kalerkantho


জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি ট্রাম্পের

আরব বিশ্বের তীব্র প্রতিক্রিয়া

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি ট্রাম্পের

মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক মহলের অনুরোধ-আহ্বান অগ্রাহ্য করেই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, মার্কিন দূতাবাসও তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নেওয়া হবে।

গতকাল বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা) দেওয়া  গুরুত্বপূর্ণ এক ভাষণে ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। ট্রাম্প বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার থেকে সরে আসছে। 

ভাষণে ট্রাম্প আরো বলেন, দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র দুই রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন জানাতে প্রস্তুত, যদি উভয় পক্ষ সেটাই চায়।

ট্রাম্প একে ঐতিহাসিক ও আধুনিক উভয় বাস্তবতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। তবে দূতাবাস স্থানান্তরের জন্য ট্রাম্প কোনো সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছেন না। প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করতে তিন থেকে চার বছর লেগে যেতে পারে।

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের সমর্থকরা এবং ইসরায়েল সরকার উল্লাস প্রকাশ করতে শুরু করলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে। সৌদি আরব, মিসর, জর্দান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ফ্রান্স, জার্মানি, তুরস্ক আগেই ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিল, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তাতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়বে এবং এতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে চলমান শান্তি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। গতকাল বুধবার নতুন করে জাতিসংঘসহ ব্রিটেন, চীন, সিরিয়া, বিভিন্ন দেশ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে। পোপ ফ্রান্সিস জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী জেরুজালেমের ‘মর্যাদা’ বর্তমানে যে অবস্থায় তার প্রতি সবাইকে সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘জেরুজালেম ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম সবার জন্যই পবিত্র স্থান।’

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় আগামী ১৩ ডিসেম্বর ইস্তাম্বুলে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। ওআইসির সভাপতি দেশের প্রধান হিসেবে এরদোয়ান এ বৈঠক ডাকেন।

প্রাচীন শহর জেরুজালেম মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছে পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত। এটি নিয়ে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুগের পর যুগ ধরে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলে আসছে। পুরো জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে ইসরায়েল। অন্যদিকে পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে চায় ফিলিস্তিনিরা। ১৯৯৩ সালে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তিচুক্তি মতে, জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ পরবর্তী সময়ে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফিলিস্তিনিরা তিন দিনের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে, যা গতকালই শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে ওই এলাকায় বড় ধরনের অশান্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের সংগঠন হামাস নতুন ইন্তিফাদার (গণ-অভ্যুত্থান) ডাক দিয়েছে। গতকাল কয়েক শ ফিলিস্তিন নাগরিক গাজা উপত্যকায় বিক্ষোভে নামে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকার পাশাপাশি ট্রাম্পের ছবিতে আগুন লাগায়। এ ছাড়া পশ্চিম তীরের হেবরনে ও বেথেলহেমের কাছে একটি শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে ট্রাম্পের ভাষণকে ঘিরে আগেই নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জেরুজালেমের ওল্ড সিটি ও পশ্চিম তীরের এলাকা এড়িয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না করলেও তাঁর শিক্ষামন্ত্রী নাফটালি বেনেট জেরুজালেম ইস্যুতে অন্য রাষ্ট্রগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্রের পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় আগামী ১৩ ডিসেম্বর ইস্তাম্বুলে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। ওআইসির সভাপতি দেশের প্রধান হিসেবে এরদোয়ান এ বৈঠক ডাকেন। এ ছাড়া এরদোয়ান ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জাতিসংঘ দূত নিকোলায় ম্লাদেনভ বলেন, জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি আলোচনায়। তিনি বিতর্কিত ওই শহরে যেকোনো ধরনের পাল্টাপাল্টি কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্ক করে দেন। বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিব এই ইস্যুতে বহুবার কথা বলেছেন। তিনি এ কথাও বলেছেন, আমাদের এমন সব কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সকলকেই অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে এ কারণে যে, এর পাল্টা কর্মকাণ্ড ঘটতে পারে।’

ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন গতকাল ব্রাসেলসে বলেন, ‘আমরা খবরটিতে উদ্বিগ্ন। আমরা মনে করি, জেরুজালেমের বিষয়টি অবশ্যই ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতার অংশ হিসেবেই থাকবে।’ দেশটির প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি ট্রাম্পকে জেরুজালেম নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা জানার বিষয়ে ফোন করবেন। তিনি বলেন, জেরুজালেম নিয়ে ব্রিটেনের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি। বিষয়টি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি আলোচনায় সমাধান হবে বলেই তাঁরা মনে করেন।

চীন সতর্ক করে বলেছে, ট্রাম্পের জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ওই অঞ্চলে ‘উত্তেজনা’ বেড়ে যেতে পারে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র চেং সুয়াং বলেন, ‘আমরা ওই অঞ্চলে সম্ভাব্য উত্তেজনা বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন।’

জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেছেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত শান্তি আলোচনা ফের শুরু করার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। জর্দান ও ফিলিস্তিন মিসরের কায়রোতে আরব লিগের জরুরি বৈঠক ডেকেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, শনিবার এই বৈঠক হতে পারে।

মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি ট্রাম্পকে ‘ওই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে জটিল করে না তোলার’ আহ্বান জানিয়েছেন।

সৌদি আরবের অন্যতম মিত্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি বাদশাহ সালমান বলেছেন, মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে সরানো হলে তা হবে ‘বিপজ্জনক পদক্ষেপ’ এবং তা বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়াবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি কড়া ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা এ মার্কিন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না। ইরান সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, রুহানি বিষয়টি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা মার্কিন প্রশাসনের একটি বিপজ্জনক উদ্যোগ, যাতে দেশটির আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।’ এর পরিণাম ভয়ানক হবে বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।

এ ছাড়া ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে পাকিস্তান।

পোপের আহ্বান : পোপ ফ্রান্সিস জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী জেরুজালেমের ‘মর্যাদা’ বর্তমানে যে অবস্থায় তার প্রতি সবাইকে সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘জেরুজালেম ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম সবার জন্যই পবিত্র স্থান’। পোপ বলেন, ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আমার গভীর উদ্বেগ চেপে রাখতে পারছি না। একই সময়ে আমি সবার প্রতি জোরালোভাবে এই আহ্বান জানাব যে জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী শহরটির (জেরুজালেম) মর্যাদা বর্তমানে যেভাবে আছে তার প্রতিই যেন সম্মান জানানো হয়।’ ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার পরদিন গতকাল তিনি বলেন, ‘জেরুজালেম হচ্ছে একটি অনন্য শহর, যা ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের কাছে পবিত্র। তিনটি ধর্মেরই মানুষের কাছে এটি পবিত্র। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, পবিত্র ভূমির স্বার্থে, মধ্যপ্রাচ্যের স্বার্থে এবং সমগ্র বিশ্বের স্বার্থে ওই জায়গাটির এ পরিচয় যেন রক্ষা করা ও অক্ষুণ্ন রাখা হয়।’ সূত্র : বিবিসি, এএফপি, সিএনএন।



মন্তব্য