kalerkantho


বই ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করি না

সঙ্গীতা ইমাম

নওশাদ জামিল   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বই ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করি না

উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম। পরিবার থেকেই পেয়েছেন সাংস্কৃতিক দীক্ষা, পেয়েছেন বই পড়ার অনুপ্রেরণা। ছোটবেলায় তাঁকে হাত ধরে বইমেলায় নিয়ে আসতেন বাবা বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাসান হাসান ইমাম ও মা বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান। পাঠক হিসেবে প্রতিবছর মেলায় আসেন; ঘুরে ঘুরে বই কেনেন, প্রিয়জনকে বই উপহার দেন। বই পড়া প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় সঙ্গীতা ইমাম বললেন, ‘বই ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করি না। যত ব্যস্ততাই থাকুক, কিছু না কিছু পড়ার চেষ্টা করি। দুই মলাটে ছাপার অক্ষরেই বই পড়তে ভালোবাসি বেশি। অনেক সময় সাথে বই না থাকলে ইন্টারনেটেও পড়া হয় বিভিন্ন কিছু।’

বইমেলায় পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের সামনে গতকাল সোমবার বিকেলে কয়েকজন বন্ধু-সহকর্মীর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন সঙ্গীতা ইমাম। তাঁদের সেই আড্ডারও কেন্দ্র ছিল বই। আড্ডার এক ফাঁকে দীর্ঘক্ষণ কথা হয় তাঁর সঙ্গে। প্রথম বই পড়ার অনুপ্রেরণা কার কাছে—এ প্রশ্নের জবাবে সঙ্গীতা বলেন, ‘আমার দাদি সাঈদা খাতুনের কাছেই প্রথম পেয়েছিলাম বই পড়ার অনুপ্রেরণা। দাদি ছিলেন সর্বভারতের বিখ্যাত বামপন্থী রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে। পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতিতে তাঁর পরিবারের ছিল অগ্রণী ভূমিকা। দেশভাগের পর তাঁরা চলে আসেন ঢাকায়। আমার ছোটবেলা কেটেছে দাদির স্নেহ ও মায়ায়। খুব যত্ন করে তিনি আমাকে পড়ে শোনাতেন দেশ-বিদেশের গল্পের বই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকুমার রায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ অনেক লেখকের সঙ্গেই তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।’

ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে ছেলে-মেয়েরা কখনো বিপথে যেতে পারে না উল্লেখ করে সঙ্গীতা ইমাম বলেন, ‘সব অভিভাবকই ছেলে-মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান। কিন্তু উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যদি সৃজনশীলতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ, বিনয় ও উদারতার সংশ্লেষ না ঘটানো হয়, তাহলে সেই উচ্চশিক্ষা ব্যর্থ হয়ে যায়। শিক্ষার মূল লক্ষ্যটাই সত্যিকারের মানুষ হওয়া। শুধু পাঠ্যপুস্তক পড়ে সেই মানুষ হওয়া সম্ভব নয়। তার জন্য সৃজনশীল ও মননশীল সাংস্কৃতিক চর্চা ও বই পড়া অত্যাবশ্যক। পরিবার থেকে যদি অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তচিন্তা, সহনশীলতার শিক্ষাটা না দেওয়া হয়, ছেলে-মেয়েদের ভেতর মানবিকবোধ জাগ্রত না করা হয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ না শেখানো হয়, তাহলে সত্যিকার মানুষ হওয়া কঠিন হয়ে যায়। আর সেই পরিশীলিত, মার্জিত, বিনয়ী, দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমিক মানুষ হতে শেখায় বই।’

বাবা হাসান ইমামকে একজন সত্যিকারের মানুষের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে সঙ্গীতা বলেন, ‘সত্যিকার মানুষ শব্দটি যখন উচ্চারণ করি, তখন ভেসে ওঠে বাবার মুখটি। পরিপূর্ণ একজন আদর্শ মানুষ তিনি। সব ধরনের মানবিক গুণের অপূর্ব সমন্বয় তাঁর মধ্যে দেখেছি, তাঁর কাছেই পেয়েছি মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা। আমার মা লায়লা হাসানও চমৎকার মানুষ। অবচেতন মনে আমি মাকে ধারণ করি, কিন্তু সব সময় হতে চেয়েছি বাবার মতো। বাবাকে ছোটবেলায় বলেছিলাম—আমি যদি তোমার মতো হতে চাই, তার জন্য সবার আগে কী করতে হবে? তখন বাবা একটি কথাই বলেছিলেন, প্রচুর বই পড়তে হবে।’

সঙ্গীতা জানালেন, এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে যখন অবসর সময় কাটাচ্ছিলেন, তখন তাঁর বাবা সঙ্গীতার হাতে তুলে দেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতাসমগ্র। প্রতিদিন বাবার সামনে তাঁকে আওয়াজ করে পড়তে হতো মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা। শব্দ করে পড়ার কারণ ছিল দুটি; প্রথমত বাক্য ও শব্দ শেখা, দ্বিতীয়ত সঠিক উচ্চারণ শেখা।

সবচেয়ে প্রিয় লেখক কে—এ প্রশ্নের জবাবে সঙ্গীতা ইমাম বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছোটবেলায় কবিগুরুর গল্পগুচ্ছ পড়ে তাঁর প্রেমে পড়েছিলাম। একটু বড় হওয়ার পর তাঁর গান শুনে সেই প্রেমটা তীব্র হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রতি সেই প্রেমের গাঢ়তা এখন পর্যন্ত এতটুকুও কমেনি।’

নিজের লেখালেখি প্রসঙ্গে সঙ্গীতা ইমাম বলেন, “শিশু-কিশোরদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন আমার। তাদের জন্যই হাতে কলম তুলে নিয়েছি। লিখেছি জীবনের প্রথম বই। বইটির নাম ‘আমাদের গল্প’, প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। আজকের শিশু-কিশোরই আগামী দিনের সত্যিকার মানুষ হবে। সমাজ বদলের সত্যিকার হাতিয়ার হবে।”


মন্তব্য