kalerkantho


ইলিশ

জালে মাছ মুখে হাসি

তৌফিক মারুফ, ঢাকা-বরিশাল নৌপথ ঘুরে   

২৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



জালে মাছ মুখে হাসি

তিস্তায় জেলেদের জালে ইলিশ। গতকাল রংপুরের গঙ্গাচড়ার মহিপুর ঘাট থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল রাত ১২টা পর্যন্ত। কিন্তু জেলেদের তর সয়নি, কার আগে কে কোন জায়গায় জাল ফেলবে তা নিয়ে পদ্মা, মেঘনাসহ অন্য সব ইলিশপ্রধান নদ-নদীতে রবিবার বিকেল থেকেই শুরু হয় হুড়োহুড়ি।

চলে জাল-নৌকা নিয়ে নদী দখলের লড়াই। যে যার পছন্দমতো স্থানে জাল ফেলে বসে যায় নৌকা নিয়ে। মেঘনা-আড়িয়াল খাঁ-পদ্মায় যত দূর চোখ যায় কেবলই দেখা মেলে জালের ছড়াছড়ি। জলের ওপরে ঢেউয়ের তালে তালে ভাসতে দেখা যায় জালের সঙ্গে বেঁধে রাখা প্লাস্টিকের চিহ্নগুলো।

সন্ধ্যার পর অন্ধকারে চারদিক ঢেকে আসতেই দূর থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় এসব জালের চিহ্ন কিংবা নৌকা বা জেলেদের শরীর। পুরো নদীতে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে দেখা যায় হাজারো বাতি। কোনোটি নৌকার সঙ্গে আবার কোনোটি জালের সঙ্গে, যার আলোতে ঢাকা পড়ে যায় একেকটি বাতিঘর। সবটাই ইলিশ ধরার আয়োজন, যা রীতিমতো জেলেদের এক উৎসবে রূপ নেয় ইলিশপ্রধান নদ-নদী ঘিরে। সেই সঙ্গে প্রথম দিনেই ইলিশেরও ছড়াছড়ি টের পায় জেলেরা।

অক্ষত একেকটি জাল ভরে ওঠে ইলিশে। একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের কান্না আর হতাশা, অন্যদিকে অক্ষত জালের জেলেদের মুখে এখন হাসি আর আনন্দের জোয়ার।

তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেলেদের এমন উৎসবের জোয়ারে ভাটা পড়ে একের পর এক যাত্রীবাহী নৌযানের কারণে। বিশাল আকারের একেকটি লঞ্চ-স্টিমারের পাখার আঘাতে কেটে যেতে থাকে একের পর এক জাল। কোথাও মাঝনদীতে আবার কোথাও তীরের দিকে থাকা জেলেদের চোখের সামনেই পানির নিচে ডুবে থাকা জালের রশি কেটে ভেসে ওঠে। সেই সঙ্গে শুরু হয় ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের চিৎকার। কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালও করে। ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলমুখী আবার দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকামুখী এসব নৌযান মাঝেমধ্যে গতি কমিয়েও এসব জাল রক্ষা করতে পারেনি।

জানতে চাইলে মেঘনায় ইলিশ শিকারি জেলে আলী হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২২ দিন বন্ধের পর নদীতে উৎসব শুরু অইছিল। জাল ভইর‌্যা মাছ উঠতে শুরু করছে। কিন্তু যেই জাইল্যাগো জাল কাটা পড়ছে হেগো তো সর্বনাশ অইয়া গেল। ’

জেলে মনির উদ্দিন গতকাল সকালে ফোনের অপর প্রান্ত থেকেই হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিয়ে বলেন, ‘নতুন জাল কিনতাম পারি না, পুরান জালডারে কত কষ্ট কইর‌্যা কয় দিন বইয়া জোড়াতালি দিছিলাম। বেশি মাছ পাওনের আশায় মাঝখানে গিয়া জাল হালাইছিলাম। কিন্তু বরিশালের তন ঢাকা যাওন্যাকালে একটা লঞ্চ আমার সর্বনাশ কইর‌্যা দিয়া গেছে। দূর দিয়া লাইট মাইর‌্যা ইশারা দিছিলাম, কিন্তু কোনো কাম অয় নাই। লঞ্চডা সোজাসুজি আইয়া আমার জাল কাইট্যা গেছে গা। ’

শুধু আপনার জালই কেটেছে? এমন প্রশ্নের মুখে ওই জেলে বলেন, ‘অন্য কয়েকটা লঞ্চে আরো কয়েকজনের জাল কাটছে। পয়লা দিন দেইখ্যা সবাই হুড়মুড়াইয়্যা যে যেমনে পারছে জায়গা দখল কইর‌্যা জাল হালাইতে গিয়া এহন মাছের বদলে কান্দন লাগদে আছে। ’

আবুল কাশেম নামের আরেক জেলে বলেন, ‘প্রথম দিনেই এত মাছ উঠব তা বুঝতে পারি নাই। মনে অয় যেই কয় দিন মাছ ধরা বন্ধ আছিল, হেইয়া পোষাইয়া যাইব। ’

জাল কাটার কারণ সম্পর্কে ওই জেলে জানান, ইলিশের জালগুলো সাধারণত একেকটি দুই হাজার হাতের মতো লম্বা, যা কেউ এপাশে, কেউ ওপাশে অবস্থান নিয়ে এসব জাল ফেলে রাখার কারণে পুরো নদীই আটকে যায়। জাল এড়িয়ে কোনো নৌযান চলাচলের মতো জায়গা খালি থাকে না। এর মধ্যে ডুবো জাল কিছুটা নিরাপদ হলেও ভাসান জালের ওপর দিকে কোনো নৌযান গেলেই সেই জাল কেটে যায়।

অন্যদিকে পদ্মায় ইলিশ শিকারি মনসুর মাঝি নামের আরেক জেলে জানান, কেবল যাত্রীবাহী নৌযানই নয়, পণ্যবাহী নানা নৌযানের কারণেও অনেক জাল কেটে যায়। এ ক্ষেত্রে অনেক জেলেরও দোষ আছে। তারা জাল ফেলার সময় নৌযান চলাচলের জন্য জায়গা রাখে না। ফলে তারাই বিপদে পড়ে।

আলমগীর মাস্টার নামের একজন লঞ্চচালক কালের কণ্ঠকে বলেন, জেলেরা এমনভাবে পুরো নদী আটকে জাল ফেলে রেখেছিল, যাতে এসব জাল এড়িয়ে লঞ্চ এদিক-সেদিক ঘুরিয়েও অনেক জাল রক্ষা করা যায়নি। লঞ্চের সামনে যে জাল পড়েছে বাধ্য হয়ে তা কেটেই সামনে এগিয়ে যেতে হয়। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) অতিরিক্ত পরিচালক রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৬৬ সালের নৌ চলাচল আইনে পরিষ্কারভাবেই বলা আছে নৌযান চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখার জন্য। এ দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনেরও ওপর ন্যস্ত। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যত্যয় ঘটে। যখনই বিসয়টি আমাদের নজরে আসে তখনই আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করি। মাঝেমধ্যে অভিযানও পরিচালনা করা হয়। ’

ওই কর্মকর্তা বলেন, কেবল অভিযানই নয়, জেলেদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মত্স্য বিভাগেরও কাজ করা দরকার। বিশেষ করে জেলেরা যাতে নৌ চলাচলের পথ ফাঁকা রেখে জাল ফেলে, সে বিষয়ে তাদের সতর্ক করতে হবে। নয়তো জেলেদেরই বেশি ক্ষতি হয়, অন্যদিকে নৌযানও নানা ঝুঁকির মুখে পড়ে।


মন্তব্য