kalerkantho


রোগী ভর্তি হয়েছে ৩ দিন চিকিৎসকরা জানেন না

নড়াইল প্রতিনিধি   

২২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



রোগী ভর্তি হয়েছে ৩ দিন চিকিৎসকরা জানেন না

সকাল ৮টা। নড়াইল সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগ খোলা।

অফিস সহায়ক মো. নিজাম উদ্দীনসহ তিনজন দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসক মো. আফতাব উদ্দিন খান রয়েছেন বিশ্রাম কক্ষে। দায়িত্ব পালন শেষে চলে যাওয়ার অপেক্ষায় তিনি। বিভাগের চিকিৎসক ও নার্সদের দায়িত্ব পালনের তালিকায় দেখা গেল ১৭ অক্টোবরের সময়সূচি। কেন হালনাগাদ করা হয়নি জানতে চাইলে নিজাম উদ্দীন  বললেন, ‘ওগুলো ডাক্তার আর নার্সরা লেখে, আমরা জানি না। ’

হাসপাতালে ঢোকার পথে দেখা গেল একটি মাইক্রোবাসে উঠছেন নার্সরা। জিজ্ঞাসা করতেই একজন বললেন, ‘গোপালগঞ্জে নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলন রয়েছে। সেখানে ১৬ জন নার্স যাচ্ছেন নড়াইলের প্রতিনিধি হিসেবে। ’ তাঁরা চলে গেলে হাসপাতালে রোগীদের সেবা ব্যাহত হবে কি না প্রশ্ন করলে একজন জবাব দিলেন, ‘আমাদের ডিউটি নাই।

’ আরেকজন বললেন, ‘আমরা সবাই মিলে অন্যদের ডিউটি পূরণ করে দেব। সবাই তো একসঙ্গে যাওয়া যায় না, তাই আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে ওনারা যাচ্ছেন। ’

সকাল ৮টা ২০ মিনিট। খোলা হয়েছে রেডিওলজি বিভাগ। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট আশীষ কুমার খুলেছেন তাঁর বিভাগ। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁকে নিজের চেয়ারে বসে ঝিমুতে দেখা যায় প্রায় তিন ঘণ্টা। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিদ্যুৎ আসার পর তাঁর কাজ শুরু হয়। কিন্তু দুপুর ১টার সময় এক্স-রে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ কারণে অন্তত ১০ জন রোগীকে বাইরে থেকে এক্স-রে করিয়ে আনতে দেখা গেছে।

গতকাল শনিবার নড়াইল সদর হাসপাতালে সরেজমিনে ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়। দুই দিন ধরে একটানা বৃষ্টি হচ্ছিল। শুক্রবার ভোরের আগ থেকে শহরে বিদ্যুৎ নেই। হাসপাতালের পুরো আঙিনা একেবারে অন্ধকার।

সকাল ৮টা ৩০ মিনিট। বহির্বিভাগের ওষুধ সরবরাহ কক্ষ ও টিকিট কাউন্টার খোলেন অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মচারী গোলাম মোস্তফা। টিকিট কাউন্টারে কর্মরত আলফাজ ছুটিতে থাকায় তিনি একাই পুরুষ ও নারী কাউন্টার সামলাচ্ছেন বলে জানান মোস্তফা।

বৃষ্টির দিন, রোগী কম। কর্মচারীরাও ঠিক সময়ে কাজে যোগ দিতে পারেননি—এমন সব অজুহাতে হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট শরীফুল ইসলাম আসেন সকাল পৌনে ৯টায়। হাসপাতাল থেকে মাত্র ২০০ গজের দূরত্বে থাকা আরেক ফার্মাসিস্ট নিরুপমা মল্লিক আসেন সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে।

সকাল ১০টা পর্যন্ত বহির্বিভাগে কোনো চিকিৎসক আসেননি। সকাল থেকে বিদ্যুৎ নেই, তাই ফিঙ্গারিং মেশিনে কোনো কাজ হচ্ছে না। এর আগে সকাল ৯টার দিকে বহির্বিভাগে রোগীদের কাউন্টার থেকে টিকিট নিতে দেখা গেছে। ওই সময় বহির্বিভাগের ১১৬ নম্বর কক্ষের চিকিৎসকের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তিনি একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার (স্যাকমো)। তাঁর নাম কল্লোল অধিকারী। তাঁর কর্মস্থল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। কিন্তু সেখানে কোনো স্থাপনা না থাকায় নড়াইল সদর হাসপাতালে কাজ করছেন। এই কক্ষে মেডিক্যাল অফিসার ডা. অলোক বাগচীর চিকিৎসা দেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিচ্ছেন। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে রোগীকে জরুরি বিভাগে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বলে জানান এই উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আসেন আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারের (আরএমও) দায়িত্বে থাকা ডা. সুজল কুমার বকশী। এসেই তিনি সোজা চলে যান তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে। পরে আর তাঁকে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাশার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ওনাকে আমার এখানে আসতে বলেছিলাম। ’ কিন্তু পরে কেন আর নিজের কক্ষে বসেননি জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তত্ত্বাবধায়ক।

সকাল ১১টার দিকে হাসপাতালে আসেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অনিতা সাহা। তিনি এসেই ওয়ার্ডে রোগী দেখতে চলে যান। দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে  তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে বসে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু পরে আর হাসপাতাল ভবনের দোতলায় তাঁর কক্ষে বসেননি। বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু রোগীদের তিনি টর্চ নিয়ে দেখেছেন বলে আক্ষেপ করলেন।

বহির্বিভাগের ১১৭ নম্বর কক্ষে শিশু রোগীদের দেখানোর জন্য পাঠানো হলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক রোকসানা বিনতে আকবর দুই দিনের ছুটিতে রয়েছেন। এখানে বসেন ডা. আলীমুজ্জামান সেতু। সকাল ১১টা পর্যন্ত তাঁকে চেম্বারে না পেয়ে ফেরত গেছে কয়েকজন রোগী। সাড়ে ১১টার দিকে ডা. আলীমুজ্জামান এসে আবার ঘণ্টাখানেক থেকে চলে যান। ওই সময় হাসপাতালের দোতলায় ১২ নম্বর কেবিনের সামনে আয়ার সঙ্গে ঝগড়া হচ্ছিল রোগীর স্বজনদের। আয়ার সঙ্গে হাসপাতালের আরেক কর্মচারী যোগ দেওয়ায় রোগীর স্বজনরা চুপ হয়ে যায়।

জানতে চাইলে আবু সাইদ নামের একজন ওই কেবিনে চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজন বলে পরিচয় দেন। তিনি কলেজ শিক্ষক। বললেন, ‘ভাই, আমার তিন বছরের মেয়ে মোসাইবাকে গত বৃহস্পতিবার এই কেবিনে ভর্তি করেছি। এখানে ঢোকার পরে বিড়ালের পায়খানা নিজেরা পরিষ্কার করেছি। দুই দিন কেউ পরিষ্কার করেনি। কেবিনের ভাড়া প্রতিদিন ৩২৫ টাকা। তাহলে পরিষ্কার করবে না কেন জানতে চাওয়ায় আয়া ঝগড়া করছে আমার শাশুড়ির সঙ্গে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এই তিন দিনে আমার মেয়েকে দেখতে আসেননি কোনো ডাক্তার। এটা কি হাসপাতালের নিয়ম?’

এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কেবিনের দায়িত্বে থাকা নার্স গোপালগঞ্জে নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলনে যোগদান করতে গেছেন। তাই কেবিনে থাকা রোগীর ফাইল পৌঁছেনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে।

জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ‘আমরা ওসব বিষয় কিভাবে সমন্বয় করা যায় সে ব্যাপারে আলাপ করছি। ’

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অনিতা সাহা বলেন, ‘আমি তো শিশু ওয়ার্ড, সংক্রামক ওয়ার্ড রাউন্ড দিয়ে আসলাম। আমার কাছে তো ১২ নম্বর কেবিনের কোনো ফাইল আসেনি। ’

সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে আসেন হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. মীনা হুমায়ুন কবীর। হাসপাতালে অ্যানেসথেটিস্ট না থাকায় জরুরি সিজার করতে না পারায় হতাশ তিনি।

ডা. মীনা বলেন, ‘দুই সপ্তাহ ধরে এই হাসপাতালে কোনো অ্যানেসথেটিস্ট নাই। ফলে এখানে সিজার করতে না পেরে অন্তত ৩০ জন গর্ভবতী মা ফেরত গেছেন। এভাবে কোনো হাসপাতাল চলতে পারে না। ’

নিরালী গ্রামের মাঝবয়সী মিনতী রায় শুক্রবার সন্ধ্যায় উঠানে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলেছেন। গতকাল অর্থপেডিক চিকিৎসক ডা. আব্দুল কাদের জসিমকে দেখান। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি এক্স-রেও করান। রিপোর্ট দেখার পর তাঁকে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন ডা. জসিম। তবে চিকিৎসক তাঁকে বলেছেন, ‘অ্যানেসথেটিস্ট এলে পরে অপারেশন করা হবে। ’ এ কথা শুনে মিনতী রায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তাইলে বাইরে কোথাও দেখাব। এখানে পড়ে থেকে কি পচে মরব?’

নড়াইলের আলাদাতপুরের ষাটোর্ধ্ব আবু বক্কর সিদ্দিকী ডায়াবেটিক রোগী। চোখে ঠিকমতো দেখতে পারছেন না বলে এসেছেন সদর হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে। কিন্তু চিকিৎসক না পেয়ে হতাশ হয়ে সকাল ১০টার দিকে চলে যাচ্ছিলেন। তখন কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বললেন, ‘যে ছেলেটা চোখ দেখে, ওর একটি ঔষধে ভালো কাজ হয়েছিল। তাই দেখাতে এসছিলাম। কিন্তু এখনো তো ঘরই খোলেনি। তাই চলে যাচ্ছি। ’

হাসপাতালের অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. আব্দুল কাদের জসিম (অর্থো-সার্জারি), ডা. মায়ারানী বিশ্বাস (গাইনি বিশেষজ্ঞ), শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অনিতা সাহা, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) ডা. এস এম আব্দুর রশীদ, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি) ডা. জয়ন্ত পোদ্দার, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডা. মো. আকরাম হোসেন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি) ডা. মীনা হুমাযুন কবীর কর্তব্যরত আছেন। তাঁদের মধ্যে ডা. জয়ন্ত পোদ্দার ছুটিতে, ডা. মায়ারানী বিশ্বাস, ডা. এস এম আব্দুর রশীদ, ডা. মো. আকরাম হোসেনকে হাসপাতাল চত্বরে পাওয়া যায়নি।

হাসপাতালের এসব সমস্যা নিয়ে কথা হয় তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাশার মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা এতক্ষণ বসে সেসব বিষয় নিয়েই কথা বলছিলাম। ’ তিনি বলেন, ‘নড়াইল হাসপাতালে অ্যানেসথেটিস্ট নাই। কিন্তু লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে দুজন অ্যানেসথেটিস্ট রয়েছেন। আমরা তাঁদের আনার ব্যবস্থা করতে পারছি না। ’

হাসপাতালে অবেদনবিদ (অ্যানেসথেটিস্ট) না থাকার বিষয়ে নড়াইলের সিভিল সার্জন ডা. মুন্সী আসাদুজ্জামান টনি বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ অ্যানেসথেটিস্ট ডা. আবু সাঈদ আল মামুনকে মাগুরায় বদলি করা হয়েছে। আমি খোঁজ নিয়েছি, তিনি মাগুরায় যোগদান করেননি। তাহলে কেন তাঁকে এখান থেকে বদলি করা হলো?’ তিনি আরো বলেন, ‘ওপরের মহলের এক ধরনের খামখেয়ালির কারণে আমরা সঠিক সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সাহেব আমাকে অবহিত করেছেন। আমি আশা করছি, নানা মহলকে ধরে তাড়াতাড়ি অ্যানেসথেটিস্টের ব্যবস্থা করতে পারব। ’


মন্তব্য