kalerkantho


সদকাতুল ফিতরের বিধিবিধান

মুফতি শাহেদ রহমানি

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



সদকাতুল ফিতরের বিধিবিধান

সদকাতুল ফিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা রমজানুল মুবারকের শেষে ঈদুল ফিতরের দিন আদায় করতে হয়। এটা ‘ফিতরা’ নামেও পরিচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ ইসলামের অন্য মৌলিক ইবাদতের মতো সদকাতুল ফিতরও নিয়মিত আদায় করে আসছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন, অনর্থক অশালীন কথা ও কাজে রোজার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণের জন্য এবং নিঃস্ব লোকের আহার যোগানোর জন্য।’ (আবু দাউদ হাদিস : ১৬০৯)

জারির (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রমজানের রোজা সদকাতুল ফিতর আদায় করার আগ পর্যন্ত আসমান-জমিনের মধ্যে ঝুলন্ত থাকে।’ (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব  : ২/৯৬)

সদকাতুল ফিতর আদায়ের পরিমাণ : সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ সম্পর্কে হাদিস শরিফে দুটি মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে : তা হচ্ছে (‘সা’) ও (‘নিসফে সা’)।

খেজুর, পনির, জব ও কিশমিশ দ্বারা আদায় করলে এক ‘সা’=৩২৭০.৬০ গ্রাম (প্রায়), অর্থাৎ তিন কেজি ২৭০ গ্রামের কিছু বেশি। আর গম দ্বারা আদায় করলে ‘নিসফে সা’= ১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম বা ১.৬৩৫৩১৫ কেজি (প্রায়), অর্থাৎ ১ কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি প্রযোজ্য হবে। (আওযানে শরইয়্যাহ পৃ. ১৮)। বাংলা সের হিসেবে ১ ‘সা’-এর পরিমাণ তিন সের ৬ ছটাক এবং আধা ‘সা’-এর পরিমাণ ১.৫ সের ৩ ছটাক। (কিতাবুন নাওয়াযেল ৭/২৪৩)  

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) একজন ঘোষক প্রেরণ করেন যেন মক্কার পথে পথে এ কথা ঘোষণা করে : জেনে রেখো! প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, গোলাম-স্বাধীন, ছোট-বড় সবার ওপর সদকায়ে ফিতর অপরিহার্য। দুই মুদ (আধা সা) গম কিংবা এক সা অন্য খাদ্যবস্তু। (তিরমিজি : ১/৮৫)। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রমজানের শেষ দিকে বসরার মিম্বারের ওপর খুতবা দানকালে বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর গোলাম-স্বাধীন, নারী-পুরুষ ও ছোট-বড় প্রত্যেকের ওপর অপরিহার্য করেছেন এক সা খেজুর বা জব কিংবা আধা সা গম। (আবু দাউদ : ১/২২৯)। এই খাদ্যবস্তুর পরিবর্তে সেগুলোর মূল্য আদায় করারও অবকাশ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে উল্লিখিত খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটিকে মাপকাঠি ধরে তার নির্ধারিত পরিমাণ যথা—‘সা’ বা ‘নিসফে সা’ এর বাজারমূল্য আদায় করলেও সদকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার  : ২/৩৬৬)

এখানে স্মর্তব্য যে মূল্যের দিক থেকে ওই খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্যে যেহেতু তফাৎ আছে, তাই সবচেয়ে কম দামের বস্তুকে মাপকাঠি ধরে কেউ যদি সদকাতুল ফিতর আদায় করে, তাহলেও তা আদায় হায়ে যাবে। বর্তমান বাজারদর হিসাবে যেহেতু গমের দামই সবচেয়ে কম, তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রতিবছর আধা ‘সা’ গমকে মাপকাঠি ধরে ওই সময়ের বাজারদর হিসাবে তার মূল্য ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ ঘোষণা করা হয়। এ বছর তা সর্বনিম্ন ৭০ টাকা। কেননা ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ সেটিই, যা সুন্নাহে উল্লিখিত খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্যে পরিমাণ ও বাজারদরের বিচারে সর্বনিম্ন। টাকার অঙ্কে সর্বনিম্ন ফিতরা এই মানদণ্ডের ভিত্তিতেই হবে। তবে উত্তম হলো, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্তুকে মাপকাঠি ধরে সদকাতুল ফিতর আদায় করা। কেননা সদকার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হলো গরিবদের প্রয়োজন পূরণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ। এর পাশাপাশি আদায়কারীর সামর্থ্যকেও বিবেচনায় রাখা হয়। অতএব এ দিক বিবেচনায় রেখে সামর্থ্যবানদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্তু যথা এক ‘সা’ খেজুর, পনির ও কিশমিশ ইত্যাদিকে মাপকাঠি ধরে সদকাতুল ফিতর আদায় করাই বাঞ্ছনীয়।

লেখক : সিইও, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

 


মন্তব্য