kalerkantho


প্রার্থীর খোঁজে আ. লীগ বিএনপির ভরসা পিন্টু

অরণ্য ইমতিয়াজ ও আব্দুর রাজ্জাক   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রার্থীর খোঁজে আ. লীগ বিএনপির ভরসা পিন্টু

গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-২ আসন। জাতীয় সংসদের আসন নম্বর ১৩১। আসনটির অন্তর্ভুক্ত দুই উপজেলায়ই আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে চরম অন্তঃকলহ রয়েছে। বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ব্যানার, রংবেরঙের পোস্টার, ফেস্টুন নিয়ে নিজেদের আগ্রহ জানান দিচ্ছেন। তাঁরা নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়সহ বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। নির্বাচন সামনে রেখে তাঁরা উন্নয়নমূলক কাজ, জনসভা, পথসভাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছেন।

বর্তমান সংসদ সদস্য খন্দকার আসাদুজ্জামান আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে এ আসনে তিনবার নির্বাচিত হন। তাঁর বয়স হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ। তাঁর পক্ষে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। এমন হলে আওয়ামী লীগকে নতুন প্রার্থী খুঁজতে হবে। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আরো যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁদের মধ্যে আছেন খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেল, মো. ইউনুছ ইসলাম তালুকদার ঠাণ্ডু, খন্দকার আশরাফউজ্জামান স্মৃতি ও তানভীর হাসান।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় কারাবন্দি আব্দুস সালাম পিন্টু এ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি চারদলীয় জোট সরকারে উপমন্ত্রীও ছিলেন। এ আসনে তিনিই বিএনপির ভরসা। বিকল্প সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁদের অন্যতম হচ্ছেন পিন্টুর ছোট ভাই শামসুল আলম তোফা ও যুবদল নেতা সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য খন্দকার আসাদুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবেন না বলে দলীয় একাধিক সূত্র মনে করছে। মনোনয়ন চাইতে পারেন তাঁর ছেলে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক পরিচালক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেল। তিনি এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে নেতাকর্মীদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। বিগত বন্যায়ও ব্যাপক ত্রাণ তত্পরতা চালিয়েছেন তিনি। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান ও দুস্থ নেতাকর্মীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

মশিউজ্জামান রোমেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বাবা তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। বাবার সঙ্গে আমিও দীর্ঘদিন যাবৎ মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। বাবার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে মনোনয়ন চাইব। আশা করি, তিনি মূল্যায়ন করবেন।’

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের আরো কয়েকজন নেতা নিজ নিজ আঙ্গিকে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন গোপালপুর উপজেলা পরিষদের দুইবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মো. ইউনুছ ইসলাম তালুকদার ঠাণ্ডু। তিনি গোপালপুরে সুপরিচিত হলেও ভূঞাপুরে নতুন। আর এ কারণে ভূঞাপুরে অফিস ভাড়া নিয়ে তিনি নেতাকর্মীদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে পরিচিত হচ্ছেন ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করছেন। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আশরাফউজ্জামান স্মৃতি এবং দলের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক তানভীর হাসান মনিরও দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও দুইবারের পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদ দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন। এদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে মনোনয়ন দৌড়ে তিনি অনেকটাই এগিয়ে গেছেন বলে অনেকে মনে করে।

আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে খ্যাত গোপালপুরেও রয়েছে ব্যাপক কোন্দল। গোপালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হালিমুজ্জামান এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মো. রকিবুল হক ছানার মধ্যে ব্যাপক দ্বন্দ্ব রয়েছে। ফলে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এখন দুটি অংশে বিভক্ত। দলীয় কার্যক্রমেও পড়েছে ভাটা।

এ উপজেলায় বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই চলছে দলটি। আহ্বায়ক খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম রুবেল ও যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম লেলিনের মধ্যে রয়েছে তীব্র দ্বন্দ্ব। ফলে নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছে দুটি অংশে।

এ আসনে বিএনপির  মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তিনবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর। তিনি ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় দীর্ঘদিন যাবৎ কারাবন্দি রয়েছেন। তাঁর ছোট ভাই টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি শামসুল আলম তোফা ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এলাকায় গিয়ে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করছেন। সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, আব্দুস সালাম পিন্টু একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। ত্যাগ-তিতিক্ষায় তিনিই একমাত্র যোগ্য প্রার্থী। বিনা দোষে তাঁকে কারাগারে রাখা হয়েছে। এ জন্য তাঁর প্রতি দলের এবং সাধারণ ভোটারদের সমবেদনা রয়েছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিনি ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন।

এ ছাড়া বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক পৌর মেয়র অ্যাডভোকেট আব্দুল খালেক মণ্ডলও বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘স্ট্যান্ডিং কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়াই আমাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। আমি বিএনপিতে ছিলাম ও আছি। নিয়মিত দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছি।’

ভূঞাপুরে উপজেলা ও পৌর বিএনপির দুটি কমিটি রয়েছে। উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা ও অন্যটির সদ্য বহিষ্কৃত সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক পৌর মেয়র অ্যাডভোকেট আব্দুল খালেক মণ্ডল। তবে বেশির ভাগ নেতাকর্মী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফার অনুসারী। এবার বন্যায় ত্রাণ বিতরণের সময় উভয় কমিটির লোকজনকে পৃথকভাবে ত্রাণ বিতরণ করতে দেখা গেছে। বিজয় দিবসেও বিএনপির দুই গ্রুপই ব্যাপক শোডাউন করে স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। অন্যদিকে দলীয় কোন্দলের কারণে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই চলছে ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ। বর্তমান আহ্বায়ক কমিটিতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দেওয়ায় তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।

টাঙ্গাইল-২ আসনে গোপালপুর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং ভূঞাপুর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাতেম আলী তালুকদার ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মো. হাতেম আলী খানকে পরাজিত করেন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি প্রার্থী আফাজ উদ্দিন ফকির জয়লাভ করেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের হাতেম আলী তালুকদার। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামছুল হক তালুকদার ছানু আওয়ামী লীগের হাতেম আলী তালুকদারকে পরাজিত করেন। ১৯৮৮ সালে জাসদের (সিরাজ) আ. মতিন হিরু নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির শামছুল হক তালুকদার ছানু। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুস সালাম পিন্টু আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাতেম আলী তালুকদারকে পরাজিত করেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির আব্দুস সালাম পিন্টু পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছরই সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুস সালাম পিন্টু আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদুজ্জামানের কাছে হেরে যান। ২০০১ সালে বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধার করে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদু্জ্জামানকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন পিন্টু। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য  নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের খন্দকার আসাদুজ্জামান। আব্দুস সালাম পিন্টু ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় কারাগারে থাকায় তাঁর ছোট ভাই তৎকালীন ছাত্রদল নেতা সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিএনপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং হেরে যান। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদুজ্জামান তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) প্রার্থী  আজিজ বাঙ্গাল।

এবার এ আসনে মহাজোটের অংশীদার জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে মনোনয়ন চাইতে পারেন শামছুল হক তালুকদার ছানু।


মন্তব্য