kalerkantho


রোহিঙ্গা ইস্যুতে অবস্থান বদলায়নি কাছের বন্ধুরা

মেহেদী হাসান   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা ইস্যুতে অবস্থান বদলায়নি কাছের বন্ধুরা

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বিশেষ অধিবেশন আয়োজনে বাংলাদেশকে সমর্থন দিলেও অধিবেশনে প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটির সময় অনুপস্থিত ছিল জাপান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৌশলগত মিত্র হয়ে ওঠা চীনের ভোট এবারও জোটেনি বাংলাদেশ উত্থাপিত প্রস্তাবের পক্ষে। আর একাত্তরের যুদ্ধ-বন্ধু এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয়েরই সীমান্ত লাগোয়া প্রতিবেশী ভারত এবারও সতর্ক অবস্থানে থেকেছে পক্ষে-বিপক্ষে কাউকেই ভোট না দিয়ে। মানবাধিকার পরিষদের সদস্য না হওয়ায় গত মঙ্গলবার রাতে জেনেভায় বিশেষ অধিবেশনে ভোটাধিকার ছিল না রাশিয়ার। কিন্তু রাশিয়াও বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিজের অবস্থান সম্পর্কে আভাস দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে গত ১৬ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটির প্রস্তাবে ভোটের ফল আর গত মঙ্গলবার রাতে জেনেভায় মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ অধিবেশনের ভোটের ফলের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। থার্ড কমিটিতে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল ১৩৫-১০ ভোটে। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া ১০টি রাষ্ট্র ছিল চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিরিয়া, ভিয়েতনাম ও জিম্বাবুয়ে। ভারতসহ ২৬টি দেশ প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল।

মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে গত মঙ্গলবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের উত্থাপিত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে ৩৩-৩ ভোটে। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া তিন রাষ্ট্র হলো চীন, বুরুন্ডি ও ফিলিপাইন। ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল এমন ৯টি রাষ্ট্র হলো ইকুয়েডর, ইথিওপিয়া, ভারত, জাপান, কেনিয়া, মঙ্গোলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভেনিজুয়েলা।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের বিভ্রান্তিকর নিরপেক্ষতা : কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয়ের বন্ধু হিসেবে চীন রোহিঙ্গা সংকট প্রশ্নে নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা বললেও গত কয়েক মাসে দেশটি আন্তর্জাতিক ফোরামে কার্যত মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীন ওই পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব আনতে দেয়নি।

জাতিসংঘের অন্যান্য ফোরামেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে উত্থাপিত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে চীন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য চীন বাংলাদেশে ত্রাণ সহযোগিতা পাঠিয়েছে। আবার বৈশ্বিক ফোরামে রোহিঙ্গা নিপীড়নের জন্য মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব উঠলে চীন তার বিরোধিতা করেছে। চীনের এমন নিরপেক্ষতা বিভ্রান্তিকর।’

ওই কূটনীতিক বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখনো যদি বড় ও একমাত্র কোনো বাধা থেকে থাকে সেটি অবশ্যই চীন। দেশটি এখনো মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আছে। এখনো তারা রোহিঙ্গা সংকট দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের কথা বলছে। যদিও বাংলাদেশ স্পষ্ট জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যু এখন আর দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়।

ভারতের সতর্ক অবস্থান : সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা বলছেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয়েরই সীমান্ত লাগোয়া নিকট প্রতিবেশী হওয়ায় ভারতকে সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান নিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রত্যাশা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রস্তাবের পক্ষে ভারত ভোট দেবে। মিয়ানমারের প্রত্যাশা, ভারত প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেবে। এমন একটি অবস্থায় ভারত পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো ভোট না দিয়েই অনুপস্থিত থাকছে।

ভারতের যুক্তি, একক কোনো দেশের বিষয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবকে সমর্থন না করার নীতি অনুসরণ করছে তারা। তবে ভারত আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নকে সমর্থন করে, যার উদ্দেশ্য রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান।

চীনের সমান্তরাল অবস্থানে রাশিয়া : কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভূরাজনীতির অংশ হিসেবেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে কারও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশ দুটি সমান্তরাল অবস্থান নিয়ে আসছে। অর্থাৎ তাদের অবস্থান প্রায় অভিন্ন। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেছে।

রাশিয়া মঙ্গলবার রাতে মানবাধিকার পরিষদে বিশেষ অধিবেশনে রাখাইনে সৃষ্ট সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সংকটের কারণ হিসেবে ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে’ দায়ী করেছে। রাশিয়ার প্রতিনিধি একদিকে মিয়ানমার সরকারকে সব সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে, অন্যদিকে বিশেষ অধিবেশন ডাকার মতো শর্ত পূরণ হয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

আসিয়ান সদস্যদের মধ্যেও পক্ষে-বিপক্ষে ভোট : মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের সদস্য। তবে আসিয়ান জোটেও মিয়ানমারের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান দেখা যাচ্ছে। আসিয়ান সদস্য ইন্দোনেশিয়া জাতিসংঘ থার্ড কমিটির মতো মানবাধিকার পরিষদেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ফিলিপাইন উভয় ফোরামেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। এমনকি ফিলিপাইন মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন পাঠানোরও বিরোধী।

পশ্চিমা দেশগুলোর জোরালো সমর্থন : মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ নিয়ে শুরু থেকেই পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পেয়েছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার রাতে মানবাধিকার পরিষদের ভোটেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শুধু ভোট দেওয়াই নয়, পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিনিধিরা ভোটের আগে মিয়ানমার পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন।

গণহত্যার আশঙ্কা তাত্পর্যপূর্ণ : জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধান যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন বিশেষ অধিবেশনে রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চলার যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাকে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা। তাঁরা বলেন, মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধানের এই আশঙ্কা কার্যত জাতিসংঘেরই আশঙ্কা। এই আশঙ্কার কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। হয়তো ভূরাজনৈতিক নানা স্বার্থ ও সমীকরণের কারণে আজই মিয়ানমারকে জবাবদিহির আওতায় আনা যাচ্ছে না। কিন্তু ভবিষ্যতে সব সময় যে এ সমীকরণ থাকবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে তখন এ ধরনের বক্তব্যের ভিত্তিতে মিয়ানমারকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

১০০ দিনে ছয় লাখ ২৬ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে : গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢল শুরুর পর ইতিমধ্যে ১০০ দিন পার হয়েছে। ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে প্রায় ছয় লাখ ২৬ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে ওই ব্যক্তিদের প্রাণ বাঁচিয়েছে। মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চাপে রাখতে জাতিসংঘ তার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মিয়ানমারের কাছে রাখাইনের মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চেয়েছেন। জাতিসংঘের বিশেষ দূত প্রমিলা প্যাটেন ১২ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা নারীদের ওপর মিয়ানমার বাহিনী ও তাদের দোসরদের যৌন সহিংসতার বিষয়ে তথ্য তুলে ধরবেন।

গত মাসে সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর এ মাসেই তা সাধারণ পরিষদের প্লেনারিতে ওঠার কথা।


মন্তব্য