kalerkantho


কলাপাড়া

বেল্লালের পায়ে ‘জাদু’

এবার দিচ্ছে দাখিল পরীক্ষা

জসীম পারভেজ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বেল্লালের পায়ে ‘জাদু’

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নেছারউদ্দিন সিনিয়র মাদরাসা পরীক্ষা কেন্দ্রে দাখিল পরীক্ষায় পা দিয়ে লিখছে বেল্লাল। ছবি : কালের কণ্ঠ

তার দুটি হাতই নেই। ডান পা দিয়ে লিখেই এবতেদায়ি ও জেডিসি পরীক্ষায় ‘জিপিএ ৫’ পেয়েছিল। সে এবার দিচ্ছে দাখিল পরীক্ষা। এই পরীক্ষায়ও ভালো করবে। এই উদ্যমী, মেধাবী ছাত্রের নাম মো. বেল্লাল আকন। কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের উমেদপুরের খলিল আকন ও হোসনেয়ারা বেগমের ছেলে এবং উমেদপুর দাখিল মাদরাসার ছাত্র সে।

বেল্লাল আকন দাখিল পরীক্ষা দিচ্ছে কলাপাড়া পৌর শহরের নেছারউদ্দিন সিনিয়র মাদরাসা কেন্দ্রে। গতকাল সোমবার কেন্দ্রের একটি কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, সব পরীক্ষার্থী বেঞ্চে বসে লিখছে। আর একটি কাঠের আসনে বসে ডান পায়ের দুই আঙুল দিয়ে দ্রুত লিখে চলেছে বেল্লাল। ডানে-বাঁয়ে তাকানোর সময় নেই তার।

কেন্দ্র এলাকায় উমেদপুর দাখিল মাদরাসার সুপার মো. হাবিবুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেল্লালের মেধা আছে। শিক্ষাগ্রহণে তার ত্যাগ আর পরিশ্রম আমাদের কাছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সে পা দিয়ে লেখে; সে কারণে ওর জন্য ক্লাসরুমে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তৈরি করা হয়েছিল একটি কাঠের আসন। সেখানে বসে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বেল্লাল স্বাচ্ছন্দ্যে লিখতে ও পড়তে পেরেছে। লেখাপড়ায় বেল্লালের খুব আগ্রহ। বেল্লালের সুবিধার্থে একটি এনজিও বিদ্যালয়ে একটি র‌্যাম (সিঁড়ি) তৈরি করে দিয়েছে। বেল্লাল আমাদের গর্ব ও অহংকার। আমাদের প্রত্যাশা, বেল্লাল দাখিল পরীক্ষায়ও মাদরাসার সুনাম রাখতে পারবে।’

বেল্লালের জন্য গর্বিত বাবা খলিল আকন এবং মা হোসনেয়ারা বেগম। কালের কণ্ঠকে তাঁরা বলেন, ছেলের দুটি হাত নেই। পা আছে, কিন্তু হাঁটু নেই। তাঁদের ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় সে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। পা দিয়ে লিখে অসাধ্যকে সাধন করেছে। চোখের পানি ছেড়ে খলিল আকন বলেন, বিদ্যার মহাসাগর থেকে জ্ঞান পিপাসা মেটাতে গিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শারীরিক প্রতিবন্ধী বেল্লাল।

বেল্লালের সহপাঠী মো. জাবের মোল্লা বলে, ‘বেল্লাল পা দিয়ে লিখে আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়েছে।’ আরেক সহপাঠী মো. সজিব বলে, ‘বেল্লালের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ এবং কৌশল দেখে পড়ালেখায় আমাদের আগ্রহ বেড়ে গেছে। দাখিল পরীক্ষা শেষে আমরা হয়তো ভর্তি হব পটুয়াখালী বা বরিশাল শহরের বিদ্যাপিঠে। কিন্তু বেল্লাল তার মায়ের সাহায্য ছাড়া অন্য কাজ করতে পারে না। তাই তাকে হয়তো কলাপাড়াতেই লেখাপড়া করতে হবে। তবে ও যেখানেই পড়ুক ভালো রেজাল্ট করতে পারবে।’

বেল্লালের প্রত্যাশা

বেল্লাল কালের কণ্ঠকে বলে, ‘২০০৮ সালে প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাদরাসায় যেতে রাস্তায় পড়ে গিয়ে বহুবার আহত হয়েছি। ২০১০ সালে মাদরাসা থেকে বাড়ি ফেরার সময় মাথায় জখম হয়েছি। তার পরও লেখাপাড়ায় অনীহা সৃষ্টি হয়নি আমার ভেতর। এখন আমি দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি সফল হব। আমি লেখাপড়া চালিয়ে যাব। আমার মা-বাবা আমাকে শিক্ষাগ্রহণে সহযোগিতা করছেন। আমি ফাজিল পর্যন্ত লেখাপড়া করে একজন শিক্ষক হব। শিক্ষক হয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখাপাড়ার সুযোগ করে দিয়ে নিরক্ষরতা দূর করব।’

খলিল আকন বলেন, ‘আমার দুই মেয়েরই বিয়ে দিয়েছি। ছেলে নেছার উদ্দিন আকন (২২) বরিশাল বিএম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পড়ছে। ছোট ছেলে বেল্লাল দাখিল পরীক্ষায় ভালো ফল করবে ইনশা আল্লাহ। ওকে নিয়েই আমার যত চিন্তা-ভাবনা। বেল্লাল ওর মা ছাড়া কিছুই করতে পারে না। তবু আমি ওকে ফাজিল পর্যন্ত লেখাপড়া করাব। সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে একজন আদর্শবান শিক্ষক হতে সহযোগিতা করব। আমার মাত্র পাঁচ বিঘা জমি আছে। বেল্লালের জন্য স্থায়ী সম্পত্তি করব; যা দিয়া ও আজীবন খেয়েপরে সুখী জীবন যাপন করতে পারে। সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। ওর মতো কষ্ট করে এই কঠিন ও নিষ্ঠুর পৃথিবীতে কোনো মানুষ পড়ালেখা করেনি বলে আমার ধারণা।’

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানভীর রহমান বলেন, ‘একটি দরিদ্র পরিবারের শারীরিক প্রতিবন্ধী সন্তান হয়েও লেখাপড়া করছে। বেল্লালের মেধা ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ আমাকে মুগ্ধ করেছে। সে যেন শিক্ষাগ্রহণ করে অনেক বড় হয়। এ ধরনের মেধাবী, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য সমাজের মানুষের কিছু করা প্রয়োজন। বেল্লালের মতো অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছাশক্তির মানুষের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের অনেক শেখার আছে।’


মন্তব্য