kalerkantho


মুসলমানদের দুর্দশার কারণ

মাওলানা আবুল কাসিম নুমানি   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৯:১১



মুসলমানদের দুর্দশার কারণ

মাওলানা আবুল কাসিম নুমানি

যে পরিস্থিতি সারা দুনিয়ায় বিরাজমান- এটা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। প্রিয় নবীজি (সা.) অনেক আগেই তার ভবিষৎবাণী করে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, তোমাদের উপর এমন একটি সময় আসবে, তোমাদের বিরুদ্ধে সকল জাতি এমনভাবে ডাকবে, যেমনটি খাওয়ার দস্তরখানের দিকে লোকদের ডাকা হয়ে থাকে! এ কথা শোনে একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে রাসূল! সে দিন কি আমাদের মুসলিমদের সংখ্যা কম হবে? রাসূল (সা.) বললেন, না, সেদিন তোমরা সংখ্যায় কম হবে না। বরং তোমরা সেদিন আরো অনেক বেশি হবে। তবে তোমরা বন্যার পানির উপরিভাগে ভাসমান খড়কুটার মত হবে। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের দুশমনদের অন্তর থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দেবেন। আর তোমাদের অন্তরে ওহান ডেলে দেবেন। এক লোক দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ওহান জিনিসটি কী? আল্লাহর রাসূল বললেন, দুনিয়ার মহব্বত আর মৃত্যুকে অপছন্দ করা।

আজ সারা বিশ্বে মুসলমানরা সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বাধিক জনসংখ্যা। কমপক্ষে ২২টি দেশ আছে মুসলমানদের; যেখানে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা ও রাজত্ব। তা ছাড়া অনেক দেশ এমন আছে; যেখানে প্রচুর সংখ্যক মুসলমানের বসবাস।

সারা দুনিয়ার মুসলমানদের যদি গণনা করা যায় তবে তাদেরকে স্বল্পসংখ্যক বলা যাবে না। তো নবীজি বলেছেন, বাহ্যত ওইসময় তোমরা সংখ্যায় অধিক হবে। আজ মুসলমানদের কত রাষ্ট্র আছে, কত ধন-সম্পদ আছে, তেলের খনিগুলো তাদেরই দখলে। কিন্তু এসব থাকা সত্ত্বেও মুসলমান আজ লাঞ্চিত, বঞ্চিত, তাদের কোনো শক্তি-ক্ষমতা নেই। এর কারণ কী? দুইটি কারণ এসবের পেছনে: দুনিয়ার মহব্বত এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা। দুনিয়ার মহব্বত-এর ব্যাখ্যা কী? দুইটি বিষয় আছে এখানে। নবীজি বলেন, "যে দুনিয়া ভালোবাসল সে আখেরাতের ক্ষতি সাধন করবে আর যে আখেরাত ভালোবাসল সে দুনিয়ার ক্ষতি সাধন করবে। অতএব তোমরা প্রাধান্য দাও এমন বিষয়কে যা উপকারী তার ওপর যা নিঃশেষ হয়ে যাবে। " তো দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টা পুরোপুরিভাবে একইসঙ্গে অর্জন করা যাবে না। দুনিয়ার সবকিছু অর্জন করতে গেলে আখেরাতের আমলে কিছু না কিছু ব্যাঘাত ঘটবেই আর আখেরাতের পূর্ণ সফলতা অর্জন করতে চাইলে দুনিয়ার কিছু না কিছু বিসর্জন বরদাশত করতে হবে। সুতরাং চিরস্থায়ী মুনাফাকে ক্ষণস্থায়ী উপকারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। নবীজি ইরশাদ করেন, "দুনিয়ার মহব্বত সব গোনাহের মূল। " মানুষ কেন মিথ্যা বলে? কেন বেইমানি করে? কেন দুর্নীতি করে? খুনখারাবি কেন করে? অবশ্যই তার পেছনে দুনিয়াবি কোনো না কোনো ফায়দা নিহিত থাকে।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, মুসলমানদেরকে নিজেদের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এই পরিবর্তন কী হতে পারে? সারা দুনিয়া আজ মুসলমানদের বিরুদ্ধে, ইসলামের বিরুদ্ধে। এর সঙ্গে যতসব উপায় থাকতে পারে ইসলাম ও মুসলমানদের বদনাম করার, তাদের কলুষিত করার- সেইসবের মাধ্যম ও উপকরণগুলো প্রয়োগ করা হচ্ছে, সব চেষ্টা-তদবির পরিচালিত হচ্ছে। এই যুগ প্রোপাগান্ডার যুগ। আজকের দর্শন তো এই যে, মিথ্যা এত বেশি বলতে থাক যাতে করে স্বয়ং মিথ্যাবাদীর এই আশংকা সৃষ্টি হয়ে যায় যে, তবে এটি সত্য নয় তো! আজ এত বেশি এবং এত দৃঢ়ভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে মিথ্যা বলা হচ্ছে, প্রোপাগান্ডা করা হচ্ছে যে, যাতে স্বয়ং মুসলমান নিজেদের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং নিজেদের ব্যাপারে হীনম্মন্যতায় ভোগে। বড়ই আশ্চর্যের কথা যে, কিছুদিন পূর্বেও ধর্মপ্রাণ মুসলমান, দাঁড়ি-টুপি-পাঞ্জাবি পরিহিত মুসলমানকে সমাজে সম্মানিত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি মনে করা হতো। কিন্তু আজ পরিবেশ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, যেসব ব্যক্তি দ্বীনদার, যারা দাঁড়ি-টুপি-পাঞ্জাবি পরেন, যারা ধর্মকর্ম পালন করেন- সমাজে তাদেরকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। তাদেরকে অবিশ্বস্ত এবং অনির্ভরযোগ্য বিবেচনা করা হচ্ছে। আজ মুসলমানদের কখনও টেরোরিস্ট বলা হচ্ছে, কখনও আরও কত কিছু বলা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে, ইসলাম, মুসলমান, মসজিদ ও মাদরাসার প্রকৃত রূপ বিশ্বদরবারে তুলে ধরা হচ্ছে না অথবা পর্যাপ্ত পরিমাণে এ বিষয়ে কাজ হচ্ছে না। এজন্য প্রথমে আমরা নিজেদের আমল-আখলাক ঠিক করতে হবে। আমাদেরকে যেই জীবনবিধান প্রদান করা হয়েছে তার সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু আখলাক ও মুয়ামালাত আছে, যেখানে মুসলিম-অমুসলিমের মাঝে কোনো তফাৎ করা হয় নি। অতএব এসব বিষয়ে অমুসলিমদের সঙ্গে আমাদের ব্যবহার দুরস্ত হওয়া চাই। অমুসলিমের সঙ্গেও মিথ্যা বলা যাবে না, তাকে ধোঁকা দেয়া যাবে না।

তেমনিভাবে প্রতিবেশীর সঙ্গেও উত্তম ব্যবহারের যেসব শিক্ষা দেয়া হয়েছে; নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, "আল্লাহর কসম! ওই ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! ওই ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! ওই ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হল, কে সেই ব্যক্তি? বললেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়। " এখানে তো কোনো ব্যবধান করা হয় নি যে, প্রতিবেশী মুসলমান না ইহুদি না ভিন্ন কোনো ধর্মাবলম্বী। প্রতিবেশী যেই হোক, আমাদের প্রতিবেশী হওয়ার কারণে সে আমাদের পক্ষ থেকে সবরকমের উত্তম ব্যবহার পাওয়ার হকদার।

লেনদেন, ব্যবসাবাণিজ্য সর্বত্র আমাদের আচরণ এমন হওয়া চাই; যেন তা অন্যদের জন্য আদর্শ হয়। তেমনি আমানত ও বিশ্বস্ততার ক্ষেত্রেও।

আমরা আমাদের আখলাক, আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করব, লোকদের নিকট ইসলামের পরিচিতি পেশ করব। ইসলাম আমাদেরকে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার শিক্ষা দেয়।

এবার আসুন দ্বিতীয় বিষয়ে। মুসলমানদের অধঃপতন ও অপদস্থ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হাদিসে বলা হয়েছে, মৃত্যুকে অপছন্দ করা। ঈমানদারের বিশ্বাস তো এই যে, মানুষ যখন দুনিয়ায় আগমন করে তখন তার মৃত্যুর সময় নির্ধারিত হয়েই আসে। সেই নির্ধারিত সময় থেকে একমুহূর্তও আগ-পিছ হবে না। অতএব মুমিন একমাত্র আল্লাহকে ভয় করবে। মৃত্যু তো আসবেই, যদিও কেউ পরিবেষ্টিত দুর্গেও থাকে। যেই মৃত্যুর ভয় আমাদের অপদস্থ হওয়ার একটি কারণ সেই ভয় ও ভীতিকে অন্তর থেকে বের করে ফেলুন। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করাকে পছন্দ করবে আল্লাহও তার সাক্ষাত পছন্দ করবেন আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাত অপছন্দ করবে আল্লাহও তার সাক্ষাত অপছন্দ করবেন। অর্থাৎ যে মৃত্যুকে অপছন্দ করবে। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়িশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসূল! আমরা প্রত্যকেই তো স্বভাবত মৃত্যুকে অপছন্দ করি? মৃত্যুকে কেউ পছন্দ করবে না। প্রত্যেকের নিকট তার জীবন প্রিয় হয়ে থাকে। নবীজি আয়িশাকে বললেন, এটা উদ্দেশ্য নয়। স্বভাবত মৃত্যুকে অপছন্দ করাকে এখানে বোঝানো হয় নি। আল্লাহর প্রিয় বান্দা যারা, যারা সারাজীবন আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী পরিচালনা করেছে- তাদের রূহ নেওয়ার জন্য জান্নাতের ফেরেশতা আসবেন, তাদের সামনে জান্নাতের নিয়ামতরাজি ভেসে উঠবে- তারা তখন আল্লাহর সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়বেন। পক্ষান্তরে যারা সারাজীবন আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরোধিতা করেছে, বরং দ্রোহিতা করেছে- তাদের মৃত্যুর সময় জাহান্নামের ফেরেশতা আসবেন এবং জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি তাদের সামনে ভেসে উঠবে- তারা তখন মৃত্যুকে অপছন্দ করবে। মোটকথা, হাদিসের এই অংশের ব্যাখ্যা হলো, এমনভাবে জীবন পরিচালনা করো যাতে মৃত্যুর সময় দিল আল্লাহর সাক্ষাতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। এমন জীবন যাপন করা থেকে বেঁচে থাকো, যার কারণে মৃত্যুর সময় শুধু ভীতি আর ভীতি হয়। সুতরাং আমাদেরকে এমন জীবন গঠন করতে হবে, যাতে করে মৃত্যুর সময় যখন আসবে, আনন্দের সহিত আল্লাহর সাক্ষাত লাভের আশা নিয়ে মরতে পারি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

(গত ৮ এপ্রিল'১৭ তারিখে পাকিস্তানের পেশাওয়ারে জমিয়তের শতবার্ষিকী সম্মেলনে প্রদত্ত দারুল উলুম দেওবন্দের স্বনামধন্য মুহতামিম সাহেবের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের বাংলা অনুবাদ)

ভাষান্তর : মাহফুয আহমদ


মন্তব্য