয়ে

সুনামগঞ্জের হাওরে এই দৃশ্য চিরচেনা। প্রতিবছর ধান কাটা শুরু হলে উৎসব পড়ে যায় চারদিকে। কিন্তু এবার কৃষকের গোলা ধানে ভরলেও মুখের হাসি মিলিয়ে যায় হাটে নিয়ে সেই ধান বেচতে গিয়ে। কারণ দাম নেই ধানের। ছবি : কালের কণ্ঠ

হাওরের ধান কাটা প্রায় শেষ। এখন উঁচু জমিগুলোর ধান কাটছে কৃষক। এবার প্রচুর ধান ফলেছে, গত কয়েক বছরের মতো বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়নি। কিন্তু শুরুতে কৃষকদের মাঝে যে উৎসবমুখরতা ছিল তা কেড়ে নিয়েছে ধানের বর্তমান বাজারদর। বাজারে ধানের যে দাম পাওয়া যাচ্ছে তাতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কৃষকের। সরকারের খাদ্য বিভাগ এখনো ধান কেনা শুরু করেনি। তাই ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না কৃষক। ধান ব্যবসায়ীরা যে দাম তাদের দিচ্ছেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাদের। ধানের আগে চাল কেনার সরকারের পদক্ষেপ থেকে কোনো সুফল পাচ্ছে না তারা। আর সরকারের ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রাও ‘খুব কম’ হওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়ছে।

কিশোরগঞ্জের এলংজুরি গ্রামের কৃষক টিটু মিয়া বলেন, সরকার ধান কেনা শুরু করেনি। ধান কিনছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা মণ দরে  বিক্রি হচ্ছে ধান। যে যেভাবে পারে সিন্ডিকেট করে কম দামে নিয়ে যাচ্ছে ধান। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের শনির হাওরের কৃষক গোলাম সরোয়ার বলেন, হাওরের কৃষকরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও ধানের দাম পাচ্ছে না। মাত্র ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে ধান বিক্রি হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার চামড়াঘাট হলো পাইকারি ধান কেনাবেচার বড় একটি বাজার। সেখানে দামের খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, নতুন বোরো হাইব্রিড মোটা ধান ৫৫০ টাকা, ব্রি ২৯ ধান ৬৩০ টাকা ও ব্রি-২৮ ধান ৬৫০ টাকা মণ দরে কেনাবেচা হচ্ছে। ধান বেচতে আসা সুতারপাড়া গ্রামের কৃষক মফিজ উদ্দিন হিসাব দেখিয়ে বলেন, ‘আমার এক মণ ধান উত্পাদনে কম করে হলেও ৮০০ টাকা খরচ পড়েছে। বর্তমান দরে ধান বেচলে উত্পাদন খরচই উঠবে না।’ তিনি বলেন, ‘সারা বছর খেটে যদি আসল টাকাই ঘরে নিতে না পারি তাহলে ধান চাষ হবে কিভাবে?’ করিমগঞ্জের চংনোয়াগাঁও হাওর ঘুরে দেখা গেছে, নগদ টাকা হাতে না থাকায় জরুরি প্রয়োজনগুলো মেটাতে বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের।

সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের ইটনার ইরাবিরা হাওরে গিয়ে দেখা যায় দল বেঁধে ধান কাটছে শত শত শ্রমিক। তদারক করছেন কৃষক মহির উদ্দিন। মাঝে মাঝে দ্রুত হাত চালাতে শ্রমিকদের উদ্দেশে হাঁকডাক দিচ্ছেন। যেকোনো সময় নামতে পারে বৃষ্টি। তাঁর চোখমুখে আনন্দ দেখা গেলেও কথায় হতাশা। ‘গতবার ৫০০ কাঠা জমি করছিলাম। এক ছডাক ধানও ঘরে নিতারছি না। এইবার জিদে বারো শ কাঠা জমি করছি। আল্লায় দিছেও দুই হাত ভইরা! এত সুন্দর ধান! দেখলে কইলজাডা ঠাণ্ডা অইয়া যায়। আর সব ধান ঘরো যায় আমিই ফাইবাম ১২ হাজার মণ ধান। কিন্তু বাজারদরের কারণে মনডা বালা না। সরহার বাজারদরটার দিকে খেয়াল দিলে আমরার উফকার অইত।’ বলছিলেন মহির উদ্দিন।

কিশোরগঞ্জ খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ধান কেনা শুরু না হলেও মিল মালিকদের কাছ থেকে ৩৮ টাকা কেজি দরে চাল কিনছে তারা। একটি সূত্র জানায়, এবার কিশোরগঞ্জে যে ধান হয়েছে তা থেকে প্রায় সাত লাখ টন চাল পাওয়া যাবে। অথচ এ জেলায় সরকারের চাল কেনার টার্গেট প্রায় পাঁচ হাজার টন মাত্র। অথচ পাশের ময়মনসিংহ জেলায় চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা ৫৩ হাজার টন। কিশোরগঞ্জে এ লক্ষ্যমাত্রা যদি বেশি থাকত তাহলে কৃষকরা কিছুটা হলেও উপকৃত হতো। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, কয়েক দিন আগে ২৬ টাকা কেজি দরে ধান কেনার একটি বরাদ্দ এসেছে। তবে তা ১৩ উপজেলার মধ্যে কেবল চারটি উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার জন্য। এ চার উপজেলা থেকে ধান কেনা হবে মাত্র দুই হাজার ২০০ টন। কৃষকরা বলছে, এ সামান্য পরিমান ধান কেনায় কৃষকের কোনো লাভ হবে না।

সোনারাঙা ধানের টানে ভোর থেকে রাত অবধি হাওরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে মহির উদ্দিনের মতো বহু কৃষক। আর সঙ্গে রয়েছে তাদের শ্রমিক বাহিনী। যদিও বর্তমানে তাদের শ্রমমূল্য অনেক বেশি, তাতেও ভ্রক্ষেপ নেই কৃষকের। চংনোয়াগাঁও গ্রামের আনোয়ারা মাঠ থেকে আনা ধান মাড়াইয়ের কাজ করছিলেন। তিনি জানালেন, ঘরে চাল নেই, এগুলো শুকিয়ে সিদ্ধ দিয়ে চাল করতে হবে। শ্রমিকরা ধান কাটছে, তাদের খাওয়াদাওয়া আছে। নিজেদের চাল দরকার। শুধু আনোয়ারা নন, গ্রামের সব নারী এখন আছেন কৃষকের পাশে। আনোয়ারা জানালেন, গতবার তাঁর মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গতবার সম্ভব হয়নি, এবার মেয়েকে ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন। অথচ গত বছরের এই দিনগুলো এমন উৎসবমুখর ছিল না এখানে। হাওরজুড়ে ছিল কৃষকের কান্না আর হাহাকার। কষ্টে বোনা ধান আর স্বপ্ন সব ভাসিয়ে নিয়েছিল অকালবন্যা।

ধান কাটা রেখে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ইটনার এলংজুরির কৃষক আবু সিদ্দিক। ‘গতবার ধারকর্জের দেড় লাখ টাকা খরচ করে ৮০ কাঠা জমিতে বোরো চাষ করেছিলাম। চোখের সামনে আধাপাকা সব ধান ভেসে গেল পানিতে। ঘরে এক কেজি চাল ছিল না। পেটে পাথর বেঁধে দিনগুলো কাটিয়েছি। আর আল্লাহ আল্লাহ করেছি এই দিনটির আশায়।’ তিনি বলেন, শুধু দামের দিকে সরকার যদি একটু নজর দিত, তাহলেই খুশি হতেন তিনি।

কৃষকরা বলছে, ধারণার চেয়েও বেশি ধান হয়েছে এবার। হাইব্রিডসহ বিভিন্ন জাতের ধান চাষ হলেও ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ বেশি চাষ করেছে তারা। এলংজুরি হাওরে মিঠামইনের গোপদীঘি গ্রামের ধানকাটা শ্রমিক মোজাম্মেল বলেন, কৃষকরা ধান পেলে শ্রমিকরাও খুশি হয়। এবার পারিশ্রমিক বাবদ অন্তত ৫০ থেকে ৬০ মণ ধান নিয়ে যাবেন ঘরে। তাতে বছরের খোরাক হয়ে যাবে। কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৬৫ হাজার ২৮২ হেক্টর। কিন্তু চাষ হয়েছে তার চেয়েও দুই হাজার হেক্টর বেশি জমিতে। যে ধান চাষ হয়েছে, তা থেকে চাল পাওয়া যাবে ছয় লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৮ মেট্রিক টন।

সুনামগঞ্জে বিআর ২৮ ও বিআর ২৯ ধানে কিছু চিটা হলেও এ বছর আবাদকৃত জমির সব কাটাতে পেরে খুশি কৃষকরা। তবে উত্পাদন খরচ বাড়ার বিপরীতে ধানের দাম না পাওয়ায় মুখ কালো হতে শুরু করেছে তাদের। পাঁচ দিন ধরে টানা রোদের কারণে কিষান-কিষানিদের ভিড়ে এখন হাওরের ধানখলা মুখর। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, বজ্রপাত, পাহাড়ি ঢল, বৃষ্টি ও শিলা আতঙ্কের মুখে অবশেষে হাওরের সম্পূর্ণ ধান কাটতে সক্ষম হয়েছে কৃষক। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কৃষি বিভাগের মতে, সব হাওরের প্রায় শতভাগ বোরো জমির ধান কাটা হয়ে গেছে।

কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাম্পার ফলনের কথা জানালেও কৃষকরা জানিয়েছে, ধান কাটার শুরুতে প্রায় সব হাওরে ব্লাস্ট রোগ আক্রমণ করায় কিছু ধানের ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া বীজতলা, ধান রোপণ, ধান কর্তন ও গোলায় তুলতে গিয়ে উত্পাদনমূল্য বহুগুণ বেড়ে গেছে। সে তুলনায় ধানের বাজারমূল্য এখন অনেক কম। এখন ধান সংগ্রহ অভিযানের খবরেও খুশি নয় তারা। ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা গত কয়েক বছরের তুলনায় একেবারে কম নির্ধারণ করায় কৃষকরা সরকারের কাছে বেশি ধান বিক্রির সুযোগ পাবে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জের দেড় শতাধিক হাওরে ১১ উপজেলায় প্রায় শতভাগ বোরো জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। এ বছর দুই লাখ ২২ হাজার ৭৭৯ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এ থেকে প্রায় আট লাখ ৮৮ হাজার টন চাল উত্পাদিত হবে, যার বাজারমূল্য প্রায় তিন হাজার ২৩৭ কোটি টাকার ওপরে। উত্পাদিত চাল জেলার খাদ্যচাহিদা মিটিয়ে আরো পাঁচ লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকার কথা জানিয়েছে জেলা খাদ্য বিভাগ।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩০ হাজার টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবার বাম্পার ফলন হলেও সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ছয় হাজার টন। এই সপ্তাহের মধ্যেই ধান সংগ্রহ শুরু হবে। লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে আবেদন জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত প্রতিদিনই বৃষ্টি ও বজ্রপাত হয়েছে হাওরাঞ্চলে। এর মধ্যে ফাঁকে ফাঁকে একটু রোদের দেখা পেলে কৃষকরা জমিতে ধান কাটার চেষ্টা করেছে। ১২ মে থেকে গত বুধবার পর্যন্ত দিনগুলো ছিল রোদ্রোজ্জ্বল। এই সুযোগে হাওরের কৃষক কেটে আনা ধান শুকিয়েছে ক্লান্তিহীন। কৃষকরা জানায়, গতবার ফসল হারানোর কারণে গবাদি পশুর খাদ্য খড় নিয়ে উত্কণ্ঠায় ছিল। এবার পুরো ধান কাটতে সক্ষম হওয়ায় খড় নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। দিরাই উপজেলার শ্যামার চর এলাকার কৃষক নেতা অমর চাঁদ দাস বলেন, ‘লাভ-লসের হিসাব পরে, ধান কেটে তুলতে পারছে—এটাই এখন বড় ঘটনা। তবে ধানের মূল্য অনেক কম।’

হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক ইছব আলী বলেন, ধানের বীজতলা তৈরি, ধান রোপণ, কাটা ও গোলায় তুলতে পরিবহন খরচ অত্যধিক হয়ে গেছে। নিজের শ্রমমূল্য বাদ দিয়েও উত্পাদন খরচ উঠছে না। ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলন সূত্রে জানা গেছে, পুরো ধান কেটে গোলায় তুললেও উত্পাদনমূল্য পাচ্ছে না কৃষক। হাওরে প্রতি ৩০ শতাংশ জমিতে চারা গজানো, ধান রোপণ, সার, কীটনাশক দেওয়া, ধান কাটাসহ ধান ঘরে তুলে আনতে কৃষকের নিজের পরিশ্রম ছাড়াই প্রায় আট হাজার টাকা খরচ হয়। এই পরিমাণ জমিতে ধান উত্পাদন হয় প্রায় ১২-১৫ মণ। তবে এ বছর বিআর ২৮ ধানে চিটার পরিমাণ বেশি থাকায় উত্পাদন কম হয়েছে। সরকারি হিসাবে ধানের মূল্য এবার মণপ্রতি এক হাজার ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও হাওর এলাকায় এখন ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০-৭০০ টাকায়। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হচ্ছে।

 


মন্তব্য