kalerkantho


দেশের জন্য কাজ করব

স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যার পথিকৃৎ চিকিৎসক জাতীয় অধ্যাপক ডা. শাহলা খাতুন। বিএসএমএমইউতে এই বিভাগ গড়ে তুলেছেন। নিরাপদ মাতৃত্ব, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে তাঁর উদ্যোগ অনন্য। সেই জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দেশের জন্য কাজ করব

ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা কিভাবে জন্ম নিল?

আমাদের সিলেট শহরের বাড়িটিকে হাফিজ কমপ্লেক্স নামে সবাই চেনে। এই বাড়িতে সব ধরনের লোকের আনাগোনা ছিল। আব্বা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ পেশায় উকিল হলেও রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ছিলেন। আমার জন্ম থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত যতটুকু মনে আছে, সিলেটে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। মাঝেমধ্যে শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে গিয়ে পড়াতেনও। যখন সিলেট গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে (এখন অগ্রগামী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) ফোর-ফাইভে পড়ি, বাড়িতে দুজন ডাক্তার প্রায়ই আম্মা-আব্বার সঙ্গে পেশাগত ও ব্যক্তিগত কাজে দেখা করতে আসতেন। পাড়ার আরেক গোল্ড মেডেলিস্ট ডাক্তারকে আমরা ‘কাকু’ ডাকতাম। তাঁরা সবাই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। মানবসেবা করতেন, যত্ন করে রোগী দেখতেন। এসব দেখে ভালো লাগত। তখনই মনে হলো, ডাক্তার হলে তো ভালো হবে। সিক্সে পড়ার সময় হোমওয়ার্ক দিল, ‘দ্য এইম অব ইউর লাইফ’। বড় ভাইকে (ড. আবু আহমেদ আবদুল মুহসি) বললাম, ‘আমার তো ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা, কী লিখব?’ তিনি বললেন, ‘তোর যখন ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা, কেন লিখবি না?’ খুব সুন্দর করে লিখেছিলাম। সাড়া পড়ে গিয়েছিল। ১৯৪৯ সালের এ ঘটনার পরে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে অন্য কোনো কিছুর দিকে আর তাকাইনি।

 

সেই আমলে মেডিক্যালের জীবন কেমন ছিল?

১৯৫৬ সালের আগস্টে ঢাকা মেডিক্যালে ক্লাস শুরু করেছিলাম। আগে তো স্কুল-কলেজে রোজার ছুটি পেতাম, এখানে এসে দেখি রোজায়ও ছুটি নেই! একটানা ক্লাস হয়। বাড়ি যেতে পারি না। পড়ালেখার এত চাপ ছিল যে তখন  অনেকেই এই পেশায় ভয়ে আসতে চাইতেন না। আমাদের সময় পাঁচ বছর লেখাপড়াই করতে হয়েছে। ওয়ার্ড, আউটডোর, ইমার্জেন্সি রুম ও অপারেশন থিয়েটারে সিনিয়র ও শিক্ষকদের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে কাজ করতে হতো। রোগের ইতিহাস নেওয়া, ব্লাড প্রেসার চেক করা, রক্ত ও মল-মূত্র পরীক্ষা করা ছিল আমাদের কাজ। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ক্লাস করে সন্ধ্যার পর ওয়ার্ডে আসতে হতো। হাতে-কলমে ডাক্তারি শিখতাম। পাকিস্তান আমলে কিন্তু কোনো ইন্টার্নশিপ ছিল না। ১৯৬১ সালের মে মাসে পরীক্ষা দিয়ে ফাইনাল শেষ হলো।

 

উল্লেখযোগ্য স্মৃতি?

ফোর্থ ইয়ারে পড়ার সময় লন্ডন থেকে কিছু ডেলিগেট এলেন, যাতে আমাদের এমবিবিএস ডিগ্রি ব্রিটিশ মেডিক্যাল কাউন্সিল অনুমোদন করে। তাহলে এখান থেকে পাস করে আমরা সেখানে উচ্চশিক্ষা নিতে যেতে পারব। গাইনির নামকরা ব্রিটিশ অধ্যাপকও এই দলে ছিলেন। তিনি আমাদের হাসপাতালে খুব জটিল একটি অপারেশন করলেন। সেই অপারেশনে আমিও একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলাম এবং সেটি আমার পরবর্তী জীবনে খুব কাজে লেগেছে। স্যার, ম্যাডামরা এই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। পরে বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার সময়ও এমন সুযোগ আমি পাইনি। অনেক পরে এমআরসিপি পাস করে পিজিতে এই অপারেশন করার সময় তাই বলেছিলাম, ‘জানো, ১৯৬০ সালে এই অপারেশন করা দেখেছি। তখন সাহায্যকারী ছিলাম, এখন নিজে অপারেশন করছি।’  

 

অধ্যাপনার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে দেখি এক মহিলা অধ্যাপক ক্লাস নিচ্ছেন। তখন তো ভয়েই আমরা শিক্ষকদের কাছে যেতাম না। খোঁজ নিয়ে জানলাম, তিনি হুমাইয়া সাঈদ, সবচেয়ে সিনিয়র স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ। দূর থেকে তাঁকে দেখে এত ভালো লাগল, বাহ, এ তো আরো ভালো কাজ। তিনি পড়াচ্ছেন আর শিক্ষার্থীরা চুপ করে বসে আছে! দূর থেকে তাঁকে দেখেই অধ্যাপক হতে মন চাইল।

 

চাকরির শুরু?

মেডিক্যাল কলেজে তখন ‘অনারারি জব’ ছিল। দুই-তিন মাস কাজ করার পর আর সুবিধা হলো না। দেখলাম, ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট এখন তাঁদের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার বলে তাঁরাই অপারেশনসহ বিভিন্ন কাজ করতে পারেন। ফলে সরকারি চাকরিতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের সময় এটি দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরি ছিল। আমার ভাই আবুল মাল আবদুল মুহিত তখন প্রথম শ্রেণির চাকরি করেন। আরেক ভাই মুহসি পিএইচডি করতে গেছেন। তবে আর্মিতে গেলে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা পাওয়া যায়; এমনকি মুহিত ভাইয়ের পরিচিতরাও পরামর্শটি দিলেন। কিন্তু আমার সংকল্প ছিল—দেশেই থাকব এবং চাকরি করব। তখনকার দিনে মেডিক্যাল কলেজে দুই-তিন বছরে এক-দুটি পদ খালি হতো। ঢাকা মেডিক্যালে চাকরি পেয়ে গেলাম। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দিলাম। কাজ অনেক ছিল। অবসরও তেমন পেতাম না। তার পরও উপভোগ করেছি। কেন জানি সারা জীবন, সারা দুনিয়ায় আমার ডাক্তারি চাকরি উপভোগ্য বলে মনে হয়েছে।

 

তখনকার কোনো স্মৃতি?

ঢাকা মেডিক্যালে নার্সদেরও পড়িয়েছি; পড়ানো সারা জীবনই খুব ভালো লেগেছে। একটানা চার বছর ঢাকা মেডিক্যালে কাজ করেছি। ঢাকা মেডিক্যালে সব পদে ছিলাম। সেটিই আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি। সারা বাংলাদেশ থেকে তখন যাঁরা ঢাকা মেডিক্যালে আসতেন, তাঁদের আমি সাহসী বলব। তাঁদের কত যে কষ্ট হতো! ‘ব্লাড ব্যাংক’ নামেই ছিল। রোগীর অপারেশন করতে গিয়ে দেখতাম, রক্তের অভাবে অপারেশন করা যাচ্ছে না। যতটুকু সম্ভব ম্যানেজ করে আমরা কাজ করেছি। প্রায়ই উর্দুভাষী রোগী আসতেন। যখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, পাকিস্তানিদের সঙ্গে আর থাকব না, তখন বাংলায় কথা বলা শুরু করলাম। যাঁরা ডাঁটেয়াল ছিলেন, তাঁরা উর্দুতে বলতেন। আর আমরা বাংলায় কথা বলতাম। তাঁরা বলতেন, আমরা আপনাদের বাংলা বুঝতে পারি না। পাল্টা জবাবে বলতাম, আমরাও উর্দু বুঝি না। এভাবে বাংলা বলা শুরু করলাম। কিন্তু যেসব রোগী বাংলা বোঝেন না, তাঁদের বুঝিয়ে দিতাম। আগের দিনে আমরা এত লোক ছিলাম না। যখন স্যার, আপাদের অধীনে কাজ করেছি—আমরা একজন রেজিস্ট্রার, একজন আরএস (রেসিডেন্স সার্জন), দুজন ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট—এই চারজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলাম। আর কিছু অনারারি হাউস সার্জন। ফলে ওয়ান টু ওয়ান কাজ করতে পারতাম। সিনিয়ররা কোনো অপারেশন করলে আমরা সহযোগিতা করতাম, তাঁরা দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের দিয়ে কাজ করাতেন। আমিও সেটি সারা জীবন করেছি। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করেছি। এখন তা মোটেও সম্ভব নয়।

 

ব্রিটেনে উচ্চশিক্ষা নিতে চলে গেলেন কবে?

স্টেটস স্কলারশিপের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে বিলাতে গেলাম। পড়ালেখা করেছি, চাকরি করেছি এবং প্রশিক্ষণ নিয়েছি। রয়েল কলেজে অব অবস অ্যান্ড গাইনোকলজি থেকে ‘এমআরসিওজি’ নামের উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছি। সেখানে ও পরবর্তীকালে আমেরিকায় কাজের সময় কাউন্সেলিংয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। পরে সারা জীবন আমি এটি করেছি। বহু লোককে চিকিৎসা না দিয়েও শুধু কথা বলেই ভালো করা যায়। সবার যে চিকিৎসা দরকার তা-ও নয়। ১৯৬৮ সালের অক্টোবরে বিলাত থেকে চলে এলাম। পরে ১৯৭৪ সালে আমেরিকা গেলাম। তাঁরা আমাকে স্টাফ গ্রেডে নিলেন। ফলে ‘সহযোগী অধ্যাপক’ পদে চাকরি করলাম। সেখান থেকে ‘ইসিএফএমজি’ ডিগ্রি নিয়েছি। তবে হাসপাতালে ছয় মাসের মতো কাজ করে আমেরিকায় থাকতে মন চাইল না। সিনিয়র, মুহিত ভাইয়ের কলিগরা পর্যন্ত বললেন, ‘তোমার কী মাথা খারাপ? আমরা বাংলাদেশে থাকতে চাই না, আর এত ভালো চাকরির পরও তুমি দেশে ফিরে যেতে চাও?’ ইংল্যান্ডেও একই ঘটনা ঘটেছে। আমি তো পাস করার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসেছি। তখন সবাই বলেছেন, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করেছ, এত আরামের জীবন ছেড়ে কেন যাবে? কিন্তু আমি চলে এসেছি। সব সময়ই আমার ইচ্ছা ছিল, দেশের জন্য কাজ করব।

 

ইংল্যান্ড থেকে ফিরে?

১৯৬৯ সালের জুন-জুলাইতে আইপিজিএমআরে যোগ দিলাম। তখন অনেকেই বিদেশ থেকে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরেছি। এত চিকিৎসককে কোথায় নিয়োগ দেবে? ফলে এখনকার খুব প্রচলিত ‘কনসালট্যান্ট’ হিসেবে আমরাই প্রথম বদলি হলাম। খুলনা শহরের সরকারি হাসপাতালে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হলো। ভাঙাচোরা দোতলা হাসপাতাল, অ্যানেসথেসিয়া পর্যন্ত নেই। একজন অপারেশন থিয়েটার সহকারী অপারেশনের সময় বেডে শুয়ে থাকা রোগীর নাকে ইথার ঢালেন আর আমি সার্জারি করি। সব ধরনের রোগীরই চিকিৎসা, অপারেশন করেছি। কখনো খারাপ লাগেনি। তখন যশোর সিএমএইচে গিয়েও অপারেশন করতে হতো। সে হাসপাতালে সপ্তাহে দুদিন ঢাকা থেকে অ্যানেসথেসিস্ট আসতেন। তিনি তখন রোগীদের অ্যানেসথেসিয়া দিতেন।

 

গ্রামে গ্রামে গিয়েও তো রোগী দেখতে হতো?

১৯৬৯ সাল থেকেই সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহের গ্রামে গ্রামে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছি, মাঠে-ঘাটে কাজ করেছি। বারডেমের অনেক ফ্রি হেলথ ক্যাম্পও অনেক সময় করে দিয়েছি। সমাজসেবী মরহুম আলমগীর কবীর আমাকে বারডেমের অনেক ক্যাম্পে নিয়ে গেছেন। নড়াইল, মাগুরা, ফরিদপুর, জামালপুরসহ আরো অনেক জায়গায় ফ্রি হেলথ ক্যাম্প করেছি। এই ৮০ বছর বয়সেও এখনো ফ্রি হেলথ ক্যাম্পে যাই। কয়েক দিন আগেও তো সিলেটের নবীগঞ্জে ঢাকা থেকে সড়কপথে গিয়ে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ফ্রি ক্যাম্প করেছি। আসলে যখন রোগী দেখি বা মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিই—বয়স ভুলে যাই। কাজটি সব সময়ই উপভোগ করে এসেছি এবং এ কারণেই আমি ভালো আছি।

 

মুক্তিযুদ্ধ আপনার জীবনে কিভাবে এলো?

২৫ মার্চের দুই দিন আগে ঢাকা থেকে সিলেটে চলে গেলাম। মেয়ের (লুবনা কবীর) তখন আড়াই, ছেলের (সাঈদ বিন কবীর) বয়স এক বছর। ভাই ড. এ কে এম আবদুল মোমেন বলল, ‘আপা এখানে অসুবিধা হবে। ওদের নিয়ে থাকতে পারবে না। চলো সিলেটে চলে যাই।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এক বোন ও দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে আমরা বাড়ি চলে গেলাম। আমাদের বাড়িটি সিলেট শহরে, তিন দিকেই রাস্তা। প্রথম আক্রমণ আমাদের বাড়িতেই হলো। এটি তো টার্গেট পয়েন্ট। ইপিআরের সদস্যরা আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা পাকিস্তানি আর্মিকে প্রতিরোধের জন্য গুলিবর্ষণ করেছিলেন। তখন বাড়িতে আমরা ১৩ জন। গোলাগুলি চলছে, একের পর এক ঘরে গিয়ে আমরা আশ্রয় নিচ্ছি। রাত ৮টায় প্রচণ্ড বৃষ্টিতে তাঁরা চলে গেলেন। তখন আমরা খাবার ঘরের নিচে। আশপাশের মানুষজন মনে করেছিলেন, আমরা সবাই বুঝি মারা গেছি! ভোরের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরেক বাড়িতে চলে গেলাম। সেখানেও গোলাগুলি হলো। পরে গ্রামে চলে গেলাম। সেখানে শহর থেকে গিয়ে সবাই আশ্রয় নিয়েছিলেন। হাসপাতাল, কলেজ, মসজিদের ভেতরেও মানুষ। সেখানেও যুদ্ধ হলো। ওসমানী সাহেব যুদ্ধ করলেন। আমার ছেলের প্রচণ্ড ভয়ে খিঁচুনি জ্বর শুরু হয়ে গেল। তখনই শুনলাম, গ্রামে এক নারীর মাতৃত্বকালীন ব্যথা শুরু হয়েছে। ছেলেকে মা-বাবার কাছে রেখে সেই রোগিণীকে দেখলাম। এরপর আরেক রোগিণীকে দেখতে হলো। এরপর সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে এলাম।  অন্য সব মানুষের মতো যেভাবে পেরেছি আমিও মুক্তিযুদ্ধে মানুষকে সাহায্য করেছি।

 

আইপিজিএমআরের তো আপনিই একমাত্র স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন?

১৯৭১ সালের জুলাইয়ে আইপিজিএমআর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এখনকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। তখন এটি শাহবাগ হোটেল ছিল। আমার স্যার অধ্যাপক এম এ ওয়াদুদ, মারা গেছেন, তিনি তখন এটির প্রধান। তিনি ঢাকা মেডিক্যালেই থাকতেন। সময়ের অভাবে আইপিজিএমআরে আসতে পারতেন না। ফলে এ বিভাগটি আমার হাতেই তৈরি, আমিই বিভাগটি পরিচালনা করেছি। আমিই তখন বিভাগের একমাত্র স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ছিলাম। কোনো বেড, ওয়ার্ডও আমার ছিল না। সিনিয়র স্যাররা তাঁদের অধীনে রোগী ভর্তি করে বলতেন, রোগী আছে, দেখে যাও। তাঁরা খুব ভালো ছিলেন, তাঁদের সার্জারির ওটি (অপারেশন থিয়েটার) আমায় ছেড়ে দিয়ে বলতেন, তুমি ওটি করো। প্রথম দিকে তো রোগী অল্পই ছিল, আমি কিন্তু সিনসিয়ারলি কাজ করেছি। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করতাম। নিজে ড্রাইভ করে রাত ১টায়ও পিজি থেকে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরতে হয়েছে। এ জন্যই আমরা ওপরে উঠতে পেরেছি। শেষ পর্যন্ত বেড পেলাম। আমার বিভাগে পরে বহু বেড হয়েছে, বিভাগও অনেক বড় হয়েছে।

 

তখনকার কোনো স্মরণীয় স্মৃতি?

ওয়াদুদ স্যারের অধীনে সন্তানসম্ভাবনা শেখ হাসিনা ভর্তি হলেন। তাঁর মাতৃত্বের অপারেশনটি আমাকে করতে হয়েছে। আমার হাতেই ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্ম। সে কথা তিনি সব সময়ই মনে রেখেছেন এবং আমি যেমন তাঁকে সম্মান করি, তিনিও তেমনি আমাকে ভালোবাসেন। তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল দ্বিতীয়বার মা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আপা, আপনি তাকে যদি বলেন, দেখবেন, সে দেশে থাকবে।’ তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম আমার হাতেই হয়েছে। পিজি হাসপাতালে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড ছিল না। সেটি আমি খুলেছি। তাঁরা বলেছিলেন, পিজিতে ডাক্তার কম, ইমার্জেন্সি কিভাবে খুলবেন? উত্তরে বলেছিলাম, ডাক্তার কম থাকলে আমি আসব। মাঝেমধ্যে রাতে দুইবার গিয়েও রোগী দেখে এসেছি। রোগী দেখতে কোনো দিন কার্পণ্য করিনি। 

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার সময়ও তো আপনিই বিভাগের প্রধান?  

যখন এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হলো, তখন আমিই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন। দুই বছর দায়িত্বে থেকে অনেক কিছু আমাকে বদলাতে হয়েছে। ইনফার্টিলিটি ইউনিট খুলেছি, কলপোস্কোপ করাতে শুরু করলাম, আলট্রাসনোগ্রাম নিয়ে আসলাম। যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করেছি। তখন সীমিত অর্থ বরাদ্দ ছিল। এখন তো সহজেই টাকা পাওয়া যায়। এম এ কাদেরী স্যার তখন ভিসি। পরে তিনি অবসর নিয়ে এমপি হয়েছিলেন। তাঁরা খুব ডেডিকেটেড ছিলেন। ভিসি থাকার সময়ও তাঁর বয়স অনেক। তার পরও তিনি প্রতিদিন পুরো ক্যাম্পাস রাউন্ড দিতেন। তাঁর সঙ্গে আমাকে থাকতে হতো। কারণ আমি যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি, তখনই তিনি আমার লেকচারার। যখন সিনিয়র ক্লাসে গেছি, তিনি আরএস (রেসিডেন্স সার্জন), পরে সহকর্মী। এতকালের সম্পর্কের জন্য স্যার আমাকে ছাড়া কোথাও যেতেন না। আমরা সারা দিন ঘুরতাম। সময় পেলেই সারা ক্যাম্পাস ঘুরে সব কিছু ঠিক করতাম। আমরা একে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে নিয়ে এলাম।

 

মাতৃমৃত্যু কমাতেও তো আপনার উদ্যোগ অনন্য।

দেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর জন্য ইউনিসেফের সহায়তায় আমরা ‘ইওসি’ প্রকল্পের আওতায় আমাদের ওজিএসবি’র (অবসথেটিকস অ্যান্ড গাইনোকলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ) মাধ্যমে ১১ জেলায় সার্ভে করেছিলাম। লক্ষ্য ছিল—কিভাবে আমাদের মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে পারি? দেখলাম, প্রতিটি সার্ভিস সেন্টারে কিন্তু রোগীরা যান। তবে কর্মীরা তাঁদের বলেন, এখানে এর চিকিৎসা হয় না, ওখানে যান। এভাবে তাঁদের হয়রান করা হয়। সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য এবং এই হয়রানির হাত থেকে তাঁদের রক্ষা করার জন্য আমরা সার্ভিস সেন্টারগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছি। একেবারে গ্রামে যেখানে নরমাল ডেলিভারি, টিকা, ব্লাড প্রেসার চেক করার মতো জরুরি সেবা দেওয়া যাবে, এগুলোকে প্রাথমিক প্রসূতি সেবাকেন্দ্র বলা হবে। রেফারেল সিস্টেম তৈরি করলাম। সেখান থেকে রেফার করে তাঁরা আরেকটি সেন্টারে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠাবেন। সেখানে ভালোভাবে ডেলিভারি হবে, রক্তক্ষরণ হলে তারও প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারবে। সেখানে ভালো নার্স থাকবে। খিঁচুনির কারণে অজ্ঞান হয়ে গেলে ইনজেকশন দিতে পারবে। সেখানেও উন্নত চিকিৎসা না পেলে টারশিয়ারি মানে জেলা সদর হাসপাতাল এবং আরো উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠাবে। সেখানে সব রকমের চিকিৎসা পাবে। আমাদের কর্মীরাই তাঁদের গাড়িতে নিয়ে যাবেন বা কোথায় যেতে হবে লিখে দেবেন। এখন রোগীরা কে কোথায় যাবেন, আরো উন্নত চিকিৎসার খোঁজ পাচ্ছেন। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে নারীদের মাতৃত্বের সময় কাজে লাগানোর জন্য প্রতিদিন মাটির পাত্রে কিছু কিছু করে টাকা জমানোর অভ্যাস করিয়েছিলাম। তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে ব্লাড গ্রুপ করে রাখার উপায় শিখিয়েছিলাম, যাতে প্রয়োজনে তাঁরা রোগীর সঙ্গে যেতে পারেন। কেন্দ্রগুলোতে সরকার ব্লাড ব্যাংক ও অপারেশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এ ছাড়া মায়েদের কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাড়ার রিকশাওয়ালা, ভ্যানচালকদের সঙ্গে নিয়ম করে আলাপ করার কথা বলে দিয়েছিলাম। আমরা পাইলট প্রজেক্ট আকারে এটি বাস্তবায়ন করেছিলাম। পরে সরকার সেটি নিয়ে সারা দেশে জরুরি মাতৃকালীন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালু করেছে। আমরা প্রথম প্রফেশনাল সংগঠন হিসেবে সরকারের সঙ্গে তখন কাজ করেছি। এ জন্য দেশে মাতৃমৃত্যুর হার ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। মা মারা গেলে সুস্থ শিশু জন্মালেও সে সাধারণত জন্মের এক বছরের মধ্যে মারা যায়।

 

নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য কী করেছেন?

১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে গিয়ে তাঁকে অনুরোধ করে জাতিসংঘের এই সনদে সম্মতি নিয়েছি। নিরাপদ মাতৃত্ব আমাদের অধিকার—এটি আমাদের কেউ দান করছে না, নিরাপদ মাতৃত্বের মানে হলো, আমি কখন সন্তান নেব, কোথায় চিকিৎসা নেব, কোথায় ডেলিভারি করব, সে অধিকার আমার আছে। এই সনদে স্বাক্ষরের মাধ্যমে এ দেশের প্রত্যেক নারী তাঁদের মাতৃত্বকালীন সময়ে সরকারের কাছ থেকে সব অধিকার পাবেন। আবার সন্তান জন্মদানের সময় তাঁর জন্য কেন্দ্রগুলো সরকার স্থাপন করে দেবে। তিনি কোথায় গেলে ডেলিভারি হবে—সেটি সরকার ঠিক করে দেবে। এরপর সন্তান জন্মদানের পর তাঁর পরিবার পরিকল্পনার উপকরণগুলো সরকার অধিকার হিসেবে তাঁকে সরবরাহ করবে। দিবসটি আমরা বছরে একবার পালন করি। সচেতন হই, সাধারণ মানুষকেও সচেতন করি। এসব কারণে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক স্বীকৃতিও পেয়েছেন। মানুষের আয়ুও বেড়েছে। বাংলাদেশে আগে চেক আপের বহু জায়গা ছিল, কিন্তু ডেলিভারির কোনো জায়গা ছিল না। এনজিওগুলোও চেক আপ করত। আমরা ‘ওজিএসবি’র মাধ্যমে ডেলিভারি ব্যবস্থাকে মানুষের দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি, এমনকি নবজাতক শিশুর জন্মের পর ন্যূনতম সেবা দেওয়া শেখানো হয়েছে। এ দেশের শিশুমৃত্যুর হার কমাতে মাতৃদুগ্ধ খুব ভূমিকা পালন করেছে। আমি বিএসএমএমইউসহ বহু হাসপাতালে শুধু মাতৃদুগ্ধদান পদ্ধতি চালু করেছি। এখন তো দেশে সবাই মাতৃদুগ্ধ খাওয়ান। ফলে শিশুরা সুস্থ হচ্ছে, তাদের শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কমে গেছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে গেছে। এখন তো কোনো হাসপাতালেই প্যাকেট বা বোতলজাত দুগ্ধ ব্যবহার করা হয় না। এগুলোকে ‘বেবি ফ্রেন্ডলি হসপিটাল’ বলে। বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফ্রিডিং ফাউন্ডেশনের আমি উপদেষ্টা। এ সংগঠনটি আমরাই উদ্যোগী হয়ে ১৯৮৭ সালে শুরু করি। সেখানে আমরা এমন অনেক কাজ করেছি। কাজ করতে চাইলে করা যায়।

 

আপনাকে মাদার টিচার বলা হয় কেন?

১৯৬২ সালে চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই কমবেশি শিক্ষকতা করছি। কেননা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে রেজিস্ট্রারের কাজই হলো পড়ানো। রেজিস্ট্রার হিসেবে আমার চাকরিই ছিল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা; মাঝখানের বিরতির পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮-৯টা পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো। আমাদের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, মেজর জেনারেল (অব.) মতিউর রহমান—তাঁরা সবাই আমার ছাত্র ছিলেন। আমার অনেক ক্লাসফ্রেন্ড যারা দেরিতে পাস করেছে, তাদেরও আমি শিক্ষক। ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আসার পরও আমার কাজই ছিল পড়ানো। বিসিপিএসের (বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস) ওবিজিওয়াইএনের (স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা) সব পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। পরীক্ষক ছিলাম। স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যায় যত ইনস্টিটিউট আছে, যত ছাত্র-ছাত্রী আছে, তাদের প্রায় সবাইকে আমি পড়িয়েছি। আগে তো পিজিতে সবাইকে এসে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট পড়তে হতো। ১৯৭১ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত পিজিতে তাদের প্রায় সবাইকে পড়িয়েছি। আমাদের ওজিএসবির সবাই আমার ছাত্র-ছাত্রী। এই সংস্থাও ১৯৭২ সালে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি।

 

আপনাদের হাসপাতালও তো আছে?

মিরপুরে আমাদের ওজিএসবির দুটি হাসপাতাল আছে। একটি পুরনো, আরেকটি নতুন। পুরনোটি মিরপুর ঈদগাহ রোডে ভাড়া বাড়ি, নতুনটি সরকারের কাছ থেকে জায়গা কিনে নিয়ে মিরপুর ১৩ নম্বরে পুলিশ কনভেনশন সেন্টারের পাশে আমরা তৈরি করেছি। সেখানে রাস্তা তৈরি করতে হয়েছে। সেগুলোরও আমি চেয়ারপারসন। সেখানে আমরা স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যার এবং শিশুদের সব রকমের চিকিৎসাসেবা দিই। আমাদের সেবার মান ঢাকা মেডিক্যালের মতো। আউটডোরের টিকিট ৫ কি ১০ টাকা। অন্য চিকিৎসা খরচও খুব কম। আমাদের অনেক কনসালট্যান্ট আছেন। ব্যাংকসহ সমাজসেবকরা আমাদের নানা কিছু দান করেছেন।

 

বিভিন্ন হাসপাতালেও কাজ করেছেন, হাসপাতাল গড়েছেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের এই বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করার সময় অনেক ব্যবস্থা বদলে দিয়েছি। সেখানেও প্রায় সবাই আমার ছাত্রী ছিল। আমি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তারা সবাই আমাকে খুব সম্মান করেছে। গাজীপুরের বোর্ড বাজারে ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে ঘটনাচক্রে যুক্ত হয়েছি। গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের আমি চেয়ারপারসন। এখানে আমরা কম খরচে উন্নত সেবা দিই। ভারত থেকেও আমাদের কাছে রোগীরা আসেন। এখানে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হলো, রোগীর সেবা করবে—আমরা এমন ডাক্তার বানাব। ঢাকা শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা বোর্ড, শিশু হাসপাতাল ট্রাস্ট ফান্ড ও ইনস্টিটিউটের আমি চেয়ারপারসন। আমরা হাসপাতালটিকে ৬৫০ বেডে উন্নীত করেছি। নিউনেটেল, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, অ্যাডোলোসেন্ট ওয়ার্ড, কার্ডিয়াক সার্জারির উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। ৪০ শতাংশের বেশি রোগীকে ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছি।

 

(৩০ ডিসেম্বর ২০১৭, পান্থপথ, ঢাকা)


মন্তব্য