kalerkantho


বাংলাদেশে অ্যাপ ভিত্তিক পরিবহন সেবায় বিপ্লব

সজীব রায়   

২০ অক্টোবর, ২০১৭ ১২:৫২



বাংলাদেশে অ্যাপ ভিত্তিক পরিবহন সেবায় বিপ্লব

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পরিবহন ব্যবস্থায় এক নিরব বিপ্লব ঘটছে। যানজটের নগরী হিসাবে পরিচিত ঢাকায়  গাড়ির সারিবদ্ধ লম্বা লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামের মধ্যে নিরুপায় হয়ে বসে থাকা, সবই যেন নিত্য দিনের চিরচেনা রুপ।

মোবাইল অ্যাপ ভিত্তিক এই সেবা পরিবহণ ব্যবস্থাকে জাদুর কাঠির মতো বদলে দিয়ে নতুন এক রুপ দিয়েছে। চিরাচরিত প্রথা মেনে হাত তুলে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঠফাটা রোদ কিংবা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে বাস কিংবা ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা এ সব কিছুকে বিদায় জানাতে যাত্রীদের জন্য বেশ কিছু  প্রতিষ্ঠান এনেছে মোবাইল অ্যাপ ভিত্তিক পরিবহন সেবা। উবার, পাঠাও, বাহন, চলো এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য।

উবার: উবার মোবাইল অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি সেবা ২০১০ সালে আমেরিকায় যাত্রা শুরু করে। যাত্রা শুরুর কিছুদিনের মধ্যে সেবাটি দ্রুত  জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বর্তমানে বিশ্বের ৭৪টি দেশের সাড়ে চারশ শহরে মানুষ উবার অ্যাপ দিয়ে ট্যাক্সি সেবা নিচ্ছেন। তারই ধারাবাহিকতায়  দক্ষিণ এশিয়ায় ৩৩তম শহর হিসেবে ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর  ঢাকায় যাত্রা শুরু করে। যাত্রা শুরুর মাত্র কিছু দিনের মধ্যেই বেশ আলোচনায় উঠে আসে উবার। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের  নিকট জনপ্রিয় হয়ে  উঠে উবারের এই পরিবহন সেবা।

উবার ব্যবহার করার জন্য অবশ্যই অ্যাপল স্টোর ও গুগল প্লে থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে। গ্রাহক সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারবেন। ফোন নম্বর এবং ই-মেইল ব্যবহার করে যাত্রীর নাম নিবন্ধন  করে নিতে হবে।
উবারের বেইজ ভাড়া ৫০ টাকা। এরপর প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২১ টাকা আর ওয়েটিং চার্জ মিনিটে তিন টাকা। যাত্রা শুরুর আগে গন্তব্য ঠিক করে সম্ভাব্য ভাড়া জানা যাবে।   নগদ টাকা বা কার্ডে ভাড়া পরিশোধ করা যাবে।

পাঠাও : উবারের পাশাপাশি বেশকিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান এই সেবাটি নিয়ে আসে এর মধ্যে পাঠাও বেশ জনপ্রিয় হয়। পাঠাও মূলত মোবাইল আপ্লিকেশনের মাধ্যমে মোটরবাইক সেবা দিচ্ছে যাত্রীদের। যে কোনও জায়গা থেকে অ্যাপ এর মাধ্যমে  মোটরবাইক ভাড়া করে  গন্তব্যে যাওয়া যাচ্ছে। ঢাকায় রাস্তায় বর্তমানে তাদের পাঁচশত চালক আছেন, যাঁরা চুক্তি ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। পাঠাও এর বেইজ ভাড়া ২০ টাকা এবং প্রতি কিলোমিটার ১০টাকা হারে ভাড়া দিতে হয়। ভাড়া নগদে পরিশোধ করা যাবে। সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তাদের সেবা পাওয়া যাবে

চলো: চলো আরও একটি মোবাইল আপ্লিকেশন ভিত্তিক পরিবহন সেবা। অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ট্যাক্সিসেবার পাশাপাশি, অ্যাপ, ই-মেইল বা ফোনে গাড়ি আগে থেকে বুকিং দেওয়ারও সুযোগ আছে। ‘প্রিমিয়াম’ ‘ইকোনমি’ সহ নানা ধরনের সার্ভিস দিচ্ছে চলো। এ ছাড়া নির্ধারিত ভাড়ায় সারা দিনের জন্যও তাদের সেবা নেওয়া যাবে।

কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা : দেশের পরিবহন সেবায় নতুন মাত্রা দেবার পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। হাজার হাজার তরুণ নিজেদের এই সেবায় নিযুক্ত করেছে। নিজের অবসর সময়টুকু এই সেবা দিয়ে বাড়তি আয় করছে। এই সেবায় চাকরিজীবী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী সবাই আছেন। স্বাধীন ভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকায় প্রতিনিয়ত অনেকেই যুক্ত হচ্ছেন এই সেবায়। যে কেউ চাইলে অ্যাপ ভিত্তিক পরিহন সেবার সাথে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন।

চালক হিসেবে এই  সেবায়  নিজেকে যুক্ত করতে চাইলে নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। যেমন : উবার রেজিস্ট্রেশন করার জন্য চালকের অবশ্যই গুগল প্লে স্টোর থেকে উবার অ্যাপ ডাউনলোডের পাশাপাশি ড্রাইভিং লাইসেন্স,ন্যাশনাল আইডি কার্ডের কপি, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নাম্বার, গাড়ির ট্যাক্স নাম্বার, ইনস্যুরেন্স নাম্বার, ফিটনেস ছাড়পত্র ইত্যাদি কাগজপত্র দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। ঠিক একই ভাবে পাঠাও কিংবা বাহন এবং চলো’তে  রেজিস্ট্রেশন করা যাবে।

পাঠাও শুধুমাত্র মোটর বাইক সেবা দিলেও উবার কয়েকটি ক্যাটাগরিতে যাত্রীদের সেবা প্রদান করছে এর মধ্যে রয়েছে উবার এক্স, উবার প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্য।
 
চালকের তথ্য : অ্যাপ ভিত্তিক এই পরিবহন সেবায় প্রত্যেকটি চালক নিবন্ধিত হওয়ায়, একজন রাইডার তার যাত্রা শুরুর পূর্বে চালকের সব তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন। একই সাথে  রিভিউয়ের সুযোগ রয়েছে ।   যদি কোন চালক যাত্রীদের সাথে খারাপ আচরণ করে তাহলে ঐ চালকের বিরুদ্ধে রেটিং ও মন্তব্য করার সুযোগ রয়েছে। সেই সাথে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।    
সুতরাং সবদিক বিবেচনা করলে গণপরিবহণের তুলনায়  মোবাইল অ্যাপ ভিত্তিক এই সার্ভিস অপেক্ষাকৃত অধিক নিরাপদ। বিশেষ করে নারীদের জন্য যারা চাকরি কিংম্বা যে কোন কাজের জন্য গনপরিবহণ গুলোতে নানা রকম যে সমস্যার সম্মুখীন  হচ্ছে।

নিয়মিত মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন  ভিত্তিক পরিবহণ  সেবা নিচ্ছেন এমন অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায় তারা এই সার্ভিস পেয়ে মোটামুটি সন্তুস্ট।   অ্যাপ ভিত্তিক পরিবহণ সেবা গুলোর মধ্যে উবার ব্যবহারকারী এমনই  একজন হল রাফিউল আহমেদ পিয়াস। পড়াশুনা করছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাসা মিরপুরে। ক্লাস করার জন্য প্রতিদিন তাকে মিরপুর থেকে বসুন্ধরাতে আসতে হয়। এর জন্য তিনি কখনো সিএনজি আবার কখনো বাস ব্যবহার করতেন। একদিকে বাসে  সিট পাওয়া মুশকিল অন্য দিকে সিএনজির বাড়তি ভাড়া। এ সব কিছুর অবসান ঘটিয়ে তিনি নিয়মিত উবার ব্যবহার করছেন।

পিয়াস বলেন, উবার ব্যবহার করে খুব সহজেই বাসায় বসেই আমি সিএনজি বা ট্যাক্সি ডাকতে পারি। ভাড়া ও অপেক্ষাকৃত কম আর সব থেকে বড় কথা কোন রকম ঝামেলা নেই। আমার মত অনেকই আছে যারা নিয়মিত এই সার্ভিসটি ব্যবহার করেন।

বাংলাদেশে প্রযুক্তি ভিত্তিক এই সেবা নতুন হবার কারণে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটি (বিআরটিএ) এই সেবাগুলোকে এখনো অনুমোদন দেয়নি। বিআরটিএ নির্দিষ্ট নীতিমালা করেছে  ‘ট্যাক্সি ক্যাব সার্ভিস গাইড লাইন-২০১০’  রয়েছে । অ্যাপ  ভিত্তিক পরিবহন সেবাদান কারী প্রতিষ্ঠান গুলো যথাযথ ভাবে বিআরটি এর নীতিমালা অনুসরণ করলে যাত্রী সেবার মান আরও বাড়বে।

সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে সারা বিশ্বের সাথে। নানা সমস্যার কার্যকরী সমাধান নিয়ে কাজ চলছে। প্রযুক্তির  ব্যবহার জীবন যাত্রাকে আরও সহজ করে তুলছে। সেই  ধারাবাহিকতায় অ্যাপ ভিত্তিক পরিবহন সেবা বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সংযোজন। যা পরিবহন সমস্যার আধুনিক সমাধানের পাশাপাশি অর্থনীতিতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।

 


মন্তব্য