kalerkantho


আ. লীগ ও বিএনপির তিনের বিপরীতে তিন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগ ও বিএনপির তিনের বিপরীতে তিন

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তিনজন হেভিওয়েট প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী তিন নেতার নাম প্রচারে আছে। 

তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন আওয়ামী লীগের তিনজন হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে মনোনয়নযুদ্ধই আগামী নির্বাচনের ফল নির্ধারক হবে। ক্ষমতাসীন দলের এ মনোনয়নযুদ্ধে যিনি বিজয়ী হয়ে অন্য দুজনের সমর্থন পাবেন তিনিই এ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) হবেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কেননা আওয়ামী লীগের অন্য দুই হেভিওয়েট নেতা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হলে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে মাঠ কাঁপানো কঠিন হবে।

আওয়ামী লীগ : আসনটিতে আওয়ামী লীগের তিনজন হেভিওয়েট নেতাসহ মোট চারজন মনোনয়ন দৌড়ে আছেন। তাঁরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীরপ্রতীক, সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আহমদ হোসেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্তি ডিআইজি মুক্তিযোদ্ধা মুহ. আবদুল হাননান খান এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মিজবাহুজ্জামান চন্দন।

বর্তমান এমপি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীরপ্রতীক সর্বশেষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিশিষ্ট শিল্পপতি বেলাল জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহেরের ছোট ভাই।

বেলাল আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে প্রথম দলীয় মনোনয়ন পান। হঠাৎ এসে মনোনয়ন পাওয়ায় দলের ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়। এতে তিনটি গ্রুপের সৃষ্টি হয়—বেলাল গ্রুপ, প্রয়াত নেতা সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেনের গ্রুপ ও আওয়ামী লীগের তখনকার কেন্দ্রীয় প্রচার উপকমিটির সহসম্পাদক আহমদ হোসেন সমর্থিত গ্রুপ। তবে মোশাররফ ও আহমদ সমর্থিত গ্রুপটি এক হয়ে ওই নির্বাচনে বেলালের বিরোধিতা করে। ফলে বিএনপির প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ আলীর কাছে বেলাল হেরে যান।

পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের দুটি অংশের বিরোধ চরমে ওঠে।  আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ বেলাল ও আহমদ এ দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন দলীয় মনোনয়ন পান। এতে বেলাল সমর্থিত আওয়ামী লীগের অংশ বিরোধিতা করে। এ নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ আলীর কাছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয় হয়। দুই গ্রুপের বিরোধ আরো চরমে পৌঁছে। মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর সমর্থিত লোকজন আহমদ গ্রুপের সঙ্গে মিশে যায়।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীরপ্রতীক আবার দলীয় মনোনয়ন পান। নির্বাচনে আহমদ হোসেন সমর্থিত গ্রুপটির বিরোধিতা সত্ত্বেও বেলাল বিজয়ী হন।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেলাল আবারও মনোনয়ন পান। নির্বাচনে আর কোনো প্রার্থী না থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

দুইবার এমপি নির্বাচিত হয়ে বেলাল এলাকায় ঘন ঘন আসতে শুরু করেন। স্থানীয় রাজনীতি ও প্রশাসন তাঁর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।

আহমদ হোসেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পেলে তাঁর অনুসারীরা আরো শক্তিশালী হয়। তবে কেন্দ্রীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণে আহমদ হোসেন স্থানীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। তিনি এলাকায় তেমন না এলেও কর্মী-সমর্থকরা তাঁকে স্থানীয় বিভিন্ন ঘটনায় জড়িয়ে রাখে।

এরই মধ্যে বেলাল তাঁর দূর সম্পর্কের ভাগ্নে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম সুজনকে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতে ভূমিকা রাখেন। নিজের অবস্থানকে শক্ত করতে এর আগে একইভাবে আগের নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যান বানিয়েছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন মালুকে। এ দুজনকেই এখন ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন বেলাল।

বেলাল ও আহমদ দুই গ্রুপের বিরোধ এখনো চরমে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন মালু এখন আহমদ সমর্থক। বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম সুজন আহমদ গ্রুপের সবুজ সংকেত না পেয়ে আবারও মামার বাঁশির অপেক্ষায়।

২০১৫ সালের ইউপি নির্বাচন ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে বেলাল ও আহমদ দুই পক্ষই আলাদা আলাদা প্রার্থী দেয়। আহমদের সমর্থকরা অভিযোগ করে, সেই নির্বাচনে আহমদ নিজে এলাকায় উপস্থিত থাকেন এবং তাঁর ভাই আমজাদ হোসেনকে বিষকাকুনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে বিজয়ী করেন। নির্বাচনে ১১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ১০টিতেই বেলাল সমর্থিত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বিজয়ী হন। নির্বাচনে বেলালের ভাগ্নে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম সুজন জয়ী হন। তবে গত বছরের শেষ দিকে মামা-ভাগ্নের বিরোধ শুরু হয়।

উপজেলা চেয়ারম্যান ভাগ্নের সঙ্গে হঠাৎ বিরোধের কারণ কী—জানতে চাইলে এমপি ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান সুজন হঠাৎ করে অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে। সবার কাছ থেকে সুজন বিভিন্ন কাজে টাকা নিয়েছে। আমি ভাবলাম, এমন যদি হয় তাহলে আসছে নির্বাচনে ভোটাররা বলবে, আপনার ভাগ্নের কাছে আমরা টাকা পাই। তখন আমি তাদের কাছে ভোট চাইব কিভাবে? তাই তাকে সরিয়ে দিয়েছি।’

অভিযোগের ব্যাপারে পূর্বধলা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘আমি কারো কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নিয়েছি এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। নিজে ব্যবসা করি। আমার বিরুদ্ধে এসব বলে তিনি আমার ইমেজ নষ্ট করতে চাইছেন।’

এদিকে আহমদ হোসেনও ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছিলেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও পরে ঢাকা বিভাগীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণে এলাকার রাজনীতির অঙ্গনে নিজেকে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করাতে চাননি আহমদ হোসেন।

আহমদ হোসেন বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে যাঁর প্রতি জনগণের আস্থা থাকবে দল তাঁকে মনোনয়ন দেবে। নেত্রী যদি আমাকে মনোনয়ন দেন তাহলে আমি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব এবং বিজয়ী হব।’

বর্তমানে বেলাল ও আহমদের বিরোধের সুযোগে সাধারণ ভোটারদের কাছে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্তি ডিআইজি মুহ. আবদুল হাননান খান। তিনি দলীয় মনোনয়ন পেতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আবদুল হান্নান খান বলেন, ‘আগেও আমি মনোনয়ন চেয়েছিললাম। এবারও চাইব। আশা করছি, দল আমাকে মনোনয়ন দেবে।’

আওয়ামী লীগের উপজেলা, জেলা ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে দলীয় কোনো পদে না থাকায় এ আসনের অন্য হেভিওয়েট প্রার্থীদের ডিঙিয়ে দলীয় মনোনয়ন কিভাবে পাবেন—এ প্রশ্নে হান্নান খান বলেন, ‘দলীয় পদ-পদবি না থাকলে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া যাবে না, এটা ঠিক নয়। আমি ইচ্ছা করে দলীয় পদ নিই নাই। আমি আমার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পদে আছি। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমি তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়েছিলাম।’

দীর্ঘদিন এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে এগিয়ে এসে সবার চোখে পড়ে গেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মিজবাহুজ্জামান চন্দন। তাঁর সম্পর্কে পূর্বধলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সমাজকল্যাণ সম্পাদক আবদুল মালেক তালুকদার বলেন, ‘চন্দন সাহেব একজন উচ্চশিক্ষিত লোক ও বিশিষ্ট সমাজসেবক। এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি আছে। স্থানীয় যুব ও তরুণ সমাজ তাঁর সঙ্গে আছে।’

পূর্বধলা উপজেলার রাজনীতিতে এমপি বেলালের সমর্থকদের সঙ্গে দ্বিধাবিভক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে আহমদ হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এমপির লোকজনরা সব সময় আমার লোকদের ওপর আক্রমণ করে থাকে। আমার লোকজন তা প্রতিহত করে।’

মনোনয়ন চাইবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আহমদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আমার এলাকায় ছাত্রজীবন থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এসেছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে যথেষ্ঠ উচ্চ মর্যাদায় স্থান দিয়েছেন। এ জন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। তবুও সংসদীয় রাজনীতিতে জনপ্রতিনিধির গুরত্ব আছে। তিনি যদি আমাকে মনোনয়ন দেন তাহলে আমি আমার আসনে বিজয়ী হতে পারব।’

বিএনপি : এ আসনে বিএনপিদলীয় মনোনয়ন পেতে যাঁরা মাঠে ও কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা হলেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের তালুকদার, কেন্দ্রীয় নেতা ও নেত্রকোনা জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শরিফ আহমেদ, পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি বাবুল আলম তালুকদার।

উপজেলা বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সাবেক এমপি ডা. মোহাম্মদ আলীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী রাবেয়া আলী স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। আর ডা. মোহাম্মদ আলীর ছোট ভাই সাইদুর রহমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে নতুন কমিটি গঠন হলে তিনি সভাপতির দায়িত্ব না পাওয়ায় ডা. মোহাম্মদ আলীর ভাই-ভাবি কারোই স্থানীয় রাজনীতিতে আর তেমন যোগাযোগ নেই।

এ আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের তালুকদার। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নেতাকর্মীদের নিয়ে দলীয় সব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে দলকে এগিয়ে নিয়ে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর রাখতে জোরালো ভূমিকা পালন করে আসছেন। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা চাচ্ছে আবু তাহের এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাক।

উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক সায়েদ আল মামুন বলেন, ‘সারা জেলায় দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে আবু তাহের তালুকদার একজন ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত। আমরা আশা করছি, তিনি দলীয় মনোনয়ন পাবেন।’                                                                                                

তবে পূর্বধলা উপজেলা বিএনপি সাবেক সভাপতি হাজী আবদুল গনি এ আসনে বিকল্প প্রার্থী চাইছেন। তিনি এ আসনে সাবেক জেলা ছাত্রদলের সভাপতি দলের পরীক্ষিত নেতা শরিফ আহমেদের মনোনয়নের দাবি জানান।

পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক মনিরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর জানান, উপজেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি বাবুল আলম তালুকদার একসময়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে এই পর্যায়ে এসেছেন। উপজেলা বিএনপিকে শক্তিশালী করেছেন তিনি। তিনিও একজন শক্তিশালী প্রার্থী এ আসনের। দল তাঁকে মনোনয়ন দেবে বলে আশা করেন জাহাঙ্গীর।

 


মন্তব্য