kalerkantho


মেলা

রসের টানে বকুলতলায়

নওশাদ জামিল   

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রসের টানে বকুলতলায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় গতকাল বসেছিল রস মেলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

শীত আর খেজুরের রস যেন এক সুতোয় বাঁধা। শীত ছাড়া বছরের অন্য কোনো সময় মেলে না এই সুস্বাদু পানীয়। শীতের হিম সকালে খেজুরের রসের গ্লাসে চুমুক দেওয়ার তৃপ্তি—তুলনা মেলা ভার। আবহমানকাল ধরে শীত মৌসুমে খেজুর রসের ঘ্রাণে ভরে ওঠে বাংলার পল্লী-প্রকৃতি। গ্রামে গ্রামে শুরু হয় খেজুরের রস আর গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা খাওয়ার ধুম। তবে ইট-পাথরের নগর রাজধানীতে এই স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ মেলা ভার। খেজুরগাছ নেই, রসও নেই। তার পরও আশপাশের গ্রাম থেকে রাজধানীতে আসে খেজুর রস ও রস দিয়ে তৈরি নানা জাতের গুড়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় গতকাল শুক্রবার নগরবাসী পেয়েছিল খেজুরের রসপানের দারুণ এক সুযোগ। শহরবাসীকে খেজুর রস ও রসে তৈরি মজাদার নানা খাবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ভিন্নমর্ধী এই রসমেলার আয়োজন করা হয়। শীতের সকালে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় হতে, রসের টানে চারুকলায় জড়ো হয়েছিল নানা বয়সের অসংখ্য রসিক মানুষ। খেজুরের টাটকা রসে রাজধানীবাসী মেতে ওঠে গ্রামীণ আমেজে।

‘রঙ্গে ভরা বঙ্গ’ নামের একটি সংগঠন আয়োজন করে এই মেলা। এ উপলক্ষে চারুকলার বকুলতলা সাজানো হয় গ্রামীণ আবহে। গাছগাছালির নিচে সারি সারি মাটির হাঁড়ি। তাতে টাটকা খেজুর রস। অন্য পাশে রসের তৈরি নানা জাতের গুড় ও খাবারের পসরা। খেজুর রস থেকে তৈরি গুড়ও নানা নামের—ঝোলা গুড়, নলেন গুড়, পাটালি গুড়। ছিল খেজুর রসের তৈরি হয় নানা জাতের পিঠা।

মুড়ি-মুড়কি-বাতাসার সঙ্গে খেজুর গুড়। সঙ্গে হিম খেজুর রস। শহরবাসী যেন ফিরে যায় গ্রামের এক অনন্য জীবনে। মাটির কলসি ও মাটির গ্লাসে আগতদের পরিবেশন করা হয় খেজুর রস। সঙ্গে ছিল নলেন গুড়ের পিঠা। বাদ যায়নি মুড়ি, মুড়কি, বাতাসাও। শীতের রাতে ‘দস্যি দলের’ রস চুরি, খেজুর গুড়ের পায়েস আর পিঠাপুলির স্মৃতিচারণা করলেন মেলায় আসা রসিকজন। মাটির গ্লাসে আসা রসে চুমুক দিতে দিতে একেকজনের হা-পিত্যেশ—‘কোথায় গেল সেই শৈশব!’

গতকাল সকালে মেলার উদ্বোধন করেন লেখক ও প্রাবন্ধিক হায়াৎ মামুদ। আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সচিব আকতারী মমতাজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির ফোকলোর বিভাগের পরিচালক শাহিদা খাতুন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউডার চারুকলার অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদ, কোরিয়ান উন্নয়ন সংস্থা কইকার কান্ট্রি ডিরেক্টর ক্যারি হিউনগু জুয়ে।

হায়াৎ মামুদ বলেন, ‘খেজুর রসের সঙ্গে জড়িয়ে আমাদের শৈশবের নানা স্মৃতি! শহরের তরুণ-তরুণীরা এই মজাদার পানীয় থেকে বঞ্চিত। এই উৎসবে আসুন সবাই মিলে গ্রামের জন্য মঙ্গল কামনা করি—গ্রামগুলো যেন ভালো থাকে। কেননা গ্রাম ভালো থাকলে দেশ ও শহর ভালো থাকবে।’

আকতারী মমতাজ বলেন, ‘রস উৎসব মনে করিয়ে দেয় বাঙালির রসবোধের কথা। খেজুর রসের পায়েস, পিঠা, ক্ষীর, সন্দেশ যে কত মজাদার, তার সত্যিই কোনো তুলনা নেই।’

লোকজ উপাদানের গবেষক শাহিদা খাতুন বলেন, ‘রস উৎসব বাঙালির সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির উৎসব। আমরা অতীতের ঐতিহ্যকে ধারণ করে বাংলার আবহমান সংস্কৃতিকে আরো এগিয়ে নেব, এই শপথ নিই। আমরা যেন কোনোভাবেই ঐতিহ্যবিমুখ হয়ে না পড়ি সে জন্য নগরে এ উৎসব বড় প্রয়োজন।’

রসের মেলায় বাড়তি অনুষঙ্গ হিসেবে ছিল গানবাজনার আসরও। সকাল সাড়ে ৮টায় জনি বয়াতি ও তাঁর দলের লোকজ সংগীত পরিবেশনায় শুরু হয় রস উৎসব।

মেলায় এসেছিলেন আবৃত্তিশিল্পী জুবাইদা লাবণী। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘নগরে যে লোকজ উৎসবগুলো হয় তার মধ্যে রস উৎসব একটু ব্যতিক্রম। অধিকাংশ বাঙালি খেজুর রসের সঙ্গে পরিচিত।’

আয়োজক সংগঠনের অন্যতম সদস্য ইমরান উজ জামান বলেন, ‘সপ্তমবারের মতো আমরা এই উৎসব আয়োজন করছি। উৎসবে রসের পাশাপাশি লোকজ উপাদানগুলোও রাখার চেষ্টা করেছি।

প্রজন্ম যেন কোনোভাবেই আমাদের শিকড়ের কথা ভুলে না যায়, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমাদের এ আয়োজন।’


মন্তব্য