kalerkantho


কেন্দ্রের ২০০ মিটার এলাকায় ফোন বহন নিষিদ্ধ

এমসিকিউ থাকবে না : প্রতিমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কেন্দ্রের ২০০ মিটার এলাকায় ফোন বহন নিষিদ্ধ

প্রশ্ন ফাঁস রোধে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাকেন্দ্রসহ চারপাশের ২০০ মিটারের মধ্যে মোবাইল ফোন বহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নির্দেশ অমান্য করলে গ্রেপ্তার করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পরীক্ষার দিন সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েও তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আজ পদার্থবিজ্ঞান, বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা এবং ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং পরীক্ষা রয়েছে।

গত রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ সংক্রান্ত’ এক আদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানদের এই নির্দেশ পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে সব পরীক্ষার্থীর আবশ্যিকভাবে হলে প্রবেশ ও আসন গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং ওই সময়ের পরে কোনো পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষার সময় কেবল কেন্দ্র সচিব সাধারণ একটি মোবাইল ফোন (স্মার্টফোন নয়) ব্যবহার করতে পারেন, এমন ফোন যা দিয়ে ছবি তোলা যায় না। তবে ওই ফোনটিও কেন্দ্র সচিবের কক্ষে রেখে ব্যবহার করার নিয়ম।

রবিবারের নির্দেশে আরো বলা হয়, পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে সব পরীক্ষার্থীকে হলে প্রবেশ করে আসনে বসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কিছু কিছু কেন্দ্রে ওই সময়ের পরও পরীক্ষার্থীরা প্রবেশ করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রের আশপাশে অনেকেই স্মার্টফোন নিয়ে ঘোরাফেরা করছে।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে গত শনিবার বিটিআরসি মোবাইল অপারেটরদের সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ রাখতে বলে। এরপর রবিবার মোবাইল অপারেটরসহ ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরদের এসএসসি ও সমমানের প্রতিটি পরীক্ষার দিন সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবার গতি কমিয়ে বা প্রায় বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশ রবিবার রাতে ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নও করা হয়। কিন্তু গতকাল সোমবার সকালে স্থগিত করা হয় ইন্টারনেট বন্ধ রাখার নির্দেশ। সকালে ৮টা ১০ মিনিটে আইআইজি অপারেটরদের ই-মেইল দিয়ে ইন্টারনেটের গতি স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দেয় বিটিআরসি। ই-মেইলে বলা হয়, ‘ইন্টারনেটের গতি সীমিত করার সব নির্দেশনা পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।’

নুসরাতের ১০ সিম : প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সিলেট শহর থেকে নুসরাত জাহান নামের একজনকে দশটি সিমসহ আটক করেছে পুলিশ। নুসরাত সিলেট এমসি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার তিরাইলের আব্দুর রশিদের মেয়ে। ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্ন বিক্রির অভিযোগ পেয়ে গত রবিবার রাতে বিয়ানীবাজার থানার পুলিশ সিলেট শহরের শিবগঞ্জ-হাতিমবাগের একটি বাসা থেকে নুসরাতকে আটক করে। এ সময় তাঁর কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন সেট, দুইটি পেনড্রাইভ ও ১০টি সিম জব্দ করা হয়। পুলিশ এসএসসি পরীক্ষার্থী সেজে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে বলে জানা গেছে।

এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে এমসিকিউ পদ্ধতি তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী। গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, একটি চক্র প্রশ্ন ফাঁস করে সরকারকে বিব্রত করার অপচেষ্টা করছে। এরই মধ্যে তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে এমসিকিউ প্রশ্ন পর্যায়ক্রমে তুলে দেওয়া হবে। তাহলে প্রশ্ন ফাঁসের সুযোগ থাকবে না বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।

রাজধানীতে গ্রেপ্তারকৃত ১৪ জন এবং সন্দেহভাজন আরো কয়েকজনের সূত্রে প্রশ্ন সরবরাহ করা অর্ধশতাধিক গ্রুপ শনাক্ত করা হয়েছে—গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। স্কুল বা শিক্ষা বিভাগে সম্পৃক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের হাত থেকেই প্রশ্ন ফাঁস হয় বলেই ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। ডিবির এক কর্মকর্তা গতকাল পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শেষ ধাপে যেতে চাইছি আমরা। ধারণা করছি, সেখানে শিক্ষক বা প্রেসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী থাকতে পারে। গ্রেপ্তারকৃত ১৪ শিক্ষার্থী বা প্রশ্ন বিক্রেতার যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, তারা নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপ থেকে প্রশ্ন পেয়েছে। এরপর বিক্রি করেছে আলাদা গ্রুপে। বিক্রেতা গ্রুপগুলোর সূত্র ধরেই প্রশ্ন ফাঁসকারীকে খোঁজা হচ্ছে। বেশ কিছু ফেইক (ছদ্ম) নাম পাওয়া গেছে। এগুলো ধরে তদন্ত চলছে।’

চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার ২ : গত রবিবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানের জগন্নাথহাট বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তারের পর মাত্র ২০০ টাকায় এসএসসি প্রশ্নপত্র বিক্রির তথ্য পেয়েছে র‌্যাব-৭। মোবাইল ফোনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃতরা হলো রাউজানের ডাবুয়া গ্রামের মো. শাহ আলমের ছেলে মো. ইমরান (১৮) ও একই এলাকার মো. নূরুচ্ছফার ছেলে মো. নূরুল আফছার সবুজ (২০)। ইমরান এসএসসি পরীক্ষার্থী। সে নিজে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে এবং অন্য বন্ধুদের বিক্রি করে টাকা আয় করছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।

র‌্যাব ৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতা উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত দুজন জানিয়েছে, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে কেনাবেচা হলেও টাকা লেনদেন হয় বিকাশের মাধ্যমে। তিনি আরো বলেন, মাত্র ২০০ থেকে ৬০০ টাকার বিনিময়ে তারা প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছে। এসব প্রশ্নপত্র সংগ্রহের পরপরই তারা অন্যদের মধ্যে বিক্রি করে দেয়।

র‌্যাব ৭-এর উপ-অধিনায়ক লে. কমান্ডার আশিকুর রহমান বলেন, রবিবার আইসিটি বিষয়ের পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় এবং সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে আসে। আইসিটি বিষয়ের প্রশ্ন ছাড়াও দুজনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইংরেজি, গণিতসহ একাধিক প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে।

গ্রেপ্তারের পর মো. ইমরানের কাছে কয়েকটি ট্রান্সলেশনের বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। কিন্তু ইমরান এর উত্তর দিতে পারেনি। এতে বিস্মিত হন র‌্যাব কর্মকর্তারা। এত সহজ প্রশ্ন করা হয়েছিল সেগুলো প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও দিতে পারে বলে মনে করেন লে. কমান্ডার আশিকুর রহমান। তিনি আরো বলেন, ‘একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী লেখাপড়ায় এতটা দুর্বল, ভাবলেই অবাক লাগে।’ তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃত দুজনের বিরুদ্ধে ‘পাবলিক পরীক্ষা আইন’ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুজনের বিরুদ্ধে রাউজান থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন র‌্যাবের ডিএডি নাজমুল হুদা। পরে দুজনকে রাউজান থানায় সোপর্দ করা হয়।

এদিকে প্রশ্ন ফাঁস খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গত রবিবার তাদের প্রথম সভা করেছে। সভাশেষে এই কমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর বলেন, ‘এরই মধ্যে অনেক মোবাইল ফোন নম্বর চিহ্নিত করে তা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। পুলিশ একাধিক চক্রকে গ্রেপ্তারও করেছে। আগামী রবিবার আমরা আবার বসব। এরপর দুই-এক দিনের মধ্যেই আমরা আমাদের প্রতিবেদন জমা দেব।’

নবাবগঞ্জে গ্রেপ্তার ৬ : নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন জানান, এসএসসি গণিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত শনিবার নবাবগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে থেকে বক্সনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রনি মিয়া (২৮) ও বাহ্রা ওয়াছেক মেমোরিয়াল হাই স্কুলের শিক্ষক সোহেল রানাকে (৩০) আটক করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল বাহ্রা ও আলালপুর থেকে ছয় এসএসসি পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। তারা হলো মো. রাব্বি, মো. রুহান, শামীম হাসান, মো. শাকিব, তৌহিদুল ইসলাম ও মো. আলামিন। তারা সবাই এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী বলে জানা গেছে। আরাফাত হোসেন জানান, দুই শিক্ষক ও ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে সোমবার আদালতে পাঠানো হয়েছে।

গত শনিবার রাজধানীতে ১৪ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় চারটি মামলা হয়। শেরেবাংলানগর থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলায় তিন ভাই আমান উল্লাহ, বরকত উল্লাহ, আহসান উল্লাহ এবং শাহাদাত হোসেন স্বপনকে রবিবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। যাত্রাবাড়ী থানায় পুলিশের আরেক মামলায় রাহাত ইসলাম, সালাউদ্দিন, সুজন, জাহিদ হোসেন, সুফল রায় শাওন, আল আমিন ও সাইদুল ইসলামের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এদিকে শনিবার শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল কেন্দ্র থেকে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুলের পরীক্ষার্থী তাহসিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। হাজারীবাগ থেকে আরেক পরীক্ষার্থী আবিরকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুই পরীক্ষার্থীর সহযোগী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের রিমান্ড চায়নি পুলিশ।


মন্তব্য