kalerkantho


পছন্দমাফিক বই কেনার সময়

নওশাদ জামিল   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পছন্দমাফিক বই কেনার সময়

দিনমান ছিল রোদের খেলা। দুপুরে কিছুটা গরম অনুভূত হলেও আবহাওয়া ছিল মনোরম। এমনই দিনে গতকাল শনিবার বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বইমেলা প্রাঙ্গণে ঢুকতেই বোঝা গেল, উদ্যানের গাছগাছালি নাড়িয়ে বইছে ফাগুনের এলোমেলো হাওয়া। মন-মাতানো সেই হাওয়ায় মেলা প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়াল অসংখ্য পাঠক ও ক্রেতা-দর্শনার্থী। শুধু ঘুরে বেড়ানো নয়, কমবেশি সবার হাতেই দেখা গেল সদ্য কেনা নতুন বইয়ের প্যাকেট।

সপরিবারে গ্রন্থমেলায় এসেছিলেন আসাদুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী কেয়া চৌধুরী। সঙ্গে একমাত্র সন্তান আয়মান রহমান। স্বামী-স্ত্রী দুজনের হাতেই সদ্য কেনা বইয়ের প্যাকেট। প্রথমা প্রকাশনীর সামনে দাঁড়িয়ে গতকাল বিকেলে আসাদুর রহমান বলেন, ‘ব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন মেলায় আসতে পারি না। সাধারণত মেলার মাঝামাঝি সময়ে ও শেষ দিকে আসি। তখন নতুন বইগুলো প্রকাশিত হয়ে যায়। ফলে দেখেশুনে বই কেনা সহজ হয়।’

বইমেলার এই মাঝামাঝি সময়টা বেশ তাৎপর্যময়। এ সময় দর্শনার্থীর চেয়ে ক্রেতা-পাঠকই থাকে বেশি। এটাই পছন্দের বই কেনার উপযুক্ত সময়। এখন মেলায় যারা আসছে, তাদের বেশির ভাগই বই কিনে বাড়ি ফিরছে।

অনিন্দ্য প্রকাশের প্রধান নির্বাহী আফজাল হোসেন জানান, বসন্ত আর ভালোবাসা উৎসবের পর মেলায় চলছে সত্যিকার বেচাবিক্রির পর্ব। এখন পাঠক বই কিনতে আসছে।

গ্রন্থমেলায় গতকাল সকালটা ছিল শিশু-কিশোরদের। দুপুরের পর শুরু হয় সব বয়সী মানুষের আনাগোনা। সন্ধ্যাটা হয়ে ওঠে আনন্দের সম্মিলন। এ সময় প্রচণ্ড ভিড়-বাট্টা দেখা যায়। বিক্রিও ছিল ধুন্ধুমার। তাম্রলিপি প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী এ কে এম তারিকুল ইসলাম রনি বলেন, ‘প্রথম সপ্তাহে মন্দা থাকলেও এখন বিক্রি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, বাড়ছে প্রকৃত পাঠকের আনাগোনাও। আশা করি, এই ধারা শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।’ 

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন সত্তরোর্ধ্ব কাবেদুল ইসলাম। বাড়ি পুরান ঢাকার ওয়ারীতে। কালের কণ্ঠকে তিনি বললেন, ‘সত্তরের দশক থেকে মেলায় আসি। প্রতিবছরই বই কিনি। এবার খানিকটা অসুস্থ ছিলাম। তবু চলে এসেছি।’

গ্রন্থমেলায় গতকাল প্রকাশিত হয়েছে ২২১টি বই। এর মধ্যে চারটি বইয়ের তথ্য পরিচিতি ছাপা হলো।

সুবর্ণ শেকড় : ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সায়েন্স ফিকশন ঘরানার উপন্যাস। বইটি কল্পকাহিনির হলেও তা বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত। বিশেষত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। উঠে এসেছে যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গ। উপন্যাসটির ভাষা প্রাঞ্জল ও ঝরঝরে। সহজ ভাষায় লেখা উপন্যাসটি সব শ্রেণির পাঠকের আনন্দের উপকরণ হতে পারে। বইটি প্রকাশ করেছে তাম্রলিপি। প্রচ্ছদ করেছেন তাহমিনা ইয়াসমিন। দাম ২২০ টাকা।

কঙ্কাবতীর নাইন্থ ফ্লোর : রোমান্টিক ও দ্বন্দ্বমুখর উপন্যাসটির লেখক আন্দালিব রাশদী। কথাসাহিত্য নিয়ে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। পাশাপাশি প্রবন্ধ ও অনুবাদেও বিচরণ স্বতঃস্ফূর্ত। মেলায় কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর এই উপন্যাস। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। আন্দালিব রাশদীর উপন্যাসটির পটভূমি নগরের যাপিত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা। সেসব তিনি লিখেছেন সহজিয়া ভাষায়। প্রেম, সম্পর্কের টানাপড়েন ইত্যাদি অবলীলায় উঠে এসেছে তাঁর রচনার শরীরে। বইটির মূল্য ১৫০ টাকা।

এই নাও বিষাদ : কবি ও কথাসাহিত্যিক মাহবুব আজীজের কবিতার বই। আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গ চেতনা, হতাশা, বিষাদ এবং তার সঙ্গে যাপিত জীবনের নানা টানাপড়েনকে কবি তুলে ধরেছেন কাব্যপ্রতিমায়। কল্পনা, প্রতীক, দৃশ্যকল্পের নবব্যঞ্জনায় মাহবুব আজীজ পাঠকদের নিয়ে যাবেন এমন এক জাদুবাস্তবতার জগতে, সেখানে ফুটে ওঠে জীবনের গূঢ়তর তাৎপর্য। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ১৫০ টাকা।

তনুর সঙ্গে তিন রাত : খায়রুল বাবুইয়ের গল্পগ্রন্থ। তাঁর গল্পের ভাষা মেদহীন, সতেজ ও প্রাণবন্ত। লেখক এই ভাষায় তুলে ধরেছেন মানুষের স্খলনের কারণ, উত্তরণের শক্তি ও জীবনের নানা অভিজ্ঞান। বইটি প্রকাশ করেছে দেশ পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদ করেছেন দেওয়ান আতিকুর রহমান। দাম ১৮০ টাকা।

অন্যান্য নতুন বই : ফরহাদ মজহারের ‘সদরুদ্দীন’ ও ড. মো. আনোয়ার হোসেনের ‘রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার পথচলা’ (আগামী প্রকাশনী); অধ্যাপক আবু সাইয়িদের ‘ইতিহাসের দায়ভার ও একজন আদুরী’, আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর ‘যা দেখেছি যা পেয়েছি’ (অনন্যা); মোস্তফা কামালের ‘নীল পরির কাণ্ড’, আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘কিশোর উপন্যাস সমগ্র’, মুজিব ইরমের ‘প্রেমের কবিতা’ (পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স); মাহতাব হোসেনের ‘বেজক্যাম্প হোটেলের মধ্যরাত’ (দেশ পাবলিকেশন্স); সালেক খোকনের ‘যুদ্ধাহতের ভাষ্য’, শেখর কুমার সান্যালের ‘একাত্তরের পথে প্রান্তরে’, মনি হায়দারের ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প’ (কথাপ্রকাশ), মোরশেদ শফিউল হাসানের ‘স্বাধীনতা পটভূমি : ১৯৬০ দশক’, সিদ্দিকুর রহমানের অনুবাদে রবার্ট পেইনের ‘সেই দুঃসময়’ (অনুপম); আন্দালীব রাশদীর ‘একাত্তরের দলিল’, সেলিনা হোসেনের ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর উপন্যাস’, শ্যামলী নাসরীন চৌধুরীর ‘ডা. আলীম চৌধুরী’ (আলোঘর) ইত্যাদি।

মোড়ক উন্মোচন : মেলায় প্রকাশিত হয়েছে সাংবাদিক রাজু আহমেদের প্রথম বই ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও দারিদ্র্য বিমোচন’। উন্নয়ন ও অর্থনীতি বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে লেখা ১২টি গবেষণা প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ নিয়ে বইটি প্রকাশ করেছে পালক পাবলিশার্স। আনুষ্ঠানিকভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন লেখকের মা নূরজাহান বেগম।

মেলামঞ্চের আয়োজন : গতকাল বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘এ কে এম আহসান, খান শামসুর রহমান, মুজিবুল হক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। তিন কৃতীকে নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন এম মোকাম্মেল হক, এনামুল হক ও অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ রবিবার বিকেল ৪টায় মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘এ এফ সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ, মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী, এ কে নাজমুল করিম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।



মন্তব্য