kalerkantho


ফলপ্রসূ আলোচনায় নতুন যুগের সূচনা

সিঙ্গাপুরে ট্রাম্প-উন ঐতিহাসিক বৈঠক

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ফলপ্রসূ আলোচনায় নতুন যুগের সূচনা

স্নায়ুযুদ্ধকালীন দুই বৈরী দেশ সম্পর্কের বরফ গলিয়ে নতুন দিনের বার্তা দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। অতীতের সব তিক্ততা ভুলে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ঘোষণা দিয়েছেন, এখন থেকে একসঙ্গে পথ চলবেন তাঁরা। এই ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই রচনা করবেন নতুন ভবিষ্যত্। অব্যাহত থাকবে সহযোগিতা।

এই সহযোগিতা নিশ্চিত করতেই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া আর চালাবেন না তিনি।ইঙ্গিত দিয়েছেন, দক্ষিণে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ হাজার সেনাকেও বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে।অবধারিতভাবেই উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তার নিশ্চয়তাটিও ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির তালিকা থেকে বাদ পড়েনি।

প্রতিশ্রুতি দেওয়াতে কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই উত্তর কোরিয়ার উনও। তিনি বলেছেন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে তাঁর দেশের কোনো আপত্তি নেই।নজরদারির জন্য খুশিমতো পর্যবেক্ষকদের আতিথেয়তা দিতে চান তিনি। উন এখন গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু পরীক্ষাক্ষেত্র বন্ধ করে দিতেও এক পায়ে খাড়া।

তবে দুই নেতা যে শুধুই প্রতিশ্রুতির বিনিময় করেছেন তা নয়, পরস্পরকে প্রশংসার স্রোতেও ভাসিয়েছেন তাঁরা। মাত্র মাস ছয়েক আগে উনের দৃষ্টিতে ট্রাম্প ছিলেন ‘ভীমরতিগ্রস্ত বুড়ো’। আরএখন সেই ‘পাগলা বুড়োর’ সঙ্গেই উন হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আলো ছড়ানো হাসি দিয়ে ছবি তোলার জন্য পোজ দিচ্ছেন। আর তাঁর চেয়ে আরো দু-কাঠি সরেস স্বয়ং ট্রাম্প। ‘বেঁটে, মোটা রকেটম্যান’ উন এখন ট্রাম্পের দৃষ্টিতে ‘অসাধারণ প্রতিভাবান’ যুবক। তাঁকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানাতে চান ট্রাম্প। ভবিষ্যতে সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করার আশা রাখেন।

সিঙ্গাপুরের সেন্টোসা দ্বীপের ক্যাপেলা হোটেলে গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় মঞ্চে অবতীর্ণ হন ট্রাম্প ও উন। হাত মেলান দুই ভিন্ন বয়সের (ট্রাম্পের ৭১ আর উন মধ্য তিরিশে), ভিন্ন মতাদর্শ আর আচরণের দুই নেতা। ১২ সেকেন্ডের ওই দৃঢ় করমর্দনের মাধ্যমে রচিত হয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছিল পুরো বিশ্ব। ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন একটি অধ্যায়। তবে বিপরীত মেরুর চরম বৈরী দুই নেতার মধ্যে সাক্ষাতের সাক্ষী এর আগেও হয়েছে বিশ্ববাসী। গতকাল ট্রাম্প-উনের এই করমর্দন মনে করিয়ে দেয় ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চীন সফর, অথবা রোনাল্ড রিগ্যানের রুশ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের সঙ্গে ১৯৮৬ সালের রিকজাভিকের শীর্ষ সম্মেলনটিকে।

ছবি তোলার পর বৈঠকে বসেন উন ও ট্রাম্প। দোভাষীর মাধ্যমে ৪৫ মিনিটের এই বৈঠকের পর দুই নেতা মধ্যাহ্নভোজ সারেন। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় দুই নেতা একসঙ্গে কাটিয়েছেন।একটি যৌথ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বৈঠকের ইতি টানেন ট্রাম্প ও উন। কিমের সঙ্গে এই বৈঠককে ‘অভূতপূর্ব’ বলে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। আর বৈঠক শুরুর আগেই উন বলেন, ‘অতীত আমাদের পেছনের দিকে টেনে রেখেছিল। আমাদের চোখ-কান ঢেকে রেখেছিল পুরনো চর্চা আর কুসংস্কার।তবে আমরা সে সব কিছু সরিয়ে ফেলে আজএখানে পৌঁছতে পেরেছি।’ তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানাতে হাত তুলে তাঁকে বাহবা দেন ট্রাম্প।মূলত চারটি বিষয়কে সামনে রেখে এই যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়। এগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দুই দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষানুযায়ী সহযোগিতার ভিত্তিতে ‘নতুন ইউএস-ডিপিআরকে (ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া) সম্পর্ক’ স্থাপনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। ওদিকে উত্তর কোরিয়াকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। কোরীয় উপদ্বীপে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র ও ডিপিআরকে যৌথ উদ্যোগ নেবে। এবং চলতি বছরের ২৭ এপ্রিলের পানমুনজম ঘোষণা পুনর্নিশ্চিত করে কোরীয় উপদ্বীপকে পুরোপুরি পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করতে ডিপিআরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। এ ছাড়া যুদ্ধবন্দিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একমত হয় তারা।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কোরিয়া উপদ্বীপে ওই যৌথ মহড়াকে ‘খুবই উসকানিমূলক’ এবং ‘ব্যয়বহুল’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। উত্তর কোরিয়াকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশ দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিবছরই নিয়মিত এ সামরিক মহড়া দিয়ে আসছে। এ মহড়াকে ‘যুদ্ধের উসকানি’ বলেই মনে করে উত্তর কোরিয়া।

সিঙ্গাপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘ওই যুদ্ধ মহড়া (ওয়ার গেম) খুবই ব্যয়বহুল। এ মহড়া অনুষ্ঠানের জন্য বেশির ভাগ অর্থ আমরাই দিতাম।বর্তমান পরিস্থিতিতে, যেহেতু আমরা আলোচনা করছি...আমার মনে হয় ওই যুদ্ধ মহড়া চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।’ একে স্পষ্টতই বড় ধরনের ছাড় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধ করার কথা বলে ট্রাম্প আসলে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে জানতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। ব্লু হাউসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যের যথার্থ অর্থ বা তার আসল উদ্দেশ্য আমাদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন।’ যদিও দেশটির প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন গতকালের বৈঠক নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। এই বৈঠককে ঐতিহাসিক আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘সামনের পথ খুব কঠিন হলেও আমাদের আর পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই।’

এ সময় ট্রাম্পকে আরো প্রশ্ন করা হয়, উত্তর কোরিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর উনের সঙ্গে কথা হয়েছে কি না। ট্রাম্প ইতিবাচক জবাব দিলেও এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাননি। প্রায়এক ঘণ্টা স্থায়ী এ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, উনের সঙ্গে তাঁর একটি বিশেষ বন্ধন গড়ে উঠেছে।শিগগিরই তাঁর সঙ্গে আবার দেখা হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ ছাড়া তিনি বলেন, দুই কোরিয়ার মধ্যে অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে যে যুদ্ধ স্থিতাবস্থায় রয়েছে তাও দ্রুতই শেষ হবে।

তবে এখনই উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে      নেওয়া হবে না। পরিস্থিতির অগ্রগতি বিবেচনা করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।  যদিও ট্রাম্পের মতো আশাবাদী নন বিশ্লেষকরা।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের মেলিসা হ্যানডাম এক টুইট বার্তায় বলেন, উত্তর কোরিয়া এর আগেও বহুবার এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে কখনোই রক্ষা করেনি। তা ছাড়া এবার কী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়াএ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে সে ব্যাপারেও কোনো বক্তব্য তাদের তরফ থেকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে ট্রাম্প ও উনের এই বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছে চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বহু দেশ ও সংস্থা।সার্বিকভাবে এই সম্মেলন থেকে উত্তর কোরিয়াই বেশি লাভবান হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সূত্র : বিবিসি, এএফপি, সিএনএন, দি ইনডিপেনডেন্ট।


মন্তব্য