kalerkantho


পৃথিবীর কোড

ধ্রুব নীল

৩০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পৃথিবীর কোড

আন্ত মহাকাশীয় সম্মেলনে সচরাচর পৃথিবীকে বিশেষ পাত্তা দেওয়া হয় না। ছোটখাটো গ্রহ, মানুষগুলোও অন্য গ্রহের প্রাণীদের চেয়ে একটু হ্যাংলা-পাতলা। তবে বুদ্ধিসুদ্ধির কারণে মাঝে মাঝে মানুষদের ডাকা হয়। আজকের সম্মেলনের কথা আলাদা। সম্মেলন ডাকাই হয়েছে পৃথিবী ঘিরে। নজিরবিহীন ঘটনা। আর পৃথিবীর একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন মহাকাশবিজ্ঞানী বজলু খন্দকার। একটু পর পর কৌটা থেকে পান বের করে খাচ্ছেন আর উপস্থিত বক্তাদের কথা এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিচ্ছেন। তাঁর পান চিবানো দেখে একটু পর পর মহাবিরক্ত হয়ে জিব নাচাচ্ছে উলুলু গ্রহের লিকলিকে এক প্রতিনিধি। বিজ্ঞানী বজলু নির্বিকার। উলুলুর দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটলেন। প্রাণীটা খুশি হয়ে গেল। তাদের গ্রহে ভেংচি কেটেই সম্মান দেখানো হয়। পৃথিবীর প্রতিনিধি হিসেবে বিজ্ঞানী বজলুকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে ডাকা হলেও তিনি ভাবলেশহীন। তিনি অবশ্য এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না ঘটনা আসলে কী।

পরিচয়পর্ব আর ছোটখাটো সমস্যার কথা বলল অনেকে। শেষের দিকে এসে আসল কথা বলতে শুরু করল স্যারকারান গ্রহের বিদঘুটে এলিয়েনটা। তার কথাবার্তা, আচার-আচরণ পুরোই স্বৈরাচারের মতো।

‘মাননীয় মহাকাশীয় প্রাণীবৃন্দ। আপনারা জানেন, আমরা মানে স্যারকারানিয়ানরা এই মহাকাশে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও সম্পদে ভরপুর প্রাণী। আমাদের কাছে এই মহাবিশ্বের সর্বাধুনিক অস্ত্র থেকে শুরু করে সবই আছে, যা কারো কাছে নেই। আমরা চাইলেই যেকোনো গ্রহকে নিমেষে উড়িয়ে দিতে পারি। এ কারণে আপনাদের কেউ কেউ আমাদের গোলামি করেন, কেউ কেউ আমাদের উপহার দেন। আমরা সময়ে সময়ে আপনাদের নিরাপত্তাও দিই। কিন্তু আমাদের সুযোগ-সুবিধাও আপনাদের দেখতে হবে, নাকি? সম্প্রতি আমাদের বৃহস্পতি গ্রহের গ্যাসের দিকে নজর পড়েছে। ওটার গ্যাস আমাদের লাগবে। এদিকে আমাদের মধ্যে যাঁরা ধনী, তাঁদের মঙ্গল ও শুক্র গ্রহটা পছন্দ হয়েছে। তাঁরা এ দুটি গ্রহে রিসোর্ট বানাতে চান। রিসোর্ট বানাতে গ্যাস নিয়ে যেতে হবে সেখানে। তারপর আবার নিয়মিত যাতায়াতও করবেন তাঁরা। কিন্তু এই রুটের ঠিক মাঝে এসে পড়েছে পৃথিবী। গ্রহটা আমাদের মোটেও পছন্দ নয়। বাজে ধরনের সবুজ একটা প্রাণীতে ভরা এ গ্রহ। কথা নাই, বার্তা নাই সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকে আর বিষাক্ত অক্সিজেন ছাড়ে ওটা। আপনারা জানেন, অক্সিজেন জিনিসটা কত খারাপ। আমাদের মতো কার্বন ডাই-অক্সাইড ভিত্তিক প্রাণের জন্য এটা মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। তা ছাড়া মঙ্গল থেকে শুক্রে যাওয়ার পথে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিটাও বাগড়া বাধায়। আমাদের স্পেসশিপগুলোকে হিসাব-নিকাশ করে চলতে হয়। তো বুঝতেই পারছেন আমাদের সমস্যা হলো পৃথিবী। তাই আমরা ঠিক করেছি পৃথিবীটাকে সৌরজগৎ থেকে সরিয়ে দেব। মানুষগুলো এতে মরে যেতে পারে। তবে যারা আমাদের গোলামি মেনে নেবে, তাদের আমরা ক্রাশিয়ামপুর গ্রহে পাঠিয়ে দেব। ওটা আকারে বড়সড়। বিচ্ছিরি সবুজ প্রাণীও আছে সেখানে। তাদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিষাক্ত অক্সিজেনও পাঠিয়ে দেব। এখন এ বিষয়ে আপনাদের ভোট দরকার। ভোট পেলে সুবিধা হয়। আর না পেলে আপনাদেরও ঘোর বিপদ। কী বলেন ভাইসব?’

বিজ্ঞানী বজলু ভেবেছিলেন ঘুম দেবেন। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ঘুমাতে পারছেন না। সবার দিকে তাকালেন। কেউ টুঁ শব্দ করছে না। পাগল নাকি! একটা গ্রহকে সরিয়ে দেবে ওরা আর কেউ প্রতিবাদ করছে না! বিজ্ঞানী বজলু উত্তেজনায় আরেকটি পান মুখে দিলেন। তাঁর মুখে এখন দুটি পান। তিনি হালকা করে কাশলেন। পানের পিক ফেলে বললেন, ‘দেখো ভাই স্যাকারিন, আমরা শান্তিপ্রিয় প্রাণী। পৃথিবীর গাছ আর অক্সিজেন তোমাদের ভালো না লাগতে পারে, কিন্তু আমাদের বেশি ঘাঁটিও না।’

‘ঠাঁ ঠাঁ ঠাঁ...হাসালে আমায় হে মানুষ। চাইলে তোমাকে এখুনি...।’

‘চাইলে তুই আমার কিছুই করতে পারবি না রে হাঁদারাম!’

নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না বজলুর। পুরোপুরি অন্ধকারে ঢিল ছুড়লেন। প্রাণীটার ক্ষমতার কথা টুকটাক শুনেছিলেন। কিন্তু তাই বলে এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভরা মজলিশে ক্ষমতাধর এলিয়েনকে খেপানো ঠিক হলো কি না...।

‘হুঁঠুর পুঁচ মাচুন! (মানুষটা বলে কী!)’

‘ব্যাটা বাংলায় বল! তুই ভেবেছিস তোদের গোপন খবর আমার জানা নেই। আমি বাংলার বিজ্ঞানী বজলু, পৃথিবীর বিজ্ঞানী। গ্যালাক্সির কোনো এলিয়েন আমাদের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে পারে নাই। আর তুই এসেছিস আমাদের গ্রহ নষ্ট করতে!’

বিজ্ঞানী বজলুর আচমকা এত সাহসের পেছনে কলকাঠি নাড়াচ্ছে রোবট মন্টু মিয়া। সে এতক্ষণ ধরে বিজ্ঞানীর কানে লাগানো হেডফোনে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিল। স্যারকারান গ্রহের দুর্বলতা খুঁজছিল সে। পেয়েও গেছে মোক্ষম একটা। আর সেটাই সে বিজ্ঞানীকে জানিয়ে দিয়েছে।

বিশাল শরীর নিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল স্যারকারানিয়ানটা। অন্য এলিয়েনরা ভয়ে নড়াচড়া বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ কেউ ভয়ে নিজেকে অদৃশ্যও করে ফেলেছে। বিজ্ঞানী বজলু অনড়। স্যারকারানিয়ানটাকে দেখে মনে হচ্ছে সে খানিকটা ঘাবড়েও গেছে। পৃথিবীর মানুষটা এত সাহস পেল কোথা থেকে বুঝে উঠতে পারছে না। এদিকে বিজ্ঞানীর কানে কানে বলে দিল রোবট মন্টু—‘স্যার, আমি রেডি। শয়তানডারে কন হাইপার-স্যাটেলাইট রেডি। এখন ট্রান্সমিশন দিয়া দিমু।’

মন্টুর কথা শুনে সাহস দ্বিগুণ বেড়ে গেল বিজ্ঞানীর।

‘ওহে স্যাকারিনের বাচ্চা! তোর গ্রহের প্রাণীদের মধ্যে একটা জিনিস নাই। সেটার ট্যাবলেট আছে আমার কাছে। মানুষের নিউরনের সবচেয়ে বড় কোডিংটা ডিকোড করেছি আমি। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ওটা। সেটা এখন তোর গ্রহের প্রাণীগুলোর দিকে তাক করা। সুইচে চাপ দিলেই ওই কোডিং তোদের গ্রহের প্রাণীরা লুফে নেবে। আর এটা নেশার মতো। একবার ধরলে ছাড়াছাড়ি নাই। একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে যাবে ওটা। খুব ছোঁয়াছে।’

দাঁড়িয়ে গেল স্যারকারানিয়ানটা। ‘কিসের কোডিংয়ের কথা বলছ হে নিকৃষ্ট মনুষ্য! ঠাঁ ঠাঁ ঠাঁ!’

বিচ্ছিরি হাসিটা শেষ হওয়ার আগেই পকেটে থাকা সুইচে চাপ দিলেন বজলু। ঘটনা কী ঘটল তা উপস্থিত কেউ টের পেল না। তবে থমকে দাঁড়াল স্যারকারানিয়ান। কেমন যেন মিইয়ে গেছে ও। সবাই হাঁ করে বিজ্ঞানীর দিকে তাকিয়ে আছে। স্যারকারানিয়ানটা হঠাৎ দৌড়ে এসে তিন-চারটি শুঁড় বাড়িয়ে বিজ্ঞানী বজলুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল। বিকট সেই কান্না দেখে বিজ্ঞানী বজলু ঘাবড়ে গেলেন। কানের কাছে মন্টুর আশ্বাস ‘ডরাইয়েন না স্যার। তারেও ধরছে কোডিংটায়।’

বিজ্ঞানী বজলু এবার গলা খানিকটা খাদে নামিয়ে বললেন, ‘উপস্থিত সুধী। পৃথিবী ছোটখাটো গ্রহ সন্দেহ নাই। তবে আমার ক্ষুদ্র গবেষণায় যা দেখেছি, তা হলো একমাত্র পৃথিবী নামের গ্রহে একটা জিনিস আছে, যা আপনাদের মতো বড় বড় গ্রহের ক্ষমতাধর এলিয়েনদের মাঝে নেই। এটা একটা বিশেষ নিউরাল কোডিং, যার স্বাদ কোনো খাবার বা সম্পদে আপনারা পাইবেন না। আপনাদের নিউরাল নেটওয়ার্ক ওইভাবে তৈরিই হয় নাই। তবে হ্যাঁ, আমি মানুষের ওই কোডিংয়ের এমন এক ভার্সন তৈরি করেছি, যা আপনাদের মগজে বসাইয়া দেওয়া যাইবে। এই মাত্র যা স্যারকারানিয়ানদের মাথায় ঢোকানো হয়েছে। তারা এখন আর কারো ক্ষতি করবে না। উল্টো উপকার করে বেড়াবে। এখন আপনারাও কি সেই কোডিংয়ের স্বাদ পাইতে চান?’ একযোগে উপস্থিত সব এলিয়েন সায় দিল। বিজ্ঞানী বজলু আরেকটি পান মুখে পুরে ওয়্যারলেস ফোনে রোবট মন্টুকে নির্দেশ দিলেন, ‘ও মন্টু, এইখানকার সব এলিয়েন ভাইয়ের মাথায় ভালোবাসার কোডটা ঢুকাইয়া দাও।’


মন্তব্য