kalerkantho


উত্তরের নদীতে রুপালি ঝাঁক

কালের কণ্ঠ ডেস্ক    

২৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



উত্তরের নদীতে রুপালি ঝাঁক

স্রোতের বিপরীতে চলা মাছ ইলিশ। নোনা পানির এই মাছ মিঠা পানিতে পাওয়া যায় কেবল প্রজনন মৌসুমে।

হাতে গোনা কয়েকটি নদী ছাড়া অন্যান্য নদ-নদীতে কদাচিৎ মেলে ইলিশ। তবে এ বছর এই ধারণা বদলে গেছে, দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীতে প্রচুর ইলিশ পাচ্ছে জেলেরা। পদ্মা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে সেই ইলিশ চলে যাচ্ছে ভারতের আসাম রাজ্যের বিভিন্ন নদীতে।

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা নদী থেকে জালে ইলিশ পাচ্ছে জেলেরা। স্থানীয় লোকজন বলছে, প্রায় ৫০ বছর পর তিস্তায় এভাবে ইলিশ পাওয়া গেল। এ তিস্তাপাড়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে ইলিশ দেখার জন্য ছুটে যাচ্ছে নদীর পাড়ে। রাজশাহীর পদ্মায় গত কয়েক বছর খুব একটা ইলিশের দেখা পেত না জেলেরা। কিন্তু সেই পদ্মায় এখন প্রতিদিনই ধরা পড়ছে ইলিশ।

কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র ও তার সঙ্গে সংযুক্ত তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।

মত্স্য কর্মকর্তারা বলছেন, ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকায় মাছের প্রাচুর্যতা বেড়ে গেছে। নদীগুলোতে পানি থাকায় সহজে এসব মাছ উত্তরের নদীতে চলে এসেছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে আসছে নতুন নিষেধাজ্ঞা। সব ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা ফলপ্রসূ হলে ভবিষ্যতে নদ-নদীগুলোতে ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়বে।

মাত্স্যবিজ্ঞানী, ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রজনন মৌসুমে সাগরের নোনা পানি ছেড়ে মা ইলিশের ঝাঁক নদীর মিঠা পানিতে ছুটে আসে। কোনো বাধা না পেলে দুই থেকে তিন শ কিলোমিটার ভেতরে চলে যায় ইলিশ। সাগরের মোহনার সঙ্গে মেঘনার সম্পর্ক। আবার মেঘনার সঙ্গে পদ্মা, মহানন্দা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, সুরমাসহ অনেক নদীর যোগসূত্র। ফলে এসব নদ-নদীতে তাই তীব্র স্রোতের বিপরীতে চলা ইলিশ এসব নদীতে পাওয়া যাচ্ছে। ’ তিনি বলেন, ‘মা ইলিশের পেটে যখন ডিম আসে তখন সে খাবার বন্ধ করে দেয়। ফলে কোনো খাবার গ্রহণ না করেই টানা দুই মাস ইলিশ বেঁচে থাকে। তাই এসব ইলিশ বিশেষ কিছুদিন অবস্থান করলে কোনো সমস্যা হয় না। তা ছাড়া ইলিশের যে খাবার প্ল্যাংকটন তা কেবল চাঁদপুরের মেঘনাতেই রয়েছে। ফলে সুস্বাদু খাবার খেতেই ইলিশের ঝাঁক মেঘনায় ছুটে আসে। ’

ড. আনিস বলেন, ‘দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের নদীতে এই প্রথম নয়, ১০ বছর ধরেই সেখানে কমবেশি ইলিশ ধরা পড়ছে। এটা অবাক হওয়ার কোনো ঘটনা নয়। ’

রাজশাহী থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, পদ্মায় প্রতিদিনই জেলের জালে ধরা পড়ছে ইলিশ। নগরীসহ পবা, গোদাগাড়ী, চারঘাট ও বাঘা উপজেলা সদরের পাড়া-মহল্লায়ও ফেরি করে বিক্রি হচ্ছে পদ্মায় ধরা পড়া ইলিশ। জেলেরা বলছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এখন ধরা পড়া ইলিশগুলোর আকারও একটু বড়। প্রায় প্রতিটি ইলিশেরই আকার ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম। তারা সারা দিন ৮-১০টি ইলিশ জাল দিয়ে ধরতে পারছে। মাছ বিক্রি করে তারা সংসার চালাচ্ছে। অন্যান্য মাছের চেয়ে এখন ইলিশ শিকারেই বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ছে তারা।

রাজশাহীতে পদ্মা নদীর তীরবর্তী চারটি উপজেলা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে পবা, গোদাগাড়ী, চারঘাট ও বাঘা। প্রতিটি উপজেলার সীমানায় পড়েছে পদ্মা নদীর ২৬ থেকে ২৯ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা। পবা উপজেলার নবগঙ্গা গ্রামের জেলে হযরত আলী বলেন, ‘পাঁচ-সাত বছর আগে নদীতে গেলে জালে ইলিশের দেখা পাওয়া দুষ্কর ছিল। তবে এখন সেই চিত্র আর নেই। এখন পদ্মায় ইলিশ ধরা পড়ছে। কিছু জেলে শুধু ইলিশ শিকারের উদ্দেশ্যেই পদ্মায় জাল ফেলছে। ’

রাজশাহীর শ্রীরামপুর এলাকার জেলে আকবর আলী বলেন, ‘একসময় ছিল পদ্মায় জেলেদের কাছে ইলিশ প্রায় সোনার হরিণে পরিণত হয়েছিল। তবে এখন জেলের জালে কিছুটা করে হলেও ইলিশ আসছে। এভাবে ইলিশ এলেও জেলেরা পদ্মায় জাল ফেলে সংসার চালাতে পারবে। ’

রংপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা নদীতে জেলেদের জালে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক দিন ধরে স্থানীয় জেলে ও লোকজনের পাতা জালে উঠে আসছে ইলিশ। শুধু তিস্তায় নয়, ইলিশ মিলছে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদেও।

গতকাল সোমবার গঙ্গাচড়ার তিস্তা নদীর মহিপুর ঘাট এলাকায় দেখা যায় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা তিস্তার ইলিশ দেখার জন্য মানুষের ভিড়। সর্বত্র শোনা যায় তিস্তায় ইলিশ পাওয়ার গল্প। মহিপুর খেয়াঘাট এলাকার ইজারাদার এনামুল হক বলেন, ‘স্বপ্নেও ভাবিনি এই তিস্তায় ইলিশ মাছ পাওয়া যাবে। ’ লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াহেদুজ্জামান মাবু বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে তিস্তায় ইলিশ পাওয়া যেত। এরপর সেটি ইতিহাস হয়ে আছে। কিন্তু দীর্ঘ এত বছর পর স্থানীয়দের জালে বিভিন্ন ওজনের ইলিশ ধরা পড়ছে। ’

রংপুর জেলা মত্স্য কর্মকর্তা ড. জিল্লুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগেকার দিনে দেশের নদীগুলোতে ইলিশ পাওয়া যেত। কিন্তু অতিরিক্ত মাছ আহরণ, নদী সংকুচিত হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে মাঝখানে নদীতে আর সে মাছ খুঁজে পাওয়া যেত না। গত ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা সফল হওয়ায় মাছের প্রাচুর্যতা বেড়েছে। জাটকা নিধন বন্ধ ও ডিম পাড়ার মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধের সময়সীমা চন্দ্রের সঙ্গে মিল রেখে আরেকটু বাড়ানো হলে ইলিশে সয়লাব হবে বাংলাদেশ। ’

আমাদের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, এ বছর কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। এর আগে এমনটা দেখা যায়নি। ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে সংযুক্ত তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রজননের সময় গোপনে ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন পয়েন্টে শত শত মণ ইলিশ ধরে বিক্রি করেছে জেলেরা। দীর্ঘদিন পর জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ায় খুশি জেলেরা। দামও ছিল সাধারণের হাতের নাগালে।

কুড়িগ্রাম জেলা মত্স্য কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্রহ্মপুত্রে পানির প্রবাহ বেশি থাকায় মূলত ইলিশ ছুটে এসেছে ব্রহ্মপুত্রে। এ বছর ব্রহ্মপুত্র ও সংযুক্ত নদ-নদীতে ধরা পড়ছে ইলিশ।

যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রহিম উদ্দিন রিপন বলেন, প্রতিবছর জেলেদের জালে দু-একটি ইলিশ ধরা পড়লেও ব্রহ্মপুত্রে কখনোই এত ইলিশ দেখেননি তাঁরা। হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বলেন, এ বছরের মতো ইলিশ ধরা পড়লে তাঁদের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি এলাকার মানুষ সহজেই ইলিশ খেতে পারবে।


মন্তব্য