kalerkantho


টেলিফোন বিভ্রাট

সত্যজিৎ বিশ্বাস

২২ মে, ২০১৮ ০০:০০



টেলিফোন বিভ্রাট

আহসান আহমেদ অফিসের বড় সাহেব। মাস ছয়েক বাদেই অবসরে যাবেন। আজ বাসা থেকে বেরিয়েছেন একটু হাঁটাহাঁটি করবেন বলে। কিছুদূর যেতেই দেখেন, অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের ফরিদ সাহেব ব্যাগ হাতে তরকারিওয়ালার সঙ্গে দরদাম করছেন। মাথায় একটা প্রশ্ন চক্কর দেওয়ায় হাত বাড়িয়ে ডাকতে গিয়েও ডাকলেন না। মনে মনে ভাবলেন, এত দিন একসঙ্গে চাকরি করছেন, অথচ অফিসের কাজ ছাড়া একবারের জন্যও কাউকে ফোন দিয়ে কুশলবিনিময় করেননি। একটা অজানা অপরাধবোধে মনটা খারাপ করে বাসার পথে রওনা দিলেন।

বাসায় ফিরে গোসল সেরে এক কাপ চা আর মোবাইল ফোন নিয়ে বসলেন ড্রয়িংরুমের সোফায়। প্রথমেই ফোন দিলেন অফিসে যাকে সবচেয়ে বেশি ঝাড়ি মারেন, সেই তমাল সাহেবকে।

‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে, তোমার মুখের কথা না শুনিলে, পরান আমার রয় না পরানে’ রিংটোনে গায়ক পুরো লাইনটা গেয়ে শোনালেও তমাল সাহেবের গলা শোনা গেল না। ভ্রু কুঁচকে আবার ফোন দিলেন আহসান সাহেব। কেটে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে হাঁপাতে হাঁপাতে ফোন ধরলেন তমাল।

—কী ব্যাপার, তমাল? হাঁপাচ্ছেন কেন?

—স্যার, আপনার ফোনটা দৌড়ে ধরার জন্যই হাঁপাচ্ছিলাম। স্যরি।

—আরে না, না, স্যরির কী আছে? ছুটির দিনে ব্যস্ততা থাকতেই পারে। তা, কী করছিলেন?

—কিছু না, স্যার।

—এমনি গল্প করতে ফোন দিয়েছি।

—জি, স্যার।

—আরে বাবা, আজ আমি স্যার হয়ে অফিসের কোনো কাজে ফোন দিইনি।

—বুঝেছি, স্যার।

—বুঝলে শুধু স্যার স্যার করছেন কেন? ফিল ফ্রি ম্যান।

—জি, স্যার। ফ্রি হয়েই বলছি।

—তাহলে বলছেন না কেন, কী করছিলেন এখন?

—স্যার, বললাম তো তেমন কিছু না।

—আমাকে বলতে এত আপত্তি?

—প্লিজ! স্যার, ভুল বুঝবেন না।

—আচ্ছা ঠিক আছে, না বলতে চাইলে নাই। তা, এটা কি আপনার নিজের ফ্ল্যাট, নাকি ভাড়া বাসা?

—স্যার, ভাড়া বাসা। কেন, স্যার?

—না, মানে যে রুমে বসে কথা বলছেন, রুমটা সম্ভবত অন্য রকম। সাইজে ছোট। কেমন যেন ইকো হচ্ছে আপনার কথাগুলো।

—জি, স্যার।

—আপনার সমস্যাটা কী, বলবেন? আপনি কি আমার সঙ্গে গল্প করতে চাইছেন না?

—জি না, স্যার—না, মানে জি স্যার। আসলে ব্যাপারটা তা না।

—আসলে ব্যাপারটা কী?

—আমি আসলে এখন যা করছিলাম, তা বলাটা ঠিক হবে না।

—আপনি এমন কি করছিলেন যে আমাকে বলতে এত দ্বিধা? একসঙ্গে এত দিন থাকলাম, তা-ও আপন ভেবে বলতে পারছেন না।

—স্যার, গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিলাম।

—বলেন কী! ছুটির দিনেও কাজ করেন? কোন অফিসে পার্ট টাইম?

—স্যার, এই কাজ সেই কাজ না।

—তাহলে কোন কাজ?

—প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছিলাম, স্যার।

—এঁ!

—কাল রাত থেকেই ডায়রিয়া। রাতে এতবার এসেছি-গিয়েছি, এখন আর পারছি না। তাই সকাল থেকে টয়লেটেই বসে আছি।

—ও ইয়ে, মানে আগে বলবেন না সে কথা। ঠিক আছে, পরে কথা বলি।

—স্যার, প্লিজ স্যার, মনে কিছু নিয়েন না। আপনার কলটা রিসিভ করার জন্য রুম থেকে ফোনটা আনতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। আমি এখন আপনাকে সব খুলেই বলছি...

আর কিছু খোলাখুলির আগেই আহসান সাহেব ফোন কাটলেন। কাকে ফোন দেওয়া যায়, কাকে দেওয়া যায় ভাবতেই হঠাত্ মনে হলো—সকালে দেখা ফরিদ সাহেবের কথা। তিনি কী রঙের টি-শার্ট পরে বাইরে গেছেন, কী প্যান্ট পরেছেন, বাজারের ব্যাগে কী ছিল ইত্যাদি বলে চমকে দিলে কেমন হয়? চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে ফোন দিলেন ফরিদ সাহেবকে।

—হ্যালো ফরিদ, কেমন আছেন?

—স্যার, আর বইলেন না। শুক্রবার দিনটা যে কোন কুক্ষণে আসে কে জানে?

—কেন, কী হয়েছে?

—কী হয়নি তা-ই বলেন, স্যার। সেই সাতসকালে বউ-বাচ্চা ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে চিড়িয়াখানায়। আপনিই বলেন, চিড়িয়াখানা কি দেখার জিনিস?

—ও আচ্ছা, আপনি সকাল থেকে চিড়িয়াখানায়?

—জি, স্যার। সেই সকাল থেকেই।

—তা, আপনি চিড়িয়াখানায়...কোনো পশুপাখির শব্দ শুনি না যে?

—হে হে হে...স্যার, কী যে বলেন?

—কেন, ভুল বললাম কিছু?

—তা না, স্যার। বলছিলাম, পশুপাখিদেরও তো ছুটির দিন বলে একটা কথা আছে, নাকি? ওরাও তো সপ্তাহে একটা দিনে বিশ্রাম নেয়।

—তার মানে? আপনি কি আমাকে কিছু মিন করলেন?

—না স্যার, আপনাকে মিন করব কেন? আমি চিড়িয়াখানার চিড়িয়াদের কথা বলছি।

—আচ্ছা।

—স্যার কি মাইন্ড করলেন? জরুরি কোনো কাজ ছিল?

্—না, না, আপনি চিড়িয়াখানায় সময় দেন।

ফোনটা কেটে দিলেন। আহসান সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেল। তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এত মিথ্যা বলতে হয়? তাঁর সম্পর্কে অফিসের স্টাফদের এই ধারণা? কাজ ছাড়া কি আহসান সাহেব কুশলবিনিময়ের জন্য ফোন দিতে পারে না? কেউই কি তাঁকে পছন্দ করে না! চায়ে চুমুক দিয়ে মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল—ঠাণ্ডা শরবত হয়ে গেছে। অন্যমনস্ক হয়ে ডাক দিলেন অফিসের পিয়ন নজরুলকে। সঙ্গে সঙ্গেই মনে হলো—তিনি তো এখন বাসায়। আচ্ছা, নজরুলকে ফোন দিলে কেমন হয়? বসের ফোন পেয়ে খুশিতে নিশ্চয়ই চমকে যাবে। তিনি নাম্বার টিপলেন।

—হ্যালো, নজরুল।

—নাটকির পো, তুই কেডা?

—আমি কে মানে? আমাকে চিনতে পারছ না!

—ওই হালার পো হালা, শুদ্ধ না মারাইয়া তোর নাম কইতে পারোস না?

—তুমি কে? এটা নজরুলের মোবাইল না? নজরুল কই?

—তার আগে ক, তুই কই?

—আমি কই মানে?

—তোর লগে কি নজরুল?

—আমার সঙ্গে নজরুল থাকবে কেন? নজরুল থাকবে তার ফোনের সঙ্গে। ওর কী হয়েছে?

—কী হইছে মানে? ছয় মাস ধইরা আমারে টাকা লইয়া ঘুরায়। আইজ চান্দুরে পাইয়া কলারে ধরতেই কয়—এই যে মোবাইল জমা থাকল, এক ঘণ্টার মধ্যে টাকা লইয়া আইতাছি। দুই ঘণ্টা পার হইয়া গেল। অখন তোর ফোন দিয়া মোবাইলের খবর লয়।

—আপনে ভুল বুঝছেন, নজরুল আমার সঙ্গে

নেই। নজরুলের খবর নেওয়ার জন্যই আমি ফোন দিয়েছিলাম।

—নজরুলের খবরের লগে আইজ তোরও খবর আছে। কই আছোস ঠিকানাডা খালি একবার ক। তারপর কেমনে সাইজ করি দেখ।

—না, না, নজরুলের কোনো খবরের আর দরকার নেই।

আহসান সাহেব তড়িঘড়ি করে লাইন কেটে দিয়ে হাঁপ ছাড়লেন।

 


মন্তব্য