kalerkantho


‘সেবার মানে এক শ নম্বরে পাবে কুড়ি’

নড়াইল প্রতিনিধি    

২৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



‘সেবার মানে এক শ নম্বরে পাবে কুড়ি’

সকাল ৮টা। নড়াইল সদর হাসপাতালের ফটক দিয়ে ঢুকে অন্যদিনের পড়ে থাকা আবর্জনা আর দেখা গেল না।

একটু হেঁটে ভেতরের দিকে যেতে যেতে দেখা গেল কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করছেন। জানা গেল, হাসপাতাল পরিদর্শনে আসছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিভাগের পরিচালক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন। তাই সকাল থেকেই হাসপাতালে চলছে ঝাড়া-মোছার কাজ।

সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে একটি ভ্যানে করে হাসপাতালে আনা হয় লোহাগড়া উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের গৃহবধূ আকলিমাকে। প্রসবব্যথা ওঠার পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। জরুরি বিভাগের সামনে আকলিমাকে ভ্যানে রেখেই ভেতরে খোঁজ নিতে গেছেন স্বামী আব্দুল মজিদ। প্রথমে তিনি জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের খবর নেন। সেখান থেকে তাঁকে বলা হলো—হাসপাতালে সিজার হবে না। মজিদ দৌড়ে চলে যান নিচতলার গাইনি বিভাগের পরিচিত একজন নার্সের কাছে।

জানতে পারেন হাসপাতালে অবেদনবিদ নেই বলে প্রায় ১৫ দিন ধরে অস্ত্রোপচার হচ্ছে না। বেরিয়ে এসে মজিদ দেখেন আকলিমাকে বহনকারী ভ্যানের সামনে দুজন লোক দাঁড়িয়ে। তারা আকলিমাকে সিজার করতে হাসপাতালের পাশের একটি ক্লিনিকে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে নিয়ে সেই ক্লিনিকে যেতে যেতে রাগত স্বরে মজিদ বলছিলেন, ‘যে হাসপাতালে ডাক্তার থাকে না সেডার দরকার কি, সরকার এডা বন্ধ করে দিক। ’

সদর হাসপাতাল নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য গতকাল সোমবার সকালে সেখানে গিয়ে এসব দৃশ্য দেখা যায়। জানা যায়, গতকালই মন্ত্রণালয় থেকে হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিভাগের পরিচালক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন।

সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে হাসপাতালের কার্যালয় কক্ষে গিয়ে দেখা মিলল তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাশার মো. আসাদুজ্জামানের। মেহমানকে আপ্যায়ন আর দুপুরে চিকিৎসকদের খাবার কী হবে—এ নিয়ে শলাপরামর্শ চলছিল। কোন কোন চিকিৎসককে ফোন করতে হবে তাও ঠিক করে দিচ্ছিলেন তিনি। পরিচালক আসবেন, তাই হাসপাতালে সাজসাজ রব, কর্মচারীদের গলায় পরিচয়পত্র ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বহির্বিভাগে চিকিৎসা বন্ধ করে ছোটাছুটি করছেন।

হাসপাতালে বৃদ্ধ মাকে চিকিৎসা করাতে এসেছেন বিরডুমুরতলা গ্রামের আকরাম। চিকিৎসকদের এমন ব্যস্ততা দেখে তিনি বলেন, ‘আজকে ওপরের বস আসবেন, আজ আর মাকে ডাক্তার দেখাতে পারব না। ফিরে যাচ্ছি। ’

সকাল সাড়ে ১১টায় হাসপাতালে পরিদর্শনে আসেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিভাগের পরিচালক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন। অন্যদিন হলে যেসব চিকিৎসক হাসপাতালে আসতেন না তাঁরা সরবে তাঁর পাশে পাশে রয়েছেন। ডা. জাহাঙ্গীর কখনো সবাইকে বাদ দিয়ে কেবল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আর সিভিল সার্জনকে নিয়ে একেকটি ওয়ার্ডে ঢুকছিলেন, কথা বলছিলেন রোগীদের সঙ্গে। নার্স আর আয়াদের সঙ্গে কথা বলে নানা ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন তিনি। পুরুষ, নারী ও শিশু ওয়ার্ডে রোগীদের সঙ্গেও কথা বললেন ডা. জাহাঙ্গীর।

পরিচালকের পরিদর্শন চলাকালেই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাইরের একটি অ্যাম্বুল্যান্সে একজন রোগীকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্স বিষয়ে খোঁজ নিতে জানা গেল, সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া বেশি, তাই অধিকাংশ রোগী বাইরের অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবহার করে। কথা হয় রূপগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আমির হোসেনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘গত সপ্তাহে আমার বোনকে যশোর কুইন্স হাসপাতালে নিয়ে গেছি সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সে, ভাড়া নেছে এক হাজার ৬০০ টাকা। অথচ সরকারি ভাড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হওয়ার কথা। ’

হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেল, সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সে প্রতি কিলোমিটার যাওয়া-আসা ২০ টাকা হিসাবে যশোর পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটারের ভাড়া হওয়ার কথা ৭৫০ টাকা।

দুপুর দেড়টা পর্যন্ত হাসপাতাল পরিদর্শন করে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সম্মেলন কক্ষে আসেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে আগে কথা বলেন। পরিদর্শনে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার যে হাল তিনি দেখেছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সেবার মান বিবেচনায় এক শ নম্বরের মধ্যে নড়াইল সদর হাসপাতাল পাবে কুড়ি। তাহলে বোঝেন, এই হাসপাতাল কী পাস করল। ’ তিনি একই সময়ের নাটোর সদর হাসপাতালের তুলনা দিয়ে বলেন, ‘সেখানকার মার্ক হবে আশি। ’

হাসপাতালের চিকিৎসক সংকট বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, সারা দেশে এক হাজার ৭০০ মেডিক্যাল অফিসারের পদ খালি আছে। সরকার আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেবে। তাতে করে চিকিৎসক সংকটের সমাধান হবে।

উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার (স্যাকমো) দিয়ে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যাপারে ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘এটা একটা সাময়িক ব্যবস্থা, এটা স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। ’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট (চক্ষু,) একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অর্থো-সার্জারি), একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (্অ্যানেসথেশিয়া), একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ইএনটি), একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (রেডিওলজি), দুজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি), একজন রেডিওলজিস্ট ও একজন প্যাথলজিস্ট থাকার কথা থাকলেও হাসপাতালে এসব পদে কেউ নেই। এ ছাড়া একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেশিয়া), একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন), তিনজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট  ও তিনজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট  থাকার কথা থাকলেও এসব পদেও কেউ নেই। পাঁচজন মেডিক্যাল অফিসার ও চারজন ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার থাকার কথা থাকলেও আছেন তিনজন। পাঁচজন সহকারী সার্জনের মধ্যে আছেন একজন, মেডিক্যাল অফিসার (ইউনানি) পদে একজনের নাম থাকলেও তিনি প্রেষণে আছেন মেহেরপুরে। নতুন সৃষ্টি করা সেবা-তত্ত্বাবধায়ক পদেও কেউ নেই।

হাসপাতালে একজন ডেন্টাল সার্জন, একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি), একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি), একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ও একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) আছেন। কার্ডিওলজির চিকিৎসক জয়ন্ত কুমার পোদ্দার সপ্তাহখানেক ধরে ছুটিতে। তিনি আর আসবেন না বলেই অন্য চিকিৎসকদের ধারণা। তিনজন বিশেষজ্ঞ  চিকিৎসক মহাপরিচালকের কার্যালয়ের নির্দেশে সদর হাসপাতালে সংযুক্ত। ডা. অলোক কুমার বাগচী একাধারে সদর স্বাস্থ্য বিভাগের এবং সিভিল সার্জন অফিসের মেডিক্যাল অফিসার। জরুরি বিভাগের তিনজন চিকিৎসকের একজন কোনো না কোনো প্রশিক্ষণে বাইরে থাকেন। ফলে দুজন চিকিৎসককে পুরো হাসপাতাল চালাতে হয়।

সদর হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট থাকলেও সিনিয়র স্টাফ নার্স ও স্টাফ নার্স রয়েছেন মোট ৬৮ জন। এ দুটি পদে লোকবলের কোনো ঘাটতি না থাকলেও তাঁদের সেবা নিয়ে রোগীদের রয়েছে ভূরি ভূরি অভিযোগ।

নার্সদের সেবার ব্যাপারে হাসপাতাল পরিদর্শনে আসা পরিচালক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘নার্সদের বেতন বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, তাঁদের গেজেটেড করা হয়েছে। এখন তাঁরা আর কী চান?

হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে নানা পরিকল্পনার কথা জানালেন সদ্য যোগদান করা তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাশার মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে ডাক্তার চেয়ে মহাপরিচালক, খুলনার পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় চিঠি দিয়েছি। স্থানীয়ভাবে জেলা প্রশাসককে এখানকার সমস্যা অবগত করেছি। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে এ মাসেই সভা করার ইচ্ছা আছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সবার মাধ্যমে এই হাসপাতালটির সব সমস্যা সমাধান হবে। ’

নড়াইল জেলার সিভিল সার্জন ডা. আসাদুজ্জামান মুন্সি বলেন, ‘নির্দেশনা মেনে চললে আর আগামীতে চিকিৎসক নিয়োগ হলে নড়াইল সদর হাসপাতালের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। ’


মন্তব্য