kalerkantho


ছাদেকের মোবাইল

মো. ঘাবিব

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ছাদেকের মোবাইল

সহজ-সরল ছেলে ছাদেকের খুব শখ একটি মোবাইল। কিন্তু মোবাইল সম্পর্কে তার জ্ঞান একেবারে শূন্য। তবুও টাকা-পয়সা জোগাড় করে সে একটা ফোন কিনেই ফেলল। ভাবল, প্রথমেই বন্ধু মিজানকে কল করে সারপ্রাইজ দেবে। সে সবুজ বোতাম চাপ দিয়ে কানের কাছে ধরল। তত্ক্ষণাত্ শুনতে পেল একটি মিষ্টি মেয়েলি কণ্ঠ, ‘আপনার অ্যাকাউন্টে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা নেই। রিচার্জ করুন।’

যতবার কল করল, ততবারই একই কথা। ছাদেক বিরক্ত হয়ে ধমক দিল, ‘ম্যাডাম...চুপ করেন তো। আমি কল দেই আমার বন্ধুকে অথচ নির্লজ্জের মতো বারবার আপনি ফোন ধরেন। এবারই শেষ। আর সহ্য করব না।’

কথা বলতে বলতে ছাদেক খেয়াল করল, মেয়েটি চুপ হয়ে গেছে। সে এবার তার বন্ধু মিজানের উদ্দেশে বলতে শুরু করল—‘দোস্ত, কেমন আছিস? মোবাইল ছাড়া আর কত দিন থাকব, বল? তাই এবার কিনেই ফেললাম। কিন্তু ফোন করলেই একটা মেয়ে ধরে। কে রে? তোর কোনো আত্মীয় নাকি?’

মিজান কোনো জবাব দিচ্ছে না দেখে তার মনে একটু সন্দেহ হলো, ‘মোবাইল নষ্ট হয়ে যায়নি তো!’

মোবাইল পরীক্ষা করার জন্য সে তার আরেক বন্ধুর নম্বরে ফোন করে কানে ধরল। আগের মেয়েটি আবার একই কথা বলছে। এবার ছাদেক নিশ্চিত হলো, মোবাইল নষ্ট। সে দোকানে ফিরে গেল। শুনে মোবাইল দোকানের মালিক বলল, ‘মোবাইলে টাকা ভরতে হবে; না হয় কথা বলা যাবে না।’

ভদ্রলোক রিচার্যের দোকান দেখিয়ে দিল।

ছাদেক সেখানে এসে বলল, ‘ভাই বিশ টাকা ভরেন।’

নম্বর বলেন।

সাদেক আমতা আমতা করে ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে নম্বরটি বলল।

দোকানদার বলল, ‘ঠিক আছে চলে যান, আপনার কাজ হয়ে গেছে।’

ছাদেক সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দোকানদারের দিকে। কারণ সে দেখেছে, দোকানদার ২০ টাকা ক্যাশ বাক্সে ভরেছে, মোবাইলে না। বুঝতে পারল, সে ঠকবাজের পাল্লায় পড়েছে। তাই রাগান্বিত হয়ে বলল, ‘আমাকে মফিজ পেয়েছেন? আমি দেখেছি আপনি টাকা ক্যাশ বাক্সে ভরেছেন, মোবাইলে না। তাড়াতাড়ি লাইনমতো কাজ করেন, নইলে খবর আছে।’

দোকানদার অবাক, নিশ্চয়ই ছেলেটির স্ক্রু ঢিলা। সে বলল, ‘এটা বিশেষ ধরনের ক্যাশ বাক্স। এখানে টাকা ভরলে মোবাইলে অটোমেটিক চলে যায়। চিন্তার কারণ নেই। কল করে দেখেন, টাকা চলে এসেছে।’

ছাদেক ভাবল, এখন তো দূর থেকে টেলিভিশন চালানো যায়। এটাও ওই রকম কোনো কেরামতি হবে। এ নিয়ে বেশি তর্ক করা যাবে না। তাহলে দোকানদার আমাকে মফিজ ভাবতে পারে। সে বাড়ি ফিরে এলো।

রাতে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করল, পরিচিতজনদের তার মোবাইল ক্রয়ের সংবাদটা জানানো উচিত। কিন্তু এতজনকে কল করলে সব টাকা শেষ হয়ে যাবে। সে আগেই জেনেছিল, মিসড কল দিলে টাকা কাটা যায় না। অগত্যা মিসড কল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তার কাছে অনেকের নম্বর লেখা ছিল। সেখান থেকে রিতার নম্বরটা নিয়ে কল করল। রিং বাজছে। রিতা রিসিভ করে বলল, ‘হ্যালো।’

ছাদেক হেসে বলল, ‘রিতা, আমি ছাদেক। আজ মোবাইল কিনেছি। ভাবলাম তোকে একটা মিসড কল দিই। এইটা মিসড কল দিলাম। পরে কথা বলব। এখন রাখি।’

রিতা অনেক কষ্টে হাসি চেপে বলল, ‘ছাদেক, খুব ভালো করেছিস মিসড কল দিয়ে। তুই এভাবে মাঝেমধ্যে মিসড কল দিস। কেমন?’

আচ্ছা। তাহলে এখন রাখি।

ছাদেক এবার বন্ধু কাজলকে মিসড কল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। কাজল কল রিসিভ করতেই ছাদেক বলল, ‘হ্যালো কাজল, আমি ছাদেক। শোন, আমি একটা মোবাইল কিনেছি। ভাবলাম তোকে মিসড কল দিয়ে খবরটা জানাই। এইটা সেই মিসড কল। পরে ভালোভাবে কল দিব, কেমন!’

কাজল হাসতে হাসতে বলল, ‘তুই নাকি রিতাকেও মিসড কল দিয়েছিস?’

রিতা বলেছে?

একটু আগে আমাকে ফোন করে জানাল। আর কাকে মিসড কল দিয়েছিস?

আর কাউকে দেই নাই।

ঠিক আছে, তুই সবাইকে মিসড কল দিতে থাক। আমি রাখলাম।

এভাবে আরো কয়েকজনকে মিসড কল দেওয়ার পর যখন মিশু আপুকে মিসড কল দিতে গেল, আবার সেই নারী কণ্ঠস্বর, ‘আপনার অ্যাকাউন্টে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা নেই। রিচার্জ করুন।’

ছাদেক অবাক! সে তো একটু আগে ২০ টাকা ভরেছে। তাহলে টাকাটা গেল কোথায়? সে তো শুধু মিসড কলই দিয়েছে। এখন পর্যন্ত একটা ভালো কল করেনি। সাদেক ভাবল, এই মহিলা ঠকবাজ। টাকা ছাড়া আর কিছু চিনে না। সে আবার চেষ্টা করল মিসড কল দিতে, কিন্তু শুনতে পেল সেই আগের কথাই। ছাদেক বলল, ‘এই যে ম্যাডাম, শুধু একবার বলেন, ছাদেক আমি তোমাকে ভালোবাসি। তাহলে আমি আবারও ২০ টাকা ভরতে রাজি আছি।’

অনেকবার বলার পরও ম্যাডাম সে কথা বলল না। ছাদেক মন খারাপ করে ঘুমিয়ে পড়ল। পরদিন রিতার সঙ্গে দেখা। রিতা হেসে বলল, ‘ছাদেক, তুই আজ আমাকে মিসড কল দিবি তো?’

ছাদেক মুখ ভার করে জবাব দিল, ‘কেমনে দিব? মিসড কল দিতেও যে টাকা লাগে, সেটা জানিস না!’


মন্তব্য