kalerkantho


মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে রমজান

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

১৫ জুন, ২০১৮ ০০:০০



রমজানকে বলা হয় আত্মশুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার মাস। তাই এ মাসে ধর্মীয় ক্ষেত্রে সময় বেশি দিতে প্রায় সব মুসলিম দেশেই কর্মঘণ্টা কমানো হয়। অনেকের মতে, এর ফলে উৎপাদনশীলতাও কিছুটা কমে। যদিও মুসলিম পণ্ডিতরা বলছেন, এ সময়ে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও স্থিরতা তৈরি হওয়ায় সার্বিকভাবে অর্থনীতি লাভবান হয়। এর পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সম্প্রতি ও শারীরিক-মানুষিক সুস্থতার জন্য রমজানকে তাঁরা আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, এ মাসে খুচরা বাজারে ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি হসপিটালিটি খাতও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এটা শুধু মুসলিম দেশগুলোতেই ঘটে না, মুসলিম প্রধান অন্যান্য অঞ্চলগুলোতেও দেখা যায়। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও ডাটা বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ইউগভ ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় একটি জরিপ পরিচালনা করে। তিন হাজার ২৮৮ জন মানুষের ওপর পরিচালিত ওই জরিপে দেখা যায়, তাঁরা রমজানে বেশি অর্থ ব্যয় করেন। সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় খাদ্য ও মুদি পণ্য। জরিপে অংশগ্রহণকারী বেশির ভাগই জানান, রমজানে তাঁদের জীবনযাত্রায় কিছুটা পরিবর্তন আসে। ৬২ শতাংশ মনে করেন রোজা শরীরে কোনো দুর্বলতা তৈরি করে না। ৪৯ শতাংশ জানায়, তাঁদের কর্মক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন আসে না।

জরিপে ৫৭ শতাংশ মানুষ জানান, তাঁরা অর্থ জমিয়ে রাখেন রমজান ও ঈদে কেনাকাটার জন্য। এর মধ্যে ৪৭ শতাংশ জামাকাপড়ে বেশি খরচ করেন, ৭১ শতাংশ খাদ্য ও মুদি পণ্যে বেশি অর্থ ব্যয় করেন। ২০১০ সালে নিলসেন ইন্দোনেশিয়ার এক জরিপে দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়ায় রমজানে পণ্য বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি এসেছে রেকর্ড ৯.২ শতাংশ। আরেকটি জরিপে দেখা যায়, ২০১৩ সালে দেশটিতে খুচরা বাজারে বিক্রি বেড়েছে ৩০ শতাংশ। গ্লোবাল রিস্ক অ্যাডভাইজরসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সৌদি আরবে ২০১৪ সালে রমজানে গৃহস্থালির ব্যয় ছিল রেকর্ড ১৯৩ বিলিয়ন ডলার।

রমজানে মুসলিম দেশগুলোতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মঘণ্টা কমানোর কারণে উৎপাদনশীলতা কমে ও জিডিপি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন তথ্যও গ্লোবাল রিস্ক অ্যাডভাইজরসের গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে মুসলিম পণ্ডিতরা মনে করেন রমজানে মানুষ শারীরিক ও মানুষিকভাবে তুলনামূলক বেশি সুস্থ থাকেন। বিশেষ করে শ্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টায় মানুষের মধ্যে আত্মিক পবিত্রতা কাজ করে, যা তাকে মানসিক প্রশান্তি দেয়। আর এই প্রশান্তির ফলে কর্মক্ষেত্রে তার মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে। ফলে বাহ্যিকভাবে কর্মঘণ্টা কমলেও রমজানে অল্প সময়ের কাজে অনেক বেশি উৎপাদনশীলতা আসে। এ ছাড়া এ সময়ে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমায় তারা সন্তুষ্টচিত্তে অনেক ভালো কাজ করে।

ইউনিভার্সিটি অব কিং সৌদের মেডিক্যাল অনুষদের অধ্যাপক ড. সাবাহ আল-বাকির এক গবেষণায় দেখান, রোজা মানব দেহে এক ধরনের বিশেষ হরমোন নিঃসরণ করে, যার ফলে মানুষের টেনশন কমে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বস্তি অনুভব করে। এ সময় অপরাধ অনেক কমে যায়। অন্যদিকে রমজানে ইফতার ও সাহরিতে মানুষকে একসঙ্গে খেতে হয় বিধায় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন আরো অটুট হয়, যা অন্য সময়ে এভাবে হয় না।

অধ্যাপক আহমদ এতেবারির নেতৃত্বে ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক জরিপে দেখা যায়, রমজানে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখিতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ৯ গুণ বেশি। এতে বাহরাইন, ওমান, তুরস্ক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, পাকিস্তান, জর্দান, মিসর, মরক্কো, তিউনিসিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং সৌদি আরবের ১৯৮৯-২০০৭ সময়ের শেয়ারবাজারের ডাটা বেইস ঘেঁটে দেখা যায়, এ ১৫টি দেশে স্বাভাবিক সময়ে শেয়ারবাজার থেকে গড় আয় যেখানে ছিল ৪.৩ শতাংশ, সেখানে রমজানে তা বেড়ে হয়েছে ৩৮ শতাংশ।

গ্লোবাল রিস্ক অ্যাডভাইজারস জানায়, এ সময়ে মানুষের মন থাকে তুলনামূলক বেশি প্রশান্ত, সুস্থির ও ইতিবাচক। ফলে এ সময়ে তারা ভুল করে কম এবং শেয়ারবাজারে তার প্রতিফলন ঘটে। বিনিয়োগকারীরা এ সময়ে বেশি শেয়ার কেনে ও বেশি ঝুঁকি নিতে পারে। অন্যদিকে রমজানের পরে ঈদকে ঘিরে মানুষের মধ্যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের যে প্রবণতা তৈরি হয় তা পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতকে শক্তিশালী করে।

ইউনিভার্সিটি সেইনস ইসলাম মালয়েশিয়ার শরিয়া ও ল অনুষদের ডিন ড. জুলকিফলি হাসান বলেন, কোরআন-হাদিসের নির্দেশনার কারণে রমজানে মানুষ দানে অনেক বেশি উৎসাহিত হয়। জাকাত, ফিতরার পাশাপাশি মানুষ দরিদ্রদের খাওয়ায় ও দান করে। এটিও অর্থনীতে ইতিবাচক প্রভাব রাখে। ডেইলি নিউজ, স্ট্রেইটস টাইমস।

 



মন্তব্য